behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

বণিকের মানদণ্ড দেখা দেবে রাজদণ্ডরূপে

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী১৮:৩৭, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৫

Bakhtiar Uddin Chowdhuryগত অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেছিলেন ‘আজকে রাজনীতি বেশিরভাগ চলে গেছে ব্যবসায়ীদের পকেটে। এটা আমাদের দেশের জন্য বড় কলঙ্ক।’ এবারে পৌরভোটের দিকে তাকালে সেটা আরও বেশি করে উপলব্ধি করা যাবে। ৩০ ডিসেম্বর দেশব্যাপী ২৩৬টি পৌরসভার নির্বাচন হবে। মেয়র প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন তাই নির্বাচনটা দুই বৃহত্তর দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ নিয়েছে।
নির্বাচন বিধি ঠিক রেখে নির্বাচন পরিচালনা সম্ভবত অসম্ভব হয়ে উঠেছে। হয়তোবা সে কারণেই নির্বাচন কমিশনার প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। মনে হয় সরকারি দলই বেশি বিধি ভঙ্গ করছে। বিধি ভঙ্গের যে সব ছবি পত্রিকায় দেখি তাতে দেখা যায় এমপিরাই মিছিলের আগে। আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টি নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে এমপিদের কাজ করতে দেওয়ার অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সে অনুমতি দেননি। অনুমতিটা দিলেই মনে হয় ভাল ছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার যখন অভ্যাস হয়ে যায় তখন আর কারফিউও মানে না। সুতরাং যত্রতত্র ১৪৪ ধারা না দেওয়াই ভাল। ভারতসহ বহুদেশে রাষ্ট্রপতি ছাড়া সবাই সব নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন।
এখন নির্বাচন হচ্ছে বিত্তশালীদের নির্বাচন। আওয়ামী লীগের ১৪০ জন আর বিএনপির ১২৬ জন মেয়র প্রার্থী ব্যবসায়ী। তার মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩৩ জন কোটিপতি আর বিএনপির ৫৬ জন নাকি কোটিপতি। লেখাপড়ার দিক থেকে স্বশিক্ষিতের ছড়াছড়ি। ব্যবসায়ীরা শাসক হিসেবে দুর্বল, অমার্জিত আর দুর্নীতি পরায়ণ হন, তার ওপর স্বশিক্ষিত! ধীরে ধীরে জাতি শিক্ষিত, ত্যাগী সৎ আর রুচিসম্পন্ন লোকের শাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বিগত কয়েকটা সংসদেও ব্যবসায়ীর আধিপত্য ছিল বেশি। চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর তার পুত্র বিন্দুসার রাজা হয়েছিলেন। ভারতের সঙ্গে তখন সিরিয়ার যোগাযোগ ছিল। সিরিয়ায় তখন গ্রিকদের শাসন। বিন্দুসার সিরিয়ার শাসক এন্টিয়োকাসের কাছে অনুরোধ করেছিলেন কিছু ডুমুর, কিছু মদ আর আরেকজন সু-শিক্ষিত সুবক্তা ও সুপণ্ডিত ব্যক্তিকে তার কাছে পাঠানোর জন্য। রাজা এন্টিয়োকাস তার কাছে ডুমুর আর মদ পাঠিয়েছিলেন আর বিন্দুসারকে জানিয়ে ছিলেন গ্রিসের সুশীলেরা রফতানিযোগ্য সামগ্রী নয়। সুশীলের কদর আড়াই হাজার বছর আগেও ছিল।
বাংলাদেশে সম্ভবত সুশীলের কদর উঠে যাচ্ছে। আগে পেশাগতভাবে যারা রাজনীতিবিদ ছিলেন তারাই নির্বাচন করতেন। ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আমার জেলা চট্টগ্রামে ১৮টি সংসদীয় আসন ছিল। ২ জন ব্যবসায়ী আর অবশিষ্ট ১৬ জন ছিলেন সার্বক্ষণিক আওয়ামী লীগ কর্মী। ২ জন ব্যবসায়ীর মাঝে এম আর সিদ্দিকী দীর্ঘদিন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়ও তিনি দল ছেড়ে যাননি। আর অন্যজন ইদ্রিস সাহেব ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত (মৃত্যুর আগ মুহূর্ত) তিনি আওয়ামী লীগ করেছেন এবং দীর্ঘ সময়ব্যাপী জেলেও ছিলেন। কোটিপতি ছিলেন এবং এ কে খানকে পরাজিত করে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশিষ্ট ১৬ জনের মাঝে এমএ ওহাব এবং এম ছিদ্দিক ছিলেন সম্পূর্ণভাবে অর্থহীন মানুষ। কর্মীরাই তাদেরকে চালাতেন আর নির্বাচনি ব্যয়ও কর্মীরাই যোগাড় করতেন।
এমএ ওহাব দুইবার সংসদ সদস্য ছিলেন আবার ১৯৫৬ সালে জেলা বোর্ডের নির্বাচনে ফজলুল কাদের চৌধুরীকেও পরাজিত করেছিলেন। ওহাব সাহেব যখন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তখন আমি তাকে কৃষি কাজ করতে দেখেছি। জহুর আহাম্মদ চৌধুরী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্নের নেতা। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য। আমি জহুর আহাম্মদ চৌধুরীকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের কাপড় ছিল দু’টি পায়জামা, দু’টি  পাঞ্জাবি আর একটি কালো শেরওয়ানি। আর ছিল দু’টি কাচাছাড়া সবুজ লুঙ্গি। ঢাকা আসলে থাকতেন সেন্ট্রাল হোটেলে। ভাড়া ছিল ৭ টাকা।

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ইডেন কাউন্সিলে তাসখন্দ ডিক্লারেশন নিয়ে কোনও কোনও বক্তা বললেন তাকে অভিনন্দন জানাতে হবে। কোনও কোনও বক্তা বললেন নিন্দা জানাতে হবে। বঙ্গবন্ধু যখন কাউন্সিলে দ্বিধাবিভক্তি লক্ষ্য করলেন তখন জহুর আহাম্মদ চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করলেন-তাসখন্দ ডিক্লারেশনের ওপর সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য পেশ করতে। তখন জহুর আহাম্মদ চৌধুরী ‘না গ্রহণ না বর্জন’-এর প্রস্তাব করলেন। খুবই জ্ঞান-গরিমা সম্পন্ন লোক ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও খুব স্নেহ করতেন ওনাকে।

১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বিরাট এক ত্যাগীকর্মী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। মূলত তাদের কারণেই মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছিল। এখন সে প্রজন্ম প্রায় নিঃশেষ হতে চলেছে। কদাচিৎ নিষ্ঠাবান-আদর্শবান কর্মী গড়ে উঠছে। এখন রাজনৈতিক কর্মীদের লালসার শেষ নেই। আওয়ামী লীগ ধনবাদী সংগঠন। ধনবাদী সমাজ বিবর্তনের ধনবাদের প্রগতিশীল ভূমিকা থাকে। মার্কসও সে কথা স্বীকার করেছেন। এখন সমাজে গরীবেরা যে ছিটে ফোঁটা উপকার পাচ্ছে তা ধনবাদের প্রগতিশীল ভূমিকার কারণে। আওয়ামী লীগ তার রাষ্ট্র পরিচালনায় সে ব্যবস্থাটুকু বজায় রাখার চেষ্টা করে থাকে।

এবারে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল। সারাদেশের পৌরসভাগুলোতে তাদের প্রার্থী রয়েছে। অর্থ-বিত্তে তারা পিছিয়ে নেই। কোনও কোনওখানে তারা অর্থবিত্তের জৌলুস প্রদর্শনে অগ্রগামী। বিদ্রোহী প্রার্থীও রয়েছে অনেক। সবদিক বিবেচনা করলে তারা সরকারি দলের চেয়ে পিছিয়ে নেই। প্রত্যেক প্রার্থী অঢেল অর্থ খরচ করছে। বাংলাদেশ সামরিক শাসক হিসাবে এসে নিজের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য জিয়াই প্রথম রাজনৈতিক দল বিএনপি সৃষ্টি করে ছিলেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার জন্য জিয়া পাকিস্তানি ভাব-আদর্শ-চিন্তা-চেতনার সবকিছুরই পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য পাকিস্তান সমর্থক নেতাদেরকে তার দলে স্থান করে দিয়েছিলেন। তার রাজনীতির কলেবর বিস্তৃত করার জন্য মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ইত্যাদি পাকিস্তানপন্থী দলগুলোর পুনরায় গড়ে ওঠার বাধাও অপসারণ করেছিলেন।

এদেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীর আগমণ জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। অন্য এক সামরিক একনায়ক জেনারেল এরশাদও ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে টেনে আনার সংস্কৃতি অব্যাহত রাখেন। এ দুই সামরিক একনায়কের হাতেই রাজনীতি তার পুরনো বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। ব্যবসায়ীরা নেতৃত্বে চলে আসেন আর ত্যাগী কর্মীরা ব্যবসায়ী নেতাদের রাজনীতির কামলায় পরিণত হন। আওয়ামী লীগকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সে পথে পা বাড়াতে হয়। অন্যথায় পাল্লায় তাদের সঙ্গে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যতক্ষণ রাজনীতিতে ত্যাগী নিষ্ঠাবান কর্মীর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত না হবে ততক্ষণ আর রাজনীতির সত্যিকার সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। হতশ্রী দশা হতে হতে একসময়ে রাজনৈতিক দল সংঘবদ্ধ দুষ্কৃতিকারীদের আখড়ায় পরিণত হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং  কলাম লেখক

Bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ