শিক্ষা ও কাজের সম্পর্ক

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:০৬, জুন ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৭, জুন ২৬, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাঅর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে তিন কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করা। সরকার কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এই কাজটি করবে, তার কোনও ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। তবে কর্মসংস্থান যে প্রয়োজন, সেই তাগিদ সরকারের ভেতর যে সৃষ্টি হয়েছে, তাকে স্বাগত জানাতে হয়।  
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গত বছরের ‘ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বেকারত্বের হার বাংলাদেশেই বেশি। ২০১০ সালের পর থেকে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা ও ভুটান এ হার কমিয়ে এনেছে। ভারতে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বেড়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে। শিল্পায়নে পিছিয়ে, বিনিয়োগে পিছিয়ে, বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে পিছিয়ে। যে দেশ এই বিষয়গুলোতে পিছিয়ে, সে যে বেকারত্বে এগিয়ে থাকবে, তাতে আর সন্দেহ কী।
সরকারি চাকরির যেটুকু সুযোগ আছে, সরকার সেখানে নিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। বেতনভাতা বেড়ে যাওয়ায় সরকারি চাকরি মানুষের কাছে লোভনীয়ও হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান করতে গেলে বেসরকারি খাতে উদ্যম প্রয়োজন। গত এক দশক ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির ২২/২৩ শতাংশে আটকে থেকে প্রমাণ দিচ্ছে, ব্যক্তি খাত একটা স্থবির অবস্থায় আছে।  

অর্থনীতির চত্বরে কর্মসংস্থানের সমস্যা নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা চলছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের সরকার কর্মসংস্থান বাড়াতে বদ্ধপরিকর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তিনি তিন কোটি লোকের কর্মসংস্থানের কথা বলেছেন, তবে সেটা চাকরি নয়। বাংলাদেশ এখন একটি উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ। মানুষের মাথাপিছু আয়ও বেশি। সেই বাস্তবতায় কর্মসংস্থানে সাফল্যই প্রত্যাশিত। বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি পেতে তরুণ সমাজের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা, তা আমরা দেখে চলেছি। অল্পসংখ্যক সরকারি পদে প্রচুর আবেদন জমা পড়ে। এক দৃষ্টিতে এটি যেমন বেকার সমস্যার একটা চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে এটাও বলে দেয়, মানুষ একটা পছন্দসই কাজ চায়। 

বেকারত্ব আছে, বেকারত্ব দূর করার সরকারি প্রচেষ্টা থাকবে, সেটাও ঠিক। কিন্তু বাংলাদেশে এখন শিক্ষার সঙ্গে চাকরি বা কর্মসংস্থানের সম্পর্কগত ধারণা বদলে যাচ্ছে। প্রকৌশলী বা চিকিৎসক বিসিএস দিয়ে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র দফতরে, প্রশাসনিক বা পুলিশ ক্যাডারে। প্রাণিবিজ্ঞানে পড়ালেখা করে কাজ করছে ব্যাংকে বা বীমা খাতে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে কর্মের কোনও সাযুজ্য নেই। অথচ শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যই এই সাযুজ্য, উপযুক্ত সম্মান এবং যোগ্যতা অনুসারে অর্থ উপার্জন নিশ্চিত করা। কর্মসংস্থানের জন্য দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য শাস্ত্রের জয় জয়কার। প্রচুর ছেলেমেয়ে বিবিএ আর এমবিএ করে বের হচ্ছে প্রতিবছর। তাদের প্রায় সবাই চায় চাকরি। আত্মকর্মসংস্থান, অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে যে ধরনের ব্যক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন, তা সাধারণভাবে উপস্থিত নেই। ব্যবসায়িক মেধার সঙ্গে ব্যবসা করতে পারার পরিবেশটা রাষ্ট্র দিতে পারছে কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদাবাজির সংস্কৃতি আছে, কিন্তু একজন তরুণ উদ্যোক্তার জন্য পুঁজি পাওয়ার জন্য আর্থিক খাতটা সহায়ক নয়।   

যে ছেলেরা মরিয়া হয়ে বিদেশ যেতে গিয়ে দূর দেশের সাগরে মারা গেছে বা মরতে মরতে ফিরেছে, তারা বহু টাকা খরচ করে, ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে এ কাজটি করেছে। এবং আরও অনেকে সেটা করবে, তাও আমরা জানি। অনেকেই বলছেন, ১৫-২০ লাখ টাকা দিয়ে এরা এই ঝুঁকি নিচ্ছে, অথচ এই পুঁজি দিয়ে দেশেই ভালো কিছু করা সম্ভব। সত্যি বলতে কী, বিষয়টি এত সরল না। আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সাংগঠনিক দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, পরিশ্রম করার ও ঝুঁকিগ্রহণের মানসিকতার বাইরেও কাজের পরিবেশ ও মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত। অনেকেই বলেন, কৃষিকাজ করলেও তো পারে এসব ছেলে। কিন্তু চাষাবাদ এ দেশে অর্থকরী হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। সম্প্রতি ধানের দাম না পেয়ে কৃষকরা যেভাবে বিক্ষুব্ধ হয়েছে, তাতে এর প্রতি আর কারও আগ্রহ নেই। কৃষিকাজ আর অন্য ধরনের আত্মকর্মসংস্থানে যারা যুক্ত, সেই শ্রেণির সামাজিক কৌলীন্যও জোটে না এই সমাজে। তাই দিন শেষে চাকরির ওপরেই ভরসা রেখেছে আমাদের যুব শ্রেণি। না পারলে মরিয়া হয়ে বিদেশ যেতে চাচ্ছে। 

নিরন্তর বদলে যেতে থাকা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমাদের দেশ। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণে বৈচিত্র্য আনা দরকার। কী ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা আমরা করছি বা করতে পারছি, সেই ভাবনা দরকার। ভালো চাকরির জন্য ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তার সমমানের দু-চারটি বিদ্যার ওপর ভরসা আর রাখা যাচ্ছে না। সাধারণ বিএ, বিএসসি, বিকম পাস করেও কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন তরুণ বেশি আয় করছে প্রকৌশলী বা চিকিৎসক থেকে। মূলত সেই ক্ষেত্রটি বাড়ানোই সরকারের লক্ষ্য হতে পারে। 

চাকরি রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তিতে, আয় রয়েছে অনলাইন বিপণিতে। এক দশক আগেও সাধারণ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষা দিয়ে কিছু করা যায়, তা ভাবা যেত না। বড় বড় ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীকে ব্যাংকের টাকা লুটের সুযোগ না দিয়ে এই জায়গাগুলোকে কীভাবে সহায়তা দিতে পারে, সেটাই ভাবুক সরকার। দলে দলে, হাজারে হাজারে বিবিএ, এমবিএ’র বদলে শিক্ষাকে কর্মমুখী করতে হবে। দারিদ্র্যমুক্তির মানচিত্র অঙ্কন শিক্ষার এই ধরনের বিস্তার ছাড়া সম্ভব না। 

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ