ভুল: চিকিৎসার না সিস্টেমের?

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৩:০৮, মে ২২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৪, মে ২২, ২০১৭

প্রভাষ আমিনঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আফিয়া জাহিন চৈতীর মৃত্যু ছুঁয়ে গেছে সবাইকে। বয়স কত? ২০/২২ হবে হয়তো। এমন একটি মেয়ের যখন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ানোর কথা, তখন তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর কোনও জবাব নেই। আমি কখনও দেখিনি, নামও শুনিনি। তবু আমার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এটুকু নৈকট্যই আমাকে বেদনার্ত করেছে। আর তার স্বজন-বন্ধুরা কতটা কষ্ট পেয়েছে, কতটা ক্ষুব্ধ হয়েছে; তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। কোনও শিক্ষার্থী মারা গেলেই আমরা বলি মেধাবী। কিন্তু আফিয়ার ক্ষেত্রে এটা সত্যি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলেই মেধার অনেক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আসতে হয়। তাই আফিয়ার এমন অকাল মৃত্যু সবার জন্যই ক্ষতির।
কিন্তু আফিয়ার মৃত্যুর পর যা হলো, সেটাও অনাকাঙ্ক্ষিত। ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভাঙচুর, ডাক্তারদের মারধোর, ডাক্তারদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার- সব মিলে বিষয়টা বাড়াবাড়ি হয়েছে। আফিয়ার মৃত্যু ভুল চিকিৎসার কারণে হয়েছে কিনা, তা এখনও প্রমাণিত নয়। তারপরও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে সেন্ট্রাল হাসপাতালে যা হয়েছে, তা তারুণ্যের শক্তির নিদারুণ অপচয়। সংঘবদ্ধতার শক্তিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করলে তা ইতিবাচক। কিন্তু আপনি যদি তা তাৎক্ষণিক আবেগ প্রশমনের কাজে ব্যয় করেন, তা প্রতিভাত হয় নিছক মাস্তানি হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্যের শক্তিকে মাস্তান ভাবতে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে, আমার কাছে গ্লানির মনে হয়। তারা ভাঙচুর করে আইন হাতে তুলে নিয়েছে, আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বাদি হয়ে মামলা করেছেন!
বাংলাদেশে ভুল চিকিৎসা হয় না, তা বলছি না, আকছার হয়। দেশের বিভিন্নস্থানে প্রায়ই ভুল চিকিৎসার অভিযোগ শোনা যায়। বলতে গেলেই, পাল্টা শুনতে হয়, চিকিৎসা ভুল না ঠিক তা বিচারের আপনি কে? কিন্তু কিছু অনিয়ম তো সাদা চোখেই দেখা যায়, এ জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হতে হয় না। পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়া, ডান পায়ের সমস্যায় বাম পা কেটে ফেলা, অপ্রয়োজনে গাদা গাদা টেস্ট করানো, অপ্রয়োজনে আইসিইউতে রাখা, মৃত্যুর পরও আইসিইউতে রেখে দেওয়ার ভুরি ভুরি উদাহরণ আমাদের চারপাশেই। চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। চিকিৎসা একটি সেবা। কিন্তু বাংলাদেশে এখন চিকিৎসা নিছকই পণ্য। হাসপাতাল তো নয়, যেন ফাইভ স্টার হোটেল বা কসাইখানা। কিন্তু তাই বলে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এলেই ভাঙচুর, মামলা কোনও কাজের কথা নয়। আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদেরও নেই। তাহলে কি কেউ ভুল চিকিৎসার শিকার হলে তার প্রতিকার পাবেন না? অবশ্যই পাবেন। সে আলোচনায় পরে আসছি।

ভুল মানুষের হতেই পারে। কিন্তু সমস্যা হলো সাংবাদিক ভুল করলে মানুষের মান যাবে, আর ডাক্তার ভুল করলে জান যাবে। তাই ডাক্তারদের আরও সচেতন হতে হবে। এ কারণেই ডাক্তাররা সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার আসনে থাকেন। একজন অসুস্থ মানুষ ডাক্তারের কাছে গিয়ে বলেন, ওপরে আল্লাহ, নিচে আপনি; আমাকে বাঁচান। আমরা সাধারণ মানুষ আশা করি, ডাক্তাররা সে আস্থার প্রতিদান দেবেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আমরা তা পাই না। না পেলেই হতাশ হই, ক্ষুব্ধ হই, ভাঙচুর করি। আর ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে কেউ মরে গিয়ে বেঁচে যাই। আর কেউ জীবনভর তার মাশুল দেই। আমি নিজেও বাংলাদেশে ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছি, ভুগছি এখনও। তবে ভুল চিকিৎসা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এমনকি বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ুন আহমেদও ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছেন বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। ভুলেরও রকমফের আছে। ভুল আর অদক্ষতা এক নয়। কিছু ভুল নিছকই মানবিক। আর কিছু ভুল হয় অদক্ষতা থেকে, অযোগ্যতা থেকে, খামখেয়ালি থেকে হয়। কিন্তু অন্তত ডাক্তারদের ক্ষেত্রে অদক্ষতা, অযোগ্যতার কোনও জায়গা নেই; খামখেয়ালির তো নয়ই। কারণ ডাক্তারদের একটু খামখেয়ালিপনায় আরেকজনের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে আমার শঙ্কা বর্তমান নিয়ে নয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে। বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষার মান এখন যে পর্যায়ে নেমেছে, তাতে ভবিষ্যতে অদক্ষ, অযোগ্য ডাক্তারে দেশ ভরে যাবে। দেশে প্রয়োজনীয় দক্ষ শিক্ষক নেই। নতুন ডাক্তারদের কারা শেখাবেন, কারা তৈরি করবেন। বিশেষ করে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয় মেধার চেয়ে টাকার গুরুত্ব বেশি। ভালো শিক্ষক নেই, ভালো হাসপাতালও নেই; নবীন ডাক্তাররা তৈরি হবেন কোথায়? এটা ভয়াবহ সঙ্কট। এখনই সবার উচিত অবিলম্বে দেশের চিকিৎসার শিক্ষার মান উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া।

সত্যি সত্যি কেউ ভুল চিকিৎসার শিকার হলে তার প্রতিকারের উপায় কী? ডাক্তাররা বলবেন, বিএমডিসিতে যাওয়ার কথা। কিন্তু আপনারাই বলুন, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিএমডিসি অভিযোগ করে কেউ কি কোনও প্রতিকার পেয়েছেন? পাননি বলেই সংক্ষুব্ধ মানুষ ভাঙচুর করে বা সরাসরি থানায় গিয়ে মামলা করে। তাই এই প্রবণতা বন্ধ করতে হলে অবশ্যই বিএমডিসিকে সক্রিয় ও কার্যকর করতে হবে। নইলে ডাক্তারদের সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্কে অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধা আরো বাড়বে।

এটা তো বাস্তবতা, ডাক্তারদের কাছে না গিয়ে তো আমাদের উপায় নেই। তাই ডাক্তারদের শত্রু না ভেবে, পুরো ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করতে হবে, আমাদের স্বার্থেই। এ ক্ষেত্রে ডাক্তারদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। তারাই ভালো জানবেন, কে দক্ষ, কে অদক্ষ? কে ভালো চিকিৎসক, কে ভুল- তা তারাই ভালো জানবেন।

তবে সেন্ট্রাল হাসপাতালে যা হয়েছে, তা আমাদের চলমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমান্তরাল নয়। ভুল চিকিৎসার মামলায় এক নম্বর আসামী ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ। এটাই পুরো ঘটনাকে অবিশ্বাস্য করে তুলেছে। এত অব্যবস্থাপনার পরও যাদের দেখে এখনও বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখি, ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ তাদের একজন। তার সাথে আমার ব্যক্তিগত আলাপ নেই। বছর দশেক আগে একবার রোগী হিসেবে গিয়েছিলাম। কিন্তু সিরিয়াল পেতে তিনমাস লাগে বলে পরে আর যাইনি। কিন্তু লম্বা সিরিয়ালের দায় তো আমাদের, তার নয়। আমরা সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ি বলেই তাকে রাত আড়াইটা পর্যন্ত রোগী দেখতে হয়। তারপরও পরদিন সকালে অফিসে ঠিক সময়মত পৌঁছে যান। তিনি অন্যদের মতো রক্তচোষা ডাক্তার নন। তার ফি তার ছাত্রদের চেয়ে কম। ডা. আব্দুল্লাহ শুধু বাংলাদেশ নয়, মেডিসিনে বিশ্বের সেরা ডাক্তারদের একজন। তার লেখা বই পড়ে বিশ্বের ৪১টি দেশের শিক্ষার্থীরা ডাক্তার হন। সেই আব্দুল্লাহ যখন ভুল চিকিৎসার মামলার আসামি হন, তখন আসলে বাংলাদেশের পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যায়। এটা আসলে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করারই নামান্তর। এটা কি করা উচিত? ডা. আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধেও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে ভাঙচুর, মারধোর, মামলা করলে আমাদের আমাদের আর ভরসার জায়গা থাকে না।

ডা. আব্দুল্লাহও মানুষ। তিনি ভুল করতেই পারেন না, তা নয়। আবার ভুল চিকিৎসায় যেমন রোগী মারা যেতে পারে, তেমনি সঠিক চিকিৎসার পরও মারা যেতে পারে। কিন্তু আফিয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসা ঠিক ছিল না ভুল; সেটা বিচারের ক্ষমতা নিশ্চয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, প্রক্টর, সাংবাদিক বা পুলিশের নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ভাঙচুর করলেন, প্রক্টর মামলা করলেন, আর আমরা সাংবাদিকরা লিখে দিলাম- ডা. আব্দুল্লাহর ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু; এ কেমন কথা। ডা. আব্দুল্লাহ ভুল করেছিলেন কিনা, সেটা যাচাই করতে পারবেন ডাক্তাররাই। প্রয়োজনে বিএমডিসি বা বিএমএ তদন্ত করুক। কিন্তু ডা. আব্দুল্লাহ ভুল চিকিৎসার মামলার আসামি হলে আন্তর্জাতিকভাবেই বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে ভুল বার্তা ছড়াবে।

ডাক্তারদের পেশাটা বিশেষ। তাদের ভুলের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা থাকা দরকার। চিকিৎসা ভুল হোক আর ঠিক হোক, কেউ মারা গেলে স্বজনদের কাছে তা ভুল মনে হবে। তাই ভুল চিকিৎসার অভিযোগে সরাসরি থানায় মামলা করাকে উৎসাহিত করা হলে সারাদেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। একজন ডাক্তার বাসায় বউ পেটালে, সরাসরি থানায় মামলা হতে পারে। কিন্তু পেশাগত বিচ্যুতির মামলা থানায় যাওয়ার আগে একটা সেফগার্ড থাকা উচিত। মামলার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তো কারো পক্ষে চিকিৎসা করা সম্ভব নয়, জটিল রোগী হলেই সবাই এড়িয়ে যেতে চাইবেন।

প্রথম কাজ হলো, চিকিৎসা শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে, যাতে সার্টিফিকেটধারী অদক্ষ ডাক্তার তৈরি না হয়। তারপরও কেউ ভুল চিকিৎসা করলে, অবহেলা করলে, খামখেয়ালি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। ঠুঁটো জগন্নাথ বিএমডিসিকে সক্রিয়, কার্যকর ও সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। নইলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাঙচুর, মারধোর, মামলা, হামলা চলতেই থাকবে।

লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ