প্রিয় প্রধানমন্ত্রী সুস্থ থাকুন, দীর্ঘায়ু হোন!

Send
ফজলুল বারী
প্রকাশিত : ১৪:০৩, জানুয়ারি ১২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪১, জানুয়ারি ১২, ২০১৬

দু’ হাজার চৌদ্দ সালের ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন মান সম্পন্ন হয়নি। এটা আমি মানি। কোন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও সে নির্বাচন হয়নি। পাঁচশ’র বেশি কেন্দ্র জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে! হত্যা করা হয়েছে নির্বাচন কর্মকর্তাকেও! আজ যারা সে নির্বাচনের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে বলেন তারা কিন্তু বিধ্বংসী সে ঘটনাগুলো বলেন না। তারা ঢালাও বলেন, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাননি। তারা গিয়েছিলেন? না গিয়ে থাকলে কেন যাননি? একটা পক্ষ হয়ে গিয়েছিলেন সে জন্যে? জামায়াত-বিএনপি পক্ষ! যারা সে নির্বাচনে না যেতে বলেছিল! মানুষ মেরে ভোট কেন্দ্র জ্বালিয়ে ভীতির সৃষ্টি করা সেই নির্বাচনে দেড়শ’র বেশি প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কথা বলা হয়। যারা এ বক্তব্যে চড়াও হন তারা নির্বাচনে কেন প্রার্থী  হলেন না অথবা দাঁড় করালেন না? একটা নির্বাচনে কত হাজার কেন্দ্র থাকে? সব কেন্দ্রের ছবি কী মিডিয়ায় ছাপা হয়? না সম্ভব? যে কেন্দ্রে সমস্যা ছিল শুধু সে কেন্দ্রের ছবি দেখিয়ে গলাবাজি কি যেসব কেন্দ্রে সমস্যা ছিলো না সে সব এলাকার ভোটারদের অপমান করা নয়? ১৬-১৭ কোটি মানুষের দেশে কী সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দিয়েও শতভাগ সুষ্ঠু ও মানসম্পন্ন নির্বাচন করা এখনও সহজ-সম্ভব? এমন নানা বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই একটি পক্ষ দুর্ভাগ্যজনক ভাবে নিরপেক্ষতার বুলি আওড়ায়! আমি অবশ্য বাংলাদেশের অনেক পণ্ডিতের নিরপেক্ষ কনসেপ্টের সঙ্গে একমত না। এদের নিরপেক্ষ কনসেপ্টের মূল সুর হচ্ছে বাংলাদেশ বিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে থাকা! মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে আমি মোটেই নিরপেক্ষ না। এটি আমার ঘোষিত অবস্থান।

ফজলুল বারীআর বাংলাদেশে সব মহলের কাছে প্রশংসিত নির্বাচনের কোনও ইতিহাস নেই। ২০০৮ সালের নির্বাচন কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়নি? সে নির্বাচনে কি সেনাবাহিনী ছিলো না? কিন্তু বেগম জিয়া কি এই সেদিনও সেই নির্বাচনের বিপক্ষে বলেননি? এমন যে যখন নির্বাচনে হেরে যান তারা সে নির্বাচনের বিরুদ্ধে বলেন। এভাবে তারা বলবেনই। এটাই তাদের খাসলত। এরসঙ্গে সরকারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায় আমি স্বস্তি পেয়েছি। এর অনেক কারণ উল্লেখ করার মতো আছে। দুটো কারণ এখানে উল্লেখ করছি। বাংলাদেশের একটি নেতিবাচক বাস্তবতা অনেক দিন ধরে চলে আসছে। একটা সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকার পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া বেশিরভাগ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয় কাটছাঁট করে অথবা আমূল পরিত্যক্ত করে দেয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সরকার বদল না হওয়াতে বাংলাদেশ এই আত্মঘাতী যজ্ঞ থেকে রক্ষা পেয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অটুট থাকায় এর সুফল পেতে শুরু করেছে দেশ। আগামীতে আরও পাবে। দ্বিতীয় যে কারণে আমি এবং আমার মতো দেশের অনেক মানুষ স্বস্তিতে আছি তা হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না ফিরলে এই বিচার নিশ্চিত বন্ধ হয়ে যেত। বাংলাদেশের জন্মবিরোধী জামায়াত যাদের জোট সঙ্গী তাদের নিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে তারা যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের বিচার করবেন, এই ছেলে ভোলানো গল্প দেশের মানুষকে খুব স্বাভাবিক বিশ্বাস করানো যায়নি।  এখন ‘আমরাও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, তবে এ বিচার হতে হবে স্বচ্ছ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন’ বুলি যারা আওড়ান তাদেরকে কেউ বিশ্বাস করে না। ক্ষমতায় থাকতে তারা এ নিয়ে কী করেছেন তা দেশের মানুষের ঢের মনে আছে। 

বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির বড় একটি বাধা দুর্নীতি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতি কমে গেছে বা হচ্ছে না এমন দাবি করার মতো বুরবক আমি নই। এখনকার সত্য হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবারের কোনও সদস্য দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। সরকারের সমালোচকরা অনুবীক্ষণ যন্ত্রপাতিসহ এ নিয়ে কম অনুসন্ধান করেননি বা করছেন না। সরকার প্রধান ও তার পরিবার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত না থাকায় দুর্নীতির অভিযোগ-প্রমাণ যখন যেখানে পাওয়া যাচ্ছে ধরা হচ্ছে। কিছুটা পরে হলেও।

অপরদিকে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তার পরিবার প্রত্যক্ষ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। হাওয়া ভবন খুলে আজান দিয়ে দুর্নীতি অথবা কমিশন বাণিজ্য করা হয়েছে! খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে কোকো, ভাই সাঈদ ইস্কান্দারকে বাণিজ্যের সুযোগ করে দিতে ওপেন সিক্রেট দুর্নীতি করা হয়েছে। তারেক রহমানের বন্ধু মামুনকে শতকোটি টাকার মালিক করতে দেওয়া হয়েছে দুর্নীতির স্পেশাল পারমিট! এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় সদ্য রাজনীতিতে নামা খালেদা জিয়ার মিছিলের পেছনে একটা ফিফটি সিসির হোন্ডা মোটরবাইক নিয়ে ঘুরতেন মোসাদ্দেক আলী ফালু! আলাদীনের জাদুর চেরাগের মতো তিনি হয়ে যান ব্যাংক-মিডিয়াসহ কয়েকশত কোটি টাকার সম্পদের মালিক! সরকার প্রধান এমন দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক হলে যা হয়, এবার তা হয়নি। যেখানে যে দুর্নীতির অভিযোগ-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিজের টাকায় হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু! শিক্ষাসহ আরও কিছু খাতের অগ্রগতিও উল্লেখযোগ্য। দেশের মানুষের গড় আয়ু, মাথাপিছু আয়, ক্রয় ক্ষমতা, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, কৃষি উৎপাদনসহ নানাকিছু বেড়েছে। বছরের প্রথম দিনে সারাদেশের স্কুল ছাত্রছাত্রীদের উৎসব করে নতুন বই দেওয়া হয়, তা পৃথিবীতে আর কোথায় কোথায় দেওয়া হয় তা আমি নিশ্চিত জানি না। স্কুলের বাচ্চাদের দুপুর বেলা স্কুলে রান্না করা খাবার দেওয়া যায় কিনা তা বিবেচনার জন্যে আমি সরকারকে অনুরোধ করছি। 

সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার নানা খতিয়ান শুরু হয়েছে এবং আগামীতেও হবে। সাফল্য যতোটা আছে এবং আসছে আমার মতে এর পেছনে অন্যতম নিয়ামক শক্তি হিসাবে কাজ করেছে এবং করছে তা হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসীপনা ও দৃঢ়তা। দুর্নীতি স্পর্শ করতে না পারলেই একজন মানুষ এমন সাহসী হয়-হতে পারে। মূলত শেখ হাসিনার সাহসী-দৃঢ়তার কারণেই দেশি-বিদেশি এতো চক্রান্ত-তদবির সত্ত্বেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। এই বিচারের আন্দোলন আমরা যখন গুটিকয় মানুষ শুরু করেছিলাম, এর স্বপ্ন দেখতাম কিন্তু এটি এভাবে বাস্তবায়িত হবে সত্যিকার অর্থে তা নিশ্চিত ভাবতে পারতাম না। পদ্মা সেতু যে নিজেদের টাকায় হচ্ছে এটিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহস-দৃঢ়তার আরেক দৃষ্টান্ত। এ নিয়ে তো দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র কম হয়নি বা এখনও যে হচ্ছে না তা নয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পণ্ডিত অনেকে ‘সম্ভব না, এই হয়ে যাবে সেই হয়ে যাবে’ বলেছিলেন! কিন্তু সত্য বাস্তব হচ্ছে পদ্মা সেতুর কাজ জোরকদমে চলছে। সরকারের ধারাবাহিকতা থাকলে-চললে বাংলাদেশের মতো একটি কাজ পাগল পরিশ্রমী মানুষের দেশ দৃশ্যত কতো অগ্রগতি অর্জন করতে পারে শেখ হাসিনার ধারাবাহিক সাত বছরের শাসনকাল এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। 

কিন্তু এই সময়ে আরও অগ্রগতি অর্জন করা যেত। এরজন্যে সবার কথা শোনার সুযোগ-ব্যবস্থাগুলো আরও বাড়াতে হবে। শুধু আমলাদের কথা শুনতে গিয়ে শেখ হাসিনা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের কাছে বিরাগভাজন হতে চলেছেন এর প্রমাণ শিক্ষকদের চলতি আন্দোলন। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আওয়ামী লীগের দুর্দিনের পরীক্ষিত বন্ধু তারা গত সাতমাস চেষ্টা করেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ পাচ্ছেন না, এটা কী রকম কথা? কারা ঘটাচ্ছে এসব? গত সাত বছরেও শেখ হাসিনা দেশের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে পারেননি! অথচ এর বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন সবচেয়ে বেশি। সুন্দরবন এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধীরা দেশ বিরোধী নয়। তাদের সঙ্গে জেদাজেদি অন্তত শেখ হাসিনার মানায় না। চলতি দ্বিতীয় মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দেশের প্রয়োজনীয় একটি রাজনৈতিক সংস্কার চিন্তার অনুরোধ করছি। ঢাকাসহ সারাদেশে জন সাধারণের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক সভা-মিছিল বন্ধ করতে হবে। সভা-মিছিল কোনও হল বা মাঠের মধ্যে চলুক। কিন্তু তা কোনও অবস্থায় রাস্তায় আসতে যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে দেওয়া যাবে না। ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করতে দিলে তা রাস্তায় আসবেই। কাজেই সেখানে রাজনৈতিক সমাবেশ আর নয়। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সভার অনুমতি দেওয়া যাবে শর্ত সাপেক্ষে। কোনওভাবে তা যেন রাস্তায় কোনও জটলা বা সমস্যা না করে। প্রেস ক্লাবের সামনে যারা মানববন্ধন করেন তারা প্রেস ক্লাবের ভেতরে হলভাড়া করে যা খুশি করুন, কিন্তু রাস্তায় নয়। সর্বশেষ ১১ জানুয়ারি ঢাকায় আওয়ামী জনসভাকে কেন্দ্র করে যানজটে মানুষকে অনেক কষ্ট দেয়া হয়েছে। এসব বন্ধ করতে হবে। আওয়ামী লীগের এক এমপিকে দেখলাম এক টিভিতে বলছেন বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের কথা নতুন প্রজন্মকে জানাতে এক-দুদিন এমন কষ্ট দেওয়াই যেতে পারে। আল্লাহর ওয়াস্তে মানুষ ক্ষ্যাপানোর এসব কথাবার্তা বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতকে কেন্দ্র করে যানজটে স্থবির হয় রাজধানী! আল্লাহর ওয়াস্তে এসব বন্ধ করুন। প্রোগ্রাম করুন অফিসে-বাড়িতে। দরকার হলে কোথাও হেলিকপ্টারে যান। কিন্তু মানুষের রাস্তা বন্ধ করে নয়। কারণ আখেরে এই মানুষই ভোটার। এই মানুষই আপনাকে শেখ হাসিনা বানিয়েছে। একুশে আগস্টে এরাই আপনাকে বাঁচিয়েছে। আগামীতে বিপদে-আপদে এই মানুষই আপনার পক্ষে থাকবে। অতএব এই মানুষের পথ কীভাবে নির্বিঘ্ন থাকবে, মানুষ কীভাবে আরও বেশি আপনার পক্ষে থাকবে সে বিষয়গুলোই আরও বেশি বেশি ভাবুন, সেভাবে কাজ করুন প্রিয় প্রধানমন্ত্রী। সুস্থ থাকুন। দীর্ঘায়ু হোন।

 

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ