একসময় ইংলিশ ফুটবলে জাপানি ফুটবলার মানে ছিল বিরল এক দৃশ্য। এখন সেই ছবিই বদলে গেছে। নতুন মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে জাপানি ফুটবলারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১০ জনে। ট্রান্সফার উইন্ডো বন্ধ হওয়ার আগে সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে। কেন হঠাৎ জাপানি ফুটবলারদের দিকে এত ঝুঁকছে ইংলিশ ক্লাবগুলো?
উত্তরটা খুব সহজ- মানসম্পন্ন খেলোয়াড়, দাম তুলনামূলক কম এবং ঝুঁকিও কম। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে নিজেদের প্রমাণ করে আসা জাপানি খেলোয়াড়দের মানসিকতা, শৃঙ্খলা ও দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও এখন ক্লাবগুলোর কাছে বড় আকর্ষণ।
এবারের মৌসুম শুরুর সময় ইংল্যান্ডের শীর্ষ পর্যায়ের ক্লাবগুলোতে নিবন্ধিত ছিলেন জাপানের ১০ ফুটবলার। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম জিওন সুজুকি। ইতালির পার্মা ছেড়ে অ্যাস্টন ভিলায় যোগ দিয়েছেন তিনি।
লন্ডনে ফিরেছেন সাবেক আর্সেনাল ডিফেন্ডার তাকেহিরো তোমিয়াসু। এবার তিনি ক্রিস্টাল প্যালেসের জার্সিতে। মিডফিল্ডার হিদেমাসা মরিতা যোগ দিয়েছেন হাল সিটিতে। আর সেল্টিক ছেড়ে দাইজন মায়েদা গেছেন ইপসউইচ টাউনে।
তাদের সঙ্গে প্রিমিয়ার লিগে আগে থেকেই নিজেদের জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন ব্রাইটনের কাওরু মিতোমা, লিভারপুলের ওয়াতারু এন্দো ও ক্রিস্টাল প্যালেসের দাইচি কামাদা।
ফিফা নিবন্ধিত এজেন্ট জোয়েল প্যানিকের মতে, ইংলিশ ক্লাবগুলোর মধ্যে জাপানি খেলোয়াড়দের নিয়ে আস্থা অনেক বেড়েছে।
তার ভাষায়, জাপানি ফুটবলার দলে নেওয়ার পর মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা, ব্যক্তিত্ব, দলের সঙ্গে একীভূত হওয়া কিংবা শৃঙ্খলা নিয়ে সমস্যার উদাহরণ খুব বেশি নেই। ফলে একসময় যে ‘অজানা’ নিয়ে ভয় ছিল, সফল জাপানি খেলোয়াড়দের একের পর এক উদাহরণ সেটি অনেকটাই দূর করে দিয়েছে। অর্থাৎ, একজন জাপানি খেলোয়াড় সফল হলে পরের জনকে দলে নেওয়া আরও সহজ হয়ে যাচ্ছে।
ইংল্যান্ডের শীর্ষ পর্যায়ে থাকা জাপানিদের তালিকায় রয়েছেন লিডসের আও তানাকা, টটেনহামের কোটা তাকাই এবং কভেন্ট্রির তাতসুহিরো সাকামোতো।
জাপানের হয়ে ৪১ ম্যাচ খেলা মিডফিল্ডার তানাকা দুই বছর আগে জার্মানির ফরচুনা ডুসেলডর্ফ থেকে মাত্র ৩.৩ মিলিয়ন পাউন্ডে লিডসে যোগ দিয়েছিলেন। এমন মূল্যও জাপানি খেলোয়াড়দের প্রতি ক্লাবগুলোর আগ্রহ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
আর ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় স্তর চ্যাম্পিয়নশিপেও এখন রয়েছেন আটজন জাপানি ফুটবলার। অর্থাৎ প্রিমিয়ার লিগে ওঠার আগে ইংলিশ ফুটবলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি কার্যকর সিঁড়িও তৈরি হয়েছে তাদের জন্য।
অবশ্য ইংল্যান্ডে জাপানি ফুটবলের যাত্রা নতুন নয়। ২০০১ সালে জুনিচি ইনামোতো আর্সেনালে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এক বছর পর ফুলহ্যামে চলে যাওয়ার আগে লিগে একটি ম্যাচও খেলতে পারেননি তিনি। তারপর ধীরে ধীরে বদলেছে গল্প।
শিনজি কাগাওয়া, শিনজি ওকাজাকি, তাকুমি মিনামিনো ও ওয়াতারু এন্দো- জাপানের একাধিক ফুটবলার ইংল্যান্ডে গিয়ে লিগ শিরোপার পদক জিতেছেন।
এবার ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় সুজুকি। ২৪ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক যদি অ্যাস্টন ভিলার হয়ে মাঠে নামেন, তাহলে প্রিমিয়ার লিগে খেলা প্রথম জাপানি গোলরক্ষক হিসেবে ইতিহাসে নাম লিখবেন তিনি।
জাপানের অভিজ্ঞ ফুটবল সাংবাদিক ইয়োশিউকি ওসুমি মনে করেন, গোলরক্ষক হিসেবে সুজুকি সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তার মতে, সুজুকি যদি প্রিমিয়ার লিগে গোলরক্ষক হিসেবে খেলতে পারেন, তাহলে জাপানের ফুটবলে সেটির বড় প্রভাব পড়বে। সুজুকির জন্য বাড়তি সুবিধা—তিনি ইতোমধ্যে ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে পারেন।
ইউরোপে সফল হওয়ার জন্য শুধু মাঠের দক্ষতাই যথেষ্ট নয়—ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা বিষয়টি আগের চেয়ে বেশি বুঝতে পারছেন।
এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছেন সাবেক জাপান অধিনায়ক মায়া ইয়োশিদা। ২০২২ বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলের অধিনায়ক থাকাকালে তিনি সতীর্থদের ইংরেজিতে কথা বলার ব্যাপারে জোর দিতেন।
প্যানিকের ভাষ্য অনুযায়ী, সাউদাম্পটনে প্রায় আট বছর কাটানো ইয়োশিদা এমনকি দুপুরের খাবারের টেবিলেও সতীর্থদের ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে উৎসাহিত করতেন। তার লক্ষ্য ছিল খেলোয়াড়দের আরও বৈশ্বিক মানসিকতা তৈরি করা।
এর ফলও এখন দেখা যাচ্ছে। বর্তমান জাপান জাতীয় দলের অধিকাংশ নিয়মিত ও বিশ্বকাপ স্কোয়াডের খেলোয়াড়ই মোটামুটি ভালো ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন।
এখানে আরও উল্লেখ্য, বেশির ভাগ জাপানি ফুটবলার সরাসরি প্রিমিয়ার লিগে আসছেন না। আগে তারা বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস কিংবা পর্তুগালের মতো ইউরোপীয় লিগে খেলছেন। এরপর ধীরে ধীরে আরও বড় মঞ্চে উঠছেন।
চ্যাম্পিয়নশিপও এখন তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির জায়গা হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রেক্সিট-পরবর্তী ইংল্যান্ডের ওয়ার্ক পারমিটের নিয়ম। ইউরোপের ভেতর থেকেই খেলোয়াড় নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসায় ইংলিশ ক্লাবগুলোকে এখন ইউরোপের বাইরেও বেশি নজর দিতে হচ্ছে। আর সেখানে জাপানিদের প্রমাণিত সাফল্য তাদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
জাপানি সাংবাদিক ওসুমির মতে, শুধু খেলোয়াড়দের মানই বাড়েনি, প্রিমিয়ার লিগের ধরনও বদলেছে। এখন লিগে কৌশলগত ফুটবল ও দলগত সমন্বয়ের গুরুত্ব আগের চেয়ে বেশি।
তার মতে, এই ধরনের সমন্বিত ফুটবল জাপানি খেলোয়াড়দের জন্য মানিয়ে নেওয়া তুলনামূলক সহজ। ফলে একসময় যেখানে জাপানি ফুটবলারদের নিয়ে ছিল অজানা ঝুঁকি, এখন সেই জায়গায় তৈরি হয়েছে আস্থা।









