আমাদের জীবনে ফুটবল এক ট্র্যাজেডির নাম!

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৮:৪৫, জুন ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০২, জুন ২৬, ২০১৮

চিররঞ্জন সরকারপ্রাচীন গ্রিস থেকে ‘এপিসকিরো’ নামে একটি খেলা রোমে পৌঁছে নতুন নাম নিলো ‘হারপাস্টাম’। ধীরে ধীরে সারা ইতালিতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ক্যাসিলি’ বলে। সেই ‘ক্যাসিলি’র ইংল্যান্ড জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ব সাম্রাজ্যে তার চিরকালীন নামাভিষেক হয়—ফুটবল। আজ মানব সভ্যতার অপরিহার্য অংশ হিসেবে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় খেলা এই ফুটবল। আধুনিক সভ্যতার একটি অঙ্গ হলো খেলাধুলা। মানুষের বিভিন্ন সৃজনশীলতার মধ্যে এটি একটি। শরীরকে সুস্থ রাখা এবং আনন্দ পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে খেলাধুলার জন্ম। এর মধ্যে ফুটবলও পড়ে। বায়ুপূর্ণ একটি চর্মগোলক, বাইশ জোয়ান আর একখানি সবুজ মাঠ যে কী সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটাতে পারে সেটা ফুটবল দুনিয়ার দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়। নব্বই মিনিটের এই রুদ্ধশ্বাস খেলাটির মধ্যে বিস্ফোরক, নাটকীয়তা, পেলবতা, শিল্প, হিংস্রতা, রাগ-বিদ্বেষ-ভালোবাসা, হাসি-অশ্রু, টাকা, রাজনীতি, ভাগ্য-কুসংস্কার,বাণিজ্য—সবকিছু এমন মিলেমিশে আছে যে অবাক হতে হয়। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আনন্দ, উল্লাস, উত্তেজনা বা হতাশা, বেদনা, বিক্ষোভ প্রতি চার বছর অন্তর এই ‘পাদগোলক’টিকে ঘিরে!
ফুটবল মানে একটাই মাঠ। সবার জন্য সমান। একটাই বল। সবার জন্য সমান। খেলোয়াড়দের মধ্যে পার্থক্য করে দেয় শুধু পরিশ্রম আর প্রতিভা। ফুটবল এমন একটা সহজ সাধারণ কাঠামো, যেখানে জাতি-ধর্ম-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবাইকে স্বাগত জানানো হয়। তাই তো ফুটবল সারা বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় খেলা। বাংলাদেশে জনপ্রিয় তো বটেই। আমাদের দেশের রাজনীতি ও ফুটবল—দুটোই ‘এ’ এবং ‘বি’ এই দুই শিবিরে বিভক্ত। ‘এ’ হচ্ছে আওয়ামী লীগ; আর ‘বি’ হচ্ছে বিএনপি। ফুটবলে ‘এ’ হচ্ছে আর্জেন্টিনা; আর ‘বি’ হচ্ছে ব্রাজিল। যেমনভাবে দেশীয় ফুটবলে আবাহনী ও মোহামেডান! ইদানীং বিশ্বকাপে স্পেন, জার্মান, ফ্রান্স এবং জাতীয় লীগে মুক্তিযোদ্ধা, শেখ জামাল, শেখ রাসেল ইত্যাদি দলের উত্থান ঘটলেও সেগুলো তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। এই বাংলাদেশে ফুটবল খেলা চলছে প্রায় একশ’ বছর ধরে। এই খেলা ঘিরে জীবনমুখী প্রাণচাঞ্চল্যের চিহ্ন বুকে নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার হাওয়া বয়ে চলেছে। এই ফুটবল আমাদের কখনও আনন্দে আপ্লুত করেছে। কখনওবা জীবনের আর পাঁচটা ক্ষেত্রের পরাজয় ভোলাতে, ব্যর্থতার গ্লানি ঢাকতে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো কাজ করেছে। এই মোহজালে নিজেদের চোখ এবং মন দুই-ই ঢেকে রেখে আত্মতৃপ্তির আলসেমিতে ভুগতে চেয়েছি। আনন্দ-যন্ত্রণা, আশা-নিরাশার আলো-আঁধারিকে কেন্দ্র করে এই ফুটবল নিয়ে কত মজার ও দুঃখজড়িত দৃশ্যকাব্য প্রকাশ্যে ও নেপথ্যে অভিনীত হয়েছে।

যদিও আমরা ফুটবলের ‘ফেয়ার প্লে’র আদর্শটা গ্রহণ করতে পারিনি। আমরা জাতিগতভাবে ‘ফাউল’কেই গেম মনে করেছি। বিশ্বকাপ ফুটবলেও আমরা ল্যাং মারা, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের জার্সি ধরে টানাটানি করা, ঢুঁস মারা, কামড়ে দেওয়া ইত্যাদি দৃশ্য দেখেছি। আর জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমরা তা অনুসরণ করে চলেছি। বিশ্বকাপ ফুটবলে একজন রেফারি থাকেন। যারা নিয়ম ভঙ্গ করেন, তাদের তিনি হলুদ কার্ড বা লাল কার্ড দেখান। কিন্তু আমাদের রাজনীতির খেলায় যারা নিয়মিতই বিধি লঙ্ঘন করেন, তাদের কার্ড দেখানোর কেউ নেই। ফলে আমাদের রাজনীতিতে ‘ফাউল’টাই খেলার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একথা সত্যি যে, ফুটবল-সংসারে বাংলাদেশ নিতান্তই নাবালক, এমনকি পাকিস্তান, নেপাল, ভারত, মিয়ানমারকে অতিক্রম করার যোগ্যতা আমাদের নেই। স্বাস্থ্য-মেধায়-গতিতে-চিন্তাশক্তিতে-উদ্ভাবনে আমাদের যে দুর্বলতা পরাধীন আমলে ছিল তা এখনো শিকড় গেড়ে বসে আছে। স্যাটেলাইট টিভির কল্যাণে আমরা বর্তমানে বিদেশি ফুটবলের অতি উন্নত ক্রীড়াশৈলী দেখে বিস্মিত, উত্তেজিত। আর সেই সঙ্গে প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে আমাদের ফুটবল দৈন্য। আমাদের ফুটবল আজ পর্যন্ত শুধুই একটি হতাশার গোলক, অন্ধকার গ্লানিময় এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস! বর্তমান যুগ প্রতিযোগিতার যুগ। এই তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। আমাদের জাতীয় ফুটবলকে কেমন করে আনা যাবে আলোকিত গৌরবে, খেলোয়াড়, অনুশীলন, আস্থা, উদ্যম, ব্যবস্থাপনা, সংগঠক, পরিচালক, প্রশিক্ষণ কোথায় তাদের ত্রুটি? ক্ষুরধার অনুশীলন প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, গতিবেগ, বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ এ সবকিছুর সমন্বয় না ঘটলে এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করায় মনোযোগী না হলে এ হতাশা চিরস্থায়ী হবে। টেনিস বা ক্রিকেটের সূক্ষ্মতা ফুটবলে নেই। কিন্তু আছে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা, প্রবল স্নায়ুযুদ্ধ। ফুটবলের মাঠে যত মারামারি খুনোখুনি হয়—এমনটি আর কোনো খেলায় হয় না।

এই যে ফুটবলের অজস্র দর্শক—এই বিরাট দর্শকের অধিকাংশই আজকের অবক্ষয়গ্রস্ত পঙ্গু সমাজের প্রতিনিধি। সমাজ যদি পঙ্গু হয় সেই সমাজের ব্যক্তিদের চিন্তাভাবনাও পঙ্গু হতে বাধ্য। এদের নিজের কোনো চিন্তাভাবনা নেই। এরা চিন্তাভাবনা করার মতো অবস্থা হারিয়ে ফেলেছে। কিসে কি হয় এই সিদ্ধান্তে আসার মতো ক্ষমতা তাদের নেই। এক কথায় এরা ‘রিট্রিটিং ফ্রম রিজনিং’। এরা নিজেদের ব্যক্তিত্ব ভুলে নিছক গোষ্ঠী মনোভাবের দাস হয়ে পড়েছে। আলাদা করে কাউকে চেনার উপায় নেই। কারণ, ওদের এখন গোষ্ঠীবদ্ধ চেহারা। যেহেতু এরা নিজেরা কোনো কিছু ভেবে দেখে না, ওরা চায় ওদের হয়ে অন্য কেউ চিন্তাভাবনা করে দিক। এরা বাঁচার তাগিদে এক একটা গুরু খুঁজে নেয়। কারো গুরু কোনো রাজনৈতিক 'বড় ভাই', কারো গুরু কোনো সিনেমা তারকা, আবার অনেকের গুরু ফুটবল-ক্রিকেট মাঠের নক্ষত্ররা। যে ফুটবল ছিল একসময় নিছক একটি খেলা, অবস্থার চাপে সেই ফুটবল এখন পণ্য। ফুটবল এখন বিক্রি হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে ফুটবলার এবং দর্শকরাও। ফুটবল বিশ্বকাপে যখন দুটো দল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে তখন আসলে ১১ জন কোটিপতির বিরুদ্ধে ১১ জন কোটিপতির খেলাই আমরা দেখতে পাই। সেটাও আকর্ষণীয়।

ফুটবল মাঠে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ তাদের প্রিয় ফুটবলারদের দেখতে যায়। এদের মধ্যে অনেকেই হয়তো কোনও দিন ফুটবল খেলেনি। আবার অনেকেই খেলেছে; কেউ কেউ বড় ফুটবলার হতে চেয়েছিল। পারেনি। যে সমাজে অধিকাংশ লোক ফুটবল খেলতে, এমনকি খেতে পর্যন্ত পায় না, বড় ফুটবলার হওয়ার সুযোগ  যেখানে নেই বললেই চলে, সেখানে সেই হাজার হাজার বঞ্চিত মানুষ ভিড় করে ফুটবল মাঠে, টিভির সামনে। নিজের প্রিয় খেলোয়াড়ের মধ্যে খুঁজে নেয় নিজেকে, প্রিয় দলের জয়কে মনে করে নিজের জয়। সমাজ এদের কিছুই দেয়নি। তাই এরা অবাঞ্ছিত, অসামাজিক। জয় ছাড়া এরা অন্য কিছু বোঝে না, বুঝতে চায় না। নিজেদের দল হারলেই এরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, হিংসার উন্মত্ততা ছড়িয়ে পড়ে। এটা তরুণদের দোষ নয়। অফুরন্ত এদের প্রাণশক্তি। এর একটা বহিঃপ্রকাশ প্রয়োজন। অথচ এদের জীবনে কোনও সান্ত্বনা নেই। কোনও ভবিষ্যৎ নেই। পেছনে নেই কোনও অতীত গৌরব। ফুটবলই এদের একমাত্র শক্তির জায়গা। বিক্ষোভ দেখাবার জায়গাও বটে।

আমাদের জীবনে ফুটবল একটি ট্র্যাজেডির নাম। খেলোয়াড় হতে না পেরে সমাজের অধিকাংশ মানুষের দর্শকে পরিণত হওয়ার আশ্চর্য গল্প! আমাদের ফুটবল এবং রাজনীতির মধ্যেও রয়েছে একটি ভয়ঙ্কর সাদৃশ্য। ফুটবলে যেমন বছরান্তে দলবদল হয়, রাজনীতিতেও ইলেকশন মৌসুমে দলবদল হয়। এ দলবদলের ক্ষেত্রে দলের আদর্শ বা নীতি মুখ্য বিবেচ্য নয়, বরং নগদ অর্থ তথা প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ওপরই নির্ভর করে কে কোন দলের আনুগত্য বরণ করবে। ফুটবল ক্লাবের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কোটিপতি, কালো টাকার মালিকদেরই প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। বড় বড় ক্লাবগুলোতে বেশি বেশি টাকাওয়ালাদের সমাবেশ ঘটে এবং এদের সামর্থ্যের ওপর ক্লাবের শক্তিমত্তা নির্ভর করে। একই রকমভাবে রাজনীতিতেও যে দল যত বেশি কালো টাকার মালিক এবং কোটিপতির সমর্থন পায় তারাই তত শক্তি অর্জন করে। ফুটবলে যেমন গোটা জাতি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, আবাহনী-মোহামেডান ইত্যাদি গোষ্ঠীতে বিভক্ত, রাজনীতিতেও আওয়ামী লীগ-বিএনপি ইত্যাদি বিভাজন রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই বিভাজিত সমর্থক গোষ্ঠীর উন্মত্ততা অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রকাশ পায়।

আসলে আমাদের আর্থসামাজিক কাঠামোর সঙ্গে ফুটবল একাকার হয়ে গেছে। এদেশের একশ্রেণির মানুষ আছে যারা বিভিন্ন লিগ বা টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। এরা হচ্ছে বৃহৎ দলের নেতা এবং পুঁজিপতি প্রমুখ। আরেক শ্রেণি আছে, যারা খেলোয়াড়। যারা উচ্চদামে বিক্রি হন বিভিন্ন দলের কাছে। নগদ নারায়ণের ভরসায় তারা খেলে যান পেশাদারি মনোভাব নিয়ে। রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত আমলা প্রমুখ এ জাতভুক্ত। এর বাইরে আপামর জনগণ দু’ভাগে বিভক্ত। আমজনতার একটা বড় অংশ নিজেই ফুটবল। সারা জীবন যারা লাথি খেয়েই যায়। এক খেলোয়াড়ের কাছে লাথি খেয়ে অন্যজনের কাছে। এভাবে পায়ে পায়ে দীর্ণ হতে হতেই তাদের বেঁচে থাকা কিংবা মরে যাওয়া। এর বাইরে আরেকটা দল আছে যাদের বলা যায় নির্বোধ। এরা গাঁটের পয়সা ভেঙে সময়-শ্রম নষ্ট করে, রাত জেগে খেলা দেখে, হাততালি দেয়। স্লোগান তোলে, পটকা ফাটায়, প্রতিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে মরণপণ ঝগড়ায় মত্ত হয়, নির্বোধের মতো মাঝে মাঝে আত্মদান করে। এরা দর্শক।

স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর কেটে গেলো—আমাদের রাজনীতি হতাশা, ব্যর্থতা আর দলবাজি ছাড়া কোনও কিছুই উপহার দিতে পারেনি। আমাদের ফুটবলও আজ পর্যন্ত ব্যর্থতা আর পরাজয়ের গ্লানি ছাড়া অন্য কিছুই দিতে পারেনি। আমরা ফুটবল এবং রাজনীতি উভয়কে নিয়েই স্বপ্ন দেখেছি, প্রত্যাশার মিনার গড়েছি; সেই প্রত্যাশার মিনারে আজ শুধুই জিজ্ঞাসার চিহ্ন! আমরা তবু স্বপ্ন দেখি। প্রতিনিয়ত প্রতারিত হয়েও আওয়ামী লীগ-বিএনপির নামে রাজপথে মাতম তুলি। বঞ্চনার দগ-দগে ঘা নিয়ে ধানের শীষ বা নৌকা মার্কায় ভোট দিই। বারবার স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়েও ফুটবল খেলা দেখি। সবকিছুর মৃত্যু ঘটলেও স্বপ্নের তো মৃত্যু ঘটে না। তাই তো আশায় বুক বাঁধি- বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ খেলবে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, এদেশের মানুষ একদিন বাংলাদেশের ফুটবল টিমের জন্য হাততালি দেবে, প্রাণপণে চিৎকার করবে! আওয়ামী লীগ-বিএনপি কিংবা অন্য কারও হাত ধরে একদিন জাতির মুক্তি আসবে!

প্রশ্ন হলো, আমাদের আশার রাজনীতি, প্রত্যাশার ফুটবল আর কতকাল অনন্ত হতাশার গোলক হয়েই থাকবে?

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ