চীনের এআই বিপ্লব ঘটাতে পারে বাংলাদেশের কৃষিতেও

আরশাদ আলী
০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৫৬ আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৫৬

ধানের জমিতে পানি কতটুকু দরকার, কোথায় সার কম বা বেশি দিতে হবে, কোন গাছে রোগ ধরেছে কিংবা বন্যা কখন হানা দেবে— এসব বুঝতে বা সিদ্ধান্ত নিতে কৃষককে এখনও অনেকটাই অভিজ্ঞ। এর থেকে বাঁচতে অনুমান ও স্থানীয় পরামর্শের ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে ভবিষ্যতে এসব সিদ্ধান্তের বড় অংশই যদি তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের কৃষির চেহারা বদলে যেতে পারে।

এটি এখন আর কেবল কল্পনা নয়। চীনে কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, সেন্সর, স্যাটেলাইট তথ্য, স্বয়ংক্রিয় কৃষিযন্ত্র ও স্মার্ট সেচ ব্যবস্থার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের মার্চে চীনের কৃষি ও গ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ড্রোন ও এআই ব্যবহার করে জমির ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি, সেচ ও সার প্রয়োগের পরিমাণ নির্ধারণ এবং ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা যদি এই পর্যায়ে পৌঁছায়, তাহলে দেশের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। এর মাধ্যমে কৃষিতে ‘অনুমাননির্ভর’ সিদ্ধান্ত থেকে ‘তথ্যনির্ভর’ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।

চীনের এআই বিপ্লব ঘটাতে পারে বাংলাদেশের কৃষিতেও

তৈরি হয়েছে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তি

বাংলাদেশের কৃষিতে চীনের সহযোগিতা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে কৃষি, আবহাওয়া, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষায় সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। হাইব্রিড ধান ও গমের জাত উন্নয়ন, চাষপদ্ধতি এবং কৃষিযন্ত্র নিয়ে সহযোগিতার কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ সম্মত হয়েছিল।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের কৃষি আধুনিকায়ন নিয়ে সরকারি পর্যায়ে অংশীদারত্বের আলোচনা হয়। সেখানে সার, হাইব্রিড ধান, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সৌরসেচ, জলজ চাষ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো বিষয় উঠে আসে।

অর্থাৎ কৃষিতে চীনা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের জন্য প্রাথমিক একটি কাঠামো তৈরি হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, এর সঙ্গে যদি এআই যুক্ত হয়, তাহলে পরিবর্তনের মাত্রা কতটা হতে পারে?

এআইভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় জমির ছবি তুলতে পারে ড্রোন

বাংলাদেশের কৃষিতে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিনিয়োগের সম্ভাবনা কতটুকু এবং এই বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের কোনও পরিকল্পনা আছে কি না, এমনটি জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর কৃষি বিষয়ক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এ বিষয়ে ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে চীনের এআই বিষয়ক সহযোগিতা সংস্থার পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এ প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে সক্ষম হবে। আমাদের কৃষি খাতে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা আগেই জানিয়েছিল চীন। এ নিয়ে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এখনই চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়।’

চীনের এআই বিপ্লব ঘটাতে পারে বাংলাদেশের কৃষিতেও

কৃষিতে এআই-কে যেভাবে কাজে লাগাচ্ছে চীন?

চীনা সংবাদমাধ্যমের খবর ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে দেশটিতে কৃষিতে এআইয়ের ব্যবহারের বিভিন্ন দিকও উঠে এসেছে। ধরা যাক, একজন কৃষকের এক বিঘা জমিতে ধান চাষ হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে তিনি হয়তো জমির রঙ, মাটির অবস্থা কিংবা গাছের চেহারা দেখে সিদ্ধান্ত নেন— কোথায় সার দিতে হবে, কতটুকু পানি দিতে হবে।

এআইভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় জমির ছবি তুলতে পারে ড্রোন। মাটির আর্দ্রতা মাপতে পারে সেন্সর। আবহাওয়ার তথ্য যোগ হতে পারে স্যাটেলাইট ও স্থানীয় আবহাওয়া স্টেশন থেকে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সফটওয়্যার জানাতে পারে কোন অংশে পানির ঘাটতি, কোথায় রোগ বা পোকার আক্রমণের আশঙ্কা এবং কোথায় অতিরিক্ত সার ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।

চীনে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। দেশটির জিয়াংসু প্রদেশের একটি স্মার্ট ফার্মে ড্রোন থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে জমির ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে এআই সেচ ও সার প্রয়োগের নির্দেশনা তৈরি করছে।

সম্প্রতি চীন ঘুরে আসা টেকনোলজি মিডিয়া গিল্ডস বাংলাদেশের সহ-সভাপতি ও নিউজ ২৪-এর সাংবাদিক  কাইয়ুম হাসান রিশাদ সরেজমিনে কৃষিতে এআইয়ের প্রয়োগ দেখে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন শায়ানসি প্রদেশের ইয়ানআনের পানহুতে গেলাম, সেখানে দেখলাম স্মার্ট আপেল বাগান। এমনিতেই প্রথমবারের মতো আপেল বাগান দেখলাম, তার ওপর এটা স্মার্ট। মাইলের পর মাইল বাগানে পানি দেওয়া, সার প্রয়োগ, কীট দমন সবকিছু হয় প্রযুক্তির ব্যবহারে। তারা ড্রোনও ব্যবহার করে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে কেন্দ্রীয় আবহাওয়া অফিসের সঙ্গে তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনাও সংযুক্ত। স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কেবল উৎপাদনই যে বেড়েছে তা নয়, আপেলের স্বাদ ও গুণগত মানও অনেক বেড়েছে। লুওছুয়ানে তাদের আপেল গবেষণাগারও আমরা দেখে এসেছি। তারা কৃষিতে বিপ্লব এনেছে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহারে।’

এ ছাড়া চীনের হেনান প্রদেশের আরেকটি স্মার্ট ফার্মে স্বয়ংক্রিয় কৃষিযন্ত্র, ড্রোন, স্মার্ট সেচ ও এআই একসঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারি প্রতিবেদনে ওই খামারে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় গমের ফলন ২০ শতাংশ বেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।



কাইয়ুম হাসান রিশাদ বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে জমি সেচ, চাষ, ফসলের বীজ বপন, তাপমাত্রা পরিমাপসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা প্রযুক্তির ব্যবহার করে আসছে। শুধু তাই নয়, এই প্রযুক্তির ব্যবহারও কৃষকবান্ধব করে তৈরি করা হয়েছে। যেখানে এআই আবহাওয়ার খবরা-খবর রাখে, আগাম রোগ শনাক্তের খবর দেয় কৃষককে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এককথায় এটা এক দারুণ কর্মযজ্ঞ। এই কর্মযজ্ঞের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নাই। এই কর্মযজ্ঞে যারা একবার প্রবেশ করেছে, তারা কৃষিবিজ্ঞানকে যে কোথায় নিয়ে যাবে তা এখনও কল্পনাতীত।’

একই ধরনের অভিমত প্রকাশ করেছেন ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি)-এর প্রেসিডেন্ট ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট মোহাম্মদ আজিজুর রহমান। তিনিও সম্প্রতি চীন সফর করে এসেছেন। চীনের স্মার্ট কৃষি নিয়ে তিনি বলেন, চীনের আপেল বাগানগুলোতে যে স্মার্ট প্রযুক্তি দেখেছি তা সত্যিই চমকপ্রদ। সেখানে ড্রোন দিয়ে রোগবালাই শনাক্ত, সেন্সর দিয়ে মাটির আর্দ্রতা পরিমাপ, এআই দিয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় সেচ এবং রোবট দিয়ে আপেলের গ্রেডিং ও প্যাকেজিং হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সার্বিকভাবে চীনে কৃষিতে এআই এখন আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই, এটি উৎপাদন পর্যায়ে চলে গেছে। ফলন পূর্বাভাস, বাজার দর বিশ্লেষণ, কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার, সবই এআই করছে।

চীনের এআই বিপ্লব ঘটাতে পারে বাংলাদেশের কৃষিতেও

বাংলাদেশের কৃষিতে এআইকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা
বাংলাদেশের কৃষিতে বড় ব্যয়ের একটি জায়গা সার, সেচ ও কীটনাশক। কোনও জমিতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি বা সার দেওয়া হলে কৃষকের খরচ বাড়ে, আবার মাটির ওপরও চাপ পড়ে। এখানেই এআইয়ের বড় ভূমিকা থাকতে পারে।

জমির বিভিন্ন অংশের তথ্য আলাদা করে বিশ্লেষণ করে ‘প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার’ বা নির্ভুল কৃষি পদ্ধতিতে জমির যে অংশে যতটুকু প্রয়োজন, সেখানে ততটুকুই পানি, সার বা কীটনাশক দেওয়া যায়।

চীনের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এক্সএজি তাদের স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থায় ড্রোন, এআই, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহার করছে। তাদের কৃষি ড্রোন জমির মানচিত্র তৈরি করে নির্দিষ্ট জায়গায় প্রয়োজন অনুযায়ী সার, বীজ বা কীটনাশক প্রয়োগ করতে পারে।

এ ধরনের প্রযুক্তি বাংলাদেশে বড় আকারে ব্যবহৃত হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রযুক্তি কেনার দাম, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও প্রশিক্ষণের খরচও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

বাংলাদেশের কৃষিতে এআইয়ের প্রয়োগের সম্ভাবনার বিষয়ে সাংবাদিক কাইয়ুম হাসান রিশাদ বলেন, ‘বিভিন্ন জাতের ধান উৎপাদন, মাছে ডিম ও ডিম থেকে পোনা, পোল্ট্রি খামারে কৃষি গবেষণায় তাদের সাফল্য আছে। তবে কৃষি গবেষণাই শেষ কথা নয়। মাঠ পর্যায়ে যেহেতু এখনও এ দেশে প্রাচীন কৃষি পদ্ধতি ব্যবহার আছে সেহেতু ফসল রোপণ থেকে শুরু করে ঘরে তোলা পর্যন্ত অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। সেইসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে চীনের এইআই প্রযুক্তি হতে পারে কৃষি প্রধান এই দেশের জন্য পরম আশীর্বাদ স্বরূপ।’

এফইআরবি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আজিজুর রহমান এই বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা জলবায়ু সহনশীল, কম খরচে বেশি ফলনের স্মার্ট কৃষির দিকে যেতে পারি। বাংলাদেশে একই প্রযুক্তি আমাদের আম, লিচু বা পেয়ারা বাগানে সহজেই খাপ খাওয়ানো সম্ভব। আমাদের কৃষি ছোট জমি নির্ভর, তাই কম দামের সেন্সর ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক এআই পরামর্শ সবচেয়ে কার্যকর হবে।

চীনের স্মার্ট ফার্মে স্বয়ংক্রিয় কৃষিযন্ত্র, ড্রোন, স্মার্ট সেচ ও এআই একসঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় ভূমিকা

বাংলাদেশের কৃষির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা, লবণাক্ততা কিংবা অস্বাভাবিক তাপমাত্রা— সবই কৃষির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

২০২৬ সালের মে মাসে আগাম বৃষ্টি ও উজানের পানিতে দেশের হাওরাঞ্চলের বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় ৪৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল পানিতে তলিয়ে যায় এবং ক্ষতি দুই লাখ টনের বেশি চাল উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে এআইয়ের ব্যবহার হতে পারে আগাম সতর্কতায়।

আবহাওয়ার তথ্য, নদীর পানি, মাটির আর্দ্রতা, স্যাটেলাইট ছবি ও আগের বছরের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে কোনও এলাকায় বন্যা বা অতিরিক্ত পানির ঝুঁকি বাড়ছে কি না, তা আগে থেকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে।

কৃষককে তখন বলা যেতে পারে— কোন জাতের ধান লাগানো ভালো, কখন ফসল কাটলে ঝুঁকি কম, কোথায় দ্রুত সেচ বন্ধ করতে হবে কিংবা কোন জমিতে বিকল্প ফসল নেওয়া উচিত।

রোগ শনাক্ত হবে ছবিতে

বাংলাদেশের অনেক কৃষক গাছের পাতার রঙ বা দাগ দেখে রোগ শনাক্ত করেন। কিন্তু সব রোগ সহজে চেনা যায় না। ভুল রোগ শনাক্ত হলে ভুল ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকি থাকে।

এআইভিত্তিক মোবাইল অ্যাপে কৃষক আক্রান্ত পাতার ছবি তুললে সফটওয়্যার সম্ভাব্য রোগ শনাক্ত করতে পারে। সঙ্গে দিতে পারে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা।

এটি বিশেষ করে ছোট কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ প্রত্যন্ত এলাকার একজন কৃষকের পক্ষে প্রতিবার কৃষি বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া সহজ নয়।

যদিও এ ধরনের ব্যবস্থাকে কৃষি কর্মকর্তার বিকল্প হিসেবে না দেখে সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করাই বাস্তবসম্মত। ভুল তথ্য দিলে কৃষকের ক্ষতি হতে পারে। তাই স্থানীয় ফসল, মাটি, আবহাওয়া ও রোগের তথ্য দিয়ে মডেলকে প্রশিক্ষিত করা জরুরি।

চীনে কৃষিতে এআই এখন আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই, এটি উৎপাদন পর্যায়ে চলে গেছে

কৃষকের হাতেও আসতে পারে ‘ডিজিটাল কৃষি সহকারী’

বাংলাদেশের জাতীয় এআই নীতিমালার খসড়াতেও কৃষিতে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশের এক কোটি ৬০ লাখের বেশি কৃষিপরিবার স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মাটির অবস্থা বিশ্লেষণ ও ফসলের ফলন পূর্বাভাসের মতো এআইভিত্তিক ব্যবস্থার সুবিধা পেতে পারে।

এটি কৃষকের মোবাইল ফোনেই একটি ‘ডিজিটাল কৃষি সহকারী’ হয়ে থাকবে। কৃষক প্রশ্ন করবেন— আজ সেচ দেবো কি না? সিস্টেম তার জমির অবস্থান, ফসলের বয়স, আবহাওয়া ও মাটির আর্দ্রতা দেখে উত্তর দেবে।

তিনি জানতে চাইবেন— ধান কাটার উপযুক্ত সময় কখন? সিস্টেম স্থানীয় আবহাওয়া ও ধানের পরিপক্বতার তথ্য বিশ্লেষণ করে পরামর্শ দেবে।

এমনকি বাজারের তথ্য যুক্ত করা গেলে কৃষক জানতে পারবেন, কোন সময় বা কোন বাজারে পণ্য বিক্রি করলে পরিবহন খরচ ও সম্ভাব্য বাজারদর বিবেচনায় সুবিধা হতে পারে।

বাংলাদেশের কৃষির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন

শুধু জমি নয়, বদলাতে পারে পুরো কৃষিব্যবস্থা

এআই কৃষিকে বদলাবে শুধু মাঠে নয়, উৎপাদনের পরের ধাপেও এর ব্যবহার হতে পারে।

বাংলাদেশে ফসল কাটার পর সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অপচয় হয়। জাতীয় এআই নীতিমালার খসড়ায় বছরে প্রায় দুই কোটি ১১ লাখ টন খাদ্য বিভিন্ন পোস্ট-হারভেস্ট সমস্যায় নষ্ট হওয়ার একটি হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। ফল ও সবজিতে ক্ষতির হার আরও বেশি বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে এআই দিয়ে চাহিদার পূর্বাভাস, গুদামের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পচন শনাক্তকরণ, পরিবহন পরিকল্পনা ও বাজার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে।

ফলে কৃষক শুধু বেশি উৎপাদন করবেন— বিষয়টি এমন নয়। উৎপাদিত পণ্য কম নষ্ট করে বাজারে পৌঁছানোও কৃষি সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

ডাটাই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ

এআই কৃষিতে সফল করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ডাটা।

বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে কোন জাতের ধান ভালো হয়, কোন মাটিতে কত সার প্রয়োজন, কোন এলাকায় কোন রোগ বেশি হয়, কখন বন্যা আসে— এসব তথ্য যত বেশি সংগ্রহ করা যাবে, এআই মডেল তত বেশি স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ সরকারও কৃষকদের একটি বড় ডিজিটাল ডাটাবেস তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, ‘প্রায় দুই কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে একটি অভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

এই ডাটাবেস যদি কৃষি গবেষণা, আবহাওয়া, স্যাটেলাইট, বাজার ও মাটির তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নিজস্ব কৃষি-এআই ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

এআইভিত্তিক অ্যাপে কৃষক আক্রান্ত পাতার ছবি তুললে সফটওয়্যার সম্ভাব্য রোগ শনাক্ত করতে পারে

কতটা বদলাতে পারে বাংলাদেশের কৃষি?

চীনে স্মার্ট কৃষির সাফল্যের পেছনে শুধু এআই নেই। আছে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, বড় আকারের কৃষিজমি, যন্ত্রপাতি, ডাটা অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সরকারি সহায়তা।

চীনের ২০২৬-৩০ সালের কৃষি আধুনিকায়ন পরিকল্পনায় কৃষিতে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি কৃষিযন্ত্র, গবেষণা, উচ্চমানের কৃষিজমি, কোল্ড চেইন ও অন্য অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটির কৃষিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবদানের হার ৬৪ শতাংশের বেশি ছিল বলে চীনা সরকারি তথ্য জানিয়েছে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। জমি ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত। অনেক এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা আছে। কৃষকের বড় অংশের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে ব্যয়বহুল ড্রোন বা সেন্সর কেনাও সম্ভব নয়।

তাই চীনের কাছ থেকে শুধু যন্ত্র কিনলে হবে না। প্রয়োজন হবে সেবা হিসেবে প্রযুক্তি দেওয়ার মডেল।

পরিবর্তনটি রাতারাতি হবে না। চীনের প্রযুক্তি বাংলাদেশে এনে কয়েকটি জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করলেই কৃষিতে বিপ্লব ঘটে যাবে, এমনটি বলার সুযোগ নেই।

কিন্তু যদি বিনিয়োগের সঙ্গে এআই, ড্রোন, সেন্সর, স্যাটেলাইট, কৃষিযন্ত্র, স্থানীয় ডাটা, কৃষক প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থার অবকাঠামো তৈরি করা যায়, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব হবে।

তখন কৃষক জানতে পারবেন জমিতে কী ঘটছে, কেন ঘটছে এবং কী করা দরকার। কৃষি কর্মকর্তা মাঠে যাওয়ার আগেই অনেক সমস্যার তথ্য পেতে পারেন। সরকার আগাম উৎপাদন ও খাদ্যসংকটের পূর্বাভাস তৈরি করতে পারে। আর কৃষক আবহাওয়া বা রোগের ঝুঁকি বাড়ার পর নয়, তার আগেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

/এএ/
সম্পর্কিত
স্যামসাংয়ের রেকর্ড ৮ হাজার কোটি ডলার মুনাফা, নেপথ্যে কী?
এআই যুগে তিন ধরনের চাকরি টিকবে: সেলসফোর্স ও মেটার সাবেক এআই প্রধান
‘অলিগার্করা স্টারলিংক ঠেকাচ্ছে’, মাস্কের অভিযোগে যা বললো ভারত
সর্বশেষ খবর
ইরানে হামলা নিয়ে নতুন ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প
ইরানে হামলা নিয়ে নতুন ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প
দেশে ফ্রিগেটসহ আধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের উদ্যোগ 
দেশে ফ্রিগেটসহ আধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের উদ্যোগ 
চুরি হওয়া জিনিসপত্র ছাড়াই ঢাকায় ফিরলেন জার্মান পর্যটক, বললেন বাংলাদেশে এটাই প্রথম ভ্রমণ
চুরি হওয়া জিনিসপত্র ছাড়াই ঢাকায় ফিরলেন জার্মান পর্যটক, বললেন বাংলাদেশে এটাই প্রথম ভ্রমণ
চাকরি তৈরিতে ট্রিলিয়ন ডলারের পুঁজির দিকে বিশ্বব্যাংকের নজর
চাকরি তৈরিতে ট্রিলিয়ন ডলারের পুঁজির দিকে বিশ্বব্যাংকের নজর
সর্বাধিক পঠিত
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টিপসই দিয়ে বিধবা জানলেন ‘বিয়ে হয়ে গেছে’
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টিপসই দিয়ে বিধবা জানলেন ‘বিয়ে হয়ে গেছে’
রংপুরে চার খুন: খেজুর-শসা-সিগারেট কারা খেয়েছিল নিশ্চিত করলো সিআইডি
রংপুরে চার খুন: খেজুর-শসা-সিগারেট কারা খেয়েছিল নিশ্চিত করলো সিআইডি
মন্ত্রী বললেন বাবা শোনো, বিক্ষোভকারী বললেন ‘এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে, ঢুকতে দেবো না’
মন্ত্রী বললেন বাবা শোনো, বিক্ষোভকারী বললেন ‘এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে, ঢুকতে দেবো না’
রাতে হঠাৎ অসুস্থ, হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা গেলেন থানার ওসি
রাতে হঠাৎ অসুস্থ, হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা গেলেন থানার ওসি
‘১২ মণ কাঠ রাখা আছে, এটাই আমার শেষ সম্পত্তি’ 
‘১২ মণ কাঠ রাখা আছে, এটাই আমার শেষ সম্পত্তি’