আমার একটা ট্রেন ছিল!

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৯:২৫, এপ্রিল ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫৭, এপ্রিল ১৯, ২০১৯






আহসান কবিরকবিতার সঙ্গে নাকি ট্রেনের নিবিড় সম্পর্ক আছে। ট্রেনের গতিতে ছন্দ আছে, শব্দও আছে। কবিতারও তাই। তবে বিপদও আছে। বিপদের নাম কবি টোকন ঠাকুর। তার প্রথম বইয়ের নাম ‘অন্তরনগর ট্রেন ও অন্যান্য শব্দ’। যারা কবি টোকন ঠাকুরের প্রশংসা করতে যেতেন তাদের বেশিরভাগ নাকি বলতেন—আপনার লেখা ‘আন্তঃনগর ট্রেন’ পড়লাম! ভাগ্যিস টিকিট সংকটের সময়ে কেউ তার কাছে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট চেয়ে বসেননি!





তবুও কবিতার মতো মনের ট্রেনও হুইসেল দেয়, হৃদস্পন্দনের মতো ঝিক ঝিক শব্দ তোলে। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় তাই ট্রেনের কামরায় নায়ক নায়িকার হঠাৎ দেখা হয়। সেই সুন্দর প্রশ্নটা চলে আসে শেষমেশ- আমাদের গেছে যেদিন তা কি চিরতরেই গেছে, কিছুই কী নেই বাকি? (এখানে বাংলাদেশ রেলওয়ে সম্পর্কে কিছু বলা হচ্ছে না। কারণ, এ দেশের ট্রেনের কখনও ‘দিন’ ছিল কিনা সেটা নিয়েই সন্দেহ আছে। সুতরাং রেলওয়ের দিনকালের যাওয়া আর আসা নিয়ে প্রশ্ন না তোলাই ভালো)। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতেও আছে ট্রেনে নায়ক-নায়িকার প্রেমের দৃশ্য। গায়ক পথিক নবীর জনপ্রিয় গান ‘আমার একটা নদী ছিল জানলো না তো কেউ’-এর মতো ভবিষ্যতে কেউ গাইতে পারে—আমার একটা ট্রেন ছিল জানলো না তো কেউ!
সবচেয়ে লম্বা গাড়ির ট্রেন নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। গল্পে, ছবিতে, গানে কিংবা সাহিত্যেও ট্রেন সমানতলে ছুটে যাচ্ছে। কেউ যদি সকালটা খুব সুন্দরভাবে শুরু করতে চায় তিনি শুনতে পারেন সেই সুন্দর গান-ইফ ইউ মিস দ্য ট্রেন আই মর্ন, ইউ উইল নো দ্যাট আই হ্যাভ গন, ইউ ক্যান হেয়ার দ্য হুইসেল ব্লো এ হান্ড্রেড মাইলস...হান্ড্রেড মাইলস…! যতদূরে যেতে চান আপনাকে নিয়ে যেতে পারে ট্রেন, কাছেও নিয়ে আসতে পারে। অবশ্য দীর্ঘশ্বাসের পাল্লা ভারি থাকলে আরেকটা গান শুনতে পারেন- দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা বন্ধু চিরকাল। রেললাইন বহে সমান্তরাল! রেললাইনের সমান্তরাল বয়ে যাওয়াটাও দর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে! হুমায়ূন আহমেদের লেখায় ছিল এক পাগলের কথা। সে স্টেশনে গিয়ে ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতো-‘বাবারা লাইনে থাকিস!’ ট্রেনের মতো জীবনের লাইনে থাকাটাও জরুরি। মারফতি ভাণ্ডারি গানের কথাও তাই এমন-বাবা ভাণ্ডারি/তেল ছাড়া চলে না রেলগাড়ি! বাবা ভাণ্ডারি/লাইন ছাড়া চলে না রেলগাড়ি! লাইনে না থাকলে নাকি কখনও সাফল্য আসে না। তবে বিভূতিভূষণের মতো ট্রেনের চলাচল, জীবনে এর প্রভাব নিয়ে এমন ঘোর আর কেউ তৈরি করতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ আছে। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’ পড়ে তাই মুগ্ধ পাঠক, মুগ্ধ সত্যজিতের পথের পাঁচালি ছবি দেখে বিশ্ববাসী।
ট্রেন নিয়ে আফসোসের পাল্লাটা বেশ ভারি। এ কারণে প্রবাদ হয়ে দাঁড়ায়- নয়টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে? অথবা ঝিক্কির ঝিক্কির ময়মনসিং/আইতে যাইতে কতদিন? কখন ট্রেন ছাড়বে আর কখন পৌঁছাবে, কেমন গতিতে চলবে সেই টেনশন থেকেই গল্প তৈরি হয়। যেমন-স্টেশন মাস্টারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এক মহিলা। এই মহিলার তিনকূলে কেউ নেই, শুধু একটা গাভী আছে। রেলস্টেশনে এই গাভী রাজার মতো ঘুরে বেড়ায়। এই গাভীর দুধ প্রতিদিন এক বা একাধিক লোক দুইয়ে নিয়ে যায়। স্টেশন মাস্টারকে জড়িয়ে মামলা করার কারণ এই যে ট্রেন যতক্ষণ স্টেশনে থেমে থাকে আর যাত্রা শুরু করার পর যে গতিতে চলে, তাতে এক বা দুইবার গরুর দুধ দুইয়ে নিয়ে যাওয়া যায়! বিখ্যাত লেখক তারাপদ রায় তাঁর এক লেখায় ট্রেন নিয়ে একটা মজার ঘটনা লিখেছিলেন-
-ট্রেন কতটা দেরি করবে ছাড়তে সেই চিন্তা নিয়ে ট্রেনে চড়েছিলেন রম্যনাথ বাবু। তিনি অবাক হয়ে খেয়াল করলেন নির্দিষ্ট সময়ের পনের মিনিট আগেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে! রম্যনাথ বাবু যারপরনাই অবাক। কিন্তু তিনি আরও বেশি অবাক হয়ে খেয়াল করলেন, কয়েক মিটার যাওয়ার পরে ট্রেনটা আবার পেছনের দিকে এসে স্টেশনেই থামলো। রম্যনাথ বাবু কিছু ভাবার বা বুঝে ওঠার আগেই ট্রেন আবারও ছাড়লো এবং কিছু দূর যাওয়ার পরে আবারও ফিরে এলো। এভাবে সাত সাতবার। রম্যনাথ বাবুর মাথায় খুন চেপে গেলো। তিনি খেয়াল করলেন, রেলের গার্ড, টিকিট চেকার, স্টেশন মাস্টার সবাই দাঁড়িয়ে এই আসা যাওয়ার মজা দেখছেন। রম্যনাথ বাবু স্টেশন মাস্টারকে চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করলেন- কী মশাই ছেলেখেলা হচ্ছে বুঝি? স্টেশন মাস্টার গম্ভীর হয়ে বললেন, মোটেই ছেলেখেলা না। আমাদের ড্রাইভার বাবু তার ছেলেকে ট্রেন চালানো শেখাচ্ছেন! এরপর সত্যি সত্যি একসময়ে ট্রেন ছাড়লো। শুধু রম্যনাথ বাবু বুঝতে পারলেন না ট্রেন কে চালাচ্ছে! ড্রাইভার না তার ছেলে?

আজকাল যে ট্রেন আমরা দেখি বা চড়ি তারও একটা বিবর্তন বা ধারাবাহিকতা রয়েছে। ট্রেনের জন্য কোনু, মারডক আর স্টিফেনশনকে আপনার ধন্যবাদ দিতে হবে, তাদের মনে রাখতে হবে। ফ্রান্সের নিকোলাস কোনু তিন চাকার এক গাড়ি তৈরি করেছিলেন, যাকে ট্রেনের ইঞ্জিনের প্রথম মডেল ভাবা হয়। দেয়ালের সাথে ধাক্কা লেগে এই তিন চাকার গাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং বেচারা কোনুকে জেলে যেতে হয়েছিল। এরপরের মানুষটার নাম উইলিয়াম মারডক। তিনি ট্রেনের বিশালাকার ইঞ্জিন তৈরি করেছিলেন, যেখান থেকে কালো ধোঁয়া বের হতো এবং এটা চলতে শুরু করলে ঘরবাড়ি কাঁপতো। কালো ধোঁয়া, ইঞ্জিনের শব্দ আর ঘরবাড়ির কাঁপাকাঁপিতে গির্জার পাদ্রিরা ভেবেছিলেন মারডকের ওপর শয়তান ভর করেছে। আর শেষের জনের নাম জর্জ স্টিফেনসন। তিনি ইংল্যান্ডের কয়লা খনিতে কাজ করতেন। স্টিফেনসন ট্রেনের ইঞ্জিনের একটা আধুনিক রূপ দিতে সক্ষম হন এবং ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার থেকে লিভারপুল পর্যন্ত রেললাইন নির্মিত হয় ও কয়লা পরিবহন শুরু হয়। ভাগ্যিস, মারডকের মতো স্টিফেনকে শুনতে হয়নি যে তার ওপর শয়তান ভর করেছে। তবে সে সময়কার পরিবেশবিদরা তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন ট্রেন নাকি পরিবেশের ক্ষতি করবে, পশু-পাখিরা রেলের শব্দে এলাকা ছেড়ে পালাবে।
পশু-পাখিরা রেলের ভয়ে কতটা পালায় সেই বিতর্কে না গিয়ে আমরা রেল বা ট্রেন নিয়েই থাকি। ইংল্যান্ডে প্রথম যখন রেল চালু হয় তখন যারা চড়তো তার চেয়ে ঢের বেশি লোক ট্রেনের চলাচল দেখার জন্য জড়ো হতো। আর ভারতবর্ষে তো শুরুর দিকে রেল লাইনে পূজা দেওয়া হতো।
ভারতে ব্রিটিশদের হাত ধরে ট্রেন যোগাযোগ শুরু হয় ১৮৫৩ সালে। মুম্বাইতে তখন ৩৩ কিলোমিটার রেলপথ তৈরি করা হয়েছিল। পরের বছর শুরু হয় বাংলায় এবং বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত রেল চালু হয়। এরপর ভারতজুড়ে রেল যোগাযোগ শুরু হলেও সমস্যা দেখা দেয় টয়লেট নিয়ে। তখন রেলে টয়লেটের ব্যবস্থা ছিল না, স্টেশনে নেমেই এসব সারতে হতো। ফলাফল হয়েছিল ভয়াবহ। যারা এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতো না তারা ট্রেনেই সবকিছু করে দিতো! টয়লেটবিহীন অবস্থায় রেলগুলো হয়ে যেত লাইভ টয়লেট এবং এভাবে ৫৫ বছর চলেছে ভারতের ট্রেন। ভারতে টয়লেট সংবলিত রেলগাড়ি প্রথম চালু হয় ১৯০৯ সালে।
আজও যারা ভারতে দীর্ঘপথ রেল ভ্রমণ করেন, সকালে তারা ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে চান না। ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকালে সারিবদ্ধ মানুষের প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার দৃশ্য এখনও চোখে পড়ে!
ভারত কিংবা চীনে যত মানুষ প্রতিদিন ট্রেনে চড়ে, অস্ট্রেলিয়া, নিউ জিল্যান্ড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিলিত জনসংখ্যা তত নয়!
ভারত আর চীনের রেলওয়ের ব্যাপারটা বিশাল। দেশজুড়ে হাজারো রুটে ট্রেন চলে। বলা হয়ে থাকে ভারত, চীন বা রাশিয়ার রেল কখনও ঘুমায় না। ভারতের ট্রেন চালকদের বলা হয়ে থাকে লোকো পাইলট এবং কাশ্মিরের চেনাব নদীর ওপর ব্রিজ পৃথিবীর উচ্চতম রেলওয়ে ব্রিজের একটি। কাশ্মিরকে দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে চেনাব নদীর ধারে কিংবা ডাল লেকে। আর্জেন্টিনা কিন্তু ফুটবলের মতো ট্রেনের জন্যও বিখ্যাত। আর্জেন্টিনার সালতা থেকে একটা ট্রেন ছাড়ে, যেটি অনেক উঁচু ও পাহাড়ি পথ বেয়ে, মেঘ সরিয়ে সরিয়ে পথ চলে। আর্জেন্টিনার এই ট্রেনে চড়লে আপনার মনে পড়তে পারে সেই গান- ‘হাওয়া মেঘ সরায়ে, ফুল ঝরায়ে ঝিরি ঝিরি এলে বহিয়া’। আবার নরওয়ের ট্রেন জার্নিতে পাহাড়, সমুদ্র এবং ঝরনা ও টানেল সবকিছু চোখে পড়ে। ভালোবাসার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আপনি যেতে পারেন ইউক্রেনের ‘টানেল অব লাভ’-এ। ইউক্রেনের ক্লেভান শহরের এই ট্রেন পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় একেবারেই গাছগাছালি ঘেরা পথ ও টানেলের ভেতর দিয়ে। কেউ কেউ এটাকে ভালোবাসার ট্রেনও বলে থাকেন। তবে সুইজারল্যান্ডের ‘ল্যান্ডওয়াসার ভায়াডাক্ট’ ট্রেনে চড়লে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। ষাট মিটার উঁচু আর ৬৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রেলপথ ইতালির সঙ্গে সুইজারল্যান্ডকে যুক্ত করেছে।
বাংলাদেশের ট্রেন চড়লে আপনার ট্রেনের গা ঘেঁষে বাজার বসা, মানুষের দৌড়াদৌড়ির দৃশ্য মনে পড়তে পারে। মনে পড়তে পারে গরু, ছাগল, মুরগি ও মানুষে ঠাসা লোকাল ট্রেনের কথা। তবে থাইল্যান্ডের মেকলং এবং ভিয়েতনামের প্রত্যন্ত এক শহরতলিতে গেলে আপনার ভুল ভাঙতে পারে। মেকলংয়ে বাজারের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে। ট্রেন আসার আগে বাজারের দোকানদার ও ক্রেতারা দোকান গুটিয়ে অপেক্ষা করেন কখন ট্রেন চলে যাবে। চলে গেলে আবারও তারা দোকান সাজিয়ে বসবেন!
ট্রেনকে ঘিরে এমন বাজারের মতো প্রায় পৌনে দুইশত বছর ধরে গড়ে উঠেছে নগর সভ্যতা। ট্রেনে চাকরি করেন একদল মানুষ, আর ট্রেন স্টেশনকে ঘিরে থাকে কুলি, গাড়ির চালক, হকার, বই, পত্রিকা ও খাবারের দোকানদার, যাত্রী, ভবঘুরে, রেলওয়ে পুলিশসহ আরও কতজন। ট্রেনকে ঘিরে তাই গড়ে উঠেছে মিথ, ইতিহাস, সত্য ঘটনা ও মজাদার কৌতুক।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় ভারত থেকে পাকিস্তানগামী আর পাকিস্তান থেকে ভারতগামী ট্রেনে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ও গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ট্রেনে চড়ে যাওয়ার সময় মুক্তিবাহিনীর একাধিক আক্রমণ ও ট্রেনের বগি উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ইতিহাস হয়ে আছে।
ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা করমচাঁদ গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় কিছুদিন আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। একদিন তিনি ট্রেনে উঠে চাদরটা সামনের সিটে রাখলেন। বর্ণবৈষম্যের সেই কালে এক সাদা চামড়ার সাহেব গান্ধীজির চাদরটা ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে মারলেন। কিছুক্ষণ পরে সেই সাহেব তার গায়ের কোটটা খুলে রাখলে গান্ধীজি সেটাও জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে মারলেন। সাহেব রাগে চিৎকার করে জানতে চাইলেন-তুমি এটা কী করলে? গান্ধীজি স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিলেন-তোমার কোটটাকে পাঠালাম আমার চাদরটাকে খুঁজে আনতে!

লেখক: রম্যলেখক

 

/টিটি/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ