খাবারই ছিল পেশা এখন সেই খাবারেই লড়াই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৭ জুন ২০২৬, ০৭:০০আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ০৭:০০

খাবার একসময় ছিল তার পেশা। এখন সেই খাবারই হয়ে উঠেছে তার শরীর ও মানসিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। মাধুরী লাহিরি, যিনি অনলাইনে ম্যাডিইটস নামে পরিচিত, সাত বছর ধরে মুকবাং, যা ক্যামেরার সামনে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত, কনটেন্ট তৈরি করে গড়ে তুলেছেন বিশাল দর্শকগোষ্ঠী ও জনপ্রিয়তা। ইউটিউবে তার ফলোয়ার সংখ্যা ৬০ লাখের বেশি। বার্গার, বিরিয়ানি, ফ্রাইড চিকেন থেকে শুরু করে ঘরোয়া রান্না বিভিন্ন ধরনের বিপুল পরিমাণ খাবার ক্যামেরার সামনে খাওয়াই ছিল মাধুরী লাহিরির নিয়মিত কাজ। তবে এই জনপ্রিয়তার আড়ালে ছিল শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের জটিল লড়াই।

মাধুরী জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি কিছুটা স্থূলকায় ছিলেন। তবে আগে ডায়েট এবং জিম করে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতেন। কিন্তু একটা সময় পর শরীর আর সাড়া দিচ্ছিল না। ডায়েট ও ব্যায়ামের পরও তার ওজন ৬৫ কেজির নিচে নামছিল না, যা তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছিল। বিভিন্ন পরীক্ষায় বড় কোনও শারীরিক জটিলতা ধরা না পড়লেও তার ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ধরা পড়ে। শেষ পর্যন্ত ৩২ বিএমআই নিয়ে তিনি মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক তাকে মৌনজারো  বা টিরজেপাটাইড নেওয়ার পরামর্শ দেন, যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ওজন কমানোর ওষুধ হিসেবে ব্যাপক আলোচিত।

মুকবাং কনটেন্টের অদৃশ্য চাপ

দক্ষিণ কোরিয়ায় শুরু হওয়া এই মুকবাং সংস্কৃতি এখন বিশ্বজুড়ে একটি লাভজনক কনটেন্ট ক্যাটাগরি। ভারতে ২০২১ সালের দিকে এর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছায়। তবে থাম্বনেইলে যতটা আকর্ষণীয় দেখায়, নির্মাতাদের বাস্তব জীবন ততটা গ্ল্যামারাস নয়। মাধুরী তার ওজন বৃদ্ধির জন্য পুরোপুরি মুকবাংকে দায়ী না করলেও, সাত বছর ধরে মাসে প্রায় আট দিন অতিরিক্ত খাওয়ার পেশাগত অভ্যাস তার মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে। 

তিনি জানান, মুকবাংয়ের ভিডিও করার পরের দিনও তার অতিরিক্ত খাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা হতো। গবেষকরাও মনে করেন, এই সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি করে এবং স্বাভাবিক খাবারের পরিমাপ সম্পর্কে ধারণা বদলে দেয়।

ক্ষুধার তাড়না যেভাবে কমিয়ে দেয় মাউনজারো

মাধুরীর মতে, মাউনজারো গ্রহণের পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ক্ষুধার তাড়না কমে যাওয়া। আগের মতো খাবার নিয়ে মানসিক চাপ বা ক্রেভিং আর কাজ করে না। গত আড়াই মাস ধরে তিনি এই ওষুধ ব্যবহার করছেন। এই সময়ে তার ওজন প্রায় ৬ কেজি কমে ৭০ কেজি থেকে ৬৪ কেজিতে নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওজেম্পিক বা মৌনজারো ব্যবহারকারীদের ১৫-২০ কেজি ওজন কমানোর যে গল্প দেখা যায়, সেই তুলনায় মাধুরীর ৬ কেজি ওজন কমানোকে সামান্য মনে হতে পারে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, জৈবিক ও জিনগত কারণে সবার শরীর এই ওষুধে একইভাবে সাড়া দেয় না।

মাধুরী নিজেকে একজন স্লো রেসপন্ডার মনে করলেও এই ওষুধকে তার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। কারণ এটি তাকে ক্যালোরি ঘাটতি বজায় রাখতে ও ডায়েটের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।

মাধুরী লাহিড়ীর আগের ও পরের ছবি

ওষুধের মধ্যেও মুকবাং চালিয়ে যাওয়ার কঠিন বাস্তব

ওজন কমানোর ওষুধ নেওয়ার পরও মাধুরী প্রতি সপ্তাহে মুকবাং ভিডিও আপলোড করা বন্ধ করেননি, কারণ এটিই তার জীবিকা। তবে ক্ষুধা মন্দা তৈরি করার এই ওষুধটি এখন তার পেশাকে কঠিন করে তুলেছে। আগে যেখানে তিনি এক বসায় সব খাবার শেষ করতে পারতেন, এখন দ্রুত পেট ভরে যাওয়ার কারণে তাকে মাঝেমধ্যে বিরতি নিতে হয়। মাধুরী অকপটে স্বীকার করেন যে, সপ্তাহে দুবার মুকবাং করা তার ওজন কমানোর প্রক্রিয়াকে শতভাগ ধীর করে দিচ্ছে, কিন্তু আয়ের স্বার্থে তিনি এটি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেউ শেয়ার করে না

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ওষুধের কেবল জাদুকরী রূপ দেখানো হলেও এর কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। মাধুরীর ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে ইনজেকশন নেওয়ার পর কোষ্ঠকাঠিন্য, হালকা মাথা ঘোরা এবং বমি বমি ভাব দেখা দেয়। মৌনজারোর সক্রিয় উপাদান তিরজেপাটাইডের সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মাধুরীর এই অভিজ্ঞতাগুলো মিলে যায়।

মাধুরী বলেন, আমি এখন হালকা অনুভব করি। মনে হয় আরও কয়েক মাস চেষ্টা করলে আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে, এটি কোনও মিরাকল ড্রাগ নয়। ওষুধের পাশাপাশি ডায়েট, ব্যায়াম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

মাধুরী এবং তার স্বামী ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এজন্য তিনি চিকিৎসকের পরামর্শও নিয়েছেন। গর্ভধারণের পরিকল্পনার আগে কিছু সময়ের জন্য তাকে ওষুধ বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে তার লক্ষ্য একটাই আরও স্বাস্থ্যকর হওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং খাবারের ওপর মানসিক নির্ভরতা কমানো। যে পেশা একসময় ছিল তার পরিচয়ের কেন্দ্র, সেই পেশার সঙ্গেই এখন তার শরীর ও মনের সবচেয়ে জটিল লড়াই চলছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

/এএস/
সম্পর্কিত
ইরানমুখী জাহাজে মার্কিন হামলা
কৃষকদের হয়রানির বিষয়ে জানতে চাওয়ায় সাংবাদিকের ওপর চটে গেলেন খাদ্য নিয়ন্ত্রক
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বশেষ খবর
তাপপ্রবাহের মাঝেই বৃষ্টির বার্তা, ভিজতে পারে যেসব এলাকা
তাপপ্রবাহের মাঝেই বৃষ্টির বার্তা, ভিজতে পারে যেসব এলাকা
টিভিতে আজকের খেলা (৯ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা (৯ জুন, ২০২৬)
ইউএনডিপির সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরও জোরদারের আহ্বান আইজিপির
ইউএনডিপির সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরও জোরদারের আহ্বান আইজিপির
নাগরিক সেবায় অবহেলা করলে চাকরিচ্যুতিসহ কঠোর ব্যবস্থা: ডিএসসিসি প্রশাসক
নাগরিক সেবায় অবহেলা করলে চাকরিচ্যুতিসহ কঠোর ব্যবস্থা: ডিএসসিসি প্রশাসক
সর্বাধিক পঠিত
হোটেলে ইউপি সদস্যের লাশ, কীভাবে মৃত্যু হলো জানালেন সেই নারী
হোটেলে ইউপি সদস্যের লাশ, কীভাবে মৃত্যু হলো জানালেন সেই নারী
কবর খুঁড়তে গিয়ে প্রাণ হারালেন ২ জন
কবর খুঁড়তে গিয়ে প্রাণ হারালেন ২ জন
শতাব্দীর দীর্ঘতম সূর্যগ্রহণের অপেক্ষায় বিশ্ব
শতাব্দীর দীর্ঘতম সূর্যগ্রহণের অপেক্ষায় বিশ্ব
এনআইডি’র স্মার্টকার্ড প্রকল্প শেষ হচ্ছে নভেম্বরে 
এনআইডি’র স্মার্টকার্ড প্রকল্প শেষ হচ্ছে নভেম্বরে 
রাতে একই জায়গায় ৩ বার ভূমিকম্প
রাতে একই জায়গায় ৩ বার ভূমিকম্প