অনেকের ধমনীতে এখনও পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের রক্ত!

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৪:১৪, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৬, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮

চিররঞ্জন সরকারহ্যাঁ, ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন বাংলাদেশে এখনও আমাদের সবার ধমনীতে শহীদের রক্ত নেই, অনেকের ধমনীতে রাজাকার বা পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের রক্ত বইছে! এই পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা এখনও মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে হেঁয়ালি করতে, খানিকটা কটাক্ষ করে কথা বলতে পছন্দ করেন। ‘ইস, মুক্তিযুদ্ধের কথা আর শুনতে ইচ্ছে করে না। সেই একই প্যাঁচাল, একই ঘ্যানঘানানি!’ অনেকে আবার ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’টা ছেঁটে ফেলে কেবল ‘চেতনা’ শব্দটি ব্যঙ্গার্থে ব্যবহার করেন। মুক্তিযুদ্ধের কথা যারা বলেন তাদের ‘চেতনা ব্যবসায়ী’ বলেও উপহাস করেন। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সাধারণত রাজাকারপন্থী পরিবারের তথাকথিত শিক্ষিত ও অতি-বিপ্লবী ব্যর্থ বামরা এ ধরনের কথা বেশি বলেন। 
তাদের ভাবখানা এমন–মুক্তিযুদ্ধ একটা বাহুল্য জিনিস। ওটার কোনও দরকারই ছিল না। যদিওবা হয়েছে, তাতে কী হয়েছে? ওটা নিয়ে অনন্তকাল পড়ে থাকতে হবে? এই অর্বাচীনরা একবারও ভাবেন না, মুক্তিযুদ্ধ না হলে আজ তাদের কথা বলার মতো অবস্থাও থাকতো না। আজকে হয়তো কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া শিখে পাকিস্তানি কোনও ধনীকের বাড়িতে গোলামি করতে হতো!

হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই এগিয়ে যাবো, সামনে চলবো, কিন্তু যাদের ত্যাগ ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে এই স্বাধীনতা, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি, তাঁদের প্রতিনিয়ত যথাযথ শ্রদ্ধা সম্মান করেই যাবো। মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা হৃদয়ে ধারণ করেই সার্থক হবে আমাদের পথচলা। পৃথিবীর সব সভ্য জাতি তাই-ই করে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কুড়িয়ে পাওয়া কিংবা কারও দয়ার দানে পাওয়া কোনও দেশ নয়। এর জন্য অনেক লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেক আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছে, এখনও সেই চেতনা ধারণ করছে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললে, স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানপন্থীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কথা বললে এখনও দেখি অনেকে আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করেন। এই দলটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে দূরে চলে গেছে, মুক্তিযুদ্ধকে দলীয়করণ করেছে, মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবসায় পরিণত করেছে, আওয়ামী লীগেও রাজাকার আছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা রাজাকার পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা করেছে-এমন নানা বিষয় নিয়ে ‘ত্যানা-প্যাঁচানো’ শুরু করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ও এই গোষ্ঠীটি সক্রিয় ছিল। এত বছর পর কেন, এভাবে কেন, ওভাবে নয় কেন, আওয়ামী লীগেও যুদ্ধাপরাধী আছে, তাদেরও বিচার হোক, আমরাও বিচার চাই তবে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হতে হবে–এমন নানা কথা বলে ওই পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা হালের জামায়াতি জোটের নেতা ড. কামাল হোসেনের গুণধর জামাতাকে সঙ্গে নিয়ে বিচার বানচালের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। দেশে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর তাদের ‘জ্বলুনি’ আরও কয়েকগুণ বেড়েছে। এখন তাদের একটাই ব্রত– আওয়ামী লীগের ‘ছিদ্রান্বেষণ’! তাদের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, আওয়ামী লীগ রাজাকারের চেয়েও খারাপ!

প্রথমেই কবুল করা ভালো যে, আওয়ামী লীগ ধোঁয়া তুলসীপাতা নয়। নির্বাচনি রাজনীতিতে টিকে থাকতে গিয়ে তারা অনেক কিছুর সঙ্গেই আপস করেছে। আওয়ামী লীগের গত এক দশকের শাসনামলে অনেক সমালোচনা, ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু মনে রাখা দরকার, এই দলটির নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। গণমানুষের এই দলটিই স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরে স্টাবলিশমেন্টের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। আওয়ামী লীগ কখনও রাজাকার বা পাকিস্তানপন্থীদের পক্ষে একটা অক্ষরও উচ্চারণ করেনি, কোনও রাজাকার শিরোমণিকে কোলে তুলে নাচেনি।

অবহেলিত, দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে খুঁজে বের করা, তাদের সম্মান দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা-এসব কাজও কিন্তু আওয়ামী লীগই করেছে। বাকি সবাই মুখে মুখেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি দরদ দেখিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আওয়ামী লীগের অসততার কোনও প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবেন বলে মনে হয় না।

আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিয়ে একসঙ্গে আন্দোলন করেছে, রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর জন্য জামায়াতি আমিরের দোয়া নিয়েছে, হেফাজতের সঙ্গে আপস করেছে-এসব কথাও ‘ছিদ্রান্বেষী’ বাচালরা খুব জোরেশোরেই উল্লেখ করে থাকেন। তাদের বলি, আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে ‘একসঙ্গে আন্দোলন’ করার পরও কিন্তু যখন সুযোগ এসেছে, তখন জামায়াতের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। বিএনপির মতো জামায়াত নেতাদের কোলে তুলে নেয়নি, চিহ্নিত রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়নি। আজকে হেফাজতকে বিএনপির খপ্পর থেকে বাইরে রাখতে সাময়িকভাবে ‘তোষণ’ করছে বটে, কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করলে ঠিকই তাদের টাইট দেবে। এরশাদ সম্পর্কেও এটা সত্য। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ দৈত্যকে বোতলে ভরে রাখতে জানে! আর অন্যরা বোতলের দৈত্যকে আশকারা দিয়ে দেশকে কীভাবে আফগানিস্তান বানাতে হয়, সেই মহড়া দেয়। পার্থক্য এখানেই।

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজনৈতিকভাবে যারা নেতিবাচকক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত, তারা খুব সহজেই বিএনপির মিত্র হয়ে যায়। আর এসব ‘মিত্র’দের পাশে পেলে, শক্তিশালী হলে দেশে কী হয়– তা আমরা ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে দেখেছি। বিএনপি ক্ষমতায় না থাকলেও যে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশকে মিনি আফগানিস্তান বানাতে পারে, সেটা আমরা দেখেছি ২০১৩-১৪ সালে। কাজেই যারা কেবল সমালোচনার জন্য আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেন, আওয়ামী লীগে রাজাকার খোঁজেন, হেফাজতকে যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন, তারা জ্ঞানপাপী ছাড়া কিছু নয়। বাংলাদেশ যে এখনও ইরাক, লিবিয়া কিংবা আফগানিস্তান হয়নি, এটা অবশ্যই আওয়ামী লীগের অবদান। হ্যাঁ, আওয়ামী লীগের অনেক সমালোচনা আছে। তারা আরও অনেক ভালো কিছু করতে পারত, করা উচিত ছিল। আর্থিক খাতে অনিয়ম লুটপাট বন্ধ করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের আরও উদ্যোগী ভূমিকা পালনের কথা ছিল। শিক্ষাব্যবস্থার অধঃপতন ঠেকাতে তারা ক্ষমাহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যা, সাগর-রুনি-ত্বকি-তনু হত্যার বিচার করতে না পারা, শামীম ওসমান-বদির মতো ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা, কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে শক্তি প্রয়োগ করে দমন, এসব ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজাকারদের সঙ্গে তো আপস করেনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গ্রেনেড মেরে নিঃশেষ করার চেষ্টা করেনি। জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়নি। শুধু সুশাসন দিতে পারেনি বলে আমি তো আর স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে পারি না। কারণ, আমার ধমনীতে বইছে শহীদের রক্ত। পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের রক্ত বইলে আমি হয়তো ভিন্ন ভাবনা ভাবতাম!

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ