গণমাধ্যমের দায়িত্ব ও বাংলা ট্রিবিউন

Send
নবনীতা চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:০২, মে ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০৪, মে ১৪, ২০১৮

নবনীতা চৌধুরীআমার মনে হয় বাংলাদেশে এখন সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আসল খবর আর নকল খবরের মধ্যে পার্থক্য করা। পাঠক-দর্শক বুঝছেন না, কোন সংবাদমাধ্যমে ভরসা রাখবেন। বরং ভাবছেন, তেল-জল সবই সমান। আর আমরা দর্শক-পাঠকের মন পেতে মাথা কুটে মরছি বটে কিন্তু ভোক্তা চান, তার পাশের বাড়িতে যে স্বামী নিয়মিত বউ পেটান কিংবা তার যে চাচাতো ভাই গ্রামের আরেক বড় ভাইকে চাকরির আশায় জমি বেচা লাখ টাকা দিয়ে ঠকেছেন, তাদের খবরে সোচ্চার হোক গণমাধ্যম। কারণ, এও তো ঠিক গণমাধ্যমে বের হলেই কেবল কোনও কোনও দুর্বৃত্তকে শায়েস্তা করার তবু একটা উপায় বের হতে পারে।
মূলধারার গণমাধ্যম হোক সে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন কিংবা অনলাইন, তাকে খবরের সত্যতা ও সূত্র যাচাই করতে হয়। এখন কেউ সংবাদমাধ্যমকে বিশ্বাস করতে পারছেন না, ফেসবুক পোস্টে তিনি তার ব্যবসায়িক শত্রুর যে জালিয়াতির মুখোশ খুলে দিয়েছেন, তা প্রকাশে রাজি না হওয়ায় আবার সেই ব্যক্তিটিই তার আরেক বন্ধুকে বিশ্বের সবচেয়ে সৎ ব্যবসায়ীর উপাধি দিয়ে দিয়েছেন বলে শেয়ার করছেন আগে কোনও দিন নামও না শোনা কোনও এক অখ্যাত অনলাইনের খবর। যার নাম হয়তো বাংলা ট্রিবিউন ডটকমের জায়গায় ‘বাংলা ট্রিবিউট ডটকম’ বলেই দুইকেই এক বলে ভাবতে বেশ ভালো লাগছে তার।

সাংবাদিকতার এই চ্যালেঞ্জ অবশ্য এখন বৈশ্বিক। সারা দুনিয়াতেই সাংবাদিকরা একদিকে ভুগছেন বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে, অন্যদিকে তত্ত্ব মেনে সাংবাদিকতাটুকু জারি রাখার চেষ্টায় হচ্ছেন হয়রান। তার মধ্যে ছাপা কাগজ বা রেডিও টেলিভিশনে আরেক ভোগান্তি, একে শুধুই ক্ষমতাবান কিংবা প্রভাবশালী আর সুশীলের কথা বলা আর শোনার মাধ্যম বলে ভাবছেন সিংহভাগ মানুষ। ফেসবুক বা ব্লগ যখন যেকোনও ব্যক্তিকে  ‘যেমন ইচ্ছে লেখা আমার কবিতার খাতা’ প্রকাশ করে দেওয়ার ক্ষমতা দেয়, তখন সাধারণ পাঠক বা দর্শক এখনও ঢুকতেই পারেন না চিরাচরিত গণমাধ্যমের বিরাট সব ইমারতে।

এমন অবস্থাতেই অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো বড় ভরসার জায়গা হয়ে এলো। যাদের স্পেস বা সময় সংকট নেই, পাতা বা সেগমেন্ট উপযোগী খবর বাছাইয়ের ঝামেলা নেই, জাতীয়ভাবে উল্লেখযোগ্য খবর নয় বলে ব্যক্তির ঘোরতর সংকটকেও পাশ কাটিয়ে যেতে হওয়ার ঝামেলা নেই।

বাংলা ট্রিবিউন আমার সেই খোলা জানালা। যেখানে আমি সেসব খবর পাই, যেসব খবর চিরাচরিত গণমাধ্যম প্রকাশ করতে পারে না। একজন উচ্চশিক্ষিত চাকরিজীবী নারী আত্মহত্যা করলে, কেন তার সহকর্মীরা সে কাজে উসকানি দেওয়ার দায়ে তার সাবেক স্বামীকে দায়ী করেন বা আমাদের আইন শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীকেও আইনের মুখোমুখি করতে পারে কিনা, তার শেষ দেখে ছাড়া একটি শক্তিশালী অনলাইনের পক্ষেই সম্ভব। এমন অসংখ্য ঘটনার পাশে ছিল বাংলা ট্রিবিউন সাংবাদিকতার সব সূত্র আর শর্ত মেনে আবার স্পেস আর জাতীয় গুরুত্বের প্রতিযোগিতার তোয়াক্কা না করেই।

আমরা যারা ৮০-৯০-এর দশকে মলিন নিউজপ্রিন্টের পত্রিকা পড়ে বড় হয়েছি, তাদের মনে থাকবে, একেকটি খবর দুই ভাগে, তিন ভাগে দুই তিন পাতা মিলিয়ে ছাপা হতো। কয়েক লাইন ছেপে নিচে লেখা থাকত এত নম্বর পৃ. (পৃষ্ঠা) এত নম্বর ক. দ্র. (কলাম দ্রষ্টব্য)। ছোট করে লিখে একেক পাতায় যত বেশি সংখ্যক সম্ভব খবর জড়ো করার প্রতিযোগিতায় খবরের কার্যকারণ বা ওই যে আমাদের শৈশবে খবরের বিশ্লেষণে সবচেয়ে জরুরি, শেষ প্যারাগ্রাফে উল্লেখ্য বলে লেখা অংশটুকু পড়তাম, তা একদম উঠে গেছে আমাদের স্পেস আর সেকেন্ডের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া প্রিন্ট আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায়। বাংলা ট্রিবিউন আমার প্রিয়, সংবাদের এই কার্যকারণ আর ‘উল্লেখ্য’ অংশটুকু ফিরিয়ে আনায়।

বাংলা ট্রিবিউন আমার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া আর চিরাচরিত সংবাদমাধ্যমের মধ্যকার একটি সেতু। আর আমার অভিনন্দন ও অভিবাদন আমার প্রিয় এই অনলাইন পত্রিকাটিকে, ভাষা, বানান, শব্দ চয়ন আর সংবাদ লেখার ব্যাকরণে বিশেষ নজর দেওয়ার জন্য। আমার কাছে নির্ভরতা আর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রথম মাইলফলক ওই ভাষা আর ব্যাকরণটুকুই। প্রত্যাশা, চিরাচরিত কী নবীন, আমাদের সব গণমাধ্যমে আমরা সবাই ভাষা, সাংবাদিকতার সূত্র ও শর্তগুলো মানতেই যেন সবচেয়ে সক্রিয় হই।   

লেখক: সম্পাদক, ডিবিসি নিউজ 

/এমওএফ/এমএনএইচ/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ