আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জার্সি গায়ে যখন লিওনেল মেসি মাঠে নামেন, তখন কোটি দর্শকের চোখ পড়ে সেই আকাশনীল-সাদা ডোরায়। কিন্তু জাতীয় পতাকার মাঝখানে যে সোনালি সূর্যটা জ্বলজ্বল করে— মানুষের মুখের মতো আঁকা, রশ্মি ছড়ানো— তার গল্পটা অনেকেরই অজানা। একই সূর্য জ্বলে উরুগুয়ের পতাকায়ও। দুটো আলাদা দেশের পতাকায় একই প্রতীক কেন?
এই প্রতীকটির নাম ‘সোল দে মায়ো’, ইংরেজিতে ‘সান অব মে’, বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘মে মাসের সূর্য’।
মে বিপ্লব: সোল দে মায়ো
এই সূর্যের পেছনে আছে একটি কিংবদন্তি।
২৫ মে, ১৮১০। সেই দিনটি লাতিন আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক মাইলফলক। বুয়েনস এইরেসের প্লাজা দে মায়োতে তখন হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন। স্পেনীয় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আকাশ ছিল মেঘলা। তারপর হঠাৎ ঘন মেঘ সরে গিয়ে আকাশে উঠলো উজ্জ্বল সূর্য। ইতিহাসে এই দিনটিকে ‘মে বিপ্লব’ নামেও অভিহিত করা হয়।
প্রচলিত কিংবদন্তি বলে, সেই মুহূর্তে জড়ো হওয়া জনতা এটাকে দেখলেন ঈশ্বরের অনুমোদনের ইঙ্গিত হিসেবে, যেন প্রকৃতি নিজেই বলছে, এই বিপ্লব সফল হবে।
১৮১৩ সালে রিও দে লা প্লাতার ঐক্যবদ্ধ প্রদেশগুলোর ‘অ্যাসেম্বলি অব ইয়ার থার্টিন’ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে এই সূর্যকে জাতীয় সিলমোহরে অন্তর্ভুক্ত করে। যা পরে আর্জেন্টিনার জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়। একই বছর প্রথম জাতীয় মুদ্রায়ও এই সূর্যের ছবি ব্যবহার করা হয়।
সেই সূর্যই আজ আর্জেন্টিনার পতাকায়, উরুগুয়ের পতাকায়— ‘সোল দে মায়ো’, মে মাসের সূর্য। বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই সূর্যের মুখোমুখি স্পেন, যে স্পেনের কাছ থেকে ২১৬ বছর আগে মুক্তি আদায় করে নিয়েছিল আর্জেন্টিনা।
ইনকা সভ্যতার দেবতা থেকে পতাকার প্রতীক
সোল দে মায়োর নকশাটি মূলত ইনকা সভ্যতার সূর্যদেবতা ইন্তির প্রতিনিধিত্ব করে। ইনকারা সূর্যকে জীবনদাতা শক্তি হিসেবে পূজা করতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, তাদের শাসক বা ‘সাপা ইনকা’ সরাসরি সূর্যের বংশধর। আন্দিজ পর্বতমালা থেকে আটলান্টিক উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ইনকা সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে ছিল সূর্যমন্দির।
পেরুর ইনকা বংশোদ্ভূত হুয়ান দে দিওস তুপাক আমারু (১৭৬০-১৮৪৩) সোল দে মায়োর নকশাটি তৈরি করেন। তবে মজার বিষয় হলো, কোনও সমসাময়িক সূত্র সরাসরি ইনকা উৎসকে নিশ্চিত করে না। এই দাবি পরে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক রচনার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। প্রকৃতপক্ষে সোল দে মায়োর নকশা ইউরোপীয় হেরাল্ড্রিতে সূর্যের দীর্ঘ ব্যবহারেরও উত্তরাধিকারী।
ম্যানুয়েল বেলগ্রানো ও আর্জেন্টিনার পতাকা
জেনারেল ম্যানুয়েল বেলগ্রানো ১৮১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার পতাকা তৈরি করেন। রোসারিও শহরে, পারানা নদীর তীরে। বেলগ্রানো ছিলেন একজন আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ ও সামরিক নেতা যিনি আর্জেন্টিনার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছিলেন।
আর্জেন্টিনার পতাকায় সূর্যের ৩২টি রশ্মি আছে— ১৬টি সরল ও ১৬টি ঢেউখেলানো, পর্যায়ক্রমে সাজানো। সূর্যের মাঝখানে মানুষের মুখের মতো আঁকা একটি মুখমণ্ডল রয়েছে। এই ধরনের নকশা প্রাক-কলম্বিয়ান আন্দিয়ান শিল্পকলায় পাওয়া যায়।
উরুগুয়ে কেন একই সূর্য ব্যবহার করলো?
এখানেই গল্পটা আরও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে। উরুগুয়ের পতাকায় সোল দে মায়ো ১৮১০ সালের মে বিপ্লবের প্রতিনিধিত্ব করে। রিও দে লা প্লাতা অঞ্চলে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনার প্রতীক হিসেবে। কারণটা ইতিহাসের মধ্যেই আছে। আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে একসময় একই ঔপনিবেশিক (স্পেনীয়) প্রশাসনের অধীনে ছিল। রিও দে লা প্লাতার ভাইসরয়্যালটি, যা স্পেনীয় শাসনের অধীনে ছিল, সেটি ভেঙে দুটো আলাদা দেশ জন্ম নেয়।
১৮২৮ সালে উরুগুয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পতাকার নীল-সাদা ডোরা আর্জেন্টিনার পতাকা থেকে অনুপ্রাণিত, আর সোল দে মায়ো দুই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভাগ করা ঐতিহ্যের প্রতীক।
আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে একই সোল দে মায়ো ভাগ করে নেওয়াকে দুই দেশের মধ্যে একটি বন্ধনের প্রতীক হিসেবে দেখে।
দুই পতাকার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
দেখতে একই মনে হলেও দুই দেশের সোল দে মায়োতে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। আর্জেন্টিনার পতাকার সূর্যে রশ্মির সংখ্যা ভিন্ন। আর উরুগুয়ের পতাকার সূর্যের চূড়ান্ত নকশা ১৯৫২ সালে একটি ডিক্রির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়। একই ডিক্রিতে পতাকার ডোরার রং নীল হিসেবে নির্ধারিত করা হয়, আর্জেন্টিনার হালকা আকাশনীল থেকে আলাদা করে।
ফুটবল মাঠে সোল দে মায়ো
বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের পতাকা একসঙ্গে উড়তে দেখা যায়, তখন দর্শকরা হয়তো ভাবেন দুটো আলাদা পতাকায় কেন একই সূর্য। আসলে এটা কোনও কাকতালীয় নয়, এটা দুটো দেশের একই রক্তের প্রমাণ, একই স্বপ্নের উত্তরাধিকার।
আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের আইকনিক আকাশনীল-সাদা জার্সি সরাসরি জাতীয় পতাকা থেকে অনুপ্রাণিত। তাই মেসি যখন সেই জার্সিতে মাঠে নামেন, তখন তিনি পিঠে বহন করেন ইনকা সভ্যতার সূর্যদেবতা ইন্তি থেকে শুরু করে ১৮১০ সালের মে বিপ্লব পর্যন্ত এক দীর্ঘ ইতিহাসের ভার।









