লিনাক্সে ঝুঁকছে বার্সেলোনা, ঢাকা কেন নয়?

Send
জিশান হাসান
প্রকাশিত : ১৭:১৫, জানুয়ারি ১৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৭, জানুয়ারি ১৬, ২০১৮


জিশান হাসানকিছুদিন হলো কম্পিউটার থেকে নিজেদের ব্যয়বহুল অপারেটিং সিস্টেম আর সফটওয়্যারগুলো সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্পেনের বার্সেলোনা। মাইক্রোসফট করপোরেশনের অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যার সরিয়ে তাদের কম্পিউটারগুলোতে এবার মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে বার্সেলোনা পৌর কর্তৃপক্ষের এক হাজার ডেস্কটপে মাইক্রোসফট উইন্ডোজ ও এমএস অফিসের পরিবর্তে উবন্তু লিনাক্স ও লিবরা অফিস ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এই পরিবর্তনের সূচনা হবে। এখন প্রশ্ন উঠছে, স্পেনের চেয়ে কম সম্পদের মালিক হওয়ার পরও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো কেন ব্যয়বহুল সফটওয়্যার ব্যবহার থেকে সরে যাওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
একটা সাধারণ ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে মাইক্রোসফট কোম্পানির সফটওয়্যারের খরচ বেশিরভাগ মানুষের তেমন কোনও জানাশোনা নেই। কারণ এখানে সফটওয়্যার পাইরেসি খুব স্বাভাবিক ঘটনা। এখানকার প্রতিটি বাজারেই পাইরেটেড এমএস উইন্ডোজ বা এমএস অফিসের ডিভিডির দোকান রয়েছে। তাই মানুষও এসবের প্রকৃত খরচ নিয়ে চিন্তা করা ভুলে গেছে।
ইন্টারনেটে সামান্য ঘাঁটাঘাঁটি করলেই দেখা যায়, মাইক্রোসফট উইন্ডোজের লাইসেন্স বাবদ প্রত্যেক কম্পিউটারে ১০০ ডলার খরচ হয়। এমএস অফিস ব্যবহার করতে দরকার হয় আরও ২০০ ডলার। কিন্তু এসবের পরিবর্তে লিনাক্স ও লিবরা-অফিস ব্যবহার করলে প্রতিটি কম্পিউটারের পেছনে কমপক্ষে ৩০০ মার্কিন ডলার খরচ কমানো সম্ভব।
এছাড়া অ্যাডোবি ফটোশপ ব্যবহারের জন্য প্রতিমাসে ২০ ডলার বা চার বছরে এক হাজার ডলার খরচের বিষয়টি যোগ করলে কম্পিউটারের খরচ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অথচ অ্যাডোবি ফটোশপের বিকল্প হিসেবে গিম্প নামে ফ্রিওপেন সোর্সের একটি ফটোশপ সফটওয়্যার ব্যবহার করলে ওই খরচ হবে না।
বাংলাদেশে পাইরেটেড সফটওয়্যারের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিটি কম্পিউটারে ১৩০০ ডলার বা এক লাখ টাকার ওপরে খরচ পড়তো। যা কম্পিউটারের হার্ডওয়্যারের দামের চেয়েও দুই থেকে তিনগুণ বেশি। যদি এই অর্থ পরিশোধ করতে হতো, তাহলে তা জনগণের জন্য দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে যেতো।
বর্তমানে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে চলছে। তাই এখানে ব্যাপক বিস্তৃত সফটওয়্যার পাইরেসি আর বেশিদিন চলতে দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে সফটওয়্যার পাইরেসিকে অবৈধ ঘোষণা করে বাংলাদেশ আইন প্রণয়ন করাও হয়েছে। এখন পর্যন্ত আইনটি প্রয়োগ করা না হলেও তা সবসময় এমন থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের জন্য দেশটির বাণিজ্য কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিনিয়ত তদবির করছে বাংলাদেশ। তাই মাইক্রোসফটের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলো তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির যথাযথ দামের জন্য বাংলাদেশকেও চাপ দেবে। আর অধিকতর বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার পূর্ব শর্ত হিসেবে বাংলাদেশে সফটওয়্যার পাইরেসি বন্ধ করতে বলবে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের এই পদক্ষেপ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
মাইক্রোসফট ও অ্যাডোবির মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গরিব দেশগুলোতে তাদের কপিরাইট লঙ্ঘনের ব্যাপারটি মেনে নেয়। কারণ এখানে আদালতের মাধ্যমে সফটওয়্যার পাইরেসি নজরদারি করা ব্যয়বহুল। তাছাড়া কোনও দেশ সফটওয়্যারের লাইসেন্সের অর্থ দেওয়ার মতো সম্পদশালী না হলে তাদের কাছ থেকে লাইসেন্সের অর্থ তার নেয় না।
বাংলাদেশ আগের চেয়ে সম্পদশালী হওয়ায় মাইক্রোসফটের মতো বহুজাতিক বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির মালিক প্রতিষ্ঠানগুলো সফটওয়্যার পাইরেসির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে আগ্রহী হচ্ছে। বাংলাদেশে সফটওয়্যার পাইরেট করা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আগামী দিনে অবশ্যই মামলা হবে। এ কারণেই কাজী ফার্মস গ্রুপ, ঢাকা ট্রিবিউন পত্রিকা, দীপ্ত টিভি ও সেন্ট্রাল ওমেন্স ইউনিভার্সিটির মতো অনেক প্রতিষ্ঠানই এমএস উইন্ডোজ, এমএস অফিস ও ফটোসপের মতো পাইরেটেড সফটওয়্যারের বদলে লিনাক্স, লিবরা অফিস ও গিম্প ব্যবহার শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যার পরিচালিত কম্পিউটারের সংখ্যা এখন এক হাজারেরও বেশি। আরও বিভিন্ন বড় কোম্পানি তাদের সফটওয়্যার মাইগ্রেশনের জন্য পরামর্শ নিতে আমার কাছে এসেছেন। আর সফটওয়্যার পাইরেসি মামলা এড়াতে আমরা আরও প্রায় ২০ হাজার কম্পিউটারে লিনাক্স, লিবরা অফিস ও গিম্প ব্যবহারের জন্য কাজ করছি।
কিন্তু বাংলাদেশে মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি সমস্যা রয়েছে। তা হলো এখানে লিবরা অফিস, গিম্প ও লিনাক্সের কর্মক্ষমতা নিয়ে জানাশোনার বেশ অভাব রয়েছে। এই মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যার নিয়ে তেমন প্রচার না থাকায় ব্যবহারকারীরাও ভয় পান। তারা ভাবেন, অনেক বছর ধরে ব্যবহার করে আসা এমএস ও অ্যাডোবি সফটওয়্যার বাদ দেওয়া তাদের জন্য কঠিন হবে। আসলে এটা কোনও বিষয়ই না। আমরা অভিজ্ঞতায় দেখেছি, লিবরা অফিস ও লিনাক্স ব্যবহার শিখতে গড়ে ১৫-২০ মিনিট সময় লাগে। কারণ এগুলো খুবই গ্রাহকবান্ধবভাবে তৈরি করা আর মাইক্রোসফটের মতোই ব্যবহার উপযোগী।
তাই এখন আশা করাই যায়, বার্সেলোনার মতো বাংলাদেশও মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যারে পরিবর্তনের জন্য পদক্ষেপ নেবে।

লেখক: পরিচালক, টুএ মিডিয়া লিমিটেড

 

/আরএ/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ