উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের ফাইনালে বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ১টায় ইউরোপিয়ান পরাশক্তি স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে এই মাঠের লড়াইয়ের সমান্তরালে ফুটবল বিশ্বে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আলবিসেলেস্তেদের ডাগআউট। ফুটবলপ্রেমী ও বোদ্ধাদের মনে একটাই প্রশ্ন— বিশ্বকাপের ফাইনালই কি আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে লিওনেল স্ক্যালোনির শেষ ম্যাচ হতে যাচ্ছে?
২০১৮ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর স্ক্যালোনি নিজেকে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তবে বিশ্বকাপের পর মেসি-পরবর্তী যুগে তিনি দলের দায়িত্বে থাকবেন কিনা, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।
আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে ব্রাজিলের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ‘গ্লোবো স্পোর্টস’ জানিয়েছে, স্কালোনির বর্তমান চুক্তির মেয়াদ চলতি ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে তার চুক্তিতে এমন একটি বিশেষ ধারা বা ‘ক্লজ’ রয়েছে, যার মাধ্যমে এই বিশ্বকাপ শেষেই তিনি চাইলে কোচের দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি নিতে পারেন।
অবশ্য বিশ্বকাপে আসার ঠিক আগে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তার চুক্তি নবায়নের একটি প্রাথমিক মৌখিক সম্মতি হয়েছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে সেই চুক্তি এখনও চূড়ান্ত রূপ পায়নি এবং কোনও আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরও হয়নি। বিশ্বকাপ চলাকালীন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ৪৮ বছর বয়সী এই মাস্টারমাইন্ড সবসময়ই প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছেন। তার সাফ কথা ছিল, পুরো মনোযোগ কেবল মাঠের খেলায়। তবে ফাইনালের পরই হয়তো আলবিসেলেস্তেদের ভবিষ্যৎ এবং সেখানে স্ক্যালোনির ভূমিকা কী হবে— তা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার পর হোর্হে সাম্পাওলিকে বরখাস্ত করে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। সে সময় সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ও অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে ডাগআউটের দায়িত্ব পান স্ক্যালোনি। তখন দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিও স্কালোনির যোগ্যতা নিয়ে বড় সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে সব সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই ‘অচেনা’ কোচই ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন দীর্ঘ ৩৬ বছরের আরাধ্য সোনালী ট্রফি।
৪৮ বছর বয়সী স্কালোনির অধীনে এখন পর্যন্ত ৮১টি ম্যাচ জিতেছে আর্জেন্টিনা, বড় ট্রফি জয় ৪টি। ২০২১ সালে তার অধিনেই ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জেতে আলবিসেলেস্তেরা। এরপর ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা।
চলতি বিশ্বকাপেই কেপ ভার্দের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ইতিহাসে দ্বিতীয় কোচ হিসেবে অনন্য ‘১০০ ম্যাচ’ পরিচালনার মাইলফলক স্পর্শ করেছেন স্ক্যালোনি। ইতোমধ্যে তার অধীনে ১০৩টি ম্যাচ খেলে ফেলেছে আলবিসেলেস্তেরা, যার মধ্যে এসেছে রেকর্ড ৭৬টি জয়, ১৮টি ড্র এবং মাত্র ৯টি পরাজয়।
এই সোনালী সময়ে স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৪টি বড় ট্রফি— কোপা আমেরিকা (২০২১), ফিনালিসিমো (২০২২), ফিফা বিশ্বকাপ (২০২২) ও কোপা আমেরিকা (২০২৪)।
আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ডাগআউটে থাকার রেকর্ডটি রয়েছে কিংবদন্তি গিলের্মো স্তাবিলের। তিনি দুই দফায় মোট ১২৪টি ম্যাচে আলবিসেলেস্তেদের কোচের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। স্তাবিলের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ম্যাচ এবং সাফল্যের দিক থেকে অন্যতম সেরা হিসেবে স্ক্যালোনি নিজেকে অমর করে রেখেছেন। এখন দেখার বিষয়, এবারের ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ জিতে স্ক্যালোনি তার এই মহাকাব্যিক অধ্যায়ের ইতি টানেন, নাকি ২০৩০ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ডাগআউট আগলে রাখার নতুন মিশন শুরু করেন।









