ধানক্ষেতের আগুনের আঁচ কি পাও বাংলাদেশ?

Send
হাসান ইমাম
প্রকাশিত : ১৪:৩৮, মে ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৩, মে ১৯, ২০১৯

হাসান ইমামউন্নয়নের মহাসড়কের দ্রুতগামী যে যানে বাংলাদেশ সওয়ার, সেই যানের জ্বালানির জোগানদাতাদের কতটুকু খবর রাখি আমরা? গতির কারণে যাত্রাপথের দু’পাশের দৃশ্যপট ঠিকঠাক চোখে পড়ছে তো আমাদের?
বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন যখন বিশ্বের প্রথম পাঁচ দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি হিসেবে বাংলাদেশকে মর্যাদা দেয়, তখন এমন প্রশ্নচিহ্ন বেখাপ্পা ঠেকে বৈকি। তদুপরি আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের চেয়ে বড় ধনীর তকমা বাংলাদেশের কপালেই নাকি আঁকা হবে— এমন আভাসও স্পষ্ট বলছেন তাত্ত্বিকরা। এই পটভূমিতে দেশের দুর্মর অগ্রগতি, অর্থনীতির শনৈঃ শনৈঃ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সন্দেহ পোষণ স্রেফ কুতর্কের অবতারণা! তবু সন্দেহবাদীদের হাজির ‘রাবিশ’ প্রশ্নটার একটা ফয়সালার চেষ্টা করা যাক।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ফুলেফেঁপে ওঠার পেছনের অন্যতম নিয়ামক কৃষি (বাম্পার ক্রপ হারভেস্ট)। বিশ্বব্যাংকের বিবেচনায় বাকি খাতগুলো হলো ম্যানুফ্যাকচারিং (যেমন গার্মেন্টস), অবকাঠামো নির্মাণ (কনস্ট্রাকশন) এবং রেমিট্যান্স।

প্রযুক্তিশাসিত এই ডিজিটাল বাংলাদেশেও কৃষিতে জড়িত অধিকাংশ মানুষ। হিসাব বলছে, ৬০ ভাগেরও বেশি জনগণ সম্পৃক্ত এই খাতের সঙ্গে। আর জিডিপিতে কৃষির হিস্যা ১৪ শতাংশ।

পরপর কয়েক বছরের বাম্পার ফলনে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে; খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেয়েছে দেশ। এ তথ্য বিশ্বব্যাংকের বরাতে পেয়ে যারা তৃপ্তির বুলন্দ ঢেঁকুর তোলেন, তারা কি দুচোখ কচলে একবার কৃষকের দিকে তাকিয়ে দেখেন? অর্থনীতিকে যারা মোটাতাজা করছেন, তাদের স্বাস্থ্যের কী হালত? ফিবছর বাম্পার ফলনের পর কৃষকের ‘বাম্পার’ দুর্দশা যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে আমাদের। নইলে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বিষয়টি বছরের পর বছর জারি থাকে কীভাবে? জমির বর্গা খরচ, বীজ কেনা, মজুরের পারিশ্রমিক, সেচ, কীটনাশক, সার ইত্যাদি নানা খরচের পর বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষককে। আর বছরের পর বছর প্রতিকারের দাওয়াই পাচ্ছি আমরা সরকারি নানা পদক্ষেপের ঘোষণায় আর ‘তাত্ত্বিক আলোচনায়’।

২.

সবচেয়ে বেশি টাকায় মহাসড়ক নির্মাণের রেকর্ড গড়ে আমরা রেকর্ড গতিতেই ছুটছি বটে। কত কিছুতেই না রেকর্ড গড়েছি, গড়ছি। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতিতে (কুইকেস্ট গ্রোইং) পয়সাওয়ালা তৈরির কারখানায় পরিণত করেছি দেশকে; এমনই ‘ধনীবান্ধব’ ব্যবস্থা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির। ঋণখেলাপিদের ‘পুরস্কৃত’ করায়ও আমরা স্থাপন করেছি বিশেষ নজির।

দেশের ৮০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রার জোগানদাতা পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়াতেও বাংলাদেশ ‘অনন্য’! লাখ লাখ আধপেটা খাওয়া সেলাই দিদিমণির উদয়াস্ত শ্রমের ভিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই শিল্পের মালিকদের সম্পদের বিস্তার ঘটেছে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাত সমুদ্দুর-তেরো নদীর পাড়ের বিদেশেও। অথচ আশির দশক থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ফুটো পয়সাও ট্যাক্স দিতে হয়নি তাদের, বরং বছর বছর পেয়েছেন প্রণোদনা।

আমাদের জিডিপির ৭ শতাংশ বৈদেশিক আয় (রেমিট্যান্স) পাই প্রতিবছর তিন হাজার প্রবাসী শ্রমিকের লাশের বিনিময়ে। সরকারি হিসাব বলছে, গত এক যুগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কফিনবন্দি ৩৩ হাজার তরুণের লাশ ফিরেছে বাংলা মায়ের কোলে। এই অকালমৃত্যু, শ্রমশক্তির এই বিপুল অপচয় রোধে দৃশ্যমান কোনও উদ্যোগ আছে বলে জানা নেই।

বাড়বাড়ন্ত অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক নির্মাণ খাতের (জিডিপির ১৪ শতাংশ) অর্জনের পেছনেও অনুক্ত থাকে নির্মাণাধীন বহুতল ভবন থেকে পড়ে হাড়গোড় ভেঙে, থেঁতলে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বছরে শতাধিক শ্রমিকের করুণ মৃত্যুকাহিনি।

তবু আমরা অস্ত্র আমদানিকারক শীর্ষ ২০ দেশের সম্মানজনক তালিকায় দেশের নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পা ফেলেছি এমনকি মহাকাশেও— স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের কাতারে দাঁড়িয়েছি সগর্বে।

তাই বোধকরি মাটিতে পা রাখলেও আমাদের চলে। আর তাই মাটিতে প্রাণসঞ্চারী কৃষকের দিকে তাকানোর ফুরসত নেই কারো। কিন্তু গোল বাধালেন কিছু কৃষক; খরচের অর্ধেক দামেও ধানের বাজার না পেয়ে ক্ষোভে-দুঃখে-হতাশায় তারা ধানক্ষেতে আগুন দিলেন।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জন্ম-মৃত্যুহার থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ‘আদর্শ তুলনীয়’ দেশ ভারতও আছে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে। প্রতিবেশী দেশটি সার্বিক সব খাতের প্রতিযোগী হিসেবে নিশ্বাস ফেলছে বাংলাদেশের ঘাড়ে। ‍কৃষকের দুর্ভোগের ক্ষেত্রেই বা পিছিয়ে থাকি কেন? ভারতে প্রতিবছর শত শত কৃষক আত্মহত্যা করে ‘বেঁচে যান’, আর আমরা তাদের ‘জীবন্মৃত’ রাখার বন্দোবস্ত অটুট করছি!

এরই মধ্যে অবশ্য এই কৃষকের ‘আগুনকাহিনি’র কিনারাও করে ফেলেছেন সরকার মহাশয়। সেই আদি ও অকৃত্রিম ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব খাড়া করা সারা! কৃষিমন্ত্রী এ কথাও স্বীকার করেছেন, রাজনৈতিক প্রভাবে নাকি কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা যায় না। আহা! এই না হলে রাজার নীতি! প্রজা মারার ব্যবস্থা ষোলো আনা ছাড়িয়ে আঠারো আনা!

৩.

কিছু পেতে হলে তো কিছু দিতেই হয়। অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে, বাংলাদেশের গায়ে ঝুলছে ‘উন্নয়নশীল দেশ’-এর ট্যাগ। সরকার বারবার বিষাণ বাজিয়ে এলান করছেন, বাংলাদেশ কীভাবে বিশ্ববাসীর চোখে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’। বিনিময়ে কৃষকের ‘সামান্য’ আর্থিক ক্ষতি খুব কি আমলযোগ্য? শ্রমিকের অকালমৃত্যু ‘প্রাপ্তি’র তুলনায় নগণ্য! আমাদের হাতে আছে রাশিয়ান মিগ, চীনা ফাইটার জেট, সাবমেরিন।

পত্রপত্রিকায় ছাপা স্থিরচিত্র বা টেলিভিশনে সম্প্রচারিত সচলচিত্রে দেখা কৃষকের ধানক্ষেতের আগুনের আঁচ আমাদের শরীরে লাগে না ঠিকই, কিন্তু আগুন না নেভালে তা ক্রমে চারপাশে ছড়িয়ে যাবেই; এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তাই সময়মতো আগুন নেভানোর উদ্যোগ না নিলে মাঠের পর মাঠ পুড়ে একদিন ঠিক আমাদের ঘরের দাওয়ায় পৌঁছে যাবে!

লেখক: সাংবাদিক

hello.hasanimam@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ