behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষকদের আন্দোলন

জহিরুল হক মজুমদার১৩:২৭, জানুয়ারি ০৯, ২০১৬

জহিরুল হক মজুমদারপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও  বিশ্ববিদ্যালয়  শিক্ষকদের প্রতি খুবই বিরক্ত হয়েছেন  এটা বুঝা যায়। তিনি অত্যন্ত  ব্যতিক্রমীভাবে  শিক্ষকদের সরকারী কর্মচারী কর্মকর্তাদের মত অফিস করা এবং চাকুরীর বয়স কমিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। মিডিয়াতে  এই  বিষয়গুলো এসেছে এই শিরোনামে যে ----- শিক্ষকদেরকে প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি।বিষয়টি অত্যন্ত বিব্রতকর সন্দেহাতীতভাবে। সেই বিব্রতভাব কাটিয়ে একটি স্বাভাবিক পরিবেশ এর আকাঙ্খা থেকেই হয়তো প্রধানমন্ত্রী আবার  বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের স্বর্ণপদক প্রদান অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের সম্মান করার বিষয়ে জোর দিয়েছেন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক এবং প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে এই ধরণের উক্তি করায় শিক্ষকরা আহত হয়েছেন এতে কোন সন্দেহ নেই।এই ধরণের উক্তি সমাজের শুভ মূল্যবোধের প্রতিও আঘাত, যা বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে কাঙ্ক্ষিত নয়। যিনি ব্যক্তিগত এবং জাতীয় জীবনের বিশাল ট্র্যাজেডিকে অতিক্রম করে জনগণের পাশে আছেন গত কয়েক দশক ধরে,  তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, জনগণের প্রতি তাঁর ভালবাসা এবং শিক্ষকদের প্রতি তাঁর সম্মানবোধের চেতনার প্রতি আমরা আস্থা হারাতে চাইনা।

 জিয়াউর রহমানের শাসনামলের মাঝামাঝি আমি আমার গ্রামের  প্রাইমারী স্কুলের ছাত্র। আমার বাবা কুমিল্লা শহরের কাছে আরেকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তখন প্রাথমিক শিক্ষকদের বিশাল আন্দোলন হয়েছিল। ঢাকায় এসেছিলেন সব শিক্ষক। দিনের পর দিন মিছিল হয়েছিল। তখন প্রাথমিক শিক্ষকদের নেতা ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। পরবর্তীতে ছাত্রকে পিস্তল নিয়ে তাড়া করার অভিযোগে যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত বলে কথিত আছে। সেই ঢাকা কেন্দ্রিক বিশাল আন্দোলনের সময়, ঢাকার মানুষেরা শিক্ষকদের মিছিলে কলসি করে পানি খাইয়েছিলেন বলে বাবার কাছে শুনেছি।

 সেই আন্দোলন সম্ভবত সফল হয়নি। আন্দোলনের সময়  জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধান হিসেবে শিক্ষকদের সম্পর্কে কোন বিদ্বেষ বা তাচ্ছিল্যপূর্ণ উক্তি করেছেন বলে শুনিনি। পরবর্তীকালে শুনেছি জিয়াউর রহমানের প্রধানমন্ত্রী  রাজাকার শাহ আজিজ শিক্ষকদের সম্পর্কে তাচ্ছিল্যপূর্ণ উক্তি করেছিল।

 এইচ এম এরশাদ এর সামরিক শাসনামলে ছাত্র আন্দোলন দমন করার নামে বার বার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছে। কখনো  কখনো এইসব ক্ষেত্রে  রাষ্ট্রপতি এবং চ্যান্সেলরের আদেশ লঙ্ঘিত হতে দেখে এইচ এম এরশাদ বিস্ময়ভরা উক্তি করেছিলেন ------ বিশ্ববিদ্যালয় কি রাষ্ট্রের ভিতর আরেকটি রাষ্ট্র? ১৯৫০ এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট এইচ এম এরশাদ এই উক্তি করেছিলেন তার স্বভাবসুলভ সামরিক ইংরেজিতে এবং স্বতঃস্ফুর্ত বিস্ময়ের সাথে। বার বার তার সামরিক শাসনের প্রতি চ্যালেঞ্জ এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে। শেষ পর্যন্ত তার পতন হয়েছে ছাত্র গণআন্দোলনের মুখে। সেই আন্দোলনে শিক্ষকদেরও বিশাল ভূমিকা ছিল। সেই সময়ের একজন ছাত্র হিসেবে এরশাদ পতনের কিছুদিন আগের তীব্র গণআন্দোলনমুখর দিনগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গনপদত্যাগের হুমকির কথা এখনো আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কর্মসূচীর প্রতি ছিল মিডিয়ার সতর্ক নজর। তখনকার শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এবং ১/১১ এর বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ইয়াজ উদ্দিন আহমেদ। সেই সংগ্রাম মুখর দিনগুলোতেও স্বৈরশাসক এরশাদ শিক্ষকদের সম্পর্কে কোন খারাপ উক্তি করেছেন বলে জানা নেই।

 সাংবাদিক শফিক রেহমানের পিতা দার্শনিক সাইদুর  রহমান ছিলেন  কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরাসরি শিক্ষক। বংবন্ধু  স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর, তার শিক্ষক অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান যতবার প্রধানমন্ত্রীর দফতরে গেছেন, বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারটিতেই বসতে দিতেন,  শিক্ষকের আপত্তি সত্ত্বেও।

 মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও তার শিক্ষকদের সম্পর্কে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রফেসর আনিসুজ্জামান কিংবা প্রফেসর রফিকুল ইসলামকে প্রধানমন্ত্রীর পাশেই উপবিষ্ট আমরা বহুবার দেখেছি। নিজের শিক্ষকদের পাশে প্রধানমন্ত্রীকেও আমরা স্বস্তি ও আনন্দের ভিন্ন উজ্জ্বলতায় দেখেছি।

আমরা যে কারণে শঙ্কিত তা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী কোনও কারণে সুবিধাবাদি আমলাদের দ্বারা প্ররোচিত কি না। এখনকার সব সিনিয়র আমলারাই আশির দশকে এরশাদের স্বৈরশাসনের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত। তাদের তরুণ বয়স কেটেছে একটি স্বৈরশাসনের আমলাতন্ত্রের অংশ হিসেবে। তারা সেই অবৈধ, জনস্বীকৃতিহীন শাসনের সুবিধাভোগী, যখন তাদের বন্ধুরা, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এই কথা বলে স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলন করেছে। তাদের মনোজাগতিক  হীনমন্যতা কাটানোর জন্য তারা অনেক রকম উচ্চমন্যতার সন্ধান করে থাকতে পারেন। সম্ভবতঃ সরকারি বেতন কাঠামোর মধ্যে নিজেদের উপরে রেখে আর শিক্ষকদের নীচে রেখে, সেই আত্মহীনমন্যতার নিরসনই তারা করতে চেয়েছেন। এমনকি নিজেদের সমর্থনে স্বৈরশাসনের সময় সবচেয়ে চালু সরকারি প্রেসনোট সংস্কৃতির আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে তাঁরা  শিক্ষকদের প্রসঙ্গ এনে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করার চেষ্টা করেছেন। আশ্রয় নিয়েছেন  মিথ্যাচারের। তাদের ভাষ্যমতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা নিজ কর্মস্থলের বাইরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুযোগ রয়েছে, যা তাদের নেই। আসলে এটি আংশিক সত্য। আমলাদের মধ্যে যাদের বিদেশের ডিগ্রী রয়েছে তাদের অনেকেই সান্ধ্যকালীন পাঠ দান করেন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। যাদের যোগ্যতা নেই পাঠদানের তারা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারা বিষয়টি এমনভাবে হাজির করেছেন প্রেসনোটে যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বাইরে পাঠদানের জন্য কোন অনুমতি লাগেনা কিন্তু তাদের সরকারের অনুমতি নিতে হয়। এটি হয় মিথ্যাচার, নতুবা অজ্ঞতা প্রসূত। শিক্ষকদেরও অনুমতি লাগে এবং আয়ের দশ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় কোষাগারে দেওয়ার বিধান রয়েছে। এর সাথে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টারও বিধিনিষেধ আছে, বাইরের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার ক্ষেত্রে। এইসব বিধিবিধান সঠিকভাবে পালিত হয় এমন দাবি আমি করছিনা। কিন্তু অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রেসনোটে ভুলভাবে হাজির করা হয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমলাদের দ্বারা প্ররোচিত না হয়ে নিজস্ব প্রজ্ঞার ভিত্তিতে প্রত্যেকটি পেশার মূল্যায়ন করবেন এটাই সকলে আশা করে। শিক্ষকরা সচিব হতে চাননা। এটা এক ধরনের বিভ্রান্তি, অপপ্রচার। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা গ্রেড-১ এ বেতন চান, যা তারা আগে পেতেন। এই সামান্য চাওয়াটিকে বিচিত্র বিভ্রান্তির মোড়কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাজির করছেন আমলাতন্ত্রের একাংশ। একই সাথে দাবি করছি শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই গ্রেড-১ চালু করা হোক, যত কম করেই হোক এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক সামর্থ্য সাপেক্ষে।

আমাদের দাবি শুধু সামান্য অর্থ কেন্দ্রিক নয়, কিংবা শিক্ষকদের সম্মান শুধু আমলাদের সমান অর্থপ্রাপ্তিতে, এটি বুঝানো নয়, একটি জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ নির্মাণে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভুমিকায় দেখার আকাঙ্ক্ষারও প্রকাশ বটে, এই আন্দোলন। 

 লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 *** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ