behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ভালো অনেক আছে, কিন্তু প্রতীক মাসুদ শিকদাররাই!

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা১৩:১৩, জানুয়ারি ১৩, ২০১৬

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাবাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের চেষ্টার অভিযোগে পুলিশের এসআই মাসুদ শিকদারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে ক্লোজ করা হয়েছে। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এখন পর্যন্ত এটিই শেষ তথ্য এ সম্পর্কে। বাকি সর্বশেষ কবে জানবো, জানা নেই। সুষ্ঠু তদন্ত আদৌ হবে কিনা, মাসুদ শিকদার শাস্তির বদলে প্রমোশন পান কিনা তাও হয়তো আমরা অনেকদিন জানতে পারবো না। আইন-শৃংখলা বাহিনীর এমন আচরণ আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র কাদেরের সঙ্গে দেখেছি, লিমনের সঙ্গে দেখেছি, দেখেছি আরও অনেক অনেক।
তবে রাব্বীর জীবনে যা ঘটে গেছে, তা সারাজীবনের জন্য এক আতঙ্ক হয়ে থাকবে। আর আর্থিক ক্ষতি? তাও কি কম? রাষ্ট্রীয় পোশাকে এক ব্যক্তি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে, একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন তছনছ করে দিল, কিন্তু রাষ্ট্র নীরব হয়ে আছে। ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, কেউ সাধারণ খোঁজ খবরটুকুও নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।   
মাসুদ সিকদাররা পুলিশে আছে, অনেক বেশি সংখ্যায় আছে। প্রশ্ন উঠতে পারে কেন, ভালো কি কেউ নেই? উত্তর হবে আছে, এবং অনেক আছে। কিন্তু সমস্যা হলো মাসুদ শিকদাররাই যে প্রতীক হয়ে উঠে এই বাহিনীর!

ঘটনাটি যদি একটু না বলা হয়, তবে বোঝাই যাবে না কতোটা মরিয়া হয়ে উঠেছে, কতোটা সমাজ বিরোধী, কতোটা বেপরোয়া হয়ে শৃংখলার বাইরে চলে যাচ্ছে বা গেছে এই বাহিনীর অনেক সদস্য। শনিবার রাত ১১টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের যোগাযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে মারধর করে বড় অঙ্কের টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন রাব্বী। ঘটনার সময় মোহাম্মদপুরের খালার বাসা থেকে কল্যাণপুরে নিজের বাসায় যাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় পেছন থেকে শার্টের কলার ধরে একজন পুলিশ সদস্য তাকে বলেন, তোর কাছে ইয়াবা আছে। স্যারের কাছে চল। শার্টের কলার ধরে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ শিকদারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় এসআই মাসুদ বলেন, তোর কাছে ইয়াবা আছে। রাব্বী তা অস্বীকার করে নিজের পরিচয় দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন এসআই মাসুদ। এ সময় জোর করে তাকে পুলিশের ভ্যানে ওঠানো হয়। ভ্যানে উঠিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় তার কাছে। টাকা না দিলে ক্রসফায়ারের হুমকি দেওয়া হয় রাব্বিকে। টাকা দিতে অসম্মতি জানালে তাকে মারধর করা হয়। এ সময় কাউকে ফোন করারও সুযোগ দেওয়া হয়নি তাকে। একপর্যায়ে রাত আড়াইটার দিকে যে কোনও একজনকে ফোন দিতে বলেন এসআই মাসুদ। যেন ওই ব্যক্তি তাকে সেখান থেকে নিয়ে যায়। রাব্বির ফোন পেয়ে তার সাত-আট বন্ধু মোহাম্মদপুরে ছুটে যান। রাব্বিকে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেন তারা। পরে রাব্বি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

এসআই মাসুদ শিকদাররাব্বি ব্যাংক কর্মকর্তা, কিন্তু একই সঙ্গে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট, সময় টিভির সংবাদ উপস্থাপক। কিছুটা সুবিধা করতে পেরেছেন, দ্রুত মাসুদ সিকদারের খপ্পর থেকে বেরোতে পেরেছেন। যদি এমন একটি যোগাযোগ না থাকতো, তাহলে কি তার লাশ পাওয়া যেতো কোন এক নির্জন স্থানে? কিংবা টাকা দিয়েই তাকে ছাড়া পেতে হতো?
এমন ঘটনা একটি নয়, দুটি নয়, অনেক অনেক ঘটছে রাজধানীতে, অন্যান্য শহরে, বন্দরে, এমনকি ছোট মফস্বলে। ক’টিইবা জানা যায়, ক’টিইবা খবর হয়!
একের মধ্যে বহু রঙ এই বাহিনীর। সমাজের উঁচুতলার (বিশেষভাবে রাজনৈতিক, আর্থিক বা প্রশাসনিক ভাবে ক্ষমতাধর হলে) কেউ থানায় গেলে ব্যবহার এক রকমের (একটু বসুন প্লিজ, এ জাতীয়) আবার চেহারায়, হাবেভাবে সমাজের প্রান্তিক বা পিছিয়ে থাকা মানুষজন থানায় গেলে তার সঙ্গে ব্যবহারটা অন্য রকম। আবার কোন নারী যদি যায় কোনও কোনও পুলিশকর্মীর ব্যবহার আর এক রকমের হয়ে যায়।
তবে কি আমাদের পুলিশ কেবলই ‘হৃদয়হীন’? তা নয়। আমি নিজে বহু ভাল পুলিশ কর্মকর্তা, কর্মচারীর দেখা পেয়েছি। এবং আমি জানি কতটা কষ্টে তারা দায়িত্ব পালন করেন। থাকার জায়গা নেই, থাকলেও তা মান-সম্মত নয়, ডিউটির কোনও সময় অসময় নেই। কিন্তু তবুও পুলিশ কি মানুষের সঙ্গে এমনটা করতে পারে যা মাসুদ সিকদাররা করছেন? মাসুদ সিকদারদের খুঁটির জোর থাকে, তাই তাদের দম্ভ তাকে—যতোই অন্যায় করুক, কিছু হবে না তাদের।

আর এসবই হয় রাজনীতির কারণে। বছরে বছরে দলে দলে নেতা-নেত্রীরা তাদের সুবিধা অনুযায়ী পরিস্থিতিকে তাদের মতো করে সাজিয়ে নেন। সুবিধা অনুযায়ী পুলিশকে হিরো বানান, অথবা ভিলেন। বিরোধী পক্ষে থাকার সময়ে যে ঘটনায় উত্তাল বিক্ষোভ-প্রতিবাদ, সরকারে আসার পরে সেই সব ঘটনাকেই তাঁদের মনে হয় ‘ষড়যন্ত্র’! পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার বাড়তে বাড়তে এমন একটা অবস্থা হয় যে, পুলিশি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায় এমনভাবে—এই বাহিনীরও কেউ কেউ তার সুযোগ নিতে ছাড়ে না। অন্যায় দুর্নীতির কুখ্যাতির অভিযোগ তো এমনিতেই পুলিশের কপালে লেখা, এসব ঘটনা সমালোচনার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

পুলিশকে নিয়ে যত অস্বস্তি এবং অভিযোগ আছে, দৃশ্যত তাকে অস্বীকার করা না গেলেও এসবের দায় শুধু ব্যক্তি এবং বাহিনীর ওপর এককভাবে চাপানো যায় না। কিন্তু দায় কি কেউ নেবে না? নাকি বলে বেড়ানো হবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা? মনে রাখতে হবে মাসুদ সিকদার রোগের একটি উপলক্ষ মাত্র। এক দুটি বরখাস্তে এই রোগমুক্তি সম্ভব নয়। রোগের মূলোৎপাটনের কথা ভাবতে হবে সংশ্লিষ্টদের।

সংস্কারের কথা অনেক শুনেছি, পরিবর্তন যে কিছু হয়নি তাও নয়। কিন্তু আমাদের পুলিশ প্রতিষ্ঠানটি যে অনেক দুর্বলতায় ভুগছে এবং ভুগছে তার সদস্যদের কারণেই তা অস্বীকার করা উপায় নেই। তাই ক্রমাগত মননশীলতার প্রশিক্ষণের কোনও বিকল্প আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আর রাষ্ট্র যারা চালান, তাদের ভাবনার জগতেও নতুনত্ব আনতে হবে। পুলিশ যখন দেখে সরকার ও প্রভাবশালী রাজনীতির অনুকূলে ভালোমন্দের বাছ বিচার না করেই তাদের আদেশ পালন করতে হয় তখন দল আর বাহিনীর মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা হয়ে যায়। এই অবস্থা পুলিশকে দুর্নীতিপরায়ণ ও বেপোরোয়া হতে উৎসাহ দেয়। পুলিশে ভালো কর্মী আছে, সৎ, নিষ্ঠাবান ও মানবিক মানুষ আছে। কিন্তু মন্দের অপকর্মে ভালো সব কিছু নির্বাসিত হয়ে যায়।

মাসুদ সিকদারের ঘটনা হতে পারে সেই নির্বাসন থেকে ভাবমূর্তি পুণরুদ্ধারের একটি বড় সুযোগ। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আর একই সঙ্গে অন্য যাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আসছে সেসব সত্যিকারের তদন্ত করে ব্যবস্থা নিলে জনমনে নতুন আস্থা তৈরি এই বাহিনীকে নিয়ে। আর তাদের মগজে মানবিকতা, নাগরিকের প্রতি সম্মানবোধের ধারণা তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার এখনই সময়।

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ