হলফনামা, ইশতেহার ও নির্বাচন

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৬:৩০, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৭, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৮

আহসান কবিরনির্বাচন ও বাজেট—দুটোই দুর্ভাগা শব্দ। একপক্ষ এদের ভালো বললে অন্যপক্ষ খারাপ বলবেই। যে সরকার ক্ষমতায় থেকে বাজেট প্রণয়ন করে, তাদের ভাষায় সেটা হয় গণমুখী। আর সরকারবিরোধীরা এই বাজেটকে বলেন গরিব মারার বাজেট! নির্বাচনও তেমন। যারা কোনও না কোনও উপায়ে জয়ী হয়, তাদের কাছে নির্বাচন হচ্ছে নিরপেক্ষ ও অবাধ। আর বিরোধীদের কাছে সূক্ষ্ম কিংবা স্থূল কারচুপির নির্বাচন!
গণতন্ত্রের জন্য সব নির্বাচনই নাকি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও অখণ্ড রাশিয়ার প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) জোসেফ স্ট্যালিনের বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে–যারা ভোট দেয়, তারা কখনও নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে না, কোনও সিদ্ধান্ত তৈরি করতে সক্ষম হয় না! যারা ভোট নেয় ও গণনা করে, তারাই সবকিছু পরিবর্তন করে!
নির্বাচন ও বাজেটের মতো আরও দুটো শব্দ হচ্ছে হলফনামা ও ইশতেহার। এই দুই শব্দে যাওয়ার আগে একটু অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক।
যদিও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে আমরা এখনও আশাবাদী এবং বিএনপি,জামায়াতে ইসলামী ও ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনকে নিয়েছে ‘আন্দোলনের’ অংশ হিসেবে। তারা মনে করে এবং তাদের ইশতেহার অনুসারে:

এক. ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ‘অবৈধভাবে’ ক্ষমতায় এসেছিল। এই সরকারকে জনগণ আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। মানুষ শুধু ভোট দিতে পারলেই বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের বিশাল বিজয় হবে।

দুই. আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতি দমন করতে পারেনি। লাগামহীন দুর্নীতি, ব্যাংকের সোনা অন্য ধাতু হয়ে যাওয়া, শেয়ারবাজার ধসে লাখ মানুষের পথে বসা ও ব্যাংক লোপাটকে জনগণ ভালো চোখে দেখেনি। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে বিএনপির ইশতেহারে তাই সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং শাখা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

তিন. ঐক্যজোটের ইশতেহারে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চালিয়ে নেওয়ার ঘোষণা আছে কিন্তু বিএনপির ইশতেহারে নেই। প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের কথাও বলা আছে বিএনপির ইশতেহারে। অবশ্য, ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পরের বাস্তবতা আদৌ সেটা বলে না।

এবার সরকারি তথা আওয়ামী লীগের ইশতেহার অনুসারে:

এক. জঙ্গিবাদবিরোধী শক্ত অবস্থান এবং  মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চালিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার আছে। আওয়ামী লীগ এই কাজটি করতে পেরেছে এবং নিঃসন্দেহে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতি ও অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হয়েছে।

দুই. পদ্মা সেতুসহ সব উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া ও শেষ করার অঙ্গীকার আছে। আছে ডিজিটাল বাংলাদেশে সর্বশেষ প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও। উন্নয়ন ও ডিজিটাল ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের সফলতা চোখে পড়ার মতো।

তিন. ইশতেহারে আছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা তথা জিরো টলারেন্সনীতি। তবু, গত দশ বছরে দেশে দুর্নীতির মাত্রা বেড়েছে। কঠিন শাস্তি পেয়েছে কয়জন? ডেসটিনির মালিকদের কয়েকজন ছাড়া যারা হলমার্ক কেলেঙ্কারি করেছেন, যারা সরকারি ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন, বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংককে রুগ্‌ণ বানিয়েছেন, তাদের বিচার হয়নি। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে কয়জন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছেন? আওয়ামী লীগের ইশতেহারে সুশাসনের কথা বলা হলেও গত দশ বছরে গুম দেশবাসীর জন্য ভয়াবহ এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও এই পরিস্থিতির উন্নতি কতটা হবে?

এবার হলফনামা ও ইশতেহারের প্রসঙ্গে আসা যাক। এবারের ‘হলফনামা’ খুব আশাব্যঞ্জক। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রায় সব রাজনীতিবিদ গত দশ বছরে সম্পদশালী হয়েছেন। তাদের সম্পদ দ্বিগুণ থেকে পঞ্চাশগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। বাংলাদেশ যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, তা নেতা-মন্ত্রী-এমপিদের হলফনামা দেখলেই বোঝা যায়। এসব মানুষের স্ত্রীর সম্পদও বেড়েছে অনেকগুণ। সম্পদ না থাকলে সম্ভবত এমপি হওয়া যায় না। ড. কামাল হোসেন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কোটি টাকা খরচ না করলে নির্বাচনে জেতা যায় না! ‘হলফনামা’ হচ্ছে আদালতের কাঠগড়ার  মতো যেখানে লেখা থাকে ‘যাহা বলিব সত্য বলিব’। হলফনামায় এমপি-মন্ত্রী-নেতারা সম্পদের যে বিবরণ দেন বাস্তবে তারা তার চেয়ে বহুগুণ সম্পদের মালিক। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের মতো সৎ এবং টাকা পয়সা সম্পদহীন মানুষ বিরল। সম্ভবত তাদের দেখা মেলে বইয়ের পাতায় কিংবা সিনেমায়, বাস্তবে নয়! এমন ছবির মতো সুন্দর মানুষরাও নির্বাচনে পরাজিত হন! জনগণ কখন যে কাকে ভালোবাসে!

আর ইশতেহার হচ্ছে উপদেশমালা সংবলিত বই অথবা ‘বাণীর চিরন্তনী’র মতো। দক্ষিণ আফ্রিকার একটি প্রচলিত প্রবাদ হচ্ছে, ইশতেহার সুন্দরতম প্রতিশ্রুতির ঘোড়া। বাস্তবে ইশতেহারের বাস্তবায়ন কচ্ছপের গতিকেও হার মানায়।

সবশেষে মানুষ কী ভাবছে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে? সাধারণ মানুষের খুব সাধারণ ধারণা এমন–

এক. নির্বাচন কতখানি নিরপেক্ষ ও অবাধ হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত ও ঐক্যজোটের কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার ঘোষণা মানুষের মনে সংশয় জাগিয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে সংঘর্ষ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ুক সেটা কারো কাম্য নয়। তবে বিএনপি-জামায়াত ঐক্যজোটের সেই সাংগঠনিক ক্ষমতা আছে কিনা, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে অনেকের। তারপরও ভোটের মাধ্যমেই হোক সবকিছু। অন্য কোনও ‘আত্মঘাতী কামনা’ কারও না থাকুক!

দুই. নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সারাদেশে আলোচনা আছে। তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রধান দুই দল বা জোট দুই রকম কথা বলে। কোনটা ঘটবে, সেটা ২৯ তারিখ দিবাগত রাত থেকেই বোঝা যাবে। নির্বাচন কমিশনেও ‘ঝগড়া’ আছে!

তিন. সাধারণ মানুষ অনেক কথাই বলবে ও এটাই স্বাভাবিক। ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী বাস্তবতায় বিএনপি ও জোট সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর যেভাবে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছিল, এবারের নির্বাচন পরবর্তী বাস্তবতায় তেমন আশঙ্কার কথাই বলেন অনেকে।

জামায়াতে ইসলামী যে পঁচিশটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে, তাদের ভাগ্য ঝুলে আছে আদালতে। দলের নিবন্ধন হারানো জামায়াত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে কিনা হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সেই সম্পর্কে রায় দেওয়ার কথা আগামী ২৪ ডিসেম্বর (২০১৮)। বিএনপির ১৭ জন প্রার্থীর প্রার্থিতা আটকে গেছে ঝুলে আছে আদালতে। হাইকোর্ট তিনটি আসনে বিএনপি প্রার্থী বদলের রায় দিয়েছে। এছাড়া জেলে আছেন বিএনপির ১৫ জন প্রার্থী। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে। এই পঞ্চাশ ষাটটি আসনের ফলাফল কী বদলে দেবে অনেক কিছু?

২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে নতুন ও তরুণ ভোটার ছিল ১ কোটি ৩৭ লাখ। ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে অনেকে ভোট দিতে পারেননি বা ভোট দেননি। এবার সারাদেশে ২ কোটি ৬৪ লাখ নতুন ও তরুণ ভোটার ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবেন। এই তরুণ ভোটাররাই হারা জেতার নিয়ামক হয়ে দাঁড়াতে পারেন!

আসুন প্রতীক্ষা করি, শান্তিময় ভোটের জন্য প্রার্থনা করি এবং ব্যালটের মাধ্যমে যেন সবকিছু হয় এই কামনা করি।

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ