সিরিয়ায় তুরস্কের কুর্দি অভিযান

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৬:২২, অক্টোবর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৫, অক্টোবর ২৩, ২০১৯

আনিস আলমগীরসিরিয়ার উত্তরাংশ, ইরাকের উত্তরাংশ এবং ইরানের উত্তরাংশ—এই তিন রাষ্ট্রের উত্তরাংশ সংলগ্ন তুরস্কের বিস্তীর্ণ এলাকায় কুর্দিদের আবাসস্থল। কুর্দিরা পৃথক একটি জাতি। তবে চার রাষ্ট্রের ভেতরেই তাদের আবাসভূমির অবস্থান। যে কারণে গত ৭৫ বছর ধরে সংগ্রাম করার পরও তারা পৃথক জাতিসত্তা নিয়ে একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। কারণ তুরস্ক, ইরান, ইরাক ও সিরিয়া তাদের চেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র।
কুর্দিরা সংখ্যায় তুরস্কেই বেশি। চার রাষ্ট্রই কুর্দিদের নিয়ে সংকটে আছে। কুর্দিরা যোদ্ধা জাতি। গাজী সালাউদ্দিন তাদেরই সন্তান। ক্রুসেডে সম্মিলিত ইউরোপীয় বাহিনীর সবচেয়ে বেশি সময় ধরে মোকাবিলা করেছিলেন গাজী সালাউদ্দিন। ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ চলেছিল ১৫০ বছর। কিন্তু সম্মিলিত ইউরোপীয় বাহিনী যিশুখ্রিস্টের সমাধিটা পর্যন্ত দখলে নিতে পারেনি।
কামাল আতাতুর্ক তুরস্ককে এক জাতিরাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিলেন। যে কারণে আনাতোলিয়া থেকে ১৭ লাখ গ্রিককে গ্রিসে পৌঁছে দিয়ে ৮ লাখ তুর্কিকে গ্রিস থেকে আনাতোলিয়ায় নিয়ে এসেছিলেন। এটাই দুনিয়ার বৃহত্তম মানববিনিময়। কিন্তু তখন কুর্দি জাতি সম্পর্কে কেন তিনি কোনও সিদ্ধান্ত নেননি, তার কারণ কোনও স্থানে উল্লেখ নেই। সম্ভবত কুর্দিরাও মুসলমান। সেই বিবেচনায় তিনি কোনও সিদ্ধান্ত নেননি।


কুর্দিরা দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে স্বাধীনতার সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সম্ভবত আইরিশরা দুনিয়ার প্রথম জাতি, যারা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে শত শত বছর স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে। আর কুর্দিরা দ্বিতীয় জাতি যারা তুরস্ক, ইরাক, ইরান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করছে। এই সংগ্রামের কারণে এখন কুর্দিরা সবার চোখে সন্ত্রাসী, আর যেই রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বাধীনতা দিচ্ছে না, তারা শান্তিকামী। এ এক অভিনব বিবেচনা।

২০১১ সালে যখন আরব বসন্তের গণজাগরণ ঘটে, মধ্যপ্রাচ্যব্যাপী তখন সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধেও প্রবল গণআন্দোলন আরম্ভ হয়েছিল। সিরিয়ার জনসংখ্যার মধ্যে ২১ শতাংশ শিয়া আর ৭৯ শতাংশ সুন্নি। বাশার আল আসাদ শিয়া সম্প্রদায়ের লোক। সুতরাং তার বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র ছিল। একসময় বাশার আল আসাদ রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাশিয়া, ইরান এবং হিজবুল্লা তার পক্ষ নিয়ে মাঠে নামলে তার অবস্থান শক্ত হয়।

এর মধ্যে আবু বকর বাগদাদির আবির্ভাব ঘটে এবং তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে তার ইসলামিক স্টেট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। আবু বকর বাগদাদি ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি প্রাচীন খেলাফতের মতো খেলাফত প্রতিষ্ঠা করবেন। তার এই ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলিম বিশ্ব এবং ইউরোপ থেকে বহু মুসলিম যুবক এসে তার বাহিনীতে যোগদান করেছিল। আশপাশের মুসলিম দেশ থেকে যুবকদের যখন বাগদাদির সঙ্গে যোগদানের আশঙ্কা তৈরি হয়, তখনই আমেরিকা, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন আইএসকে প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেয়। সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস বা এসডিএফ এবং কুর্দি যোদ্ধারা পশ্চিমা জোটের প্রধান সহযোগীই ছিল।

দীর্ঘ আট বছর সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলেছে। এই প্রাচীন জনপদ বলতে গেলে প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। আবার সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে পার্শ্ববর্তী দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ তুরস্কে বর্তমানে সিরীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৩৬ লাখ, আর জর্দানে সিরীয় উদ্বাস্তু রয়েছে প্রায় ৫ লাখ। উভয় রাষ্ট্র উদ্বাস্তু সামাল দিতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাগদাদির ইসলামিক স্টেট বহুদিন আগে বিলুপ্ত হয়েছে। আবার বাশার বাহিনী আর ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের গৃহযুদ্ধও প্রায় শেষ। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভ কিছুদিন আগে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। সুতরাং বিদেশিরাও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমেরিকাও তার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বহুদিন আগে থেকে তুরস্ক-সিরিয়ার সীমান্তে সিরিয়ার মধ্যে ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ‘সেফ জোন’ সৃষ্টির কথা বলে আসছেন। তার পরিকল্পনা হচ্ছে তুরস্কে আশ্রিত ৩৬ লাখ সিরীয় উদ্বাস্তুদের জায়গা করে দেওয়া। কিন্তু সেই এলাকাটিতে বর্তমানে কুর্দিরা অবস্থান নিয়ে আছে। তুরস্ক গত ৯ অক্টোবর ২০১৯ থেকে কুর্দি অবস্থানগুলোর ওপর বোমা হামলা করে আসছে। এই অভিযানে তুর্কিদের টার্গেট হচ্ছে কুর্দিদের বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপ এবং কুর্দি জনগোষ্ঠী। তুরস্ক বিশ্বাস করে কুর্দি বিদ্রোহীদের সঙ্গে তুরস্কের কুর্দি বিদ্রোহীদের যোগাযোগ আছে।

মূলত প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার অংশ ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরের দেইর আল জহর তৎসংলগ্ন মনবিজ, তাল আবিয়াত, রাস আল আইন ঘিরে কুর্দিদের তৎপরতা খুবই বেশি। এখানটা সিরিয়ানরা দখল নিতে পারেনি। কুর্দিদের সুসংগঠিত অবস্থানের কারণে কুর্দিরা সিরিয়া এবং তুরস্কের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে মার্কিনিদের সহায়তায় কুর্দিরা সবসময় উজ্জীবিত ছিল। আগেই বলেছি মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনী যখন সিরিয়ার মাটিতে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল, তখন তাদের সহযোগী ছিল এই কুর্দি যোদ্ধারা। মার্কিন সেনারা সিরিয়া ত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পরই তুরস্ক কুর্দিদের আক্রমণ শুরু করেছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, তুরস্ক যেভাবে কুর্দি মিলিশিয়াদের তাড়িয়ে দিচ্ছে, তাতে হয়তো সিরিয়ায় জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের নতুন করে উত্থান ঘটতে পারে।

ট্রাম্প তাদের মিত্র কুর্দিদের অসহায় অবস্থায় ফেলেছে বলে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। ট্রাম্প অভিযানের বিষয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে চিঠি লিখেছেন। কিন্তু ওই চিঠি এরদোয়ানের হাতে এলে তিনি তা ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছেন। ট্রাম্প তার ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে তুরস্কে পাঠিয়েছেন। এরদোয়ানের সঙ্গে আলোচনার পর স্থির হয়েছে তুরস্ক পাঁচ দিন যুদ্ধ স্থগিত রাখবে এবং এর মধ্যে কুর্দিরা ৩০ কিলোমিটার থেকে সরে যাবে। এই ক’দিনের হামলায় পাঁচ শতাধিক কুর্দি নিহত হয়েছে। আর তিন লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। ১৭ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি চললেও একে অন্যের বিরুদ্ধে এরমধ্যে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। এই পরিস্থিতির শেষ কীভাবে হবে, এখনও বলা যাচ্ছে না।

দীর্ঘকাল কুর্দিদের নিয়ে তুরস্ক, ইরান, ইরাক, সিরিয়া সংকটের মধ্যে রয়েছে। অথচ এই চারটি রাষ্ট্রই ইচ্ছা করলে এই সংকটের একটা সম্মানজনক সমাধান করতে পারে। এরদোয়ান এবং হাসান রুহানি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি। তারা ইচ্ছা করলে কুর্দিদের সম্পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে কুর্দি হত্যার নির্মম কাণ্ডের অবসান ঘটাতে পারেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

anisalamgir@gmail.com

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ