Vision  ad on bangla Tribune

খালেদা জিয়ার তিরিশ লাখ শহীদ নিয়ে বিপদ!

ফজলুল বারী১৫:০২, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৬

Fazlul Bariমুক্তিযুদ্ধের পঁয়তাল্লিশ বছর পর এসে শহীদের তালিকা নিয়ে বিএনপি যা শুরু করেছে এটা স্রেফ ‘বদমায়েশি’ ছাড়া আর কিছু নয়। বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে এর আরেকটি প্রচলিত পরিভাষা আছে বেত্তমিজি! দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ‘বদমায়েশি’র সূচনা খালেদা জিয়ার মাধ্যমে! যিনি জনগণের ভোটে একাধিকবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন! দুই মেয়াদের ক্ষমতার দশ বছরে স্বাধীনতা এবং বিজয় দিবসের বাণীতে তিনি কমপক্ষে কুড়িবার উল্লেখ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের তিরিশ লাখ শহীদের আত্মাহুতির কথা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ১৯৭৪ সালের বিচিত্রায় ‘একটি জাতির জন্ম’ লেখাটিতেও ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির কথা উল্লেখ করা আছে। বিএনপির গঠনতন্ত্র-ঘোষণাপত্রের সূচনাতেও উল্লেখ করা হয়েছে, ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির বিষয়টি। জিয়া যতোদিন সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপতি ছিলেন ততোদিনও স্বাধীনতা দিবস-বিজয় দিবসের বাণীতে তিনি শহীদের অন্য কোনও সংখ্যা লিখেননি। বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে খালেদা জিয়াও কখনও বিজয় দিবস-স্বাধীনতা দিবসের বাণীতে সংখ্যাটি ২৮-২৯ লাখ উল্লেখ করেননি।
কিন্তু এখন যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আর একাত্তরের গণহত্যার দায় নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে তখন হঠাৎ করে কেন মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে খালেদা জিয়ার মনে সন্দেহ দেখা দিলো—এর জবাব তাকেই দিতে হবে। খালেদা জিয়ার বক্তব্যে যে তার লন্ডনে শরণার্থী হিসাবে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণকারী পুত্রের প্রভাব আছে তা অনেকেই বলছেন! বিলাতে তার পুত্র একদল তরুণ জামায়াতি পরিবেষ্টিত অবস্থায় আছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত বলে, তিনি এখন হাইকোর্টের নির্দেশে দেশের মিডিয়ায় ‘পলাতক ও নিষিদ্ধ ব্যক্তি’। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে হতাশাগ্রস্ত খালেদা জিয়ার চেহারা-কথাবার্তায় যে প্রভাব পড়েছে, মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে তার সন্দেহ সেটির অন্যতম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে  চিহ্নিত। তার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ক আন্দোলন এখন নিখোঁজ! পৌরসভা নির্বাচনে দলের নাজুক অবস্থার খবর নেই! মুক্তিযুদ্ধের শহীদ তিরিশ লাখ বা এর কম কিনা এটি তার এখন আসল সমস্যা!

ওই একটি বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে ঘরে ঢুকে গেছেন খালেদা জিয়া! সর্বশেষ তার এক সংবাদ সম্মেলন এমনভাবে আয়োজন করা হয়, যাতে কোনও সাংবাদিক এ নিয়ে প্রশ্ন করতে না পারেন! আর এখন খালেদা জিয়া যখন বেফাঁস একটা কথা বলে ফেলেছেন, বিএনপির নেতাদের তো তা যে কোনওভাবে প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে!  

১/১১'র সময় সেনা সমর্থিত সরকারের প্ররোচনায় খালেদার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সাইফুর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির মহাসচিব হয়ে গিয়েছিলেন মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন! তিনি এখন ৩০ লাখ শহীদ ইস্যুতে খালেদা জিয়ার পিঠ বাঁচানোর অন্যতম সক্রিয় যোদ্ধা! ১/১১'র সময় বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া খালেদা জিয়ার বিরোধিতা করতে গিয়ে পদ-দল হারান! খালেদা জিয়া গ্রেফতারের আগ মুহূর্তে মান্নান ভূঁইয়া পদ-দলচ্যুত করে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিবের দায়িত্ব দিয়ে যান। মান্নান ভূঁইয়ার ঘনিষ্ঠ ছিলেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা নজরুল ইসলাম খান। গত বিএনপি আমলে তাকে কুয়েতে রাষ্ট্রদূত করলে তার প্রশাসনের জালিয়াতিতে বিক্ষুব্ধ প্রবাসী শ্রমিকরা দল বেঁধে গিয়ে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা-ভাঙচুর করেন! বাংলাদেশের পঁয়তাল্লিশ বছরের ইতিহাসে বিক্ষুব্ধ প্রবাসীদের মাধ্যমে দূতাবাস আক্রান্ত হওয়ার দ্বিতীয় নজির নেই! তিনি এখন খালেদা জিয়ার তিরিশ লাখ শহীদ বিপদের অন্যতম রক্ষাকর্তা!

প্রতিবার নির্বাচনের আগে বিএনপির এক নেতা রাগে-দুঃখে-অপমানে দল থেকে পদত্যাগ করেন! কারণ খালেদা জিয়া তাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্য অথবা পাস করার মতো উপযুক্ত মনে করেন না! ইনি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। ইনি এখন খালেদা জিয়ার তিরিশ লাখ শহীদসংক্রান্ত বিপদ উদ্ধারের অগ্র সৈনিক! খালেদা জিয়াকে খুশি করতে ইনি শুধু মুক্তিযুদ্ধের শহীদ না, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কুষ্ঠি ধরেও টান দিয়েছেন! তার নেত্রী বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারীদের সঙ্গে রাজনৈতিক ঘর-সংসার করলেও প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে অন্তত মিরপুরের বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ছবি তুলতে যান। আর গয়েশ্বর কিনা 'বলিয়া বসিলেন বুদ্ধিজীবীরা বেকুবের মতো প্রাণ দিয়াছেন'! 'তাহা হইলে বেকুবদের স্মৃতি সৌধে যাহারা পুষ্পার্ঘ্য দিতে ছবি তুলিতে যায়, তাহাদের কী বলা যায়?' গয়েশ্বরের ধৃষ্ট বক্তব্যে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় এ নিয়ে দ্বিতীয় উচ্চারণের সাহস তিনি করেননি! বিএনপির একজন নেতার সাহস হয়নি গয়েশ্বরের সমর্থনে একটা শব্দ বলেন! কিন্তু গয়েশ্বর যেহেতু খালেদা জিয়ার লাইনের লোক, তাই তার বিএনপির পদ-পদবি নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি! মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কটাক্ষকারী গয়েশ্বর এখনও বিএনপির সর্বোচ্চ ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যপদে বহাল!

সেই গয়েশ্বর সর্বশেষ বলেছেন, তারা আগামীতে ক্ষমতায় গেলে গুণে গুণে শহীদদের সংখ্যা বের করবেন! এ লেখার শুরুতে 'বদমায়েশি', 'বেত্তমিজি' শব্দ দুটি তার কথা পড়ে মন থেকে বেরিয়েছে! দুই দফায় দশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, জিয়া-সাত্তারের সময়গুলো যোগ করলে তা ১৫ বছরের বেশি হবে, তখন করেননি আর আগামীতে করবেন? এর আগে তো আপনাদের আরও কিছু কাজ করতে হবে। ঘোষণা দিয়ে বলতে হবে, ১৯৭৪ সালে বিচিত্রার লেখায় জিয়া যে তিরিশ লাখ শহীদের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তা আপনারা মানেন না! জিয়া-সাত্তার-খালেদা জিয়া ক্ষমতার দিনগুলোতে স্বাধীনতা দিবস-বিজয় দিবসের বাণীতে যে তিরিশ লাখ শহীদের উল্লেখ করেছিলেন, আজকের বিএনপি কি ঘোষণা দিয়ে বলবে সেগুলো তাদের ভুল ছিলো? বিএনপির আসন্ন কাউন্সিলে তারা তাদের গঠনতন্ত্র-ঘোষণাপত্র সংশোধন করে তিরিশ লাখ শহীদের সংখ্যাটি বাদ দেবে? সে সাহস কী তাদের আছে? তাহলে এসব বদমায়েশি, বেত্তমিজি চালিয়ে যাওয়ার হেতু কী?

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো বিএনপি এমন এক বদমায়েশি শুরু করেছে যাতে বাংলাদেশের জন্মশত্রু পাকিস্তান, যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের লাভ হলেও তাদের বা আমাদের কোনও লাভ হচ্ছে না। এতে করে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবারগুলোর মনে নতুন রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। পুরো বিষয়টি এমন স্পর্শকাতর যে পঁয়তাল্লিশ বছর পর এসে এই তালিকাটি করা কোনওভাবে সম্ভব না। একটি দেশের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গণহত্যার তালিকা এভাবে করা যায় না। আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বেশিরভাগ শহীদ হচ্ছেন অজ্ঞাতনামা শহীদ। হানাদার বাহিনী আর তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর-আল শামস বাহিনীর হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে পুরো পরিবারসহ তারা পথেঘাটে প্রাণ হারিয়েছেন! ভারতে শরণার্থী গিয়েছিলেন এক কোটির বেশি। তাদের কতজন ফিরেছেন? তাদের বেশিরভাগ শরণার্থী শিবিরগুলোয় রোগেশোকে প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের তালিকাটি এখন কী করে করা সম্ভব? বিএনপির কথা শুনতে গেলে তো সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধটিকেও ভেঙে গুড়িয়ে দিতে হয়। কারণ এই স্মৃতিসৌধটিই গড়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অজ্ঞাতনামা শহীদদের স্মৃতির সম্মানে। বিএনপি আবার ক্ষমতায় গেলে কি এই স্মৃতিসৌধ ভেঙে ফেলতে পারবে?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা প্রথম থেকে একটা কথা বলার চেষ্টা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতার পর ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শহীদের সংখ্যা তিন লাখ বলতে গিয়ে তিন মিলিয়ন বলে ফেলেছিলেন! বঙ্গবন্ধু তখন তথ্যটি নিয়েছিলেন ভারতীয় পত্রপত্রিকা, রাশিয়ার প্রাদভা থেকে। সে সব মিডিয়ায় বাংলাদেশের গণহত্যায় নিহতদের সংখ্যা তিন মিলিয়ন উল্লেখ করা হয়েছিল। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রবাহিনী বলেছিল নাৎসিদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিল ৬ মিলিয়ন মানুষ। কোনও জার্মান বা সভ্য বিশ্ব আজ পর্যন্ত সংখ্যাটি নিয়ে কি কোনও প্রশ্ন তুলেছে? বাংলাদেশের জন্মশত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে যে আমাদের সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে সে মুহূর্তে খালেদা জিয়ার মনে হঠাৎ প্রশ্নটি কেন উথাল-পাতাল মোচড় দিয়ে উঠলো?

অনেকে আইন করে খালেদা জিয়াকে থামাতে বলছেন। কিন্তু আমার মতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের একটি স্পর্শকাতর মীমাংসিত বিষয় নিয়ে ধৃষ্ট প্রশ্ন তুলে খালেদা জিয়া নিজের যে নতুন গর্ত খুঁড়েছেন সেখানে তিনি পড়বেনই! ২০০৮ সালের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি নির্বাচনি ম্যানিফেস্টোয় রাখাতে আওয়ামী লীগ সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে। আর খালেদা জিয়া উল্টো যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে নির্বাচন করাতে যে গর্তে পড়েছিলেন সেখান থেকে আজো উঠতে পারেননি! চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী একেকটার ফাঁসির পর বাংলাদেশ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজনের উল্লাস উৎসব হয়। আর খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার দলবল তখন মুখে তালা দিয়ে ঘরে ঢুকে যায়! বিএনপির স্থায়ী কমিটির যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির পর তার জন্যে বিএনপি একটা শোকও প্রকাশ করতে পেরেছে কি? তার আত্মার মাগফেরাত কামনায় স্থায়ী কমিটির সভায় মুনাজাত পর্যন্তও করা হয়েছে কি? শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে বিএনপি দলটি নৈতিকভাবে কোথায় তলিয়ে গেলো এ দলের নেতাকর্মী শুভান্যুধায়ীরা টের পাচ্ছেন কি? মুক্তিযুদ্ধের শহীদের ৩০ লাখের সংখ্যা নিয়ে বদমায়েশির মাশুলও কিন্তু এই দলটিকে কড়ায়-গণ্ডা দিতে হবে।

 লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ