‘শপথ নাটক’: ক্ষতি হয়েছে সবার

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:৩২, মে ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৩, মে ০৪, ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমানকেউ কেউ বলেন, রাজনীতি একটি খেলা। আসলেই কি খেলা? আমার ধারণা, রাজনীতিকে খেলা বললে আসলে তাকে খেলাই করা হয়। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিকে কেউ কেউ যখন যুদ্ধ বলেন, তখন সেটায় আপত্তির আর খুব বেশি থাকে না। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। একটা যুদ্ধংদেহী ক্ষমতাসীন রেজিম যখন সবরকম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে বিরোধী দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তখন এটাকে আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধই বলা যায়।
রাজনীতিকে ‘খেলা’ বলি কিংবা ‘যুদ্ধ’– এর একটা খুব কমন বিষয় আছে– স্ট্র্যাটেজি। উভয় ক্ষেত্রেই একপক্ষ আরেকপক্ষকে স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমে হারানোর চেষ্টা করে। একপক্ষ আরেকপক্ষের কৌশল দেখে নিজের পাল্টা কৌশল ঠিক করে। খেলায় তো বটেই, জেনেভা কনভেনশনের পর এমনকি যুদ্ধেরও ‘রুলস অব দ্য গেম’ আছে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনীতির নামে যে যুদ্ধটা চলছে সেটায় এসবের কোনও বালাই নেই। যাচ্ছেতাই করা হচ্ছে এই রাষ্ট্রের জনগণ এবং এই রাষ্ট্রের সব ইনস্টিটিউশন নিয়ে, যার ফলে এই রাষ্ট্রের মূল কাঠামোটিই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের সম্মুখীন। যাক, সেটা অন্য আলোচনা।
ফিরে আসি কৌশলের কথায়। ‘রুলস অব দ্য গেম’-এর প্রতিটি রুল ভেঙে তথাকথিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর সরকারি দলের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কৌশল যা দেখতে পাচ্ছিলাম- যেভাবেই হোক ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিতদের সংসদে নিয়ে আসা। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্পিকার, মন্ত্রী, এবং সরকারদলীয় বড় নেতারা সভায় নানাভাবে তাদের সংসদে আসার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। এটা যদি হয় ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’, তাহলে এর নিচেই আছে তথাকথিত নির্বাচিতদের নানারকম প্রলোভন, এমনকি ভয়ভীতি দেখানো। এমনকি এমন তথ্য পর্যন্ত নানাভাবে বেরিয়েছিলো, খালেদা জিয়ার প্যারোলের বিনিময়ে হলেও বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদে যোগদান করাতে আগ্রহী সরকার। 

২৭ আসন নিয়ে জাতীয় পার্টি এই সংসদে তাদের ভাষায় ‘কার্যকর’ বিরোধী দল হিসাবে আছে। এবার তারা ‘সরকারি বিরোধী দল’ নয়। তাদের দলের কেউ মন্ত্রিসভায় নেই। সাথে মোট ৮ আসন পাওয়া ওয়ার্কার্স পার্টি-জাসদের বাঘা বাঘা নেতারা বিগত সরকারের ‘উন্নয়নের’ জয়গান করে একজোট হয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিরোধী দল হিসাবে ‘ভূমিকা পালন’ করছে। এত কিসিমের বিরোধী দল থাকার পরও সরকার যখন এতটা মরিয়া হয়ে ঐক্যফ্রন্টের এই হাতেগোনা কয়েকজনকে সংসদে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো, তখন এটা নিশ্চিত হতে হবে, এর পেছনে সরকারের খুব বড় কোনও ইনসেনটিভ আছে। 

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিতদের সংসদে নিয়ে যাওয়া ক্ষমতাসীনদের একটা বড় স্ট্র্যাটেজি– এটা প্রমাণিত হয়েছে অনেক আগেই। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিতদের সংসদে যাওয়া উচিত ছিল, নাকি অনুচিত, এই প্রশ্নের জবাব আমি মনে করি খুব স্পষ্টভাবেই আছে সরকারের এই স্ট্র্যাটেজিতে। কারণ অনুসন্ধান করার আগে এই জবাব অকপটে দিয়েই দেওয়া যায়– সরকার এতটা মরিয়া হয়ে তাদের সংসদে নিয়ে যেতে চাইছিলো, তাই ঐক্যফ্রন্টের পাল্টা কৌশল হওয়া উচিত ছিল শপথ না নেওয়া। 

কিন্তু এই দেশের সরকারবিরোধী প্রায় সব মানুষের প্রত্যাশাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অতি নাটকীয়তায় ভরা শপথগ্রহণের শেষ দিনটিতে বিএনপির নির্বাচিতরা দলীয় সিদ্ধান্তে শপথ নিয়েছেন। বলা বাহুল্য, এই সিদ্ধান্ত সরকারি দলকে দারুণ খুশি করেছে, স্বস্তি দিয়েছে। এই দেশবাসীর মতো সরকারের নীতিনির্ধারকরাও জানেন, এভাবে শপথ নিয়ে ৩০ ডিসেম্বরের ‘তথাকথিত’ নির্বাচনটিকে প্রকারান্তরে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

সংসদে যোগদানের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, দেশনেত্রীর মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদ, রাজপথের সংগ্রাম যুগপৎভাবে চালিয়ে যাওয়াকে যুক্তিযুক্ত মনে করছি।’ বাংলাদেশের সংসদে কথা বলে আসলেই কি কোনও লাভ হয়? হয়েছে কোনোদিন? 

বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে ১৪৯ জন বিরোধীদলীয় সদস্য থাকলেও একটা কার্যকর সংসদ সম্ভব না। দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়ার নিশ্চয়তাযুক্ত ৭০ ধারা যতদিন বর্তমান রূপে থাকছে ততদিন এই সংসদ একজন প্রধানমন্ত্রীর সব সিদ্ধান্তের বৈধতা দেওয়ার একটা ‘রাবার স্ট্যাম্প’-এর বাইরে কিছু হবে না। তাই ঐক্যফ্রন্টের ৭ জনকে সরকারের বিরোধিতা করে, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং পুনর্নির্বাচন দাবি করে সংসদে কিছু কথা বলতে দিয়ে সরকার দেখানোর চেষ্টা করবে দেশে একটি কার্যকর সংসদ আছে। সচেতন মানুষ প্রশ্ন করবেই– সরকারকে এই বিরাট সুবিধা দেওয়া হলো কেন?

আর একটি যুক্তি এসেছিল এ প্রসঙ্গে, সেটা হলো, এলাকার জনগণের প্রত্যাশার চাপ পূরণ করা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে আর অল্প কিছুদিন পরে। রাষ্ট্র হিসাবে এতটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেও যদি আমরা সংসদ নির্বাচনকে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা পূরণ এবং স্থানীয় উন্নয়নে যুক্ত করে রাখি তবে একটা সফল রাষ্ট্র গড়ার পথে আমাদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। সাংসদদেরকে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে রাখার কারণে আমাদের স্থানীয় সরকারগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, যেটা আমাদের নানামুখী সংকটের জন্য দায়ী। আমাদের এই প্রচারণা চালাতে হবে– সংসদ হচ্ছে একটা দেশের আইন প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় নানান নীতির পর্যালোচনা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর একটা রাষ্ট্রের মূল কাঠামোটিই যখন ভেঙে পড়েছে প্রায় তখন স্থানীয় মানুষের উন্নয়নের চাহিদা পূরণের জন্য সংসদে যাওয়া একেবারেই হাস্যকর যুক্তি। 

তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই স্থানীয় লোকজন তথাকথিত নির্বাচিতদেরকে এই ধরনের চাপ দিয়েছিলো, তবুও তারা যদি সত্যিকারের নেতা হয়ে থাকেন তাদের এলাকার জনগণকে এটা বুঝাতে পারা উচিত ছিল যে এলাকার উন্নয়নের চাইতে প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসে থাকা এই সরকারের প্রতি অনাস্থা জারি রাখা আরো বেশি জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যে টোটালিটারিয়ান চেহারা নিয়েছে, সেটার যে সার্বিক কুফল সেটার হাত থেকে ‘তথাকথিত’ নির্বাচিতদের এলাকার মানুষও মুক্তি পাবে না। তারা যদি আদৌ নেতা হতেন, এই কথাগুলো এলাকার মানুষকে বুঝিয়ে বলার সক্ষমতা তাদের থাকা উচিত ছিল।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেননি। কয়েকদিন আগে তিনি অভিযোগ করেছিলেন নির্বাচিতদের ওপরে শপথ নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের চাপ আছে। পত্রিকার খবরে আমরা দেখেছি বিএনপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব শপথগ্রহণের বিরুদ্ধে থাকলেও ‘তথাকথিত’ নির্বাচিতরা শপথ নিতে খুব দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন (সম্ভবত সরকারি চাপেই), এটা জানার পর তাদের ওপরে কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য তারা শপথগ্রহণে মত দিয়েছেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে যে সরকার ৩০ ডিসেম্বরের মতো একটা প্রহসন ঘটাতে পেরেছে তার পক্ষে এটা করা খুবই সম্ভব। কিন্তু এতে কি সরকারের প্রার্থিত লাভ হবে?

রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ‘নির্বাচিত’দের শপথগ্রহণে বাধ্য করে সরকার তার ভয়ঙ্কর কর্তৃত্ববাদী আচরণ আরও বেশি প্রকাশ্য করে তুললো। তাই স্বল্পমেয়াদে সরকার এই শপথগ্রহণে লাভ দেখলেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের ক্ষতি হতে বাধ্য। সেই ক্ষতির কথায় আসছি পরে।

নির্বাচনের পর থেকে শপথগ্রহণের বিরুদ্ধে খুব দৃঢ় অবস্থান নেওয়া বিএনপির নেতৃত্ব ওদিকে শেষ পর্যায়ে এসে শপথগ্রহণ প্রশ্নে যেভাবে আচরণ করেছেন সেটা একটা রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি’র পরিপক্বতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেই। যতই বলা হোক না কেন কৌশলগত কারণে বিএনপির এই যোগদান, আদতে সরকারের ইচ্ছে পূরণ করে বিএনপির অবস্থান গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধেই গেছে। আশা করি দলটি এই ব্যাপারে সচেতন থাকবে এবং এই সমস্যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠার কর্মকৌশল ঠিক করবে। বিএনপির মনে রাখতে হবে স্বল্পমেয়াদে এই রাষ্ট্রের পুনঃগণতন্ত্রায়নের সংগ্রামের নেতৃত্ব তাকেই দিতে হবে।

২০১৪ সালের নির্বাচন ছাড়া একটা সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া এবং মেয়াদ পূর্ণ করা দিয়ে শুরু, এরপর ৩০ ডিসেম্বরের প্রহসনের মাধ্যমে ১৬ কোটি মানুষের আবাস একটা রাষ্ট্রকে হাসির বিষয় বানিয়ে ফেলা হয়েছে, যার সাম্প্রতিকতম প্রদর্শনী হচ্ছে ‘শপথ নাটক’। দূর ভবিষ্যতে দাঁড়িয়ে অনাগত কোনও প্রজন্ম অবাক হয়ে দেখবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দান থেকে শুরু করে নানা গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অগ্রগামী দলটির হাতে কীভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে। এটা সেই সময় হয়তো আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটিয়েছে। আবার সেই সময়কার বিরোধী দলটি সরকারি চাপের মুখে নতি স্বীকার করে, প্রকারান্তরে সরকারের লক্ষ্য পূরণ করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে কিছু সময়ের জন্য হলেও দুর্বল করে তুলেছিলো। 

এই ‘শপথ নাটক’-এর কারণে মূল ক্ষতি হয়েছে এই রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের নাগরিকদের। আমি নিশ্চিত নিকট ভবিষ্যৎ তো বটেই, দূর ভবিষ্যতের প্রজন্মও এই ক্ষতির মাশুল দিয়ে যাবে।

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ