X
মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১, ৭ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

আলথুসার : পাঠ-প্রতিক্রিয়া

আপডেট : ০৭ মে ২০২০, ১৪:৫৬

কোনো ইউরোপীয় দার্শনিকের দর্শনকে পটভূমির কেন্দ্রে রেখে সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে উপন্যাস রচনা বাংলা সাহিত্যে ইতোপূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি। কবি, অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন-এর আলথুসার সেই অর্থে বাংলা সাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী প্রয়াস। ফরাসী দার্শনিক আলথুসার (১৯১৮-১৯৯০) বিংশ শতাব্দীর একজন আলোচিত দার্শনিক যিনি মার্ক্সীয় দর্শনচর্চায় নতুন কিছু বিতর্ক নিয়ে আলোচিত হয়ে ওঠেন বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বাংশ যখন জার্মানদের দখলে ছিলো তখন জার্মান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে কমিউনিস্ট সহবন্দিদের প্রভাবে আমূল পরিবর্তনবাদী চিন্তাধারার সংস্পর্শে আসা আলথুসার পরবর্তিতে ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন, সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির নেতাও হন। ফরাসি দার্শনিক সার্ত্রে, বাঁদিও, ফুকো, দেরিদা ও লাকা’র মত তিনিও প্যারিসের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইএনএস (École normale supérieure)-এর ছাত্র ও পরবর্তীতে শিক্ষক ছিলেন। প্রথম দিকে লাকা প্রভাবিত এই দার্শনিক নিজেই পরে প্রভাবিত করেছেন দেরিদা ও ফুকোর মতো দার্শনিকদের। বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে রচিত এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু, গল্প-কাঠামো ও বর্ণনায় আলথুসারীয় দর্শন, এর সীমাবদ্ধতা এবং তার আত্মজীবনীর নির্যাস নিংড়ে উঠে আসা ব্যক্তি-জীবনের চুম্বকাংশ স্থান পেয়েছে। শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে, বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য জীবনকাহিনিভিত্তিক উপন্যাসের মতো আলথুসারের জীবন-কাণ্ড অনুগামী কোনো ডালপালা বিস্তার করেনি এই উপন্যাসের পটভূমিতে। সেদিক থেকেও এটি একটি ভিন্ন অভিজ্ঞান যা প্রায় সকল আঙ্গিকেই নতুনত্বের দাবি রাখে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বায়ো-ডাইভার্সিটি, ক্ষমতা, ভূ-রাজনীতি, প্রেম, যৌনতা, পরিবার, ধর্ম, মার্ক্সবাদ সর্বোপরি ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসারের রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ বিষয়ক জটিল-গভীর বিষয় নিয়ে সাবলীল ভাষায়, বিস্তীর্ণ পাঠ-আকর্ষণ ধরে রেখে নতুন এক ধরণের ভাষা শৈলী নির্মাণের ভেতর দিয়ে এই উপন্যাস লেখা হয়েছে। প্রথমা প্রকাশনী থেকে  ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি মোট আটটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত।

প্রায় সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের মতো বাংলা সাহিত্যে আর কোনো উপন্যাস নেই যেখানে প্রকৃতপক্ষে লেখক নিজে ছাড়া আর কোনো বাঙালি চরিত্রের সেই অর্থে কোনো বড় ভূমিকা আছে। বরং কেন্দ্রীয় চরিত্রে এক বাঙালি ব্যাংকারকে রেখে এক্সটিংকশন রেবেলিয়নের মতো বিশ্বখ্যাত আন্দোলনের জীবিত প্রকৃত নেতাদের একই পাটাতনে দাঁড় করিয়েছেন লেখক, যার প্রায় সকলেই ব্রিটিশ। কল্পনার স্বাধীনতা নিয়ে অভিনব বাস্তবতা ও সম্ভাবনাই নির্মাণ করেছেন লেখক। উপন্যাসের কাহিনি বিস্তারে তাদের নিয়ে অনেক গল্পও তৈরি করেছেন। সত্যিই কি ব্র্যাডব্রুক আর ব্র্যামওয়েল পরস্পরের যৌন সঙ্গী? সত্যিই কি স্কিপিং-এর সঙ্গে নেলী’র ঐ ধরণের সম্পর্ক ছিলো? সত্যিই কি দেশে ফেরার পর তিনি এক্সটিংকশন রেবেলিয়নের অফিস নিয়েছিলেন আর কয়েকমাস টানা চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ‘এশিয়ান সেন্টিমেন্টাল’ বলে গালি খেয়েছিলেন, ব্যর্থ হয়েছিলেন বাংলাদেশে ঐ অফিস প্রতিষ্ঠা করতে?

গল্পের পটভূমি পরিবেশ আন্দোলন, যাতে ব্যাংকার নায়ক জড়িয়েছেন হুট করেই। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাগত কোর্সে অংশগ্রহণ শেষে প্রিয় আলথুসারের লন্ডনে অবস্থানকালীন বাড়িটি দেখার লোভে শ্যালিকা ফারজানা ও তার স্বামী জোসেফকে নিয়ে গিয়েছেন অক্সফোর্ড স্ট্রিটে। নিজের কৌতূহল থেকেই সেখানে চলমান এক্সটিংকশন রেবেলিয়ন (XR) নামক সংগঠনের পরিবেশবাদী আন্দোলনের মূল ফটকে চলে যান, যেখানে নূহের নৌকার থিম ধারণ করে তৈরি করা হয়েছে একটি পিংক বোট আর যার নামকরণ করা হয়েছে হন্ডুরাসের নিহত পরিবেশকর্মী বেরতা কাসারেসের নামে। সেখানেই পরিচয় নায়িকা মেগানের সঙ্গে। গ্লাসগোতে একটা কলেজে দীর্ঘদিন আলথুসার বিষয়ক পাঠদানকারী প্রফেসর লুই স্যামুয়েলের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ এবং এক্সটিংকশন রেবেলিয়নের পরিবেশ আন্দোলনের যথার্থতা নিয়ে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে প্রফেসর তাকে একরকম জোর করেই নিয়ে যান XR-এর মূল অফিসে। সেখানে পরিচয় ঘটে এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা উইলিয়াম স্কিপিং, রবিন বোর্ডম্যান, জেমস, রুবি রেইম্যান, অ্যালান ডুগাল্ড, ভুবন চাঁদ যোশি নামের এ্যাকটিভিস্টদের সঙ্গে। এই আন্দোলনের সদস্য হয়েই নায়ক পেয়ে যান পরের দিনের কী-নোট স্পীকারের দায়িত্ব। কী-নোট স্পীচটি হয়ে উঠেছে এই গল্পের পিক পয়েন্ট যেখানে জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি নদী থেকে শুরু করে সমগ্র বিশ্বের আনাচে-কানাচে পরিবেশের অসহনীয় বিপর্যয় বর্ণনা পাঠকের কাছে সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে।

এই গল্পে সবচেয়ে শক্তিশালী যে শব্দটি বারবার ব্যবহৃত হয়েছে তা হচ্ছে পারহেসিয়া বা নির্মম সত্যকথন যা XR আন্দোলনের অন্যতম শ্লোগান ‘TELL THE TRUTH’-এর গ্রীক দার্শনিক নাম। এই পারহেসিয়া মানে শুধু সত্য কথন নয় বরং কোনো ভয় ভীতি বা দ্বিধা’র তোয়াক্কা না করে কঠিন সত্যটা বলতে পারা। প্রফেসর স্যামুয়েলের মুখে পারহেসিয়ার সংজ্ঞা বর্ণনা উপন্যাসের একটা দারুণ মজার অংশ যখন তিনি নায়ককে আক্রমণ করে বসেন এই বলে যে, নায়ক আসলে একজন ব্যাংকার এবং তার ক্যাপিটালিস্ট পৃথিবীর মজা নেয়া শেষ, এখন সে এসেছে এ-পাশটা দেখতে। পারহেসিয়ার ব্যাখ্যা দিতে স্যামুয়েল আরও বলেন যে, পারহেসিয়া হতে হলে তাতে থাকতে হবে আন্তরিকতা, প্রকৃত সত্য, বিপদ জেনেও সত্য বলার সাহস, আত্মসমালোচনা এবং কর্তব্যবোধ। এক পর্যায়ে নায়কের বলার পালা এলে তিনিও প্রফেসর স্যামুয়েলকে নির্মম সত্যকথনের নামে পাল্টা আক্রমণ করেন এই বলে যে প্রফেসর তার সঙ্গে মেগানের ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা নির্দোষ সখ্যতা সহ্য করতে পারছেন না, কারণ প্রফেসরের আছে মেগানের প্রতি এক অবদমিত গোপন যৌন লালসা। কথক নায়ক ও প্রফেসর স্যামুয়েলের বিতর্কের এই জায়গাগুলো বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।

গল্পের সিংহভাগ জুড়েই এক্সটিংকশন রেবেলিয়নের পরিবেশবাদী সম্মেলন ও তার ব্যাকগ্রাউন্ডে ঘটতে থাকা নানা ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনায় প্রথম পুরুষ নায়ককে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে প্রফেসর স্যামুয়েল, ব্রিটিশ তরুণী মেগানের সঙ্গে আরও যুক্ত হয় মেগানের বোন মেলিন্ডা, কেন্দ্রীয় নেতা গেইল ব্র্যাডব্রূক, সাইমন ব্র্যামওয়েল ও আরও কিছু নাম। এই আন্দোলনের মূলমঞ্চের আশে-পাশে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা সূক্ষ্ম রসবোধের সঙ্গে এত চমৎকারভাবে চিত্রায়িত হয়েছে যে পাঠক এক অনিবার্য ঘোরের মধ্যে পড়তে বাধ্য হবেন। সে বর্ণনার মধ্যেই চলে আসে আফগান চকলেটিয়ার করিম, তার ভাই কাহহার, করিমের সাবেক প্রেমিকা জেসিকা যে কিনা আবার পুলিশ অফিসার মার্কের বর্তমান স্ত্রী। এরকম একটা সমাবেশের চারপাশে উৎসবের যে আবহ তৈরি হয় তা দারুণভাবে ফুটে উঠেছে লেখকের পারস্পেক্টিভ বর্ণনার সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গী, স্বভাবসুলভ দার্শনিকতা ও শব্দচয়নের দক্ষতার মাধ্যমে। উপন্যাসের নায়িকা মেগানের সঙ্গে লেখকের পাতানো বাবা মেয়ের সম্পর্ক পুরো উপন্যাসটিকে একটা অনামিক অনুভূতি নিয়ে শাসন করেছে অধ্যায়ের পর অধ্যায়। প্রথম দিনের সমাবেশের শেষে লেখক, মেগান, প্রফেসর স্যামুয়েল রাতে ঘুমানোর জন্য মার্কের বাসায় গেলে অসাবধানতাবশত নগ্নবক্ষা মেগানের সামনে পড়েও সম্পর্কের নাম বদলে যেকোনো কিছু করতে মেগানের প্রস্তাবে অসম্মত নায়ক যেন এক এশিয়ান পার্সপেক্টিভ। অবশ্য তার এই নীতিনিষ্ঠ বাবা মেয়ে সম্পর্ক পুরো গল্পে কাহিনির মূলসুরের স্পন্দন হিসেবেই অনুরণিত হয়েছে এবং উপন্যাসকে একটা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

কাহিনির প্রধান দুই ভাগের দ্বিতীয় অংশে আলথুসারের দর্শনকে একাডেমিক ডিসকোর্স আকারে  ধারণ করা হয়েছে রচনা শৈলীর সামন্তরালে অনন্য দক্ষতায়। প্রথম ভাগের টান টান উত্তেজনায় ভরা দুই তিন দিনের গল্পের নেশাগ্রস্ততা এক গভীর শূন্যতায় পর্যবসিত হয় হ্যাংওভারের মতো, কিন্তু দর্শন পাঠাগ্রহীর জ্ঞানতৃষ্ণায় সমানভাবে জল ছিটিয়ে যাবে আলথুসারের দর্শন, প্রফেসর স্যামুয়েলের বর্ণনায় এই দর্শনের দূর্বল দিক কিংবা মিশেল ফুকোর ততধিক বলিষ্ঠ দার্শনিকতায় খারিজ হয়ে যাওয়া আলথুসারের ‘ভাবাদর্শ’ বা আইডিওলজি সেন্ট্রিক দর্শন, যখন লেখক ফুকোর ভাষায় বলেন, ‘আইডিওলজি বলে কিছু নেই, ভাবাদর্শ নিজেই ভাবাদর্শমূলক এক নিস্ফল ও মেঘলা কথা, বস্তুগত শক্তিগুলো তা দিয়ে মোকাবেলা করা যায় না’ [আলথুসার: পৃ:১৬৫]। এক্সটিংকশন রেবেলিয়নের অফিস প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ নায়ক তবু তার প্রিয় আলথুসারকে খুঁজে ফেরেন ফ্ল্যাটের দারোয়ান আকবর ও তার বৌ মিলে মাকে পেটানোর মধ্যে, অপ্রতিরোধ্য দার্শনিক আখ্যানের মধ্য দিয়ে লেখক বর্ণনা করেন যে এই ‘বিস্তীর্ণ-পরিকীর্ণ-সর্বাত্মক কাঠামোটাতে শত কোটি মানুষের বসবার বা দাঁড়াবার কোনো জায়গা নেই, কেউ তা ছেড়ে দিতে চায় না’, আর সেজন্যই বেঁচে থাকে মানুষের অস্তিত্বের এক নিযুতবর্ষী সংগ্রাম।

শেষাংশের পরাবাস্তব বেড়ালটি আসলে লেখকের নিজেরই কোনো অপভ্রংশ হয়ে ঘোষণা করছে যে ‘পারহেসিয়া’ বা নির্মম সত্যকথনের নামেও মানুষেরা যা বলে তাও আসলে মিথ্যা। সর্বগ্রাসী হতাশা বা নৈরাজ্যবাদীতা নিয়ে মস্তিষ্কে পেরেক ঠুকে দেবার মত শেষ হয়ে যায় কাহিনি। নিতান্তই একজন পাঠক হিসেবে, আনন্দের লোভ ছাড়া আর কোন পাঠ-হেতু না থাকা এক সাধারণ পাঠক হিসেবেও লেখকের লেখনি-শক্তি প্রবল ঝাঁকুনি দেবে এর বোদ্ধা পাঠককে। ভাষার গতিশীলতা আর যে কোনো কিছুর  ডিটেইলিং দেখে মনে হয় মানুষ এত শব্দমালা জড়ো করে, মনে হয় কথাও বলতে পারে না। বইটি পড়তে পড়তে মনে হবে লেখক যেন নিজেই কথা বলছেন তার পাঠকের সঙ্গে।

যে পুস্তকের পাঠ পাঠককে কোন মরবিড ফিলিংস দেয় না, যে বই পড়া শেষে মনে হয় না যে, ‘আপনাকে কেউ হাত, পা বেঁধে ফেলে এসেছে কোনো গভীর জঙ্গলে, বা ঘুমন্ত আপনার মাথায় সজোরে আঘাত করেছে লোহার রড দিয়ে বা যে বই পড়ে মনে হয় না যে আপনি আপনার ছেলের লাশ কাঁধে নিয়ে হেঁটে বের হচ্ছেন কোনো মরচ্যুয়ারী থেকে’, সে বই পাঠ করা যেমন অপ্রয়োজন তেমনি তা সময়েরও অপচয়। সেদিক থেকে বলতে হয় ‘আলথুসার’ তার পৃষ্ঠার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছে দুর্দান্ত অনুভূতির বিচিত্র সব রঙ, স্রেফ একটা কাহিনি বর্ণনাই যার উদ্দেশ্য নয় বরং তার যাত্রাপথ এক গভীর একাডেমিক ডিসকোর্সের দিকে যেখানে ব্যাপ্ত থাকে দার্শনিক আলথুসারের নিজস্ব জীবন, স্লিপওয়াকের মধ্যে স্ত্রীকে মেরে ফেলার গল্প, আলথুসার কর্তৃক ‘মার্ক্সিজমকে অর্থনৈতিক সূত্রের মেকানিক্যাল বিশ্লেষণের বাইরে ঠেলে দিয়ে অন্য এক জায়গায়’ নিয়ে যাওয়ার উপাখ্যান। জানা যায় কীভাবে ‘ধর্ম, পরিবার, ভোট প্রথা, মিডিয়া, খেলাধুলা, সাহিত্য, শিল্প, শিক্ষা ব্যাবস্থা আইডিওলজিক্যাল স্টেট এ্যাপারাটাস হিসেবে নাগরিকে দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দেয়’, কীভাবে তাদের বেঁচে থাকার সত্যিকারের পরিস্থিতিকে অর্থপূর্ণ ও সঠিক মূল্যবোধে ভরপুর করে তোলার কাজটা করে’। ব্রিটিশ পুলিশের হাতে, বা সমাবেশ চলাকালীন কর্তব্যরত র‍্যাপিড ফোর্সের অস্ত্রগুলোর নাম, ডিটেইল স্পেসিফিকেশন রিপ্রেসিভ স্টেইট এ্যাপারাটাস কেমন হতে পারে, কতটা সুসজ্জিত আর প্রয়োগযোগ্য হয়ে উঠতে পারে তার সমরাস্ত্রের ভাষা সে বিষয়ে ভয়ংকর ইঙ্গিতবাহী হয়ে উঠেছে।

বর্তমান পৃথিবীর তমসাঘন অস্থিরতা, মানুষের জীবনধারার যে বহমান অনিশ্চয়তা, তাও যেন স্থান পায় লেখকের আলথুসারের দর্শন বর্ণনায় যখন আলথুসার বলেন, ‘কোনো বিশাল ওয়ার্ল্ডভিউ দিয়ে আমরা চালিত হই না, আমরা ইতিহাসের এক বিশেষ মুহূর্তে বিশেষ কিছু সমস্যার মধ্যে জন্ম নেয়া শিশু, আমাদের লড়াইগুলোর একদম যুদ্ধের মাঠে দাঁড়িয়েই পজিশন নিতে হয়। এলোমেলো বা কাব্যিক কোনো ওয়ার্ল্ডভিউ, কোনো বিশ্ববীক্ষণের কথা বললে তখন চলে না।’ বা যখন তিনি বলেন, ‘গরীব মানুষেরা সমাজের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ মেনে চলে, যদিও তারা জানে যে, তা মানলে তারা গরীবই থেকে যাবে’—বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও তার ক্রমাগত ধেয়ে আসা অসহায়ত্বের সময়ানুগ ভয়াবহ বাস্তব চিত্র একাকার হয়ে যায় এই বর্ণনায়।

সিরিয়াস টাইপ লেখার মধ্যেও বইয়ের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হিউমারগুলো স্টাইলের দিক থেকে মডার্ন হলেও গভীর অন্তর্দৃষ্টি নিক্ষেপের বিনির্দেশবাহী। আলথুসারের বাড়িতে বুড়ো ক্লেইজের সঙ্গে দেখা হওয়া, আলথুসারকে প্লাম্বার হিসেবে তার বর্ণনা করা বা কথা বলার সময় ক্লেইজের মুখ থেকে উৎকট গন্ধ বের হওয়ার কাহিনি সে হিউমারকে নির্দেশ করে। অথবা XR-এর কর্মী নেলী (যে উইলিয়াম স্কীপিং-এর গার্লফ্রেন্ডও) যখন রাস্তায় বসে পেশাব করে আর ডেনিস ও টিমোথি (প্রফেসর স্যামুয়েলের দুই ছাত্র) পেছন থেকে তাকে বলে হার্ডার, হার্ডার, তাও রসবোধক। আধুনিক সাহিত্যের অপরিহার্য উপাদান এই রসবোধ মানেই অট্টহাসি নয়, উপহাস বা বিদ্রুপ নয়, তা হচ্ছে এক বিশেষ ধরণের কমিক, যা একই সঙ্গে আরও নিগুঢ় কোনো অর্থময়তার দিকে পাঠক-চিন্তাকে প্রক্ষেপিত করে। এই বইয়ে স্থান পাওয়া হিউমারগুলোও সেরকমই। বুড়ো ক্লেইজের আশি-ঊর্ধ্ব অসহায় জীবন যেন তার মুখের গন্ধ হয়ে ভারাক্রান্ত করে দিচ্ছে পুরো ব্রিটিশ সমাজ ব্যাবস্থাকে, তার অসাড়তার খোল নলচে মেলে ধরছে পাঠকের সামনে। নেলী, যে ক্ষমতাধর স্কীপিং-এর বিকৃতির শিকার এবং ক্ষমতার ভয়ে বা হুমকির মুখে আদালতে গিয়ে স্কীপিং-এর অপরাধকে ডাহা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয়াও যেন আইন-আদালতকে মাকড়সার জালের মত মেলে দিয়েছে রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনুগামী কোনো নিয়ামক হিসেবে, যে জালে কীটপতঙ্গই ধরা পড়ে কেবল আর বড় বড় পাখিরা তা ছিঁড়ে বের হয়ে যায়। 

একটা উপন্যাসের চরিত্র বা আইডেন্টিটি কী, কীভাবে নির্ধারিত হবে এই আইডেন্টিটি, তা নির্ধারণ করে দেওয়া লেখকের কাজ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে চরিত্র-চিত্রণ, তা লেখক করবেন কীসের ওপর ভিত্তি করে, কী কী বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে? মানুষ তো আসলে নিজেই নিজেকে চেনে না, নিজের সঙ্গে তার বোঝাপাড়াই যেখানে এক অন্তহীন প্রক্রিয়া, সেখানে উপন্যাসের চরিত্র নির্মাণ তো নিশ্চই অত্যন্ত দুরূহ। আর ব্যক্তি-লেখকের আইডিওলজি থেকেই যদি চরিত্ররা জন্মলাভ না করে তাহলে তার ভিত্তিই বা কীভাবে নির্ধারণ করা যাবে। এই অমিমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে থমাস মান বলছেন, ‘আমরা চিন্তা করি যে আমরা ক্রিয়াশীল, আমরা চিন্তা করি যে, আমরা চিন্তা করছি কিন্তু সেটাও প্রকৃতপক্ষে আমাদের মধ্যে অন্য কেউ করে দিচ্ছে। তার অর্থ হচ্ছে, অনাদিকাল ব্যাপী আমাদের আদিম অভ্যাসগুলো উপকথার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আর অতীতের এক অদৃশ্য কুয়ো থেকে মরফিনের মতো আমাদের আকর্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করছে।’ (কুন্ডেরা: টেস্টামেন্টস বিট্রেইড: ১৯৯৫) ‘আলথুসার’ উপন্যাসের চরিত্রসমূহ নির্মাণে যেমন রয়েছে দস্তয়ভস্কির মতই লেখকের নিজস্ব আইডিওলজির খেলা তেমনি অনেক চরিত্র নির্মাণেই রয়েছে দূর অতীতের সেই আদিম অভ্যাস ধরে বাহিত হয়ে আসা এক অদম্য প্রবৃত্তির অনুরণন।

একজন কবি, প্রকৃতপক্ষেই যিনি কবি, তিনি যতই প্রবন্ধকার বা ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন না কেন, শেষ বিচারে তিনি আসলে কবিই থেকে যান। মাসরুর আরেফিনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। আলথুসার উপন্যাসের ভাষাই যেন তার উৎকৃষ্ট প্রমান। ২০০১ সালের ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প থেকে শুরু করে, কয়েকটি বৃহৎ অনুবাদকর্ম শেষে আগষ্ট আবছায়ার যে পরিণত মাসরুর, আলথুসার-এ যেন সেই মাসরুর আরও পরিণত এক কাব্যময় গদ্যভাষার নিপুণ কারিগর, যার পরতে পরতে মিশে আছে প্রকৃতি প্রেমের এক বর্ণিল এলোমেলো পথ। যে গল্পে নেশাগ্রস্ত ঘোরের মত ফিরে ফিরে আসে ধানসিঁড়ি নদী, জীবনানন্দ দাশের বরিশালের বাড়ি, বাল্যবন্ধুদের বেঁচে থাকা কিংবা মরে যাওয়ার গল্প। মাসরুর আরেফিনের কাব্যময় অনন্য গদ্যের একটি উদাহরণ দেওয়া যায়:

‘ভাবলাম মানুষের শেষমেষ ওই মোটা দাগই পছন্দ, লাইনের আড়ালে ওই যে সূক্ষ্মতর লাইন, শব্দের আড়ালে ওই যে শঠতানিপুণ শব্দ, গানের মূল সুরের আড়ালে ওই যে চোরা সুর, আর রক্তের আড়ালে ওই যে তুমুল রক্তমোছার আয়োজন, সে সব অনুধাবনের আমাদের বুঝি আর সময় বা ইচ্ছা কোনোটাই নেই’ (পৃ: ৫৬)—কবিতার মতো করে সাজালে মনে হবে যেন কবিতাই। কোনো তরল-ক্রিস্টাল স্ক্রিনে ভেসে থাকা বা বিলীনোদ্যত কোনো শব্দমালা যেন নয় এরা, বরং পাথরে খোদাই করা হায়রোগ্লিফিংকস, হাজার বছর ধরে মানুষ যার অর্থ খুঁজে ফিরছে, লোক লোকান্তরের অভিমুখে যার অন্তহীন যাত্রা...

মঞ্চে ভাষণ দেবার পর নায়ককে আটক করতে আসা পুলিশদের বিরুদ্ধে লাল লিপস্টিক পরা ‘রেড লেবেল ব্রিগেড’-এর সদস্য একদল তরুণী যখন মরিয়া হয়ে কাজ করছে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে তখন বারবার ঐ কর্মীদেরকে ডাইনি চেহারার বলে আখ্যায়িত করার বিষয়টি একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তি তৈরি করে। শৈশবের মানসপটে ডাইনিদের চেহারা যেভাবেই অংকিত থাকুক না কেন, তা নিশ্চয়ই কোনো শুভ ধারণার উদ্রেক করে না। ফলে নায়ককে বাঁচাতে আসা একদল মেয়েকে স্রেফ চেহারার বা সাজসজ্জার কারণে ডাইনি চেহারার বলে লেখক দুবাই এয়ারপোর্টের সেই জার্মান জেনারেলের রেইসিস্ট মনোভাবকেই নিজের অগোচরে মনের মধ্যে পুষে রেখেছেন কিনা সে বিচার ভবিষ্যতের বোদ্ধা পাঠকের, তবে বর্ণনার যথার্থতার স্বার্থে শব্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ব্যবহারের স্বাধীনতা বা প্রয়োজনীয়তা লেখকের একান্তই নিজস্ব। আর দেশে ফিরে এসে নায়ক কেনইবা ঐ সব নেতৃবৃন্দের বিরাগভাজন হয়ে পড়লেন, কেনই বা তারা নিরুৎসাহী হয়ে পড়লেন, বা পশ্চিমা নেতৃত্বের নিরুৎসাহটা গল্পের বাকি অংশের মতো কল্পনাপ্রসূত এক প্রায়-বাস্তবের মত আরেকটু ডিটেইলে এস্টাব্লিশ করলে, তা হতে পারত প্রকৃতপক্ষেই বর্তমান পোস্ট-কলোনিয়ালদের সঙ্গে তার কলোনাইজারদের বর্তমান টানা-পোড়েনের একটি অন্তঃস্রোতা বিবরণ।

পাঠ পর্যালোচনা বা পাঠ প্রতিক্রিয়া দিয়ে এই উপন্যাসকে বুঝতে যাওয়া বা চাওয়া এর সম্পূর্ণ রসাস্বাদনের পথে অন্তরায় হয়ে উঠবে, কেননা আলথুসার-এর মধ্যে ঘাপটি মেরে আছে আরও নন-ম্যাটিরিয়াল ফোর্স, যা সংক্ষেপে পরিমাপ করা যায় না। এই উপন্যাসের এক লাইন থেকে অন্য লাইনের ফাঁকে অদৃশ্য পরিভ্রমণ করে অজস্র নির্মম সত্যের উন্মাতাল তরণী। উমবের্তো একো’র কথা দিয়ে শেষ করা কাজ। একো বলেন, সাহিত্য, আমাদের কমন হেরিটেইজ হিসেবে ভাষাকে জীবিত রাখে। মাসরুর আরেফিনের এই নতুন ধারার কথাসাহিত্য সত্যিকার অর্থেই আমাদের সাহিত্যে এক নতুন উজ্জীবন, এক নতুন দিনের সাহিত্য-ভাষা বিনির্মাণের নিউ ম্যানুফ্যাকচারিং হাউজ।

উপন্যাস : আলথুসার/ লেখক : মাসরুর আরেফিন/প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২০/ প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন/ প্রচ্ছদ : সেলিম আহমেদ/ মূল্য : ৬৫০ টাকা/ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩৪৪

//জেডএস//

সম্পর্কিত

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষ

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune