ভারতে ঈদের বাজার: দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত

Send
আমিনুল ইসলাম সুজন
প্রকাশিত : ১২:৪৬, জুন ২৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫০, জুন ২৬, ২০১৭

আমিনুল ইসলাম সুজনসংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন গণমাধ্যম- সর্বত্র ঈদ বাজারকেন্দ্রিক অনেকগুলো সংবাদ দেখলাম ও পড়লাম।  সবগুলোতেই প্রায় একই সুর, একই কথা।  পোশাকের বাজার ভারতের দখলে বা ভারতীয় পোশাকে বাজার সয়লাব (পাকিস্তানি পোশাকও লক্ষ্য করা যায়)।  অনেক সংবাদে ভারতীয় কোনও পোশাকের বিক্রি বেশি হচ্ছে, সেসব খবরও আছে।  এমন খবর আমরা গত এক যুগ থেকেই দেখছি।  এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।  কারণ, নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে টেকসই করতে যে দেশপ্রেম দরকার, তা অধিকাংশ বাংলাদেশির নেই।
ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখলে মনে হবে, আমরা দেশপ্রেমে টুইটুম্বুর।  দেশ্রপ্রেমে একেকজন বীর সৈনিক।  কিন্তু বাস্তবে আমরা বিদেশি ভৃত্য।  নিজ দেশের স্বার্থ বড় করে দেখা এবং দেশপ্রেমের অভাবের কারণে পোশাকে ভারতনির্ভরতা ক্রমবর্ধমান।
বাংলা ট্রিবিউনে বছর তিনেক আগে একটি লেখা লিখেছিলাম, ‘শুধু পোশাকে নয়, সংস্কৃতিতেও ভারতের ভারতের প্রভাব বাড়ছে’ (২ আগস্ট ২০১৪)।  সে সময় পাখি পোশাকের জন্য একাধিক আত্মহত্যার সংবাদ, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের সংবাদও পড়েছিলাম।  প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সময়ের জন্য আমি নিজে ঢাকার একাধিক বিপণী বিতানে ক্রেতা বা সম্ভাব্য ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম।  সেই অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ লেখাটি অনেককেই অবাক করেছিল।

এ বছর নতুন যেটি নজরে এসেছে, তা হলো ঈদের বাজার করতে কয়েক লক্ষ মানুষের কলকাতা গিয়েছে।  এ সময়ে কলকাতার বড় বড় বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতা মূলত বাংলাদেশি।  কলকাতার সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগে প্রধান স্থল বন্দর বেনাপোল দিয়ে জুন মাসের প্রথম ২৩ দিনে প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার যাত্রী কলকাতায় গেছেন।  এ হিসাবে ধরলে ঈদের আগে মোট আড়াই লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে। এছাড়া অন্যান্য স্থলবন্দর এবং বিমানযোগে অন্তত আরও দেড় লক্ষাধিক মানুষ গেছেন।  একবার ভাবুন, চার লক্ষ মানুষ কলকাতায় ঈদের বাজার করতে কত কোটি টাকা সেখানে দিয়ে এসেছে! দেশের বাইরে বাজার করতে গেলে শুধু নিজ পরিবার নয়, আত্মীয়স্বজনের জন্যও কেনাকাটা করে। আর যদি উচ্চবিত্ত পরিবারের কেউ যায়, তবে অর্থ ব্যয়ের ব্যপ্তি বেড়ে যায়।  আজকাল বিয়ের বাজারও অনেকে কলকাতা থেকে করেন।  এছাড়া ঈদের অবকাশ কাটাতে আরো লক্ষাধিক যাবেন।

আন্তর্জাতিক একটি সংবাদমাধ্যমে দেখলাম, প্রত্যেকে গড়ে ১ হাজার ডলারের (৮০ হাজার বাংলাদেশি টাকা) বাজার করেন বলে জানান বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন।  এ হিসাবে চার লক্ষ মানুষের খরচ ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা।  এছাড়া হোটেলে থাকা, ঘুরা ও খাওয়া, বিনোদনবাবদ আরো ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা।  তার মানে, শুধু ঈদের আগে বাজার বাবদই ৬৪০০ কোটি টাকা ভারতে চলে গেছে।  আমি একটা গড় হিসাব ধরেছি, যার তারতম্য অস্বাভাবিক নয়।

গ্রামের ছোট্ট পোশাকের দোকানেও বাহুবলী, পাখি, আনারকলি, রাখিবন্ধনসহ বাহারি নামের ভারতীয় পোশাক পাওয়া যায়।  তবু বাংলাদেশের মানুষ ঈদ বাজার করতে কলকাতায় কেন যায়? গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ পাওয়া যায়।  প্রথমত, ভারতের যেসব পোশাক বাংলাদেশে আসে, তার অধিকাংশের মান খারাপ। দ্বিতীয়ত, একই মানের কাপড় কলকাতায় যদি ভারতীয় ১ হাজার রূপী দাম হয়, তবে সেটা বাংলাদেশে ৫ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।  তৃতীয়ত, তুলনামূলক কম দামে পরিবারের সবার জন্য ঈদের পোশাক কেনার সুযোগে আরেকটি দেশে ঘুরাও হলো।  রথ দেখা ও কলা বেচার মতো! চতুর্থত, পোশাকের বাইরে এমন অনেক পণ্য কেনা যায়, যেগুলো বাংলাদেশে নকল বা ভেজালের প্রবণতা বেশি।  অর্থাৎ বাংলাদেশি ক্রেতাদের অনেকের কাছে দেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে আস্থাহীনতার সঙ্কটও লক্ষ্যণীয়। 

একদিকে বাংলাদেশের প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ ঈদ বাজারের জন্য ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ভারতে খরচ করে।  অন্যদিকে বাংলাদেশের সর্বত্র ভারতীয় পোশাক, কসমেটিক্সের বাজারের সৃষ্টির মাধ্যমেও হাজার হাজার কোটি টাকা ভারতে চলে যাচ্ছে।  ঢাকার গাউছিয়া, নিউমার্কেট, বসুন্ধরা, পলওয়েল, ইস্টার্ন প্লাজা, টোকিও সেন্টার, যমুনা ফিউচার পার্কসহ দেশের সর্বত্র, সব বিপণি বিতানেই ভারতীয় পোশাক দেদারসে বিক্রি হচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউনসূত্রে জানা যায়, নওগাঁ (১৫ জুন), খুলনায় (২০ জুন) ও বরগুনার (২২ জুন) ভারতীয় পোশাকের দখলে ঈদবাজার।  রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, নোয়াখালী, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর, ময়মনসিংহ- সব জেলায় পোশাকের বাজার ভারতের দখলে, এমনকি উপজেলা শহরের বাজারও ভারতীয় পোশাকের দখলে।  এতে আমাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ভারতে চলে যাচ্ছে। যে মুদ্রা আয়ের জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ ঋণ করে, জায়গাজমি বিক্রি করে বিদেশে গেছেন।  যে মুদ্রা আয় করতে পরিবার-পরিজন থেকে দূরে মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণ চলে যাচ্ছে।

গণমাধ্যমে দেখা যায়, ছেলে, মেয়ে, বুড়ো- সব বয়সী বাংলাদেশি ভারতীয় বিভিন্ন সিরিয়ালে প্রদর্শিত বাহারি নামের নানারকম পোশাক কিনছে।  এতে বাংলাদেশের ক্রেতারা ভারতীয় পোশাক কারখানায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করছে।  ভারতের বেকারত্ব দূর এবং ভারতের গড় দারিদ্র্য কমাতে ভূমিকা রাখছে।

অঙ্কের হিসাবে, বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম সর্বোচ্চ দেশ, যে দেশ থেকে ভারত বৈধ পথে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে (সিপিডি ২০১৫)।  ৫ লক্ষ ভারতীয় বাংলাদেশে চাকরি বা ব্যবসার মাধ্যমে বৈধ পথেই ভারতে ৩০ হাজার কোটি টাকা পাঠাচ্ছে।  আবার ভারতে পর্যটকদের মধ্যে সবচাইতে বেশি বাংলাদেশি।  ভারতীয় পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, শুধু ২০১৬ সালে বৈধ পথে ১৩ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ ভারতে গেছে।  এর মধ্যে অন্তত সাড়ে পাঁচ লক্ষ চিকিৎসার জন্য ভারত ভ্রমণ করেন।  এসব প্রক্রিয়াতে বৈধ পথেই আরো ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি চলে যাচ্ছে।  সুতরাং, ভারতের দারিদ্র দূরীকরণে বাংলাদেশের ভূমিকা অপরিসীম।  কিন্তু নিজেদের দারিদ্র দীর্ঘায়িত করছে, মধ্য আয়ের দেশ হওয়া তথা উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে।

গণমাধ্যমে দেখা যায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্রেতা বিপণিবিতানে ভারতীয় পোশাক পোশাক কিনতে চায়।  বাংলাদেশের যেসব পোশাক কারখানা দেশীয় বাজারের জন্য পোশাক তৈরি করে, তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।  মালিকপক্ষ প্রায়ই অভিযোগ করে, ভারতীয় পোশাকের কারণে তাদের বাজার নষ্ট হচ্ছে।  তারা কম দামে ভালো মানের পোশাক বাজারে দিতে গিয়ে কম লাভে পোশাক ছাড়ছে।  তাই শ্রমিকের ন্যায়সঙ্গত মজুরি বা উৎসব বোনাস সাধ্যানুযায়ী দিতে পারে না।  এসব কথা গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে এসেছে।

পোশাকতো আসলে শুধু পোশাক নয়, সংস্কৃতির অংশ।  কিন্তু অর্থ, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি- সবকিছুর সঙ্গেই পোশাকখাতের সম্পর্ক খুবই গভীর।  যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা বিপুল।  কিন্তু নানা কারণে, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, মালিকপক্ষের শ্রমিকশোষণে এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত।  ‘মড়ার ওপর খাড়ার ঘা’ হিসাবে দেখা দিয়েছে ঈদকেন্দ্রিক ভারতীয় পোশাকের আগ্রাসন। 

ভারতীয় টিভি চ্যানেল বাংলাদেশে উন্মুক্ত।  এসব চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভারতের পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের বাজার সৃষ্টি হচ্ছে বাংলাদেশে।  বাংলাদেশি পণ্যের বিজ্ঞাপনও ভারতীয় চ্যানেলে দেওয়া হচ্ছে।  মুক্ত গণমাধ্যমের সুযোগ নিয়ে হিন্দি টিভি চ্যানেলের আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণহীন।  বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল ভারতে দেখাতে ৫ কোটি রূপি জামানতের শর্ত আরোপ করে রেখেছে, সেখানে নামমাত্র অর্থে ভারতীয় চ্যানেল বাংলাদেশে দেখার সুযোগ মারাত্মকরকম বৈষম্য সৃষ্টি করেছে।  এসব বিষয় নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।  নিত্য প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, পেয়াজ, রসুন, মসলার মতো খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে পোশাক, রূপচর্চার সামগ্রীর অধিকাংশ ভারত থেকে আসে।  দু’দেশের বাণিজ্যের এ ভারসাম্যহীনতা দূর করা দরকার। 

কথিত আছে, অবৈধভাবে বাংলাদেশে পাচারের জন্যই বাংলাদেশের সীমান্তবর্ন্তী ভারতীয় জেলাগুলোতে অনেক ফেন্সিডিল কারখানা গড়ে উঠেছে।  বিভিন্ন নেশাদ্রব্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অবৈধ বাণিজ্যের মাধ্যমেও কোটি কোটি টাকা ভারত চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জনগণ বৈধ ও অবৈধ পন্থায় যত অর্থ ভারতে খরচ করে, তার অর্ধেকও যদি দেশেই খরচ করে, তবে কয়েক লক্ষ বেকারের কর্মসংস্থান বাড়বে।  মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ও দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটবে, নির্ধারিত সময়ের আগেই মধ্যআয়ের দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে থাকবে।

পাশ্ববর্তী দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারত- দু’দেশের সম্পর্ক ভালো থাকা জরুরি।  কিন্তু সম্পর্ক দ্বিপাক্ষিক ও পারিস্পারিক হওয়া উচিত।  ভারত এককভাবে লাভবান হবে, বাংলাদেশ আর্থিক, সাংস্কৃতিকসহ অনেক দিকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমন বৈষম্যমূলক সম্পর্ক কাঙ্ক্ষিত নয়।  বৈষম্যই ক্ষোভের জন্ম দেয়।  আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেপালের মতো ভারতনির্ভর রাষ্ট্র নেপালে এক বছর অবস্থান করার সুবাদে দেখেছিলাম, নেপালীদের মধ্যে ভারতের ওপর ক্ষোভ ও ঘৃণা।  সে সুযোগটি এখন চীন ব্যবহার করছে।  বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বের সম্পর্কে এমনটি প্রত্যাশা করি না। 

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ