বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাম্প্রতিক ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬’ বাংলাদেশের উন্নয়ন ও নারী অধিকারের প্রগতির মুখের ওপর এক বিশাল আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় যে ছবি ভেসে উঠেছে, তা আনন্দের নয়, বরং সংকোচ ও উদ্বেগের। এক বছর আগেই, অর্থাৎ ২০২৫ সালে বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতা সূচকে ২৪তম স্থানে থাকা বাংলাদেশ ২০২৬ সালে একলাফে ৫৫ ধাপ নিচে নেমে পৌঁছেছে ৭৯তম অবস্থানে। বিশ্বমঞ্চে লিঙ্গ সমতার সূচকে এটিই এবার যেকোনো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ও খাড়া পতন।
যে চার ক্ষেত্র—অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন; এর ওপর ভিত্তি করে এই সূচক তৈরি হয়, তার মধ্যে প্রধান দুটি স্তম্ভে ধস নামার কারণেই ঘটেছে এই বিপজ্জনক বিপর্যয়। প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: বাংলাদেশ কি তবে নারীর উন্নয়নকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাগজেই সীমাবদ্ধ রেখেছে, নাকি সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর গোড়ায় গলদ রয়ে গেছে?
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনে যে বিশাল ধসের কথা বলা হয়েছে, তার অন্যতম মূল অনুঘটক হলো ‘রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন’ (পলিটিক্যাল এমপাওয়ারমেন্ট) খাতে সূচকের করুণ অবস্থা। সংসদ বিলুপ্তির পর গঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল এই চিত্রকে নগ্ন সত্য হিসেবে তুলে ধরেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ নির্বাচনে মাত্র ৮৪ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, যা মোট প্রার্থীর হিসাব করলে সামান্য ৪ দশমিক ০৮ শতাংশ।
আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে সরাসরি নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসতে পেরেছেন মাত্র ৭ জন নারী। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে, বর্তমানে সেখানে নারীর উপস্থিতি নামমাত্র ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৪ শতাংশে ঝুলছে। ফলে বর্তমান সংসদে মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। সংসদে নারীদের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্বের এই ঐতিহাসিক পতন সংসদীয় ব্যবস্থার লিঙ্গ সমতা তথা ‘পার্লামেন্টারি জেন্ডার প্যারিটি’-কে এক চরম সর্বনিম্ন সূচকে নামিয়ে এনেছে। নীতি নির্ধারণের উচ্চতম টেবিলে নারীর কণ্ঠস্বর না থাকলে দেশের সামগ্রিক নীতিমালায় নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া যে অসম্ভব, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের সবচেয়ে ভঙ্গুর ক্ষেত্রটি হলো ‘অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ’ (ইকোনমিক পার্টিসিপেশন অ্যান্ড অপরচুনিটি)। ডব্লিউইএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্যের মাত্র ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ দূর করতে পেরেছে, অর্থাৎ বাকি ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ বৈষম্য আজও বিদ্যমান। শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শতভাগ অর্জনের পথে অনেকদূর হেঁটেছে; মাধ্যমিক ও প্রাথমিকে মেয়েদের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। তবে এই শিক্ষাগত অর্জনের সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতি বা জীবনের কোনো সুষম সেতু তৈরি হয়নি। উচ্চশিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। একে বলা যায় ‘শিক্ষাগত অর্জন বনাম রূপান্তরের সংকট’। মেয়েদের ডিগ্রি বাড়ছে, কিন্তু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে তার প্রতিফলন ঘটছে না।
এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ গৃহে নারীর অপরিশোধিত সেবামূলক কাজের (আনপেইড কেয়ার ওয়ার্ক) বোঝা। বাংলাদেশে একজন নারী প্রতিদিন ঘরের রান্নাবান্না, সন্তান লালন-পালন ও অন্যান্য কাজে গড়ে ৬ দশমিক ২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন; যেখানে একই পরিবারে পুরুষরা ব্যয় করেন মাত্র ১ দশমিক ৪ ঘণ্টা। এই চরম অসম গৃহস্থালি কাজের বোঝা এবং শ্রমবাজারে পুরুষের তুলনায় গড়ে ২২ থেকে ২৫ শতাংশ কম মজুরি পাওয়ায় নারীকে ঘরের বাইরে পূর্ণকালীন বা স্বাধীন পেশাগত ক্যারিয়ার গঠনে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথকে রুদ্ধ করতে আরও একটি অদৃশ্য অথচ প্রত্যক্ষ দেয়াল হিসেবে কাজ করছে ঢাকার গণপরিবহন ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার গণপরিবহন ব্যবহারকারী প্রায় ৭৯ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। এমনকি প্রতি ৬ জন নারীর একজন প্রতিদিন এ ধরনের কটু মন্তব্য, স্পর্শ বা যৌন হয়রানির মুখোমুখি হন। নিরাপত্তার এই সার্বক্ষণিক ভয় নারীদের ভৌগোলিক ও পেশাগত গতিশীলতাকে বন্দি করে ফেলে। বাধ্য হয়ে অনেক যোগ্য নারীও নিজেদের ঘরের কাছাকাছি বা হাঁটাপথের দূরত্বের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছেন, কিংবা অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সান্ধ্যকালীন বা রাতের শিফটের চাকরি প্রত্যাখ্যান করছেন। রাস্তায় নিরাপদে চলার অধিকার না থাকা মানে সরাসরি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া।
বাংলাদেশের নারী অধিকারের এই খাড়া নিম্নমুখী যাত্রার নেপথ্যে দুটি প্রধান সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ঘাতক কলকাঠি নাড়ছে; একদিকে গভীর পিতৃতান্ত্রিকতার মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ, অন্যদিকে উগ্র মৌলবাদী অপপ্রচার ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। আমাদের সমাজব্যবস্থা এমনভাবে পিতৃতান্ত্রিকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করেছে, যা নারীকে স্বাধীন সত্তার বদলে কেবল পুরুষের অধীনস্থ হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, কেবল পুরুষরা নন, পিতৃতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে অনেক নারীও অবচেতনভাবে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছেন। শৈশব থেকেই কন্যাসন্তানকে ‘পরের আমানত’ কিংবা ‘পারিবারিক সম্মানের প্রতীক’ বানিয়ে গৃহবন্দি মানসিকতায় বড় করার মাধ্যমে নারীরা নিজেরাই পিতৃতন্ত্রের নীরব বাহক হয়ে উঠছেন, যা তাঁদের আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়।
এর পাশাপাশি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর সংগঠিত ও আক্রমণাত্মক কৌশল। বিশেষ করে ধর্মীয় মাহফিল, ওয়াজ-মঞ্চ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে এরা ক্রমাগত নারীবিদ্বেষ ও কুৎসা ছড়াচ্ছে। নির্বাচন বা জাতীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এলেই এই কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সরব হয়।
প্রগতিশীল যেকোনও জাতীয় নারী নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেই এরা ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে তার বিরুদ্ধে উগ্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কখনও নারীদের কাজের কর্মঘণ্টা কমিয়ে বা তাদের নির্দিষ্ট গৃহস্থালি গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখার প্রস্তাব দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার পাঁয়তারা চালায়, আবার কখনো নারীকে ‘অন্তঃপুরচারিণী’ বানিয়ে মধ্যযুগীয় দাসত্বের সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। তাছাড়া ইন্টারনেট বা গণপরিসরে কোনো নারী সোচ্চার হলে কিংবা রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চাইলে তাকে সাইবার বুলিং, সংগঠিত ট্রলিং ও চরিত্রহননের (ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন) শিকার বানিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়। ফলে এই সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দুই ঘাতকের যৌথ চাপে বাংলাদেশে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ আজ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত।
ডব্লিউইএফ-এর ২০২৬ সালের সূচকে ৫৫ ধাপের পতন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি পরিসংখ্যানিক ধস নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ও সামাজিক প্রগতির এক বড় ধরনের সতর্কবার্তা। অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রবৃদ্ধি কখনোই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে পেছনে ফেলে টেকসই হতে পারে না।
মেয়েদের কেবল বিদ্যালয়ে পাঠানোই শেষ কথা নয়, শিক্ষা শেষে যেন তারা নিরাপদ কর্মপরিবেশ, গণপরিবহন, সমমজুরি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টেবিলে নিজেদের স্থান তৈরি করতে পারেন, তা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। রাজনীতির ময়দানে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক এবং কার্যকরী সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। উগ্র মৌলবাদী অপপ্রচার ও পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক প্রথাকে আইন ও সচেতনতার মাধ্যমে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই তার কাঙ্ক্ষিত উন্নত, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রের রূপ দেখতে চায়, তবে নারীকে ঘরের কোণে বন্দি রাখার মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসে তাঁদের সম-অধিকার ও পূর্ণ ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব লুইভিল, যুক্তরাষ্ট্র