তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রণোদনা হবে সমৃদ্ধির সোপান

Send
মো. শাহিদ-উল-মুনীর
প্রকাশিত : ১৪:০৭, মে ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০২, মে ১৪, ২০২০

মো. শাহিদ-উল-মুনীরবিশ্বায়নের এই যুগে লকডাউনের কঠিন মুহূর্তকেও আমরা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ফলপ্রসূ করে তুলেছি। কিন্তু সত্যিই কি ভালো আছে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি সংগঠন থেকে শুরু করে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাঝারি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা? ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার পর লাখো তরুণ-তরুণী স্বল্প পুঁজি নিয়ে অথবা খালি হাতে নিজের মেধা ও সৃষ্টিশীল মনোভাবের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে এই খাতকে সমৃদ্ধ করতে এগিয়ে এসেছিলেন। তাই তাদের প্রতি দেশের দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জয়যাত্রায় মাত্র ১০ বছরেই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প’ অর্জন করে আন্তর্জাতিক সম্মাননা। আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভেনে আইসিটির অলিম্পিক খ্যাত ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অন আইটি (ডব্লিউসিআইটি)-তে চেয়ারম্যান অ্যাওয়ার্ডটি গ্রহণ করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশের একমাত্র প্রতিনিধি সংগঠন বিসিএস এবং আইসিটি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে দেশে অনুষ্ঠিত হবে তথ্যপ্রযুক্তির এই বিশ্ব সম্মেলন (ডব্লিউসিআইটি-২০২১)। তথ্যপ্রযুক্তির এই মহাসম্মেলনে এগিয়ে যাওয়ার গল্পগুলো আমরা সারা বিশ্বকে জানানোর একটি সুযোগ পাবো। কাজেই এই সময়টি আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৮৭ সালে ১১ জন সদস্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব দেওয়া সবচেয়ে পুরনো এবং বর্তমানের সর্ববৃহৎ সংগঠন। ২ হাজার ৩১১ জন সদস্যের দেশের প্রতিটি বিভাগে নিজস্ব শাখা কার্যালয় স্থাপন করে এই বৃহৎ সংগঠনটি সারা দেশে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার এবং জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিসিএস’র সঙ্গে এই যাত্রায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য) ও ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রায় ১০ লাখ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আইসিটি খাতের সঙ্গে জড়িত। বিসিএস সদস্যদের রয়েছে প্রতিটি তথ্যপ্রযুক্তি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। প্রতিটি সংগঠন দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং বাংলাদেশকে আইসিটি পণ্যের উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিত করতে এবং এই খাতে ৫ বিলিয়ন ডলার উপার্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিনিয়ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে হঠাৎ বদলে গেছে দৃশ্যপট। দেশজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিপণন কেন্দ্র, হাইটেক পার্ক, জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার পার্কসহ তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করতে যখন দম ফেলার সুযোগ পাচ্ছিল না, তখন হঠাৎ করেই  এই বিশাল কর্মযজ্ঞ স্থবির হয়ে গেলো।

দেশের ক্রান্তিকালে ব্যাংকিং সেবার পূর্ণ চাহিদা পূরণ করতে অটোমেটিক টেলার মেশিন (এটিএম) বুথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ঘরবন্দি মানুষদের স্বাস্থ্যসেবায় টেলিমেডিসিন সেবা ও আইটি সংক্রান্ত প্রতিটি কাজেই হার্ডওয়্যার পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমদানিকারক দেশ থেকে আইসিটি খাতে আমরা রফতানিনির্ভর ও নিজের দেশেই সংযোজন এবং উৎপাদনের কার্যক্রম পরিচালনা করছি। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ স্লোগানে আমরা এখন নিজেদের তৈরি স্মার্টফোন ব্যবহার করছি। কম্পিউটারের মাদারবোর্ড ও র‌্যাম তৈরিতেও আমরা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছি। হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি সফটওয়্যার, আউটসোর্সিং, কল সেন্টার মিলিয়ে আমাদের সেবার খাত নেহায়েত ক্ষুদ্র নয়। প্রতিবছর শুধু আইসিটির  হার্ডওয়্যার খাত থেকে আমরা প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা করছি। বেকারত্বের অবসান ঘটাতে নিত্যনতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, উদ্যোক্তা বানানোর প্রচেষ্টা এবং বাসায় থেকেও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে অনলাইন ব্যবসা করার প্রয়াস এই খাতের কারণেই সহজ হয়েছে। কাজের পাশাপাশি বিনোদনেও রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অবদান। শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস ব্যবস্থা প্রণয়নে তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন তার জন্য আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মহাসংকট কাটিয়ে উঠতে এই প্রণোদনার অংশ করা হবে বলেই আমার বিশ্বাস। ইতোমধ্যে করোনার নেতিবাচক প্রভাব এই খাতে দৃশ্যমান। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের সম্ভাব্য বিল এবং ওয়ার্ক অর্ডার পাচ্ছে না। রফতানির সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা বিরাজ করায় তাদের কাজের পরিমাণ কোনও কোনও ক্ষেত্রে ৫০-৮০ শতাংশ কমে গেছে। স্থানীয় বাজারেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করায় এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত বিপুল সংখ্যক জনবলের বেতন, অফিস ভাড়া, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন বিনিয়োগ করে যে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল তৈরি করেছে তা এই খাতের উন্নয়নের জন্য একটি অতি আবশ্যকীয় উপাদান। ধারণা করা হচ্ছে, এ অবস্থা বিরাজমান থাকলে দক্ষ জনশক্তি হারানোর আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে। সরকারের আন্তরিক ভূমিকা ব্যতীত প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনগুলোর একক প্রচেষ্টায় এই ক্রান্তিকালে টিকে থাকা চ্যালেঞ্জের বিষয় বটে।

স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অভূতপূর্ব উন্নয়ন দৃশ্যমান। এই ধারাকে অব্যাহত রাখতে আমরা চাই সরকার বরাবরের মতো আমাদের পাশে থাকুক। আমাদের উদ্যোক্তাদের সাহস দিতে এই খাতে প্রণোদনার কোনও বিকল্প নেই। সুতরাং তথ্যপ্রযুক্তি সংগঠনসহ প্রযুক্তি খাতে কর্মরতদের আগামী ৬ মাসের আংশিক বেতন ও অফিস ভাড়া পরিশোধপূর্বক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য কেবল বেতন বাবদ ১ হাজার ৫৬০ কোটি ও অফিস/শোরুম/ওয়্যারহাউজ ভাড়া বাবদ ৩৭০ কোটিসহ মোট ১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে প্রদানের আহ্বান জানাই। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অনুদানের পাশাপাশি সহজ শর্তে ৫ বছর মেয়াদি ২ শতাংশ সুদে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া প্রয়োজন। যে ঋণ গ্রহণের এক বছর পর থেকে পরিশোধের সময় শুরু হবে।  

১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ক্ষমতা গ্রহণ করার পর কম্পিউটারের ওপর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করেছিলেন। আক্ষরিক অর্থে সে সময় শুল্ক খাতে শতকোটি টাকা ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিলেও শুধু একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত পুরো দেশকে আজ ডিজিটাল করতে ভূমিকা রেখেছে। এখন আমরা গর্ব করে আমাদের আইসিটি খাতের অগ্রযাত্রার গল্প পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে পারি। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের এই দুঃসময়ে সরকার আন্তরিক হয়ে প্রণোদনা এবং ঋণের ব্যাপারটি নিশ্চিত করলে আমরা এই খাতকে আরও বেশি লাভজনক খাতে পরিপূর্ণ করতে সক্ষম হবো।

প্রধানমন্ত্রী এই খাতের ওপর আস্থা রাখেন বলেই আমার বিশ্বাস। আমরা আশা করবো, জননেত্রী শেখ হাসিনা আগের মতো বর্তমানেও আইসিটি শিল্পের এই দুঃসময়ে আমাদের পাশে দাঁড়াবেন। যেই আস্থা এবং ভালোবাসায় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প’কে লাখো তরুণ-তরুণী বুকে ধারণ করে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, সরকারের সহযোগিতায় আমরা সবাই মিলে এই দুঃসময় কাটিয়ে ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করে যেতে পারবো। আমরা দৃঢ় প্রত্যয়ে বলতে পারি, তথ্যপ্রযুক্তি খাত দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি খাত। ভিশন-২০৪১ পূরণে আমরাই হবো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)

/এইচএএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ