‘০০৭’: দায় কার?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৫:০৮, জুন ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১১, জুন ২৯, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহমহল্লাতে চোখ বুজে, কান বন্ধ করে বিনয়ের সঙ্গে হাঁটার অভ্যাস করেননি এমন ক’জন আছেন? আপনি নিম্নবিত্তের এলাকা ছাড়িয়ে অভিজাত বসতিতে থাকলেও এই অভ্যাস না করে আপনার নিস্তার নেই। মহল্লার রাস্তার মোড়ে পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে তারা। আপনি হেঁটে যাচ্ছেন অথবা কোনও বাহনে, তারা পথ ছেড়ে দাঁড়াবে না। দয়া করে না সরে যাওয়া পর্যন্ত আপনার তাদের ডিঙিয়ে যাওয়ার সাধ্য নেই। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে থাকা শব্দ আপনার বুকে চাপ বাড়াবে। ধৈর্যের বাঁধ প্রায় ভেঙে ফেলবে। কিন্তু আপনি জড়ো হয়েই থাকবেন। জড়ো হয়ে থাকাই মঙ্গল। কোনও কারণে বাঁধ ভেঙে গেলেই সর্বনাশ। আহত খুব মামুলি ব্যাপার। প্রাণে রক্ষা পেলেই শুকরিয়া। আপনার বাহনটিও চিতায় চড়তে পারে। পাঠাতে হতে পারে অর্থোপেডিক্স চিকিৎসকের কাছে। শুধু কি আপনি? আপনার সন্তান, ছেলে হোক কিংবা মেয়ে, উভয়কেই নানা রকম উত্ত্যক্তের শিকার হতে হচ্ছে বাড়ির বাইরে এলেই। আপনার স্ত্রীকেও সম্মান রেখে বাইরে যাওয়া-আসা করতে হচ্ছে। এমন নয় যে আপনি ওই এলাকায় নবাগত। তাই পুরনোরা আপনার সঙ্গে এ আচরণ করছে। স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও কোনও ছাড় পাচ্ছেন না। এই অসহায়ত্ব যে শুধু নগরে বসবাসকারী নাগরিকদের, তা নয়। নিভৃত গ্রামেও তারা এখন চরম প্রতাপশালী। শহর-গ্রাম কেঁপে ওঠে তাদের চলনে-বচনে-হুঙ্কারে। তারা কারা? আপনার পাড়া-মহল্লা-গ্রামের ওই তারা হচ্ছে-০০৭!

এই ০০৭ দলের সদস্যরা সকলেই কিশোর। কিংবা মাত্র তারুণ্যের চৌকাঠে পা রেখেছে। শহরের সদস্যদের অনেকেই নামিদামি স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। সমাজের উঁচুতলায় তাদের বাস। পারিবারিক বিত্ত-বৈভবের ঘাটতি নেই। ঘাটতি আছে শুধু পারিবারিক অনুশাসনের। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন পরিবার থেকে আসা কিশোররাও। শিক্ষার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কম। মাদক বেচাকেনা ও অস্ত্রের জোগান দিতে গিয়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ হয়। যোগাযোগের এই সূত্র ধরেই রাজনীতির প্রশ্রয়ের হাত তাদের মাথার ওপর নেমে আসে। একদম বিনে পয়সায় এই প্রশ্রয় আসে না। রাজনীতি তাদের ব্যবহার করে নানা প্রয়োজনে। আর ওপর তলার যারা আছে ০০৭-এ, তারা তো প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানই। সুতরাং বেপরোয়া হতে বাধা কোথায়? বিত্তশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ না হলেও, বিত্তহীন ও নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ঘর থেকে আসা ০০৭-এর সদস্যরা মাদকসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধে তাদের পৃষ্ঠপোষকের অভাব হয় না। সাধারণভাবে কিশোর অপরাধ গোষ্ঠীর সকলেই ক্ষমতাসীন দলের সদস্যের দাবিদার হয়ে যায়। দলের সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও, দাবিদার হয়েই এলাকায় প্রভাববিস্তার করতে থাকে। সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের আশপাশে ঘুরঘুর করে। মোটরসাইকেল বহর বা মিছিলে সমাবেশে হাজিরা দিয়ে স্থানীয় মানুষদের কাছে নিজেদের ক্ষমতার প্রদর্শন করতে থাকে। স্থানীয় রাজনীতির কর্তারাও তাদের প্রয়োজনে এই ০০৭-এর সদস্যদের পাশে নিয়ে দাঁড় করায়, ব্যবহার করে। পুলিশ প্রশাসনের কাছে বিস্তর প্রমাণ ও অভিযোগ থাকার পরেও, রাজনৈতিক নেতার পাশে যাকে দেখা গেছে, তাকে হাতকড়া পরানোর সাহস পায় না। বরং পুলিশ প্রশাসন নিজেদের স্বার্থে তাদের কখনও তোষণ এবং ব্যবহার করতে শুরু করে। এই বাস্তবতায় ০০৭ পাড়া, মহল্লা, গ্রামে হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। এবং তাদের জন্ম ও বিস্তার সকলের সামনেই। সমাজ ও রাজনীতির লালন-পালনেই এরা ০০৭ বন্ড হয়ে উঠছে।

এই ০০৭ বন্ডদের কীর্তির আত্মপ্রকাশ কি প্রথম বরগুনাতেই হলো? না তারা তো প্রকাশিত বহু আগে থেকেই। এমনকি ফেসবুকেও তাদের দাপুটে উপস্থিতি আছে। রকমারি নামে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে থাকে তারা। আমরা নিশ্চয়ই এখনও ভুলে যাইনি, ধানমন্ডিতে এক কিশোরের হাতে তারই বন্ধুর নিগৃহীত হওয়ার কথা। সেখানেও ছিল কিশোর প্রেম। উত্তরায় এমন ০০৭ সদস্যদের প্রভাব প্রতিপত্তিকে কেন্দ্র করে খুনের ঘটনা ভোলেনি নিশ্চয়ই। চট্টগ্রামের ঘটনা তো এখনও স্মৃতিতে স্পষ্ট। একের পর এক কিশোর ও উঠতি তরুণদের অপরাধমূলক ঘটনা দৃশ্যমান হওয়ার পরেও, অভিভাবকরা সন্তানদের পারিবারিক অনুশাসনে আনতে কতটা উদ্যোগী হয়েছেন, পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতা কি একটুও বাড়লো, রাজনৈতিক দলগুলো কিশোরদের ব্যবহার বন্ধ করেছে? যদি সব প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচকই হয়, তবে আর ০০৭ দের অপরাধ নিয়ে অবাক হওয়া বা আতঙ্কিত হওয়া কেন? যাদের আমরা প্রতিপালন করছি, তাদের দায় তো নিজেদের বহন করতেই হবে, তাই না?

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ