গাণিতিক সূত্রে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবে কে

ড. মো. হাসিনুর রহমান খান
০৯ জুলাই ২০২৬, ২০:১৬আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ২০:১৬

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই অনিশ্চয়তার সর্বোচ্চ মঞ্চ। এখানে পরিসংখ্যান, ইতিহাস, র‌্যাংকিং কিংবা খেলোয়াড়দের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স— সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোনোটিই চূড়ান্ত নয়। একটি লাল কার্ড, একটি ইনজুরি, একটি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা একটি পেনাল্টি শুটআউট পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়— বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় তথ্য-উপাত্ত ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য চিত্র কি আগেভাগে আঁকা সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই গত ১০ জুন ২০২৬, বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আমি ১০৪টি ম্যাচের পূর্ণাঙ্গ পূর্বাভাস প্রকাশ করি। নতুন ৪৮ দলের বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকে শুরু করে রাউন্ড অব ৩২, রাউন্ড অব ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচের সম্ভাব্য ফলাফল ও সম্ভাব্য স্কোর সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই পূর্বাভাস অনুযায়ী, স্পেন এবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে এবং ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করবে। সম্ভাব্য সেমিফাইনালিস্ট হিসেবে আমি দেখিয়েছিলাম স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে।

আমার পূর্বাভাস কোনও একক গাণিতিক সূত্র বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফল নয়। এটি একটি সাবজেক্টিভ প্রবাবিলিটি-বেইজড এভিডেন্স সিথেসিস, যেখানে ফিফা ও ইএলও র‌্যাংকিং, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, অতীত বিশ্বকাপের ইতিহাস, দলগত ভারসাম্য, খেলোয়াড়দের মান, সম্ভাব্য নকআউট ড্র এবং বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ— সবকিছু একত্রে বিবেচনা করা হয়েছে। তবুও ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ চলকের তথ্য কখনও আমাদের হাতে থাকে না। খেলোয়াড়ের মানসিক অবস্থা, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ, ইনজুরি, রেফারিং সিদ্ধান্ত কিংবা ভাগ্যের ছোট ছোট ঘটনাও ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আর সে কারণেই পরিসংখ্যানিক কিংবা গাণিতিক মডেলগুলো কখনোই শতভাগ সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারে না। অর্থাৎ, ম্যাচের ফলাফল বা বিভিন্ন দলের জয়ের কনডিশনাল প্রবাবিলিটি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ওইসব অজানা চলকের প্রভাব মডেলে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয় না। এ প্রসঙ্গে পরিসংখ্যানবিদ জর্জ বক্সের বিখ্যাত উক্তিটির কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—‘‘সব মডেলই ভুল, কিন্তু কিছু মডেল অত্যন্ত কার্যকর।’’

যথাযথ তথ্য-উপাত্তের অভাবে যে নিখুঁত মডেলিং কখনোই সম্ভব নয়, এই বিশ্বকাপে ঘটে যাওয়া কিছু অঘটন আবারও সেটিই প্রমাণ করলো। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তথ্যভিত্তিক পূর্বাভাসের মূল্য নেই। বরং দেখা যায়, তথ্য-উপাত্ত, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণের সমন্বয়ে তৈরি মডেলগুলোই তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হয়। আমার ব্যক্তিগত পূর্বাভাসও সেই ধরনের একটি প্রচেষ্টা, যেখানে পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের পাশাপাশি ফুটবলের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নকে একত্রে বিবেচনা করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মতো অনিশ্চয়তাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় কোনও মডেলই নিশ্চিত ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে না; তবে বিদ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে যৌক্তিক সম্ভাব্য চিত্রটি তুলে ধরতে পারে।

এই পূর্বাভাস প্রকাশের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। এর প্রধান কারণ, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই আমি আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সকে ফাইনালিস্ট এবং আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে পূর্বাভাস দিয়েছিলাম— যা পরবর্তীকালে শতভাগ সঠিক প্রমাণিত হয়। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই ২০২৬ সালের পূর্বাভাসও স্বাভাবিকভাবেই অনেকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখন বিশ্বকাপ রাউন্ড অব ১৬ শেষ করে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ৪৮ দলের লড়াই নেমে এসেছে শেষ আট দলে। ফলে টুর্নামেন্টের প্রথম দুটি ধাপ এবং দুটি নকআউট রাউন্ড শেষে আমার ১০ জুন প্রকাশিত পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পূর্বাভাসটি ডাউনলোড করা যাবে সরাসরি এই লিংক থেকে, https://isrt.ac.bd/wp-content/uploads/2026/06/prediction-final-Hasinur-v3.pdf.

প্রথম রাউন্ডের ৭২টি ম্যাচ শেষে দেখা যায়, ম্যাচের ফলাফল পূর্বাভাসের সফলতার হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ ৭২টি ম্যাচের মধ্যে ৪৩টি ম্যাচের ফলাফল সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব হয়েছে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— ৬টি ম্যাচের ফলাফল ও স্কোর উভয়ই হুবহু মিলে গেছে, যা মোট ম্যাচের ৮.৩ শতাংশ। শুধু ম্যাচের ফল নয়, টুর্নামেন্টের গোলসংখ্যার পূর্বাভাসও বাস্তবতার খুব কাছাকাছি ছিল। আমার পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রথম রাউন্ডে প্রতি ম্যাচে গড়ে ৩.০৭টি গোল (মোট ২২১টি) হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে হয়েছে প্রতি ম্যাচে ২.৯৯টি গোল (মোট ২১৫টি)। অর্থাৎ সামগ্রিক গোলসংখ্যার ক্ষেত্রেও পূর্বাভাস এবং বাস্তব ফলাফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়। প্রথম রাউন্ড শেষে কোন ৩২টি দল রাউন্ড অব ৩২-এ উঠবে, সে বিষয়েও পূর্বাভাসের সফলতার হার ছিল ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ৩২টি দলের মধ্যে ২৫টি দল সঠিকভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

রাউন্ড অব ৩২ শেষে কোন ১৬টি দল রাউন্ড অব ১৬-এ উঠবে— সে বিষয়ে আমার পূর্বাভাসের সফলতার হার ছিল ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ ১৬টি দলের মধ্যে ১১টি দলের বিষয়ে (ফ্রান্স, মরক্কো, স্পেন, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, নরওয়ে, মেক্সিকো, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, সুইজারল্যান্ড এবং পর্তুগাল) সঠিকভাবে পূর্বাভাস দিতে পেরেছিলাম। এরপর রাউন্ড অব ১৬ শেষে কোন ৮টি দল কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবে— সে ক্ষেত্রেও পূর্বাভাসের সফলতার হার আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা ৮টি দলের মধ্যে ৬টি দল ফ্রান্স, মরক্কো, স্পেন, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনা— আমার ১০ জুন প্রকাশিত পূর্বাভাসের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। কেবল ব্রাজিল ও পর্তুগালের পরিবর্তে বাস্তবে নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— আমার পূর্বাভাস অনুযায়ী সম্ভাব্য দুই ফাইনালিস্ট— স্পেন ও আর্জেন্টিনা এখনও টুর্নামেন্টে টিকে রয়েছে। একইভাবে সম্ভাব্য চার সেমিফাইনালিস্টের মধ্যে তিনটি দল (স্পেন, ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা) এখনও শিরোপার লড়াইয়ে রয়েছে।

এক নজরে পূর্বাভাসের পারফরম্যান্স, মূল্যায়নের ক্ষেত্রফলাফল

প্রথম রাউন্ডে ম্যাচের ফলাফল সঠিক ৪৩/৭২ (৬০ শতাংশ), স্কোরসহ হুবহু মিলেছে, ৬/৭২ (৮.৩ শতাংশ), রাউন্ড অব ৩২-এ উত্তীর্ণ দল নির্বাচন, ২৫/৩২ (৭৮শতাংশ), রাউন্ড অব ১৬-এ উত্তীর্ণ দল নির্বাচন ১১/১৬ (৬৯ শতাংশ), কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তীর্ণ দল নির্বাচন ৬/৮ (৭৫শতাংশ), সম্ভাব্য ফাইনালিস্ট এখনও টিকে আছে ২/২ (স্পেন, আর্জেন্টিনা), সম্ভাব্য সেমিফাইনালিস্ট এখনও টিকে আছে ৩/৪ (স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স)।

এই মূল্যায়ন শুধুমাত্র টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই স্কোরসহ প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ পূর্বাভাসগুলোর সঙ্গে তুলনাযোগ্য। কারণ, টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পরে প্রতিটি রাউন্ড শেষে নতুন তথ্য যুক্ত হয়— খেলোয়াড়দের বর্তমান ফর্ম, ইনজুরি, সাসপেনশন, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ, এমনকি পুরো নকআউট ড্রও তখন স্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে সেই পর্যায়ে নতুন করে পূর্বাভাস দেওয়া তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ। তাই টুর্নামেন্ট-পরবর্তী সংশোধিত পূর্বাভাসের সঙ্গে টুর্নামেন্ট-পূর্ব পূর্ণাঙ্গ পূর্বাভাসের সরাসরি তুলনা বৈজ্ঞানিকভাবে ন্যায্য নয়। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে করা পূর্বাভাসের অনিশ্চয়তা এবং তথ্যের সীমাবদ্ধতা অনেক বেশি; তাই এই দুই ধরনের পূর্বাভাসের মধ্যে একটি মৌলিক গুণগত পার্থক্য রয়েছে।

অবশ্য বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় বিস্ময়ের শেষ নেই। আমার পূর্বাভাস অনুযায়ী জার্মানি, ক্রোয়েশিয়া ও মেক্সিকোর মতো শক্তিশালী দল রাউন্ড অব ১৬ থেকেই বিদায় নিয়েছে। একইভাবে রাউন্ড অব ৩২ থেকেই জাপান ও নেদারল্যান্ডসের বিদায়ের পূর্বাভাসও বাস্তবতার সঙ্গে মিলে গেছে। অন্যদিকে পর্তুগালের বিদায়ের পূর্বাভাস আমি কোয়ার্টার ফাইনালের জন্য দিয়েছিলাম,  অন্যদিকে ব্রাজিলের দিয়েছিলাম সেমিফাইনাল থেকে, কিন্তু বাস্তবে তারা রাউন্ড অব ১৬ থেকেই বিদায় নিয়েছে। আবার নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড আমার প্রত্যাশার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে এবারের আসরের অন্যতম বড় চমক সৃষ্টি করেছে। এই ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনাই বিশ্বকাপকে অন্য সব টুর্নামেন্ট থেকে আলাদা করে।

রাউন্ড অব ১৬ পর্যন্ত এসে আমার ১০ জুন প্রকাশিত পূর্বাভাসের মূল কাঠামো এখনও যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে টিকে রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত একটি পূর্বাভাসের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে সেমিফাইনাল ও ফাইনালের ফলাফলের মাধ্যমে। বিশ্বকাপ ফুটবলকে বলা হয় অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। তবুও ইতিহাস, পরিসংখ্যান, বিশ্ব র‌্যাঙ্কিং, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং নকআউট পর্বের সম্ভাব্য পথ বিশ্লেষণ করলে কিছু দল অন্যদের তুলনায় স্পষ্টভাবেই এগিয়ে থাকে। রাউন্ড অব ১৬ শেষে যে আটটি দল কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে, তাদের পারফরম্যান্স, আক্রমণ-রক্ষণ ভারসাম্য এবং পরিসংখ্যানগত সূচক বিশ্লেষণ করলে চারটি দল অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে—স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড।

১০ জুন প্রকাশিত আমার পূর্ণাঙ্গ পূর্বাভাসেও সম্ভাব্য সেমিফাইনালিস্ট হিসেবে ছিল স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। বাস্তবে ব্রাজিলের পরিবর্তে নরওয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে এলেও পূর্বাভাসের বাকি তিনটি দল এখনও টিকে রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় ব্রাজিলের জায়গায় ইংল্যান্ডকে রাখলে শেষ চারের সম্ভাব্য চিত্রটি আরও শক্তিশালী বলে মনে হয়।

১০ হতে ১৪ জুলাই হতে যাওয়া কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স ও মরক্কোর ম্যাচটি নিঃসন্দেহে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হতে যাচ্ছে। একদিকে ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা, গতিময় আক্রমণ, কৌশলগত ভারসাম্য ও বড় ম্যাচ জয়ের সক্ষমতা; অন্যদিকে মরক্কোর দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাস, সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং অঘটন ঘটানোর মানসিক শক্তি— সব মিলিয়ে ম্যাচটি হবে রোমাঞ্চকর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ফ্রান্স পরিসংখ্যান ও শক্তির বিচারে এগিয়ে থাকলেও মরক্কোকে অবমূল্যায়ন করার সুযোগ নেই; কারণ তারা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, সাহস, শৃঙ্খলা ও দলগত দৃঢ়তা দিয়ে বড় দলকেও চাপে ফেলা যায়। এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারাতে পারে এমন দুটি দল হল মরক্কো এবং স্পেন| ফলে ফ্রান্স এই যাত্রায় আটকেও যেতে পারে| আর যদি আটকে না যায় তাহলেও সেমি ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজিত হতে পারে|

স্পেন-বেলজিয়াম, আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড এবং নরওয়ে-ইংল্যান্ড— তিনটি কোয়ার্টার ফাইনালই ভিন্ন ভিন্ন কারণে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হবে। স্পেন ও বেলজিয়ামের ম্যাচে দেখা যাবে টেকনিক্যাল পজেশন ফুটবল বনাম দ্রুত আক্রমণাত্মক ফুটবলের লড়াই; স্পেন মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ও দলগত ভারসাম্যে এগিয়ে থাকলেও বেলজিয়ামের কাউন্টার অ্যাটাক বিপজ্জনক হতে পারে। আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড ম্যাচে আর্জেন্টিনা অভিজ্ঞতা, মানসিক দৃঢ়তা ও নকআউট ফুটবলের দক্ষতায় এগিয়ে থাকবে, তবে সুইজারল্যান্ডের সংগঠিত রক্ষণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ খেলা ম্যাচটিকে কঠিন করে তুলতে পারে। অন্যদিকে নরওয়ে-ইংল্যান্ড ম্যাচে নরওয়ের আত্মবিশ্বাস, শক্তিশালী আক্রমণ ও ব্রাজিলকে হারানোর প্রেরণা বড় ফ্যাক্টর হলেও ইংল্যান্ডের স্কোয়াড গভীরতা, গতি, সেট-পিস শক্তি এবং বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা তাদের সামান্য এগিয়ে রাখবে। মোটের ওপর, তিনটি ম্যাচই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, তবে সম্ভাবনার বিচারে স্পেন, আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডকে সামান্য এগিয়ে রাখা যায়।

আমার বিশ্লেষণে প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি স্পেন ও ফ্রান্সের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনের বল দখলভিত্তিক ফুটবল, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলা তাদের অন্যতম বড় শক্তি। অন্যদিকে ফ্রান্স এখনও বিশ্বের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর একটি। তবে পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের ধারাবাহিকতা, আক্রমণ ও রক্ষণের ভারসাম্য এবং কৌশলগত পরিপক্বতা তাদেরকে সামান্য এগিয়ে রাখে।

অন্য সেমিফাইনালে সম্ভাব্য লড়াই আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা বড় ম্যাচে নিজেদের মানসিক দৃঢ়তা, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং নকআউট ফুটবলে অভিজ্ঞতার কারণে এখনও অন্যতম শক্তিশালী দল। যদিও রান অফ ৩২ এ কেপ ভারদে এবং রাউন্ড অফ ১৬ তে মিশরের সাথে নাটকীয় জয়ের মাধ্যমে কোয়ার্টার ফাইনালের রাস্তা পরিষ্কার করেছে। অপরদিকে ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ, বিশেষ করে বড় সুযোগ তৈরির ক্ষমতা, এবারের বিশ্বকাপে অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে। তবে নকআউট পর্যায়ে অভিজ্ঞতা এবং কঠিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতায় আর্জেন্টিনা এখনও বেশ এগিয়ে বলে আমার মূল্যায়ন।

এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গাণিতিক সম্ভাবনা, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, দলগত ভারসাম্য এবং নকআউট অভিজ্ঞতা—সবকিছু একত্রে বিবেচনা করলে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে সম্ভাব্য ফাইনাল স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা। স্পেনের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো তাদের অসাধারণ দলগত সমন্বয়, গভীর স্কোয়াড, মাঝমাঠের আধিপত্য এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বড় ম্যাচে নিজেদের সেরাটা বের করে আনার ক্ষমতা, ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা এবং জয়ের মানসিকতা। অন্যদিকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলও শেষ চারে থাকার মতো সামর্থ্য রাখে, কিন্তু ফাইনালে পৌঁছাতে তাদেরকে তুলনামূলকভাবে আরও কঠিন বাধা অতিক্রম করতে হবে।

অবশ্য ফুটবল কখনও কেবল গাণিতিক সমীকরণ মেনে চলে না। ইনজুরি, লাল কার্ড, পেনাল্টি শুটআউট কিংবা মুহূর্তের একটি সিদ্ধান্ত পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। তাই এই পূর্বাভাস কোনও নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়; বরং বিদ্যমান তথ্য, পরিসংখ্যান এবং সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে সবচেয়ে যৌক্তিক দৃশ্যপট।

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে ফাইনালিস্ট ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সঠিকভাবে পূর্বাভাস দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। এবারও কি সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে? স্পেন কি সত্যিই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে? আর্জেন্টিনা কি আবারও ফাইনালে উঠবে? প্রবল সম্ভাবনাময়ী ফ্রান্সও কি ফাইনালে? চ্যাম্পিয়ন হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে আগামী কয়েকটি ম্যাচেই। পরিসংখ্যান নিশ্চিত ভবিষ্যৎ বলে না; এটি সম্ভাবনার সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়। এখন সেই সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষা।

লেখক: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড স্ট্যাটিস্টিক্স অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
একই সঙ্গে ৩ জেলায় কর্মরত ডাক্তার, ঘুষ নিতে গিয়ে ফাঁস জালিয়াতি
একই সঙ্গে ৩ জেলায় কর্মরত ডাক্তার, ঘুষ নিতে গিয়ে ফাঁস জালিয়াতি
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সরোয়ার আলমগীরই হলেন চট্টগ্রাম-২ আসনের এমপি
সরোয়ার আলমগীরই হলেন চট্টগ্রাম-২ আসনের এমপি
ব্র্যাক ব্যাংকের রিটেইল ডিপোজিটে ৫০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক
ব্র্যাক ব্যাংকের রিটেইল ডিপোজিটে ৫০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক
সর্বশেষসর্বাধিক