behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

একাত্তরের মার্চ: ঐক্য ও সাহসের প্রতীক

বিভুরঞ্জন সরকার১১:১৩, মার্চ ০৪, ২০১৬

বিভুরঞ্জন সরকারমার্চ মাস বাঙালির বিজয়ের মাস। সাহসের মাস, প্রতিবাদের মাস, প্রতিরোধের মাস। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসেই স্বাধীনতার পথে বাঙালির যাত্রা শুরু হয়েছিল। পঁচিশে মার্চের রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হঠাৎ আক্রমণে বাঙালি জাতি সাময়িকভাবে হতবিহ্বল হলেও ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে ভুল করেনি। আর এভাবেই নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে বিজয় ছিনিয়ে এনে বিশ্ববাসীকে অবাক করে দেওয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির মনে নিঃসন্দেহে বড় ঝড় তুলেছিল, বাঙালির মনে সুদূরপ্রসারী আলো ফেলেছিল। অবশ্য সে আলোয় আমরা কতটুকু আলোকিত হতে পেরেছি সেটাই এখন আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে এসেছে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের যে বিষয়টি আমাকে বেশি আলোড়িত করে সেটা হলো মানুষের মধ্যে ঐক্য এবং সাহস। যেটা এর আগে বা পরে আর কখনও দেখা যায়নি। মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামেই তখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, লড়াই করেছিল, জীবনবাজি রেখেছিল। সত্যি তখন ছিল- ‘এক নেতা, এক দেশ’। তখন অন্য রাজনৈতিক দলগুলো মানুষকে তেমন প্রভাবিত করতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধুর জীবনসংগ্রামই তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর তুলনায় ত্যাগী ও যোগ্য প্রার্থীদেরও মানুষ ভোট দেয়নি সম্ভবত একটি রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই যে, শেখ মুজিবকে ভোট না দিলে বাঙালি তার অধিকার পাবে না। মানুষের এই আস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। এখন এই যে, কার ডাকে মানুষ মুক্তিযুদ্ধে গেলো বা কে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক- এ নিয়ে যে বিতর্ক হয়, এটা একেবারেই অর্থহীন। একাত্তরে এ কথা কেউ বলেনি, এ প্রশ্ন কেউ তোলেনি। বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী আহ্বান ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবা’- এটাই ছিল তখন সবার কাছে বড় দিকনির্দেশনা। সেজন্য মানুষ দ্বিধাহীন চিত্তে তখন শেখ মুজিবকেই তাদের নেতা মেনে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তখন বরং যারা মুজিবের বিরোধিতা করেছে সাধারণ মানুষের হাতে তাদের নিগৃহীত হতে হয়েছে।
সাধারণ মানুষের বীরত্বগাথাকে সামনে না এনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটাকে কেউ কেউ সামরিক শক্তির জয়-পরাজয় বলে বিবেচনা করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধতো শুধু সেনাবাহিনী বা ইপিআরের কিছুসংখ্যক সদস্যের সঙ্গে পাকি বাহিনীর যুদ্ধ ছিলো না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের যুদ্ধ, জনযুদ্ধ। সাধারণ মানুষের সমর্থন এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই যুদ্ধে এত সহজে জয়লাভ সম্ভব ছিলো না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটাকে সামরিক যুদ্ধ হিসেবে দেখার ফলে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ, তাদের ভূমিকা, সক্রিয় অংশগ্রহণ সব আড়াল হয়ে যাওয়ার ফলটা ভালো হয়নি। মানুষ দেখলো যে, তার ভূমিকাটা ছিনতাই হয়ে গেছে। মানুষ যে আত্মত্যাগ করেছে, যে ভূমিকা রেখেছে তা ইতিহাসে স্থান পাচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পরবর্তী সময়ে মানুষের উৎসাহে ভাটা পড়ার এটা কি একটি বড় কারণ যে, মানুষ মনে করেছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সে লাঞ্ছিত হয়েছে, ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছে, অনেক নিকটজনকে হারিয়েছে, নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে- সে কথা কেউ বলছে না। শুধু অস্ত্র হাতে নিয়ে কয়েকজন যুদ্ধ করলো সেটাই বড় করে দেখা হচ্ছে?

আমরা সবাই জানি যে, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের শত্রু-মিত্র ছিল। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই। অথচ যুদ্ধপরবর্তী সময়ে আমরা শত্রু-মিত্রকে আলাদাভাবে বিচার করার চেষ্টা করি না। শত্রুর বিরুদ্ধে এবং মিত্রর পক্ষে আমাদের যেভাবে অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন, সেটা আমরা প্রায়ই নেই না। ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের সাহায্য করেছে। প্রায় এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্য দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে। ভারতীয় সৈন্যরাও অনেকে জীবন দিয়েছেন। কিন্তু সেজন্য এটা বলা যায় যে, ভারতে উস্কানিতেই সবকিছু হয়েছে। এ ধরনের সরল মন্তব্য ক্ষতিকর। আমাদের দেশের মানুষ নিজেরাই পরিবর্তনের দিকে এগিয়েছে। যে মানুষ সাতচল্লিশ সালে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল সেই মানুষ আবার আটচল্লিশে সালে ভাষার জন্য লড়াই শুরু করেছে। বায়ান্ন সালে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে। এই দেশের মানুষই চুয়ান্নর নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটিয়েছে, বাষট্টিতে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন করেছে। তারপর ছয় দফার মাধ্যমে স্বাধিকারের আন্দোলন শুরু হয়েছে, যে আন্দোলন ঊনসত্তর সালে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যার ফলে, সত্তর সালে পাকিস্তানি সামরিক গোষ্ঠী নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ধারাবাহিক এই আন্দোলন-সংগ্রামে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অংশ নিয়েছে। এর কোনও কিছুই তো ভারত এসে করে দেয়নি। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালিদের দাবিয়ে রাখার জন্য ভারতবিরোধিতা ছিল শাসক শ্রেণির একটি বড় হাতিয়ার। ভারতের প্রতি এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা ঐতিহাসিক কারণেই কিছুটা দ্বিধা-সংশয় ছিল না তাও নয়। সে অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ওপর অতিনির্ভরতা স্বভাবতই কারও কারও মনে হয়তো দ্বিধার জড়িয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত অবস্থান নিতে পেরেছিলেন কি-না সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

আজকের প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার জন্যই ভারত সম্পর্কে নানা অপপ্রচার করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানানোর পেছনে ভারতের নিশ্চয়ই কিছু রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষরাই শুরু করেছে। মানুষ পাকিস্তানি অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন থেকে বাঁচতে চেয়েছে এবং তাদের অপশাসন থেকে মুক্তি চেয়েছে। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই আন্দোলন শুরু হয়। যেটা পরে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করার পর আমরা ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছি। এটা যদি চীন বা অন্য কোনও রাষ্ট্র হতো তা হলে কি হতো তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া? সেটা আমরা ভেবে দেখি না। ভারতে তখন প্রায় এক কোটি লোক আশ্রয় নিয়েছিলো। ফলে, একটা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তারা আমাদের সহযোগিতা করেছে। ভারত তার নিজের স্বার্থেই পাকিস্তান ভেঙেছে বলে যারা প্রচার করেন তারা বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে খাটো করে দেখেন। ব্যাপক জনসমর্থন না থাকলে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করা যায় না। বাইরের কোনো শক্তির প্ররোচনায় এটা হয় না। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ তখন স্বাধীন রাষ্ট্র চেয়েছিলো। এটাই সব থেকে সত্যি কথা। ভারত এ ক্ষেত্রে কিছুটা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এর বেশি কিছু বলা মানে সেটা শুধু ভারতের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া নয়, স্বাধীনতার জন্য আমাদের দেশের মানুষের যে আকাক্সক্ষা সেটারও অবমূল্যায়ন করা। তবে এ কথা সত্য যে ভারত সরকার এবং সে দেশের জনগণ বাংলাদেশের মানুষের জন্য যে অবদান রেখেছেন, যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন- সে জন্য আমাদের তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে উপায় নেই।

এ প্রসঙ্গে এটাও জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন যে, একাত্তর সালে আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব মানুষের মনে সন্দেহাতীত ছিলো। সেই সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। একাত্তর সালে এ কথা কেউই বলেনি যে, শেখ মুজিব গ্রেফতার বরণ করলেন কেন? এ সব প্রশ্ন স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছড়ানো হয়েছে। আমাদের শত্রুপক্ষ জানতোই যে তারা পরাজিত হবে। তাই তারা একটা টার্গেট নিয়েই পরে মাঠে নেমেছিলো। তারা মনে মনে এটা স্থিরই করেছিলো যে, আমরা এখন পরাজিত হলাম। কিন্তু এই পরাজয়ের একটা প্রতিশোধ নিতে হবে। ফলে, তারা পরিকল্পিতভাবে তখন থেকেই অগ্রসর হয়েছে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তিটা ছিলো স্বতঃস্ফূর্ত। তাদের কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিলো না। অর্থাৎ যারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের কাছে এটা স্পষ্ট ছিলো না যে, দেশটা স্বাধীন হলে কি হবে বা কি করতে হবে। একটা জাতি নিরস্ত্র থাকা এবং সেই জাতির অস্ত্র পাওয়া, এই দুইয়ের মধ্যে যে তফাৎ সেটাও আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব উপলব্ধি করতে পারেনি বা বুঝতে পারেনি। মূলত নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।

বামদের একটা অংশ এবং মুসলিম লীগ বা জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করেছে। আবার যারা পক্ষে ছিলো তাদেরও স্বাধীনতার পর এক রাখা যায়নি। এর নানা কারণও আছে। অংশগ্রহণকারী সবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ছিল না। চাওয়ার-পাওয়ার হিসাবও ছিল ভিন্ন। তবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দূরদর্শী হলে এক্ষেত্রে একটি সমন্বয় ঘটানো অসম্ভব হতো না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে এক রাখা এবং সংহত করার কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগ ছিল না। উল্টো আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে জাসদ তৈরি হলো। অন্যদিকে যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেছে, তাদের কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। দালালদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে। যারা খুন, নারী ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগের মতো মারাÍক অপরাধ সংঘটিত করেছিল, তাদের বিচার করা হয়নি। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল। ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, যুদ্ধ করে আমরা জয়ী হয়েছি। আমাদের আর কোনও বিপদ নেই। কিন্তু একটা যুদ্ধের পর বিজয়কে ধরে রাখার কোনও পরিকল্পনা ছিল না। তখন মানুষের মনের মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটেছে সেটাকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে তা নিয়েও কোনও পরিকল্পনাই তখন করা হয়নি।

আমরা প্রায়ই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বা অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা যদি বলি। অথচ এগুলো যে রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়- সে সম্পর্কে আমরা কতটুকু সচেতন? পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে আমরা চব্বিশ বছর সাম্প্রদায়িক আবহ ও প্রচারণার মধ্যে ছিলাম। সেই সাম্প্রদায়িক অবস্থা থেকে মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাতারাতি অসাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে- এমনটা ভাবা ঠিক হয়নি। তখন একটি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এই সম্ভাবনাকে স্থায়ী ভিত্তি দেওয়ার জন্য নেতৃবৃন্দ কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেননি। পাকিস্তানি বাহিনী হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু হিন্দুদের মধ্যে সম্ভবত এমন ধারণা হয়েছিল যে, হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে তারাই বেশি। এর একটি কারণ সম্ভবত এই যে, ভারতে আশ্রিত এক কোটি শরণার্থীর মধ্যে নব্বই লাখই ছিল হিন্দু। দ্বিজাতিতত্ত্বকে বাতিল করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সর্বাÍক সমর্থন ও সহযোগিতা ইত্যাদি কারণে শরণার্থী শিবির থেকে প্রত্যাগত হিন্দুদের কেউ কেউ হয়তো আচার-আচরণে এমন ভাব দেখিয়েছিলেন যেটা দেশের ভেতরে অবস্থানকারী মুসলমানদের আহত করেছে। ওই সময় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল সেটা রাজনৈতিক নেতৃত্বের গোচরে আসেনি। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের আগে যেসব হিন্দু জায়গা-জমি বিক্রি করে ভারতে চলে গিয়েছিলেন স্বাধীনতার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগে তারা তাদের সম্পদ ফিরে পাওয়ার জন্য জোরজবরদস্তি করছে এমন প্রচারণাও কোথাও কোথাও মুসলমানদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা অস্থিরতার সৃষ্টি করেছিল। আবার বাহাত্তর সালেই দুর্গা পূজার সময় দেশের কয়েকটি স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা উদ্বিগ্ন করেছিল হিন্দুদের। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনাকালেই হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই যে সন্দেহ-অবিশ্বাসের সৃষ্টি করেছিল সে পথ ধরেই পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটছে কি-না সেটা একটি বড় গবেষণার বিষয় হতে পারে।

স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশের সংবিধানের মূলভিত্তি হিসেবে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র গ্রহণ করেই আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে, পাকিস্তানি ধ্যান-ধারণা ও আদর্শ থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। এ বিষয়গুলো মানুষ আÍস্থ করছে কি-না, প্রাত্যহিক জীবনাচরণে মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা করছে কি-না, সেটা আমরা তলিয়ে দেখিনি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সরকার এবং আওয়ামী লীগও সংবিধানের মূলনীতিগুলো ব্যবহারিক ক্ষেত্রে চর্চার তেমন উদ্যোগ নেয়নি। দলের নেতাকর্মীরা সংবিধানের মূলনীতিগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য দৃঢ় কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বাহাত্তর সালের শুরু থেকেই গ্রাম-গঞ্জ, শহরে মসজিদ-মাদ্রাসায় সংগঠিত হয়ে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা শুরু করে দিয়েছিল। তাদের এই সংগঠিত প্রচারণার খবরও হয়তো মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী শক্তির জানা ছিলো না। মানুষের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশের জন্য স্বাধীনতার পর যেসব উদ্যোগ গ্রহণের দরকার ছিলো, বিশেষত সাংস্কৃতিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনা দরকার ছিলো তার কোনোটাই তখন করা হয়নি। একদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করা হবে অন্যদিকে বলা হবে আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকশিত করবো- সেটা হয় না। নানা ক্ষেত্রেই অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ করা হয়েছে। এই অসঙ্গতিগুলোর পরিণতি হলো আজকের বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের পর ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হলেও পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার প্রবল হতে থাকে। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে, এখন আর কোনো রাজনৈতিক দলই ধর্ম-নিরপেক্ষতার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিতে চায় না। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে ভোট পাওয়ার জন্য ধর্মকে যথেচ্ছ ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না কেউই। ধর্ম ও রাজনীতির পৃথক অবস্থান এখন অনেকটাই যেন একাডেমিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ক্ষেত্রে শুধু আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করে লাভ নেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিরই এ ব্যাপারে ব্যর্থতা রয়েছে। শুধু আওয়ামী লীগের অনুদারতার সমালোচনা করে আÍসুখ লাভের চেষ্টা কেউ কেউ করতে পারেন, তাতে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। যুদ্ধোত্তর দেশে এবং পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাম প্রগতিশীল শক্তির নিজ নিজ ভূমিকারও পুনর্মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো কেন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারে না- সে প্রশ্নের জবাব না খুঁজে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা দেশকে ফিরিয়ে নিতে পারবো কী?

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ