বিএনপি’র কাছে প্রত্যাশা

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ০২:৪৩, মে ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪১, মে ০৩, ২০১৯

লীনা পারভীনঅবশেষে রামের সুমতি হলো। আমি বলছি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র কথা। গত ১০/১২ বছরের মধ্যে এই প্রথম তারা একটি রাজনৈতিক সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি যার পরামর্শ বা আদেশেই আসুক না কেন, সিদ্ধান্তটি যে একদম সঠিক ও সময়োপযোগী সে বিষয় আশা করি তাদের অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করবে না।

গত ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে এতদিন বিএনপিসহ তাদের মিত্র ঐক্যফ্রন্ট প্রহসনের ও ভোটারবিহীন অবৈধ নির্বাচন বলে আসছিলো। নির্বাচন বয়কটেরও সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলো তারা। তাদের অন্যতম মিত্র জামায়াতে ইসলামীকে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করতে দিলেও একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠনটি। বিএনপি এতদিন জামায়াতকে নিজের ভাই বলে পরিচয় দিয়ে এলেও শেষ পর্যন্ত ভাইকে ছাড়াই তারা সংসদে যেতে রাজি হয়েছে এটাই আপাতত সুখবর।

ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যতীত বাকি সব নির্বাচিত সদস্য একে একে শপথ নিয়েছেন। জানা গেছে, তাদের একমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও লন্ডনে পলাতক থাকা নেতা তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই এসেছে এই পরিবর্তন। যদিও জানা যায়নি তারেক রহমান কোন প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে যাননি। কেন যাননি এ প্রশ্নের উত্তর তিনিই ভালো দিতে পারবেন।

যাই হোক, অবশেষে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত সদস্যরা সংসদে গেছেন এটা স্বস্তির সংবাদ।  

আশা করছি বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা সংখ্যায় লঘু হলেও কথা বলবেন গরিষ্ঠের দাবি নিয়েই। সরকারকে এতদিন অবৈধ বলে এলেও শেষ পর্যন্ত সব কথা ও দাবি জানাতে হবে এই সরকারের কাছেই। দেশের একজন ভোটার হিসেবে আমিও চাই বিএনপি’র সদস্যরা সরকারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক মনোভাব বজায় রেখেই দেশের উন্নয়ন কাজে অংশগ্রহণ করবেন। আবার তেমনি একটি শক্ত বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করবে যৌক্তিক অবস্থানে থেকে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হচ্ছে নির্বাচিত সরকারের পাশাপাশি একটি শিক্ষিত ও সচেতন বিরোধীদল। দেশের জনগণ কিন্তু তাদের সকল দাবি-দাওয়ার পক্ষে লড়াই করার জন্যই ৩০০ আসনে প্রতিনিধি নির্বাচন করে পাঠান। যতই ভোটারবিহীন নির্বাচনের অভিযোগ করুক না কেন, বিএনপি’‘র সদস্যরা নিশ্চয়ই ভোট ছাড়া নির্বাচিত হয়নি। অর্থাৎ যে ছয়জন সদস্য তাদের এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন তাদের কাছেও রয়েছে হাজারো মানুষের চাওয়া-পাওয়া।

সেই চাওয়ার অংশ হিসেবেই বিএনপি’র কাছে আমাদের দাবি এবার অন্তত তারা জনগণের কথা বুঝতে চেষ্টা করবেন। এই বাংলাদেশের জনগণ যে উন্নয়নের পক্ষে এবং সন্ত্রাসীদের বিপক্ষে এই কথাটিও আশা করি বিএনপি’র নীতিনির্ধারকরা শিগগিরই বুঝতে পারবেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপি তাদের রাজনৈতিক কোনও প্রজ্ঞা গত ১০ বছরে দেখাতে পারেনি সরকারবিরোধী কিছু ব্যর্থ তদবিরের চেষ্টা ব্যতীত। ২০১৪-এর আগুন সন্ত্রাসের কাহিনি এখনও সবার স্মৃতিতে তাজা। সেই সময়টাতে বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়; বরং জামায়াতের সহযোগিতায় নিজেদের দেশের উন্নয়নবিরোধী শক্তি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার ফলাফল গত দু’‘টি সংসদ নির্বাচনে তারা দেখেছে। বস্তুত বাংলাদেশের রাজনীতি এখন পর্যন্ত জনগণ-নির্ভর আর এখানে যারাই জনগণের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয় তারাই ওয়াশআউট হয়ে যায়। বিএনপি’র জন্মটা যেভাবেই হোক না কেন, এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে তারা নিজেদের দেশের অন্যতম বৃহত্তর রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলো। অথচ স্বাধীনতা বিরোধীদের শাস্তি ও জনমুখী রাজনীতির প্রশ্নে যখন থেকে তারা বিপরীত দিকের রাস্তায় হাঁটা শুরু করলো তখন থেকেই নিজেদের কেবল অদক্ষই প্রমাণ করেনি; বরং হাস্যকর একটি অবস্থানে নিয়ে গিয়েছে। এমনকি বর্তমান সংসদে যোগ দেওয়া না দেওয়া নিয়েও কম হাস্যরসাত্মক কাহিনির জন্ম দেয়নি তারা। নেতাদের বহিষ্কার,শপথ না নেওয়ার কঠিন প্রতিজ্ঞার কথা সংবাদ সম্মেলন করে বলার পরদিনই দলীয় নির্বাচিত চার নেতার শপথগ্রহণ এবং এই শপথগ্রহণ নিয়েও একেক নেতার একেকরকম বক্তব্য কেবল বিভ্রান্তিই তৈরি করেনি, ছিল কৌতুকোদ্দীপকও।

একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে নিজেদের হাস্যরসের জায়গায় নিয়ে কোনও রাজনৈতিক নেতা বা দল অন্তত রাজনীতির মাঠে লড়াই করতে পারে না। একজন ব্যক্তির যেমন ব্যক্তিত্বই হচ্ছে পরিচয়, তেমনি একটি দলেরও ব্যক্তিত্ব থাকাটা জরুরি।

অনেক জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে বিএনপি নেতারা সুমতে ফিরে এসেছেন এটিকে স্বাগত জানাতেই আজকের আমার এই লেখা। আমি চাই বিএনপি অবিলম্বে নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রমাণ করতে ঘোষণা দিয়ে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করবে এবং সংসদে জামায়াতসহ সকল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করবে। দেশে চলমান জঙ্গিবাদ, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও নানারকম অপরাধের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্ত অবস্থানের প্রমাণও দেবে তারা। সরকারকে চাপে রাখতে হবে যেন দেশে একটি আইনের শাসন কায়েম হয়। পাশাপাশি কেবল চাপ নয়, সময় ও সুযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের স্বার্থে বৃহত্তর ইস্যুতে সরকারের সহযোগী হিসেবে এগিয়ে যাবে। এমন একটি ইস্যু হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা। বিএনপি’‘র দিক থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তুলতে হবে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি।

আসলে যেহেতু দলটি গত অনেক বছর নিজেদের জনগণের কাছ থেকে দূরে রেখে এসেছে, তাই তাদের কাছে চাওয়ার তালিকার কোনও শেষ নেই। তবে আমরা চাই বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা অত্যন্ত গঠনমূলক ও সহযোগিতামূলকভাবে সংসদে নিজেদের সক্রিয় রেখেই কাজ করে যাবে। ওয়াকআউটে সমাধান নয় বরং অবস্থানে থেকে ফাইট করাটাই হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে সঠিক–মাথায় রাখতে হবে এই বিষয়টিও। সংসদে যোগদান যেন কেবল সংসদে দলীয় প্রার্থীদের আসনকে ধরে রাখার জন্য না হয়।

লেখক: কলামিস্ট

 

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ