ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যকে যুক্তি প্রদর্শনের একটি দুর্বল প্রচেষ্টা বলে মনে হয়।
মঙ্গলবার (২ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের সীমান্তের ‘জিরো পয়েন্টে’ না ঘটে থাকলে কোনও হত্যাকাণ্ড ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনের বিষয়।’’
মন্ত্রী নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী আইন, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স অ্যাক্ট, ১৯৬৮, যা এখনও কার্যকর রয়েছে। সীমান্তে অনুপ্রবেশ বা চোরাচালানের অভিযোগে কাউকে হত্যা করার অনুমতি দেয় না। সংবাদ সম্মেলনে তিনি যে ‘অন্যান্য অপরাধ’-এর কথা উল্লেখ করেছেন, তা এমন হতে হবে— যাতে সশস্ত্র সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা জনতা টহলরত কর্মকর্তা কিংবা অন্য ভারতীয় নাগরিকদের জন্য তাৎক্ষণিক গুরুতর শারীরিক ক্ষতির হুমকি সৃষ্টি করে; কেবল তখনই তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে।
বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স অ্যাক্ট ছাড়াও ভারতের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ আইনেও এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের কোনও সুযোগ নেই। ভারতের নতুন দণ্ডবিধি ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ২০২৪ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করে কোনও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা যদি কারও মৃত্যু ঘটান, তবে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা যেতে পারে।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিলটি হচ্ছে— ২০১১ সালের কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (সিবিএমপি), যা একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। এই চুক্তি অনুযায়ী, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) উভয়কেই নিরস্ত্র সীমান্ত লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কেবল অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, সব নিরস্ত্র অনুপ্রবেশকারীকে আটক করে অপরপক্ষের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে, তাদের ওপর গুলি চালানো যাবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব বিষয়ে কোনও উল্লেখ করেননি, বরং তিনি ‘সীমান্ত হত্যা’ শব্দবন্ধের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আর এ ক্ষেত্রে তিনি ঠিকই বলেছেন—‘সীমান্ত হত্যা’ শব্দটি প্রকৃতপক্ষে যথাযথ নয়। এর সঠিক পরিভাষা হবে নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের অবৈধভাবে হত্যা, যা একইসঙ্গে একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন।
আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর)-এর ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জীবনের অধিকার একটি পরম ও অখণ্ড অধিকার। ‘দেখামাত্র গুলি’ বা নিরস্ত্র ব্যক্তি, চোরাচালানকারী কিংবা অনিয়মিত প্রবেশকারীর বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ— তা সে নো-ম্যানস ল্যান্ডে হোক বা ভারতের অভ্যন্তরে—বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর তথ্য অনুযায়ী, বিএসএফের নথিভুক্ত অনেক অভিযানে এমন নিরস্ত্র গ্রামবাসী, চোরাচালানকারী কিংবা শিশুদের গুলি করা হয়েছে, যারা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনও ঝুঁকি ছিল না এবং কারও জীবনের জন্যও তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করেনি।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিশ্চয়ই জানা উচিত, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের একটি বড় কারণ সীমান্তে এসব হত্যাকাণ্ড। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে এ ধরনের নিহতের সংখ্যা ১৫০০-এরও বেশি, এবং শুধু ২০২৬ সালেই অন্তত ৯ থেকে ১১ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে।
দুই বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের সম্পর্ক যে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য, তা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়া প্রায় সবার কাছেই স্পষ্ট বলে মনে হয়। অথচ বিষয়টি তাঁর পেশাগত দায়িত্বের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করে এবং এ ক্ষেত্রে জনগণ যথার্থভাবেই তাঁর কাছ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ বা অন্তত একটি দৃঢ় অবস্থান প্রত্যাশা করতে পারে। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
বাংলাদেশে মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার সুরক্ষা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি মৌলিক সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব। নাগরিকদের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি বিজিবিসহ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে পরিচালনা করেন। বাংলাদেশি নাগরিকদের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলে এমন সব কার্যক্রম— সেগুলো কোনও বিদেশি সরকারের হাত দিয়ে হলেও — তা আইনের কঠোর আলোকে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, নিশ্চিত করা এই মন্ত্রণালয়ের বিশেষ দায়িত্ব।
কিন্তু যদি মন্ত্রীকে তাঁর নিজের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে বাংলাদেশের জনগণ নিশ্চয়ই তা করতে প্রস্তুত।








