X
বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

নাটক নিয়ে | গিরিশ কারনাড

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২০, ০৭:০০

 

আমাদেরকে নিশ্চিত হতে হবে, নাটক কী, সেই ব্যাপারে। সাধারণত আমরা নাটক বলি তাকেই, যেখানে ডায়লগ থাকে। কিন্তু ডায়লগ মানেই কনভারসেশন নয়, এই দুয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে, এটা মনে রাখা প্রয়োজন। যখন আপনি ট্রেনে চলছেন, আপনি লোকদের কথা বলতে শোনেন, তারা কথা বলে, ঝগড়া করে, আপনি সেসব শোনেন, তারপর ট্রেন থেকে নেমে স্বভাবতই সেসব ভুলে যান। ট্রেনে আপনি তাদের কথোপকথন, আইডিয়া শেয়ারিং ইত্যাদি শুনেছেন, যেগুলো হয়তো আপনাকে তাদের বিষয়ে কোনো ধারণা দেয়নি—তারা কী, কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাচ্ছে ইত্যাদি। আর আপনিও সে বিষয়ে আগ্রহীও নন।

তাহলে থিয়েটারে ‘ডায়লগ’ বা ‘সংলাপ’ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো—অভিনেতার মুখ থেকে দর্শক সংলাপের আদান-প্রদান শুনতে আসে। সুতরাং ডায়লগের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দর্শককে জানানো ‘তারা কে’। ডায়লগ প্রথম যে ব্যাপারটি তৈরি করে সেটা হলো ক্যারেক্টার বা চরিত্র। ধরুন চরিত্রের নাম ‘এ’ এবং ‘বি’। নাটকে সংলাপের মাধ্যমে জানানো হবে ‘এ’ এবং ‘বি’ এরা কী, এরা কোথা থেকে এসেছে। আর এই কারণেই নাটকে এটা গুরুত্বপূর্ণ। এবং এ-সব কিছুই আপনার সামনেই ঘটতে হবে, সেটা ভবিষ্যৎ, বর্তমান এবং অতীত—সবই। প্রত্যেকটি চরিত্রই এগুলো নিয়ে আসবে। এবং একটি ভালো নাটকের প্রত্যেকটি বাক্যেই সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে।

দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো, সংলাপ কী করে? চরিত্র আমাদের আসলে কী বলতে চায়? অবশ্যই তারা আমাদেরকে একটি গল্প বলতে চায়, সবাইই গল্পে আগ্রহী। কিন্তু আসলে সেখানে কী থাকে? সবকয়টি ভালো নাটকেই একটি চরিত্র আরেকটি চরিত্রকে কিছু করতে প্ররোচিত করে। মানুষেরা বলে, সেখানে কিছু ঘটতে হবে, কিন্তু কিছু ঘটতে হবেই মানেই এই নয় যে তারা দৌড়োদৌড়ি করবে। এই ঘটার ব্যাপারটি থাকবে সংলাপে, এবং এই সংলাপ যে ব্যাপারটি ঘটাবে সেটা হলো একটি চরিত্রকে দিয়ে অন্য চরিত্রকে কিছু করানোর জন্য প্ররোচিত করা। যেমন এটা হতে পারে : লেডি ম্যাকবেথ ট্রায়িং টু টেল ম্যাকবেথ, টু কিল দ্য কিং। এটা হতে পারে অনেকভাবে, কিন্তু সবথেকে নূন্যতম ব্যাপারটি হচ্ছে ক্ষুদ্র কোনো পরামর্শ, কিংবা কিছুর বিচার করা, ইত্যাদি থাকবে, যার ফলে দুটো চরিত্রের মধ্যে প্ররোচনার [কারনাড এখানে ‘Persuasion’ শব্দটি ব্যবহার করেন] প্রসেসটা চলবে। এবার এখানে আরেকটি ব্যাপার গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ডায়লগ দর্শকদেরকেও প্রভাবিত করবে এবং তাদের কাছে উপযুক্ত মনে হতে হবে, অন্যথা দর্শক বোর হয়ে যাবে।

এখানে দুইটি ব্যাপার একসঙ্গে চলছে, চরিত্ররা একে অপরকে সংলাপের মাধ্যমে প্ররোচিত [Persuade] করার চেষ্টা করছেন, এবং সেখানে একটি কনফ্লিক্ট তৈরি হচ্ছে। কনফ্লিক্টটা তৈরি হচ্ছে কারণ সবসময়ই একটি চরিত্র অন্য চরিত্রকে যে-কিছু বলে পারসুয়েট করার চেষ্টা করছে সেটাই অপরজন একমত না-ও হতে পারে, এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই চরিত্র দর্শককে যেন তাদের সংলাপ দিয়ে দর্শককে প্রভাবিত করতে পারে; যেন দৃশ্যটা দেখা তাদের কাছে কাজের মনে হয় বা উপযুক্ত কিছু করেছে বলে মনে হয়।

আর এগুলোই হলো নাটকের বেসিক ধারণা, যেগুলো প্রত্যেক নাটক লেখকের মনে সাধারণত থাকে।

এবার এখানে অনেক ব্যাপারে লিমিটেশন থাকে, টিপিকালি যেগুলোকে থিয়েটার লিমিটেশন বলে। একটা উপন্যাস আজীবন চলতে পারে। তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ দুই হাজারের বেশি পৃষ্ঠা। কিন্তু নাটক তো এতো দূরে চলতে পারে না। রাতে যদি লোকজন থিয়েটার দেখতে আসে, সারারাত তো সেটা চালানো যাবে না, তাদের ঘুমানোর সময় দিতে হবে। সুতরাং বর্তমান সময়ে নাটক এমন হওয়া উচিত যেটা দুই  থেকে আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় নেবে না। নাটকের দৈর্ঘ্য কতটুকু হবে সেটা মূলত নির্ভর করা উচিত আমাদের ভেতরের ধৈর্যশক্তি কতটুকু সেটার ওপর। সাধারণত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পর দর্শক বাড়ি যেতে চায়। এই শারীরিক ব্যাপারটা উপন্যাস কিংবা কবিতার বেলায় খাটে না, কারণ আপনি চাইলেও উপন্যাসের বাকি অংশ কালও পড়তে পারবেন, কিন্তু নাটক একটি ওয়ান কন্টিনিউয়াস অ্যাক্টিভিটি।

থিয়েটারের দ্বিতীয় লিমিটেশন হলো, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ লোক সেটা দেখতে পারবে। হতে পারে পঞ্চাশ থেকে পাঁচশত। কিন্তু পাঁচশত কিংবা ছয়শতের পরে পেছন থেকে কেউ যদি অভিনেতার মুখের এক্সপ্রেশন না দেখতে পায় তাহলে থিয়েটারের অনেক ব্যাপার সে মিস করে যাবে। মূলত মঞ্চে কী হচ্ছে সেটা কেউ যদি সঠিকভাবে দেখতে না পায় তাহলে তো থিয়েটার দেখা হলো না। সুতরাং এই দর্শকের লিমিটেশন, এটাও থিয়েটারের একটা লিমিটেশন। আর থিয়েটারের করণীয় হলো এই যে পাঁচশত জন দেখছে তাদের কন্সেন্ট্রেশন ধরে রাখা।

আরেকটি পয়েন্ট হলো, দর্শকের মনে রাখা উচিত কেন আমি টাকা খরচ করে, সময় ব্যয় করে এখানে আসলাম—এবং নাটকের বিষয়ের প্রতি তাদের মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

এবার নাটক লেখার প্রসঙ্গে আসি—নাটক লেখা হলো যেন একটা বিল্ডিং তৈরি করা। মনে করুন আপনি একটা বিল্ডিং তৈরি করবেন, তাহলে প্রথমেই আপনি একটা প্ল্যান করেন, কোথায় বসার ঘর হবে, কোথায় শোবার ঘর হবে, কিচেন কোথায় হবে, টয়লেট কোথায় হবে। একটা ঘরের প্ল্যানের উপর ভিত্তি করে অপর ঘরটি তৈরি হয়, আমার কাছে নাটক লেখার ব্যাপারটা এরকম, সুপরিকল্পিত কাঠামোর উপর এটাকে নির্মাণ করতে হয়। এখানে সব কাঠামোর মধ্যে একটা ম্যাথমেটিক্যাল ক্যালকুলেশনও থাকে। অনেকে কাঠামোর ব্যাপারটা এতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, তবে আমি এটাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, এবং আমার লেখার সময় কাঠামোর উপর ভিত্তি করে লেখার ব্যাপারে গুরুত্ব দেই।

আমি মনে করি নাটকের অন্তত কোনো ক্যারেক্টার দর্শককে অ্যাফেক্ট করা উচিত। আর সংলাপের ব্যাপারে অভিনেতাদের ভাবনা থাকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমি আমেরিকার শো করতে গিয়ে দেখেছি, আমেরিকান যে অভিনেতারা আমার নাটকে কাজ করছেন তাদের অনেকেই অনেক সময় বিভিন্ন সংলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, বলেছেন, না আমি এই সংলাপটি বলতে পারবো না, সঙ্গে তারা কারণ ব্যাখ্যা করেছেন—যদিও সেই সংলাপ নাটকের অংশ—তবু তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বলতে চাননি। পরে নাট্যকার তা পরিবর্তন বা সংশোধন করেছেন। আমি মনে করি এই ব্যাপারটাও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের অভিনেতারা গল্প কিংবা সংলাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না, কিন্তু তাদের কোনো প্রশ্ন থাকলে সেটা তোলা উচিত। আমার মনে হয়, অভিনেতাদের এরকম মনোযোগ থিয়েটারকে একটা ভিন্নরকম প্রাণ দেয়।

যদি নাটকের স্ট্রাকচার নিয়ে আরও কিছু কথা বলি। তবে বলবো নাটকের বিভিন্ন ধরণের স্ট্রাকচার থেকে। তবে যে কোনো মহৎ, ভালো বা সেরা নাটকে আপনি নিখুঁতভাবে দেখলে দেখবেন খুব সচেতনভাবেই নাটকটি একটা কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে আছে। উদাহরণ দেই—শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’—আপনারা জানেন ‘হ্যামলেট’—সিম্পল স্টোরি। কিন্তু যদি ধীরে আপনি বোঝার চেষ্টা করেন হ্যামলেটের গল্পটা কী, তাহলে—হ্যামলেট বিদেশে গেলো, সে শুনলো তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে, মাকে উৎপীড়ন করা হয়েছে [কারনাড এখানে মলেস্টেড শব্দটি ব্যবহার করেন] যার জন্য সম্ভবত তার চাচা দায়ী। এবং শেষে একটা ট্রজেডি হলো। কিং লেয়ারে খেয়াল করে দেখবেন গল্পটা প্রায় একই রকম, শেক্সপিয়র যেন রিপিট করেছেন, ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরিটা যেন একই, আমি বলবো এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। এই দুই নাটকের কাঠামোয় তফাৎ আছে।

[নাটক নিয়ে গিরিশ কারনাডের একটি ইংরেজি ভাষণের অংশ-বিশেষের তর্জমা। ভাষণের কিছু অংশে কন্নড় ভাষা ব্যবহার করায় সম্পূর্ণটুকু তর্জমা করা সম্ভব হয়নি—অনুবাদক]

//জেডএস//

সম্পর্কিত

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

দ্বিত্ব শুভ্রার কবিতা

দ্বিত্ব শুভ্রার কবিতা

বিদ্যাশ্রমের দিনগুলো

বিদ্যাশ্রমের দিনগুলো

সর্বশেষ

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

দ্বিত্ব শুভ্রার কবিতা

দ্বিত্ব শুভ্রার কবিতা

বিদ্যাশ্রমের দিনগুলো

বিদ্যাশ্রমের দিনগুলো

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune