মশা নিধনে ব্যর্থ মেয়রদের জন্য...

Send
আমিনুল ইসলাম সুজন
প্রকাশিত : ১৭:২৭, জুলাই ১১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩০, জুলাই ১১, ২০১৭

আমিনুল ইসলাম সুজনসারা পৃথিবীতে রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে সময়, শ্রম, ও মানুষের ক্ষতি—সবদিক থেকেই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা উত্তম, সহজ ও সাশ্রয়ী। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জানমালের ক্ষতি কম হয়। গত কয়েক মাস যাবত মশার বংশবিস্তার ও মশাবাহিত রোগব্যাধি ক্রমশ বাড়ছে। এ জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
এমন অভিযোগ গণমাধ্যমে দেখা যায়, যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো অকার্যকর। যেসব স্থানে নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো প্রয়োজন, সেখানে কালেভদ্রে, বছরে দু’তিন বার মাত্র ছিটানো হয়। ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি’র ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নগরবাসীকে জানানো উচিত, কোন এলাকায়, কবে মশার ওষুধ দেওয়া হবে। দু’টি প্রতিষ্ঠানই এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ৯ জুলাই ওয়েব সাইটে গিয়ে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। উপরন্তু, একটি জাতীয় দৈনিক প্রায় দেড় মাস চেষ্টা করেও ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি থেকে মশার ওষুধ দেওয়ার তথ্য আদায় করতে পারেনি।
দুই মেয়রের (আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন) নির্দেশনার পরও কর্মকর্তারা এসব তথ্য দিতে পারেননি। এ থেকে অনুধাবন করা যায়, মশা মারার ওষুধ দেওয়ায় সিটি করপোরেশনের কোনও আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নেই।
দায়িত্ব পালনের দু’বছর উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা উত্তরের মেয়র জানিয়েছিলেন, ‘নতুন ইউনিয়ন যুক্ত হয়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের আয়তন ও জনসংখ্যা অনেক বেড়েছে’। এছাড়া জলাশয় দূষণ ও মশার প্রকোপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এজন্য সিটি করপোরেশনের বাজেটে মশা মারার জন্য ওষুধ কিনতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করার কথা। কিন্তু উত্তর সিটি করপোরেশনের চলতি বছরের বাজেটে মশার ওষুধ খাতে প্রায় এক চতুর্থাংশ অর্থাৎ ছয় কোটি টাকা বরাদ্দ কমেছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, নাগরিক জীবনকে দুর্ভোগমুক্ত রাখতে সিটি করপোরেশগুলো শুধু ব্যর্থই নয়, তাদের সদিচ্ছারও অভাব রয়েছে।

অনেকে মনে করেন, মশার কয়েল ও স্প্রে কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা/কর্মচারীরা মশা মারার ওষুধ সঠিক ও নিয়মিতভাবে ব্যবহার করেন না বা ওষুধে পানির পরিমাণ বেশি মেশানো হয়, তাই মশা মরে না। কিংবা নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহার করেন। জনগণের এ শঙ্কা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করতে পারে, যে অর্থ মশা মারার জন্য বরাদ্দ থাকে, সে অর্থ কিভাবে ব্যয় হয়, কোথায় কোথায় ওষুধ দেওয়া হয়, তার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হওয়া জরুরি।  

দুই মেয়র যতই চৌকস, করিৎকর্মা হোন, শহরের উন্নয়নে যতই তাদের আন্তরিকতা থাকুক, মশা ও যানজট নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল দূষণমুক্ত করাসহ ঢাকার পরিবেশ উন্নয়ন—ইত্যাদি ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ। কিংবা তাদের অধীনস্তদের দায়িত্ব পালনে সততা, আন্তরিকতা, কর্তব্যনিষ্ঠায় ঘাটতি প্রকট, তা নাগরিক জীবনে দুর্ভোগের চিত্র দেখে সহজেই অনুমেয়।

প্রসঙ্গত, ডিএনসিসিভুক্ত মোহাম্মদপুরের যে এলাকায় আমি বসবাস করি, গত সাত মাসে এই এলাকায় মাত্র একদিন মশার ওষুধ দেওয়া হয়েছে। অথচ এই এলাকায় ঢাকার অন্যতম দূষিত খাল (রামচন্দ্রপুর খাল) রয়েছে, যা মশার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ স্থান। এ এলাকায় চিকুনগুনিয়ার প্রকোপও বেশি। নির্বাচনের আগে আনিসুল হক ও এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার তারেকুজ্জামান রাজীব খাল পরিষ্কার রাখাসহ এলাকার পরিবেশ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সম্ভবত আগামী নির্বাচনেও তারা একই প্রতিশ্রুতি দেবেন।

অনেকগুলো নাগরিক সেবা দেওয়ার পাশাপাশি নগরীর পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত রাখা এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে শহরে নাগরিক দুর্ভোগ কমাতে সিটি করপোরেশনগুলো দায়বদ্ধ। শহরে সিটি করপোরেশনই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

রাজধানীর খালগুলো ঢাকা ওয়াসা (পানি সরবরাহ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থাপনা) নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু তাদের ব্যর্থতায় খালগুলো মারাত্মকভাবে দূষিত। খালে দূষণসহ যেকোনও দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি পরিবেশ অধিদফতরের এখতিয়ারভুক্ত। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বিভিন্ন ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় কিন্তু এসব ভবনের সুয়ারেজ ব্যবস্থাপনা কিভাবে ঠিক করা হবে, তা দেখে না। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতায়িত করতে চায় না। বিভিন্ন আইন ও নীতিতে এমন বিষয় লক্ষ্য করা যায়। যে কারণে সমন্বয়হীনতা প্রকট।

খালগুলোর অধিকাংশ বিলুপ্ত, দখল ও বেদখল হয়েছে। যেগুলো বিদ্যমান, সেগুলো মারাত্মকভাবে দূষিত। ফলে জলাবদ্ধতা ও মশার প্রকট ক্রমশ বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর, ডিএনসিসি, ডিএসসিসি চিকুনগুনিয়া নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু মানুষ খুবই আতঙ্কিত। কারণ এ রোগে মৃত্যুঝুঁকি কম থাকলেও ভোগান্তি অনেক বেশি। এছাড়া কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এ রোগ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সচেতনতার কথা বলছে। বাসাবাড়িতে টব বা পানি জমে এমন কিছু পরিষ্কার রাখার কথা বলছে। কিন্তু রাস্তাঘাটে, খালে, ড্রেনে যেখানে মশার প্রধান উৎপত্তি, সেসব স্থানে মশার ওষুধ দেওয়াসহ এসব স্থানকে পরিষ্কার রাখতে তাদের ভূমিকা হতাশাজনক। 

চিকিৎসকরা বলছেন, চিকুনগুনিয়া খুব দ্রুত মানুষকে মারাত্মক অসুস্থ করে তোলে। পুরো শরীর ও গিঁটে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। ব্যথার তীব্রতায় অনেকে শয্যাশায়ী হন, কেউ কেউ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারেন না। তীব্র ব্যথা কমপক্ষে এক সপ্তাহ থাকে, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে কারও কারও ব্যাথা বছরব্যাপীও থাকে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির পেশাগত (চাকরি, ব্যবসা, লেখাপড়া ইত্যাদি) কাজ থেকে ছুটি নিতে হয়। ব্যক্তিগত বা পরিবারের কাজেও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। বরং, আক্রান্ত ব্যক্তির পরিচর্যায় পরিবারের কাউকে না কাউকে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকতে হয়।

যেহেতু চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু এডিস মশাবাহিত রোগ, তাই চিকুনগুনিয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়তে পারে। ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে। মশাবাহিত এ দুটি রোগই এমন, পরিবারে একজনের হলে অন্যদেরও এসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

ঢাকার দুই মেয়র মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শের পরিবর্তে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যা মানুষকে আশ্বস্ত করবে। চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গুর ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করবে। না হলে দুই মেয়রকে একদিন জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সদস্য, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ