Vision  ad on bangla Tribune

সিরিয়ার দুঃখ রজনীর অবসান হবে কবে?

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী১২:৩২, মার্চ ০৩, ২০১৬

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীবর্তমান বিশ্বে খুব নিকৃষ্টতমভাবে মানবতার বিপর্যয় ঘটেছে সিরিয়ায়। গত পাঁচ বছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছেন আর ১ কোটি ২০ লাখ লোক গৃহযুদ্ধের কারণে বাস্তুহারা হয়েছেন। ২০১১ সালে যখন আরব বসন্ত শুরু হয় তখন সিরিয়ায়ও প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছিলো। তিউনিশিয়া ও মিশরের বিক্ষোভের মতো সিরিয়ার বিক্ষোভ খুব দ্রুত মারমুখি রূপ নেয়নি। মিশরের হোসনে মোবারক বা তিউনিশয়ার বেন আলী খুব দ্রুত অপসারিত হয়েছিলেন। কিন্তু বাশার আল আসাদের কিছু জনভিত্তি ছিলো বলে তাকে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে তড়িৎ উৎখাত করা সম্ভব হয়নি।
ফেব্রুয়ারি মাসে যখন বিক্ষোভ আরম্ভ হয় তখন প্রেসিডেন্ট বাশার সুন্দর একটা সংস্কারেরও প্রস্তাব দিয়ে ছিলেন। বাশারের পিতা হাফেজ আল আসাদও দীর্ঘ ২৫ বছর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি কখনও ধর্মীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উত্থান সহ্য করতেন না। ইকওয়ানুল মুসলিমকে তিনি সিরিয়া ছাড়া করেছিলেন। ১৯২০ সালে ওসমানিয়া খেলাফতের অবসানের পর থেকে সিরিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিই রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলো। বাশার আল আসাদ তা অব্যাহত রেখেছেন। সিরিয়ার আয়তন ৭২ হাজার বর্গমাইল। লোক সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখ।
৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানেরা জেরুজালেম ও সিরিয়া বিজয়ের পর খলিফা ওমর বিজিত এলাকা সফর করেছিলেন। খ্রিস্টানদের বিশপ সাফ্রেনিয়াস বৃদ্ধ খলিফাকে দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। কারণ বৃদ্ধ খলিফা ওমর জীর্ণ পোষাক পরিহিত ছিলেন। এতোদিত বিশপ সাফ্রোনিয়াস তাদের শাসক হিরোফ্লিয়াসদেরকে দেখেছেন শ্রেষ্ঠ পোষাকে আবৃত। বিশপ তারপরে ওমরকে অনুসরণের অভিলাস ব্যক্ত করেছিলেন। বিশপের অনুসরণ জেরুজালেম ও সিরিয়ার সব লোকই মুসলমান হয়ে গিয়েছিলো।
সিরিয়ার অধিবাসীরা মুসলমান। সুন্নিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আর শিয়ারা সংখ্যালঘু। বাশার আল আসাদ শিয়া সম্প্রদায়ের লোক। বাশারের পিতা হাফেজ আল আসাদ ছিলেন প্রগতিশীল লোক তার উঠাবসা ছিলো রাশিয়াসহ সমাজতান্ত্রিক ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে। এ কারণে সৌদিসহ আরব রাষ্ট্রগুলো হাফেজ আল আসাদকে পছন্দ করতেন না। বাশার ক্ষমতায় এসে সে ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন।
আমেরিকা সিরিয়ার ওপর কখনও তুষ্ট ছিলো না। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর রাশিয়ার নৌঘাটি ক্রিমিয়া ইউক্রেনের অংশ হিসেবে স্বীকৃত হলে বাশার আল আসাদ সিরিয়ার সমুদ্র-উপকূলে নৌঘাঁটি স্থাপনের জন্য রাশিয়াকে জায়গা দিয়েছিলেন। এখন সিরিয়ার লাতাকানিয়ায় রাশিয়া বিরাট নৌ-বাহিনীর ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। বহিঃবিশ্বে এটিই রাশিয়ার একমাত্র নৌঘাঁটি।
২০১১ সালে আমেরিকা ও আরবে তার মিত্ররা বাশারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলো এবং এ জন্য তারা সব ধরনের ষড়যন্ত্র পাকাতেও কোনও দ্বিধা করেনি। কাতারের আল-জাজিরা টেলিভিশন তিলকে তাল বানিয়ে প্রচার করেছে ইচ্ছে মতো। তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার অর্থ-অস্ত্রসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিয়েছে সিরিয়ার আন্দোলনকারীদের। তাদের উৎসাহে সরকারি বাহিনীর একটা অংশ বাহিনী ত্যাগ করে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। তখন থেকেই গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হয়। সিরিয়ার সৈন্যবাহিনীতে সর্বমোট ৩ লাখ সৈন্য ছিলো। দেড় লক্ষ সৈন্যই সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের পরামর্শে সরকার পক্ষ ত্যাগ করেছিলো। সম্ভবতো পক্ষত্যাগী দেড় লক্ষ সৈন্যই সুন্নি মতাবলম্বী ছিলো। যার কারণে বাশার আল-আসাদকে পরবর্তী সময়ে সৈন্য বাহিনী নিয়ে আর উৎকণ্ঠায় ভুগতে হয়নি।

পরবর্তী সময়ে লেবালনের হিজবুল্লাহ্ গেরিলারা এসে সিরিয়ান বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় এবং বাশারের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করে। আফগানিস্তান থেকে শিয়াপন্থী মোজাহেদীনেরাও বাশার বাহিনীর সঙ্গে যোগদান করে। যে কারণে দেড় লক্ষ সৈন্য পক্ষ ত্যাগ করার পরও বাশারের বাহিনী রুগ্ন হয়ে পড়েনি। হিজবুল্লাহকে নিয়ে ইসরায়েল উদ্বিগ্ন। কারণ ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হিজবুল্লাহ্ এক বিরাট হুমকি। হিজবুল্লাহকে শায়েস্তা করার জন্য ইসরায়েল বাহিনী একবার লেবাননে প্রবেশ করতে চেয়েছিলো।
লেবানন সীমান্তের হিজবুল্লাহ্ বাধার কারণে প্রবেশ করতে তো পারেইনি বরং হিজবুল্লাহর রকেটের আঘাতে ইসরায়েল প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলো। ইসরায়েলের গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদ বিষয়টা তদন্ত করেছিলো এবং হিজবুল্লাহ্ উত্থানের পেছনে সিরিয়া ও ইরানের সম্পৃক্ততা পেয়েছিলো।
সিরিয়ায় হিজবুল্লাহর উপস্থিতির কারণে ইসরায়েলও বিদ্রোহীদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। গোলান এলাকায় আহত বিদ্রোহীদের চিকিৎসার জন্য এক হাজার শয্যার একটা আধুনিক হাসপাতাল তৈরি করেছে ইসরায়েল। বিদ্রোহীদেরকে ইসরায়েল অস্ত্র সাহায্যও করছে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের আখড়ায় পরিণত হয়েছে সিরিয়া। এখন ক্ষুদ্র বৃহৎ একশত বিদ্রোহী গ্রুপ আছে সিরিয়ায়।
গত সেপ্টেম্বর মাসের ৩০ তারিখ সিরিয়ার অনুরোধে রাশিয়া তাদের সাহায্য করতে এসেছে এবং গত পাঁচ মাস আকাশ পথে বোমবিং করে বিদ্রোহীদেরকে কোণ্ঠাসা করে ফেলেছে। রাশিয়ার আকাশ পথের অভিযান আর সিরিয়ান বাহিনীর স্থলভাগের অভিযান যদি সম্পূর্ণ সফল হয়ে যায় তবে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অবস্থান নাজুক হয়ে যাবে। সম্ভবতো সে বিষয়ে চিন্তা করে আমেরিকা যুদ্ধ বিরতির বিষয় নিয়ে সক্রিয় হয়েছে। জাতিসংঘ আমেরিকা এবং রাশিয়া যৌথভাবে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এনেছে। সিরিয়া এবং ইরানকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছে রাশিয়া আর তুরস্ক সৌদি আরব ও ইউরোপের অন্যান্য শক্তিকে বোঝানোর দায়িত্ব আমেরিকার। ২৬ ফেব্রুয়ারি (২০১৬) দিবাগত রাত ১২টা থেকে যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হয়েছে। আল-নূসরা ফ্রন্ট, আইএস, আহারার আল শামস যুদ্ধবিরতির কোনও পক্ষের অংশ নয় সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। ১০০ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে ৭৯টি গোষ্ঠী যুদ্ধ বিরতির পক্ষে রয়েছে।
কয়েকজন বিশ্লেষক বলছেন অসংখ্য খেলোয়াড়ের মধ্যে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হতে হয়তো পারবে না আর যুদ্ধবিরতি স্থায়ী না হলে তখন ভয়াবহ যুদ্ধ আরম্ভ হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছেই। এর চেয়ে ভয়াবহ কোনও যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আমেরিকায় এ বছর প্রেসিডেন্টে নির্বাচন। সুতরাং শেষ বছরে এসে বারাক ওবামা কোনও যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করবেন না। উপরন্তু আমেরিকার আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। তবে যুদ্ধ বিরতির পর ৭ মার্চ থেকে যে আলোচনার তারিখ স্থির হয়েছে সে আলোচনা সফল হবে কি না প্রশ্ন আছে। এতোদিন বিদ্রোহী গোষ্ঠী বাশারের পদত্যাগ ভিন্ন আলোচনায় বসতে সম্মত হয়নি। এখন বাশারের টিকে থাকা ও সফলতা দেখেই নিশ্চয়ই পদত্যাগের প্রশ্ন উত্থাপন না করে আলোচনায় বসতে তারা সম্মত হয়েছে। সুতরাং সফলতার ক্ষীণ আশা যে নেই তা নয়। তবে তুরস্ক, সৌদি আরব আর কাতার যদি ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে তবে আলোচনা ফলপ্রসূ হবে না। যুদ্ধই প্রলম্বিত হবে।
এ বিষয়টা নিয়ে জাতিসংঘ কোনও ভূমিকা রাখতে পারলে উত্তম হয়। সিরিয়া যুদ্ধের অবসান চাইলে আমেরিকাকেও আন্তরিক হতে হবে। ১ কেজি চালের জন্য সিরিয়ার মায়েরা সন্তান বিক্রি করছে। মানবতা এখানে পরাজিত হয়েছে। পরাজিত মানবতার পক্ষে ভূমিকা রাখা ধর্মবাদী আমেরিকার আশু কর্তব্য।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ