সত্যি কি রেলপথ বদলাবে?

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৪:৩৭, মার্চ ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৮, মার্চ ০৯, ২০১৯

রেজানুর রহমানরেলগাড়ি নিয়ে কতইনা স্মৃতি আছে আমার। ঢাকায় প্রথম আসি রেলগাড়িতে চড়ে। তখনকার দিনে দেশের সড়কপথ এত ভালো ছিল না। আর তাই সড়কপথ ছেড়ে সবাই ছুটতো রেলের দিকেই। সড়ক পথের উন্নতি হলো আর আমরা বেমালুম ভুলে গেলাম রেলপথকে। একদিকে সড়ক পথের জন্য বিলাস বহুল গাড়ি আসতে থাকলো অন্যদিকে দেশের অনেক রেলপথ বন্ধ হতে থাকলো। অনেক ব্যস্ত রেলস্টেশনও বন্ধ হয়ে গেলো। অনেকে হয়তো ভাবছেন সড়ক পথের উন্নতি হলে বিলাস বহুল গাড়ির তো দরকার পড়বেই। এটাই তো যুগের চাহিদা। সেখানে আপনি রেলপথ বন্ধ হওয়ার যোগসূত্র খুঁজছেন কেন? কোন যুক্তিতে? যুক্তি আছে রে ভাই। শুধুমাত্র একটাই উদাহরণ দেই তাহলেই ব্যাপারটা বোধকরি পরিষ্কার হবে। কয়েক বছর আগে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা অভিমুখি একটি ট্রেন চালু হলো। ট্রেনটি সকালে ময়মনসিংহ রেলস্টেশন অতিক্রম করে ঢাকায় চলে যাবে। ফলে ময়মনসিংহ থেকে যারা নিয়মিত বাসে করে ঢাকায় এসে ব্যবসা বাণিজ্য অথবা অফিস করেন তারা ঝুকলেন সকালের সেই ট্রেনের প্রতি। বাসের যাত্রী কমে গেলো। তখন বাস মালিকরা তাদের শ্রমিকদের দিয়ে এমন আন্দোলন শুরু করলেন যে, চট্টগ্রামের সেই ট্রেনটির সময়সূচি বদলে গেলো। সকাল ছয়টার পরিবর্তে ভোর পাঁচটায় ট্রেনটি ময়মনসিংহ রেলস্টেশন অতিক্রম করতে থাকলো। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। বাস মালিকরা লাভবান হলেন।

একথা সত্য, দেশে সড়ক পথের উন্নতি হওয়ার পর থেকেই রেলের দুর্গতি শুরু হয়। কিন্তু কেউ তো কারও জন্য থেমে থাকবে না। সড়কপথ তার মতো করেই চলবে। রেলপথকেও তার মতো করে চলতে হবে। দুই পথেই প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মানসিকতা না থাকলে তো কাজের কাজ কিছুই হবে না।

ওই যে বললাম রেলপথ নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি আছে। সেটা একটু বলি। ছোটবেলায় সৈয়দপুর থেকে পার্বতীপুর হয়ে লালমনিরহাট গামী ট্রেনে চেপে তিস্তা রেলস্টেশনে গিয়ে ট্রেন বদল করতাম। তারপর তিস্তা থেকেই চিলমারী অভিমুখি ট্রেনে চেপে কুড়িগ্রাম রেলস্টেশন পেরিয়ে পাঁচপীর নামক একটি রেলস্টেশনে ট্রেন থেকে নামতাম। তারপর হাঁটাপথে চলে যেতাম গ্রামের বাড়ি। তখনকার দিনে ট্রেনে বেশ ভীড় হতো। দাঁড়াবারও জায়গা পাওয়া যেত না।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তিস্তা থেকে চিলমারী অভিমুখি পথে এখন নাকি নিয়মিত ট্রেনই চলে না। এই রুটে অনেক রেলস্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কুড়িগ্রাম ও উলিপুর অভিমুখি রেলের মাঝপথে আমার স্মৃতি বিজড়িত সেই ‘পাঁচপীর’ নামের রেলস্টেশনটির কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। শুনলাম সেখানে নাকি নিয়মিত কোনও রেল কর্মকর্তা বসেন না। অথচ একটা সময় এই রেলস্টেশনটির কতই না কদর ছিল। রাত দিন ২৪ ঘণ্টা ছোট্ট রেলস্টেশনটিতে ব্যস্ততা লেগেই থাকতো। আর এখন সেখানে সুনশান নীরবতা বিরাজ করে। রেলস্টেশনটির পেছন দিক দিয়ে চলে গেছে পিচ ঢালা পথ। সারাদিন বিলাস বহুল গাড়ি চলাচল করে। স্টেশনটির পাশ দিয়েই বাস গুলো শা-শা শব্দ করে চলে যায়। এক সময়ের দারুন ব্যস্ত রেলস্টেশনটি হয়তো অসহায়ের মতো পরিস্থিতি দেখে আর তার অতীত দিনের কথা ভাবে।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়। সেই তুলনায় আমাদের রেল ব্যবস্থা বদলায়নি। প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে জেনেও গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দিয়েছে। ভাবটা এমন রেলপথ তো সরকারের সম্পত্তি। সরকারি মাল দরিয়া মঞ্চে ঢাল। ক্ষতি হলে সরকারের হবে। সেখানে কোন রেলপথ বন্ধ হলো, কোন স্টেশনের অফিসই খোলে না এতকিছু দেখারই বা দরকার কী। বেতন তো পাচ্ছি। কবি আসাদ চৌধুরীর কবিতার ভাষায়, ‘খাচ্ছি দাচ্ছি ঝাকের কই ঝাকে মিশে যাচ্ছি’। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে বাংলাদেশের রেলপথ তার অতীত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। অথচ উন্নত দেশ সমূহে তো বটেই অনেক উন্নয়শীল দেশেও রেলপথকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ রেলপথই একমাত্র সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা। আর তাই রেলপথের প্রতিই সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকে বেশি। জাপানের টোকিও শহরে দেখেছি পাঁচ মিনিট পর-পর পাতাল পথে ট্রেন আসছে আর যাচ্ছে। কী সুন্দর আয়োজন। অতদূর যাওয়ারই বা দরকার কী? বাড়ির পাশে কলকাতায়ও তো রেল ভ্রমণের কী সুন্দর ব্যবস্থা করা আছে। দূরদুরান্ত থেকে রেলযোগে মানুষ আসে কলকাতা শহরে। প্রয়োজনীয় কাজ শেষে বিকেলে অথবা সন্ধ্যায় অবার রেলেই বাড়ি ফিরে যায়। আহারে আমাদের দেশেও যদি এমন ব্যবস্থা থাকতো তাহলে ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ অনেক কমতো।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলের প্রতি নজর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন শুনে বুকে বল পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী রেলের প্রতি নজর দিয়েছেন। আশা করা যায় এবার রেলপথের উন্নয়ন ঘটবেই। কারণ আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়নে যা বলেন তা করেও দেখান। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশে প্রচুর সড়ক, মহাসড়ক হয়েছে। এখন রেলের উন্নয়নে বিশেষ জোর দিতে হবে। আমাদের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত হাইস্পিড রেল দরকার।

ইতিমধ্যে আরও একটি আনন্দ সংবাদ পেয়েছি আমরা। দেশে প্রথবারের মতো পাতাল রেল নির্মিত হতে যাচ্ছে। বিমান বন্দর, খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচার পার্ক, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, রামপুরা হাতিরঝিল, মালিবাগ, রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে শেষ হবে এই পাতাল রেলপথ। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে এই খবর জানিয়েছিলেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের (অসুস্থ হওয়ার আগে) এদিকে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম কমলাপুর রেলস্টেশনের যাত্রী সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, এক মাসের মধ্যে রেলের সেবার মান না বাড়ালে দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দেশের রেল ব্যবস্থা আবার তার গতি ফিরে পাবে একথা ভাবতেই ভালো লাগছে। আবার দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া রেলস্টেশনগুলো সরব হয়ে উঠবে, বন্ধ হয়ে যাওয়া রুটে আবার কু…উ…উ… ঝিক ঝিক… শব্দে দিনরাত ছুটে চলবে সাধারণের প্রিয় বাহন রেলগাড়ি। সেই সঙ্গে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের রেল কারখানাগুলোও নিশ্চয়ই তার গতি ফিরে পাবে? বিশেষ করে এক সময়ের দুর্বার গতি সম্পন্ন সৈয়দপুর রেল কারখানা সচল হয়ে উঠবে নিশ্চয়ই?

তবে একটা ভয় দূর হচ্ছে না। সরকারি কঠোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পুরনো ঢাকায় ক্ষতিকর কেমিক্যালের ব্যবসা সরাচ্ছে না অনেকে। এতগুলো জীবন গেলো। তবুও হুঁশ হচ্ছে না অনেকের। ব্যক্তিগত স্বার্থকেই বড় করে দেখছেন প্রভাবশালীরা। রেলের পরিবর্তনে এ ধরনের প্রভাবশালীরাই না আবার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ট্রেনের সময়সূচি নিয়ে যেমন বাঁধা এসেছিল ময়মনসিংহে তেমনই নতুন কোনও অপ্রীতিকর বাঁধা না এসে দাঁড়ায়? অন্যদিকে রেলের নানা দুর্নীতে নিয়েও ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। রেলের দুর্নীতিবাজরা না আবার নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করে।

তবুও আমরা আশায় আছি। রেলপথের কাঙ্ক্ষিত বদল আসবেই আসবে…

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ