বৃষ্টি নামবে কি না, ঝড়ের গতিপথ কোন দিকে মোড় নেবে কিংবা কোনও এলাকায় আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন হবে কি না—এসব পূর্বাভাস আরও নির্ভুল ও দ্রুত করতে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল ‘ওয়েদারনেক্সট ৩’ উন্মোচন করেছে গুগল ডিপমাইন্ড ও গুগল রিসার্চ। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বৈশ্বিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়েদারনেক্সট ৩ তাদের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উন্নত ও নির্ভুল এআই মডেল। গত ৩ সেপ্টেম্বর গুগলের অফিসিয়াল ব্লগ পোস্টে নতুন এই মডেল উন্মোচনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ওয়েদারনেক্সট ৩ গুগলের আগের সব আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেলের তুলনায় অনেক দ্রুত কাজ করতে পারে। আগের ‘ওয়েদারনেক্সট ২’ মডেলে ছয় ঘণ্টা পরপর পূর্বাভাস দেওয়ার সীমাবদ্ধতা ছিল। নতুন মডেলটি এখন প্রতি ঘণ্টায় নতুন পূর্বাভাস তৈরি করতে পারে। ফলে বৃষ্টি, তুষারপাত বা ঝড়ের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া পূর্বসূরি মডেলের তুলনায় ওয়েদারনেক্সট ৩-এ ২ দশমিক ৪ গুণ বেশি প্যারামিটার রয়েছে।
পরীক্ষায় নির্ভুলতায় এগিয়ে
ব্রাইটব্যান্ডের তৈরি ‘অপারেশনাল ওয়েদারবেঞ্চ’ বেঞ্চমার্কে বিভিন্ন এআইভিত্তিক আবহাওয়া মডেলের সঙ্গে পরীক্ষা চালিয়ে ওয়েদারনেক্সট ৩ সবচেয়ে নির্ভুল ফল দিয়েছে বলে জানিয়েছে গুগল। এই পরীক্ষায় তাপমাত্রা, বাতাসের গতি ও আর্দ্রতার মতো বিভিন্ন সূচক বিবেচনা করা হয়।
পরীক্ষায় গুগল, মাইক্রোসফট ও এনভিডিয়ার তৈরি অন্যান্য ডিপ-লার্নিং আবহাওয়া মডেলের পাশাপাশি ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস (ইসিএমডব্লিউএফ)-এর মডেলকেও ছাড়িয়ে গেছে ওয়েদারনেক্সট ৩। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস ও ইসিএমডব্লিউএফ-এর প্রচলিত আবহাওয়া পূর্বাভাসের সঙ্গেও তুলনায় ভালো ফল করেছে মডেলটি।
স্যাটেলাইটের তথ্যও কাজে লাগাবে
নতুন মডেলটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট তথ্য সরাসরি এআই মডেলে ব্যবহার করা। প্রচলিত আবহাওয়া বিশ্লেষণের তথ্যের পাশাপাশি স্যাটেলাইটের সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন আবহাওয়া স্টেশনের তথ্য দিয়েও মডেলটি প্রশিক্ষিত হয়েছে।
মডেলটিতে আবহাওয়া পূর্বাভাসের স্থানিক রেজল্যুশনও বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, কতটা ছোট ভৌগোলিক এলাকার জন্য আলাদাভাবে পূর্বাভাস দেওয়া যাবে, সেই সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ওয়েদারনেক্সট ৩ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মতো তথ্য ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত রেজল্যুশনে এবং বাতাসের গতিসহ অন্যান্য তথ্য ১০ কিলোমিটার রেজল্যুশনে পূর্বাভাস দিতে পারে।
ফলে আগের তুলনায় ছোট এলাকার আবহাওয়ার পরিবর্তনও আরও বিস্তারিতভাবে শনাক্ত ও পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।
বৃষ্টির পূর্বাভাসেও উন্নতি
বিশেষ করে বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে বড় উন্নতির দাবি করেছে গুগল। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে আগের মডেলের তুলনায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুলতা বাড়তে পারে।
এ ধরনের উন্নতি কৃষি, পরিবহন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও দৈনন্দিন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসেও কাজে আসবে
ওয়েদারনেক্সট ৩ শুধু সাধারণ আবহাওয়ার তথ্যের জন্য নয়, ঘূর্ণিঝড়ের মতো চরম দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিশ্লেষণেও কাজে লাগবে। এর আগের ওয়েদারনেক্সট মডেল ইতিমধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও তীব্রতা পূর্বাভাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে।
গুগলের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের হারিকেন ‘মেলিসা’-এর ক্ষেত্রে মডেলটি সম্ভাব্য তীব্রতা ও গতিপথ সম্পর্কে আগাম পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছিল। নতুন মডেলটি এমন বিরূপ আবহাওয়ার ক্ষেত্রে আরও নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়ার মাধ্যমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও ব্যবহার
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্যও বিশেষ পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে ওয়েদারনেক্সট ৩-এ। মডেলটি মাটি থেকে প্রায় ১০০ মিটার উচ্চতায় বাতাসের গতি, মেঘের আচ্ছাদন ও সৌর বিকিরণের পূর্বাভাস দিতে পারে।
এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আগাম বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ অনুমান এবং উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবে।
ওয়েদারনেক্সট ৩ মডেলটি ইতিমধ্যে গুগল সার্চ, জেমিনি, গুগল ম্যাপস, গুগল ম্যাপস প্ল্যাটফর্মের ওয়েদার এপিআই এবং গুগল আর্থ ইঞ্জিনের আবহাওয়া-সংক্রান্ত সেবায় ব্যবহার শুরু হয়েছে।
তবে এত উন্নত সক্ষমতার পরও আবহাওয়ার সরকারি পূর্বাভাস বা দুর্যোগসংক্রান্ত সতর্কতার বিকল্প হিসেবে ওয়েদারনেক্সট ৩ ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছে গুগল। গুরুতর আবহাওয়া, জননিরাপত্তা সতর্কতা ও সরকারি পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের নিজ নিজ দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর বা জাতীয় আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।









