সেকশনস

ফুলমতি

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২১, ০৩:৪৬

মৃত মেয়েটি ছুটছে হরমুজ আলীর পেছনে। ভয়ে পালায় হরমুজ। কিন্তু পালাতে পারে না! যেখানে পালাতে চায়, সেখানেই মেয়েটি পৌঁছে যায়। হরমুজ বুঝতে পারছে না, মেয়েটি কেন তার পিছু নিয়েছে! কোনো উপায় না পেয়ে আবার দৌড়াতে শুরু করে। দৌড়াতে দৌড়াতে পেছনে ফেলে যায় কমলাপুর, মুগদা, মানিকনগর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ি, শনির আখড়া, রায়ের বাগ। দৌড় থামে চিটাগাং রোডে। আর পারছে না, খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ে সে। তবু স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে। পেছন ফিরে তাকায়। মেয়েটা কি দেখছে না। যাক বাঁচা গেল, মেয়েটি আর ধাওয়া করছে না। গাড়িহীন সড়কের সুরঙ্গের পাশে বসে ভাবছে এবার ঢাকায় ফিরতে হবে। কিভাবে ফিরবে জানে না হরমুজ। তবে, এটা জানে, তাকে ভিন্ন পথে ফিরতে হবে। যেপথে এসেছে সেপথে যাবে না। ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই পেছনে একটা মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে। ভয় পেয়ে যায় হরমুজ। আবার দৌড় শুরু করে। দৌড়াতে দৌড়াতে অদৃশ্য হয়ে যায়।

২.

ঈদ সামনে রেখে শহর ছাড়ছে গ্রামমুখো মানুষ। যাওয়ার মাধ্যম বাস, ট্রেন, লঞ্চ। যানবাহনে একটা ভিড়, কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। যেন ভৌতিক ভয় আর আতংক ধাওয়া করছে। যেতেই হবে। না গেলে রক্ষা নেই। লোকমুখে একটাই শব্দ—আসছে! আসছে! ধেয়ে আসছে! কে ধেয়ে আসছে? কী ধেয়ে আসছে? সেসব জানে না কেউই। কেবল একটাই কথা—বিপদ ধেয়ে আসছে। বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে গ্রাম। তাই হুলস্থুল কাণ্ড করে গ্রামের দিকে ছুটছে মানুষ। মানুষ নামক প্রজাতির বিনাশ ঘটাতেই এই বিভ্রান্ত বিপদের বৈপ্লবিক আগমন! কেউ কেউ বলছে ওই বিপদের কাছে পৃথিবীর অনেক মানুষই অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। গলায় স্পর্শ করেছে মৃত্যুর মালা। যাকে একবার ধরেছে তাকেই শেষ করে দিয়েছে। অথচ, কেউ মরতে চায় না। তবে মৃত্যুভয়ে সবাই আতংকিত! পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে পরীক্ষার হলে যেতে ভয় পায় পরীক্ষার্থীরা। এমন বিক্ষিপ্ত ছোটাছুটির ভেতরেও কেউ কেউ স্থির দাঁড়িয়ে আছে। যে স্বজনহীন, কেউ তার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকবে না। এরা যাবে কোথায়! এরা আসলে যায় না, নিজের কাছেই স্বেচ্ছা নির্বাসনের মতো অন্ধকারের অতলে থেকে যায়।

খাবারের সন্ধানে ছুটছে পিঁপড়া। কোথাও খাবার নেই। শহর ও গ্রামে লকডাউন চলছে। পিনপতন নীরবতা। অভেদ্য দেয়াল ভেদ করে বের হতে পারছে না মানুষ। শহরের পরিচিত দৃশ্যগুলোও হারিয়ে গেছে। মানুষের ভিড় নেই। নেই স্ট্রিট হকার। রিকশাঅলা নেই। চিরাচরিত গাড়ি-বাসের জ্যামও নেই। রাজ্যের রাস্তায় পাহারাদার পুলিশ ও আর্মি। কিছুক্ষণ পরপর র‌্যাবের গাড়ি ছুটছে সাঁইসাঁই সিগন্যাল বাজিয়ে। সাধারণত এই আওয়াজে ভয়ংকর খুনিকে তাড়া করে। এরপর ক্রসফায়ার টেবিলে বসে ফুঁ দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে। ভয়ে রাস্তায় কোনো প্রাণের অস্তিত্ব থাকে না। থাকতে পারে না। সেনাবাহিনীও নেমেছে কড়া নিরাপত্তা অভিযানে। এতক্ষণ পর পিঁপড়ারা বুঝতে পারল দেশজুড়ে কারফিউ। এত এত পিঁপড়ার মাঝে একটি পিঁপড়ার নাম ফুলমতি। ফুলমতি শুনেছে কারফিউ হলে প্রবল খাদ্য সংকট শুরু হয় রাষ্ট্রে। খাদ্য সংকটে পড়ে অন্যসব প্রাণীও। শুনেছে কারফিউ দেয়ার কারণ ভিনগ্রহ থেকে আগত ভাইরাস। সাংঘাতিক হিংস্র এরা! যাকে ধরে স্বমূলে বিনাশ করে। শুধু তাই নয়, অন্যদেরও ঘায়েল করে। জানুয়ারি মাস থেকে দুই শত বিশটি দেশে শুরু হওয়া এই ভাইরাস আট কোটি আট লাখ মানুষকে আক্রান্ত করেছে, আঠারো লাখ মানুষ খেয়েছে। আর কত খেলে ক্ষুধা মিটবে সেটাও বোঝা মুশকিল। এই মহামারি এখন বাংলাদেশেও দখলদারিত্ব শুরু করছে। এরা শুধু মারবেই না, স্নেহের পৃথিবীটা স্বৈরশাসকের মতো দখল করে ধ্বংসের রাজত্ব কায়েম করবে। হতে পারে এটা সেই আশ্বাসেরই নমুনা। বিশ্বখ্যাত ডাক্তাররা প্রাণপণ চেষ্টা করছে প্রতিষেধক বানাতে। সফল হতে না পারলেও হাল ছাড়ছে না। ততদিনে পৃথিবী দীর্ঘ ক্ষতির মুখে দঁড়াবে। খাবারের অভাবে মারা যাবে অন্তত দুই কোটি মানুষ। ফুলমতি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে! এরপর আশপাশে তাকিয়ে কাউকে খোঁজার ভান করে।

সফলভাবে সপ্তাহ পার করেছে লকডাউন। লকডাউন আর কারফিউ যেন মামাত-ফুপাত ভাই। ফলে দেশে খাদ্য সংকট তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে ঘরে ও গুহায়। সংকটে আছে ফুলমতিরাও। যখন স্বাভাবিক অবস্থা থাকে তখন মানুষের ফেলে দেয়া উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে বাঁচে কুকুর, বিড়াল। কিছু অংশ ফুলমতিরাও পায়। অবশ্য ফুলমতিরা হরহামেশা রাস্তায় বিশাল জায়গাজুড়ে আর থাকে না। থাকে বিল্ডিংয়ের দেয়ালে। রাস্তার পাশে। বড়ো বড়ো গাছের গোড়া অথবা মানুষের ঘরের নির্জন কোনো প্রান্তে। তাই রাস্তার খাবার নিয়ে তারা খুব ভাবে না। কৌশলে মানুষের খাবার চুরি করে দিব্যি সংসার চালাতে পারে। চিনি অথবা মিষ্টি জাতীয় খাবার পেলে বেশ জমে। মিষ্টির ঘ্রাণ পেলে মুহূর্তেই দল বেঁধে চলে আসে হাজার-লাখ পিঁপড়া। এরপর তৃপ্তি নিয়ে খায়। শুধু খায় তা-ই না, শীতের জন্যে মজুদ করার পরিকল্পনাও মাথায় রাখে। শীত মওসুমটায় যেন নবীন প্রবীণরা খেয়ে স্বচ্ছন্দে পার করতে পারে। অথচ রাষ্ট্রজুড়ে লকডাউন। তবে, ফুলমতিদের আটকে রাখতে পারে না। চাইলে অনেক জায়গায় যেতে পারে। কিন্তু যাবে কোথায়!

৩.

ফুলমতি দিনাজপুরের অস্বচ্ছল পরিবার থেকে এই শহরের বাসিন্দা হয়েছে। অস্বচ্ছল হওয়ার কারণও আছে। গল্পটি এগিয়ে নেয়ার জন্যে ফুলমতির বাবার একটি নাম থাকতে পারে। শাকুর সরদার। শাকুর একটা সময় দিনাজপুর অঞ্চলের বিশ ইউনিটের একটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান ছিল। তখন পাকিস্তানের বিপক্ষে শুরু হলো যুদ্ধ। পাকিস্তানি পিঁপড়ারা বেশ শক্তিশালী। তাই বলে শাকুর সরদার থেমে যান না। সৈন্যদের ওপর আস্থা রয়েছে তার। দুইপক্ষের মধ্যে বিশাল যুদ্ধ বাঁধে। যুদ্ধ চলে টানা নয় মাস। যুদ্ধে জয়লাভ করলেও বিপক্ষ দলের আঘাতে তিনটি পা হারিয়ে মন ভাঙে শাকুরের। বাকি তিনটি পা দিয়ে কোনোরকম চলতে পারলেও বাস্তবিক পক্ষে সে পঙ্গু। সেই থেকে শাকুর পরিবারের বোঝা। তিন মেয়ে ও দুই ছেলের দায়িত্ব কে নেবে? স্ত্রীও নেই। পিঁপড়া পরিবারে স্ত্রীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সবাইকে কাজের নির্দেশ দেয়। মনিটরিং করে। শুধু তাই নয়, পরবর্তী প্রজন্ম টিকিয়ে রাখতে—এক, দুই, তিন লাখ পর্যন্ত ডিম দেয়। এরপর তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। ফলে পুরুষদের সঙ্গে থাকার প্রশ্নই আসে না। শাকুর পাঁচ সন্তান নিয়ে পড়েছে মহাবিপদে। সংসারে বড়ো ফুলমতি। পিঁপড়াপরিবারের হয়ে নিজেকে মানুষের মতো ভাবতে চাইত সে। পিঁপড়াজীবন ভালো লাগে না তার। সে জানে বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষের আগে পৃথিবীতে এসেছে পিঁপড়া। প্রায় ১৪ কোটি বছর আগে ক্রিটেশিয়াস যুগে পিঁপড়া প্রজাতির উদ্ভব। সে তুলনায় মানুষ একেবারে নতুন। ত্রিশ লাখ বছর আগে মানুষের আবির্ভাব হলেও বুদ্ধি ও কৌশল দিয়ে সবার ওপরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। আজকের জনসংখ্যার বিস্ফোরণে টালমাটাল হলেও পিঁপড়ারাও যে তলে তলে ওজনের পাল্লায় মানুষের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে, সে খবর রাখে কয়জন? পঙ্গপাল, মশা, মাছি কিংবা পিঁপড়ারাও এই পৃথিবী দখল করে নিতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। হার্ভাড ইউনিভার্সিটির প্রাণিবিজ্ঞানী অধ্যাপক এডওয়ার্ড ওসবোর্ন উইলসন ও সহযোগী গবেষক বার্ট হোয়েলডব্লার ‘জার্নি টু দ্য অ্যান্টস’ নামক বইটিতে লিখেছেন, দাঁড়িপাল্লার একদিকে পৃথিবীর সব পিঁপড়া চাপালে তা অন্য ধারে সব মানুষের মিলিত ওজনের সমান। আধুনিক অস্ত্র ছাড়া মানুষের প্রধান প্রতিপক্ষ হতে পারে পিঁপড়া। তবুও পিঁপড়ারা নিজেদের অসহায় ভাবে। কারণ, তারা ভুলে গেছে তাদের অতীত ঐতিহ্য ও সক্ষমতার কথা। এসব ভেবে ফুলমতির চোখ বেয়ে পানি আসে। দোষ দেয় গোত্রপ্রধানদের ভুল পরিকল্পনাকে। আত্মকলহে সাম্রাজ্য হারিয়ে পরজীবী হয়ে বেঁচে আছে। তবে, এই দায় সম্পূর্ণরূপে নারীদের দুর্বল নেতৃত্বের ওপর বর্তাবে।

৪.

লাইলি অল্প বেতনে গার্মেন্টসে কাজ করে। থাকে মান্ডার তিনতলা পুরাতন একটি ভবনের নিচতলায়। দুই রুমের ফ্ল্যাটটির ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। বাসায় পর্যাপ্ত আলো বাতাস পৌঁছতে না পারলেও তিনপাশে জমে থাকা ময়লার দুর্গন্ধ সহজ স্বাভাবিকভাবে পৌঁছে। এখানে লাইলি একা থাকে না। দশজন মেয়ে মিলে মেস করে জড়োসড়ো থাকে। দিনে অফিসে থাকলেও রাতটা কোনোরকম ঘুমিয়ে কাটায়। শুক্রবার নিজ নিজ কাজে সবাই ব্যস্ত থাকে। কেউ বাড়িতে ফোনে মা-বাবা অথবা নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলে। কেউ প্রেমিকের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে কাটিয়ে দেয় অনায়াসে। কেউ কাপড় পরিষ্কার করে, কেউ শপিং করতে যায়। লাইলির টানাপড়েনের সংসার। তাই শপিং করা হয় না। প্রতি মাসে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয় লাইলির। বাড়িতে আছেন পঙ্গু বাবা। স্বাধীনতা যুদ্ধে পা হারিয়েছেন। তবুও নাম ওঠেনি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়। এখন পঙ্গু বাবার কাছে সংসার মানে পাহাড়।

ফুলমতির মতো লাইলিরাও তিন বোন, দুই ভাই। এত বড়ো সংসারের দায়িত্ব লাইলির ছোটো কাঁধে। লকডাউনে লাইলির রুমমেটরা বাড়ি চলে যায়। দিনাজপুরের প্রান্তিক কোনো এক গ্রামে লাইলির বাড়ি। ঢাকায় এসেছে পাশের বাড়ির আকলিমার সঙ্গে। কাজও জুটিয়ে দেয় আকলিমা। এই প্রথম লাইলির ঢাকায় আসা। শহর দেখা। প্রথম ট্রেনে চড়া। কমলাপুর স্টেশন দেখা। এর বাইরে লাইলি কিছুই চেনে না, জানে না। আকলিমা বাড়ি যাওয়ার সময় লাইলিকে বার কয়েক যেতে বলেছে, লাইলি যাবে না। বাড়ি যেতে অনেক খরচ। লাইলির হাতে এত টাকা নেই। বরং কিছু টাকা আকলিমার মাধ্যমে পাঠালে ডাল-ভাত চারটা মুখে নিতে পারবে ভাইবোনরা। বাড়ি গেলে ফিরে এসে নতুনভাবে বিপদে পড়তে হবে। সহজে ফিরতে পারবে এমনও না। সবার হাত থাকবে খালি—কারো কাছে ধারও পাবে না। তার ওপর যাওয়া-আসার পথে ওই ছোঁয়াছে রোগের ভয় তো আছেই। মহামারি হলে অবস্থান পরিবর্তন না করাই ভালো। আছে সরকারের নিষেধাজ্ঞাও। তেমনিভাবে ধর্মেরও নিষেধাজ্ঞা আছে। দুই নিষেধাজ্ঞা মাথায় রেখে—বাড়ি যাওয়ার চিন্তা বাদ দেয় লাইলি।

ভাইরাসের কারণে লকডাউন চলেছে। আবার লকডাউনের কারণে গৃহবন্দি লাইলি। গৃহবন্দি লাইলি অনুপ্রেরণা খোঁজে কারাগারে বন্দি থাকা মানুষদের থেকে। চার পাঁচ দিনের খাবার নিয়ে ঘরে অবস্থান করছে সে। একা। দিন শেষ হতে থাকে—এক, দুই, তিন করে। শেষ হয় চতুর্থ দিন। পঞ্চম দিন। কোনোরকম শেষ হয় ষষ্ঠ দিনও। সপ্তম দিনে অবশিষ্ট কোনো খাবারই নেই। এতদিন লাইলির ভাবনা ছিল সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। থাকার কথাও ছিল না, যদি দায়িত্বশীলরা সবকিছু ঠিকঠাক বণ্টন করত। খাবারের অভাবে মানুষ মারা যায় একথা যতটা সত্য, তারচেয়ে অধিক সত্য সুষম বণ্টনের অভাব। পৃথিবীতে সুষম বণ্টনের অভাবেই দুর্যোগ নামে। লকডাউন আর শেষ হচ্ছে না। সরকারি প্রকল্পের মতো বাড়তে থাকে তার মেয়াদ। দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। ভাইরাসের প্রতাপের কারণে উলটো আরো বাড়বে। যদিও লকডাউনের দিনেও প্রশাসন অনেক কিছুর স্বাভাবিক চলাফেরার অনুমতি দিয়ে রেখেছে। নির্দিষ্ট স্থানে পুলিশের পাহারায় বাজারও বসছে। দূরত্ব বজায় রেখে কেনাকাটা সম্ভব হলেও লাইলির হাতে টাকা নেই। তাই বাজারে যায় না! ভাবছে, আকলিমার সঙ্গে বাড়ি চলে গেলে এতটা ঝামেলায় পড়তে হতো না। মস্ত এই ঢাকা শহরে আপন বলতে কেউ নেই। কারো ওপর ভরসাও করা যাবে না। কে টাকা দেবে? কে দেবে চাল, ডাল? খাবার? এমন হাহাকারকে সুযোগ না দিয়ে ভাবছে একটা উপায় খুঁজে বের করতে হবে। সেই উপায়ের জন্যে আরেকটি উপায় খুঁজবে। অথচ, কিছুই মাথায় আসছে না। তার মাথাও লকডাউন হয়ে গেছে। ঠিকঠাক কাজ করছে না মনের সঙ্গে মনের দ্বৈরথ কেবল বেড়েই চলছে!

৫.

লাইলি আর ফুলমতি এক রুমে থাকে, অথচ লাইলি জানে না। জানার কথাও না। ফুলমতি বুঝতে পারলেও সে আছে পিঁপড়াদের সঙ্গে ঘরের দেয়ালে। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে থাকে লাইলি। পাশের দরজার কাছ থেকে পিঁপড়াদের সারি। দলবেঁধে ওপরের দিকে উঠছে ফুলমতি ও তার সদস্যরা। ফুলমতি স্বগোত্রীয়দের দেখে আশায় বুক বাঁধে। যাক, না খেয়ে মরতে হবে না অন্তত। পিঁপড়াবাহিনী যেকোনো বিপদে একত্রিত থাকে, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাদের শক্তি কয়েকগুণ বৃদ্ধির সঙ্গে অসাধ্য সাধন করার কৌশলটা ভালোভাবে জানা তাদের। পৃথিবীতে বিশ হাজার প্রজাতির পিঁপড়া আছে। বারো সাড়ে বারো হাজার পিঁপড়া আনাচে-কানাচে বসবাস করলেও পিঁপড়েদের সবচেয়ে বড়ো উপনিবেশ ছিলো প্রায় ৩,৬০০ মাইলের! ইতালি, ফ্রান্স, স্পেনের মতো বড়ো দেশগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে এই উপনিবেশ। এটি তৈরি করেছে আর্জেন্টিনার একটি পিঁপড়ার প্রজাতি। পিঁপড়ারা দেয়ালের প্রতি ইঞ্চিতে লাইন বজায় রেখে মাইলের পর মাইল অনায়াসে পাড়ি জমায়। এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়াল পিঁপড়াদের জন্য কয়েক মাইলের সমান। পিঁপড়াদের ক্লান্তি নেই। ঘুম নেই। তবুও পথ পাড়ি দিতে অনেক দিন লেগে যায়।

পিঁপড়া নিজের ওজনের চেয়ে বিশ গুণ ভারী জিনিস বহন করতে পারে। খাদ্য সংগ্রহের দিনে দীর্ঘ পথ অনায়াসে পাড়ি দিতে পারঙ্গম। এতে করে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীনও হয় তারা। পিঁপড়াসমাজেও আর্মি, পুলিশ রয়েছে। আর্মি শত্রুর আগাম সংকেত পায়। সংকেতের জন্য এক ধরনের রস ছিটিয়ে অপেক্ষায় থাকে তারা। মাটিতে শব্দ করে শত্রুর আগমনের খবর সহজেই জানতে পারে। টিকটিকি, মাকড়শা আর তেলাপোকা পিঁপড়াদের প্রধান শত্রু। কখনও কখনও অন্য গোত্রের পিঁপড়ারাও শত্রু শত্রু খেলায় নিমজ্জিত হয়।

ফুলমতি জানে এই পিঁপড়াদেরও খাবার সংকট চলছে। সামনে যা পায় মেরে টুকরো টুকরো করে মিলেমিশে রস আস্বাদন করে। আর্মি ও পুলিশ পিঁপড়া গোয়েন্দাসূত্রে শত্রুর আগমনের খবর জানতে পেরে বিষয়টি সরদারকে অবগত করে। পিঁপড়াগোত্রের প্রধান যেহেতু নারীপিঁপড়া থাকার নিয়ম। সেই সূত্রে ফুলমতি চিফ মিনিস্টার অব অ্যান্টস। ফুলমতি সব পিঁপড়াকে অবগত করে, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রস্তুতি থাকবে। সেই সঙ্গে খাদ্য মজুদের কথা স্মরণে রাখতে হবে।

হতে পারে—পিঁপড়াদের হিসেবে হাতের প্রতি বিঘত এক কিলোমিটার। বিশ কিলোমিটার অতিক্রমের পরই শত্রুবাহিনীর আগমনের খবর জেনে তাঁবু ফেলে। শত্রুরা লক ডাউনের দিনে ডাকাতি করতে এসেছে। এরা জানে শহরের রাস্তায় প্রকাশ্যে মানুষ নেই। সহজেই ব্যাংক, বুথ, স্টোরগুলো লুট করতে পারবে। গোয়েন্দারা জানায়, ডাকাতরা অধিকাংশ স্পেশাল ফোর্সের। যাদের মধ্যে আছে টিকটিকি, মাকড়শা আর তেলাপোকা। অথচ, এরা লকডাউনের দিনে রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দেয়ার কথা। চিন্তায় পড়ে ফুলমতি। শহর রক্ষা করতে হবে যেকোনো উপায়ে। লকডাউন শেষে খাদ্য সংকট আরো তীব্র হবে। লুটপাট বন্ধ না করলে একজন আরেকজনকে অনায়াসে খেয়ে ফেলবে। ভেঙে পড়বে প্রশাসন। বন্ধ হয়ে যাবে পৃথিবীর উৎপাদন। রাষ্ট্রের গুদামে যতটুকু আছে ততটুকুর সুষম ব্যবহার করলে মাস কয়েক চলা সম্ভব। ততদিনে হয়তো বিপদ কেটে যাবে। আশার সূর্য উঁকি দেবে, তাই এদেরকে শক্ত হাতে দমন করার সময় এখনই।

পিঁপড়াদের এমন চেইন ম্যানেজমেন্ট দেখে লাইলি আপ্লুত হয়। মূল সারির দুই পাশে অতিরিক্ত সারি দুইটি। এরা পুলিশ অথবা আর্মি। শৃঙ্খলা যে কাউকে অনেক উপরে নিয়ে যায়। ইস্ মানুষ যদি পিঁপড়াদের থেকে এসব শিক্ষা নিত। মনে মনে লাইলি নিজেকে পিঁপড়াগোত্রের একজন ভাবে। ফুলমতি পিঁপড়াবাহিনীর দিকে যেমন খেয়াল রাখে, একইভাবে লাইলির দিকেও। ফুলমতি জানে লাইলি ক্ষুধার্ত।

ফুলমতি বাহিনীর লড়াই শুরু হয় মাকড়শা, টিকটিকি ও তেলাপোকাবাহিনীর বিরুদ্ধে। এরা শহরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। সেসব ভুলে গিয়ে আমানতের খেয়ানত করছে। ফুলমতির মনে পড়ে তার বাবার যুদ্ধকৌশলের কথা। কীভাবে নিজের ইউনিটকে নিরাপত্তা দিয়েছে। যুদ্ধ পরিচালনা করে আক্রমণ করেছে। আবার ধাওয়া দিয়েছে। কৌশল পালটিয়ে নতুন কৌশল প্রয়োগে বিপক্ষ শিবিরকে পরাস্ত করে নিজ বাহিনীকে রক্ষা করেছে। ভাবা যেতে পারে, দুই রুমের ঘরটি এখন শহর। যা ঘিরে রেখেছে শত্রুর ছাউনি। ঘরটির সামনের রুমের ডান দিকে, দ্বিতীয় দেয়ালের কর্নারে অবস্থিত ব্যাংকটি রাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ব্যাংক। গোয়েন্দা গোপন গুহা থেকে রিপোর্ট পাঠিয়েছে, পরদিন ভোরে এটি লুট হবে। নেতৃত্বে থাকবে দুইটি করে মাকড়শা, টিকটিকি ও তেলাপোকা। সেনাপ্রধান ফুলমতির নির্দেশে রাতে তেইশ লাখ পিঁপড়া একত্রিত করে ব্যাংকের আশপাশে কড়া নিরাপত্তা বসায়। দুইদিনে ঢাকা শহর ও আশপাশের শহর থেকে লাখ লাখ পিঁপড়া ডেকে আনা হয়। রাষ্ট্ররক্ষার সংগ্রামে পিঁপড়ারা লকডাউন উপেক্ষা করে—স্বেচ্ছায় দলবেঁধে আসতে থাকে। এই আগমনে পিঁপড়াদের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনা।

দৃশ্যমান শত্রুরা অদৃশ্য ভাইরাসের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ ভয়ংকর! ফুলমতি বলে—জনমানবহীন এই শহর রক্ষার মহান দায়িত্ব এই মুহূর্তে আমাদের ওপর। পবিত্র দায়িত্ব জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করব। আমরা জানি, এটি অসম লড়াই। ওদের শক্তি মোকাবিলা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব। কিন্তু সত্য একটি সাহসের নাম। সাহসই হলো শক্তি। যা আমাদের আছে। আমরা এই সত্য, সাহস ও শক্তি নিয়েই এগিয়ে যাব।

আর্মি পিঁপড়ারা দলবেঁধে আক্রমণ করতে ভালোবাসে। তবে এদের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। এরা অ্যান্টেনার সাহায্যে আশপাশের শত্রুর উপস্থিতি টের পায়। একইভাবে খাবারের সন্ধানও পায়। শুধু তাই নয়—একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগও করে এই কৌশলে। ফুলমতি আর্মি পিঁপড়াকে ডেকে বলে, ওরা সংখ্যায় মাত্র ছয়, আমরা তেইশ লাখ। কিছুতেই আমাদের সঙ্গে কুলাবে না। ওদেরকে বুঝতে না দিয়ে আক্রমণ চালাতে হবে। মুখোমুখি দুপক্ষ। পায়ের নিচে পড়ে কিংবা হাতের ঘষায় হাজার হাজার পিঁপড়া মরে। তা সত্ত্বেও আক্রমণ পালটা আক্রমণ থামেনি। ফুলমতি খবর পাঠায়, যুদ্ধে জয়ের চেয়ে শহর রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনোভাবেই পিছু হটা যাবে না, প্রয়োজনে সবাই মরব। পিছিয়ে গেলে দেশটা অচল পয়সা হয়ে যাবে। এরা সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিদেশিদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। আমাদের সব পিঁপড়ার জীবনের চেয়েও দেশের জীবন অনেক মূল্যবান। এই ভূখণ্ড না থাকলে আমরা থাকব না। আবার এখানে অন্যায় শুরু হলে সেই অন্যায় ভোগ করতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকেও। ফুলমতির কথায় সবাই উজ্জীবিত। মাকড়শা, টিকটিকি ও তেলাপোকাদের টুকরো টুকরো না করে ফিরছি না, এই পণ নিয়ে পিঁপড়াবাহিনী যুদ্ধের মাঠে।

জীবিত রাখে কেবল একটি মাকড়শা। শত্রুদের এমনভাবে খতম করে রক্তের কোনো চিহ্নও রাখে না। মাকড়শাকে বাঁচিয়ে রাখার মানে মূল পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করা। উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন শেষে র‌্যাব মাকড়শাকে সবাই মিলে আনন্দ করে খাবে।

যুদ্ধ শেষে সব সৈন্যরা বিশ্রামে। ফুলমতি ক্যাম্পের সকলের খোঁজ নেয়। ক্লান্ত সৈন্যদের সেবার নির্দেশ দেয়। সুস্থদের ডেকে বলে, যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি। এখন অঘোষিতভাবে নগর রক্ষার দায়িত্বে আমরা। নগর রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে বাঁচতে হবে। বাঁচতে গেলে খেতে হবে। খেতে হলে সংগ্রহ করতে হবে খাবার। সেই সঙ্গে আশপাশের অন্যদের মুখেও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। সব প্রাণীর বাঁচার অধিকার আছে। প্রাণীর মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে আমরা জীবন দেবো। যখন প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ আসে তখন সব প্রাণীকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাই এসব মোকাবিলা করতে হবে।

৬.

গত তিনদিন লাইলি পানি ছাড়া কিছুই মুখে দিতে পারে না। এখানে আর ভালোও লাগছে না। বাড়ি যেতে চায় সে। দরজা খোলে। দারোয়ানের কাছ থেকে খাবারের সহযোগিতা চায়। দারোয়ান নিরুপায়। পুরো বাড়িতে এই মুহূর্তে আমি আর আপনি ছাড়া তৃতীয় কোনো প্রাণী নেই। লাইলি অবাক হয়ে বলে, তাহলে আমাদের কী হবে! আমাকে যে বাঁচতে হবে—আমার পরিবারের জন্যে, পঙ্গু বাবার জন্যে, ভাই-বোনের জন্যে। আমি বাড়ি যেতে চাই- কোনো একটা ব্যবস্থা করবেন?

দারোয়ান বলল, পুলিশের অনুমতি নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখতে পারেন, ট্রেন কখন ছাড়বে অথবা ছাড়বে কিনা। তবে, যতটুকু জানি সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ। শুধু তাই নয়, সারা দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কও বন্ধ। বাসায় থাকা ছাড়া কোনো উপায়ও নেই।

মন শক্ত করে দরজায় খিল আঁটে লাইলি। এই খিল হয়তো নিশ্চিত মৃত্যু অথবা টিকে থাকার জেদ। লাইলি এটাও জানে—যেখানে মৃত্যুর হাতছানি সেখানে টিকে থাকা যায় না। প্রস্তুতি নিতে হয় ইসরাফিলের বাঁশির সুর শুনে মুগ্ধ হবার।

বাঁচিয়ে রাখা মাকড়শাটি র‌্যাবগ্রুপের সদস্য। ফুলমতি ও র‌্যাব মুখোমুখি। র‌্যাবের নজর যায় ক্ষুধার্ত লাইলির দিকে। এরপরই সে লজ্জায় মাথা নিচু করে। শহর ও রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার পাশাপাশি খাবারের সুষম বণ্টনের দায়িত্ব ছিল আপনাদের ওপর। বাস্তবায়ন না করে নিজেরাই ভোগ দখল করতে চেয়েছেন। এখন ক্ষুধার্তকে বাঁচিয়ে রাখা পিঁপড়াদের প্রধান নৈতিক দায়িত্ব। সে যেই হোক না কেন। লাইলি বাঁচতে চায়। শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে কোনোরকম উঠে দাঁড়ায়। আবার দরজা খোলে। দেখে, চারপাশে কেমন ঘোর নিস্তব্ধতা। অন্ধকার না থাকার পরও অন্ধকার। দারোয়ান নেই। গেটও বন্ধ। তাহলে দারোয়ান চলে গেছে! শেষ তেলটুকু শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাতিটাও নিভে গেল! লাইলি দারোয়ানের চেয়ারে বসে। স্মৃতিচারণ করছে অতীত। স্মৃতিচারণেও কাটছে না সময়। এভাবে কাটে কয়েক ঘণ্টা। ক্ষুধা নিয়ে এতক্ষণ বসে থাকা যায় না। লাইলি ঘরে এসে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়ে। দূরের কোনো মসজিদ থেকে ক্ষীণকণ্ঠে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। হয়ত মুয়াজ্জিনও তিনদিনের অনাহারী। কণ্ঠের শক্তি লোপ পেয়েছে। এমনটা ভাবতে ভাবতে লাইলি আবারও ঘুমিয়ে পড়ে।

গল্পটি এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু শেষ হলো না। খুব সকালে লাইলির ঘুম ভাঙে। সুইচ অন করে। রুমে আলোর রেখারা খেলে যায় ঢেউয়ের মতো করে। তবুও ঝাপসা লাগে। ক্ষুধায় কাতর মানুষের এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। আস্তে আস্তে চোখ ঝাপসা কিছুটা পরিষ্কার হয়। লাইলির নজর ঠেকে দেয়ালের নিচে। কিছু চাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চাল দেখে লাইলি রীতিমতো অবাক! চোখ ক্রমে উপরের দিকে যায়, যত দূর যায় ততদূরই সারি। সারিতে লাখ লাখ পিঁপড়া। পিঁপড়াদের মুখে চাল। লাইলির চোখ বড়ো হয়ে যায়। বড়ো হওয়া চোখে আনন্দের ঝিলিক। মনে যখন আনন্দের প্লাবন খেলে যায়, তখন ক্ষুধাও হারিয়ে যেতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ লাইনের পিঁপড়াগুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লাইলি। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি পিঁপড়া। হাত ও মাথা নাড়ছে। সম্ভবত পিঁপড়াদের নেতা। নির্দেশনা দিয়ে ঠিকঠাক কাজের তদারকি করছে। লাইলির চোখ বেয়ে পানি আসে। গাল বেয়ে নিচে নামে। লাইলি পানি মুছে না। এই পানি আনন্দের। পানিতে বৈদ্যুতিক আলো এসে ঠিকরে পড়েছে। আলোর স্ফূরণ ঘটছে।

৭.

দারোয়ান স্থানীয় নেতা হরমুজ আলীর বাসায় গিয়ে জানায়, তিনতলা ভবনের নিচ তলায় একটা মেয়ে রয়েছে। খাদ্য সংকটে তিন দিন অনাহারী। নিজের বিনিময়ে হলেও খাবার পেতে চায়। হরমুজের কৌতূহলী চোখ দারোয়ানের কথা ভেদ করে অনেকদূর পর্যন্ত যেতে থাকে। গেট খোলার শব্দ শোনে লাইলি। পিঁপড়ারা তখনও খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত। ফুলমতি দক্ষ অফিসারের মতোই নির্দেশনা দিয়ে যায়—যেকোনো মূল্যে মানুষটাকে বাঁচাতে হবে। বিপদের দিনে সব প্রাণি সমান। পৃথিবীতে যতবার বর্ষা, বন্যা, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এসেছে ততবারই সব প্রাণী এক কাতারে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে। মানুষ ছিল বড়ো রকমের আশ্রয়ের জায়গা তখন। সেই মানুষের বিপদের দিনে দাঁড়াতে না পারলে পিঁপড়ার জন্ম-জীবন বৃথা হবে। ভাবনাটা নিজের ভেতর না রেখে পিঁপড়াদের জানিয়ে দেয় ফুলমতি।

দরজায় শব্দ করছে কেউ। শব্দ শুনে দরজা ঘেঁষে দাঁড়ায় ফুলমতি। লাইলি দরজা খোলে, সামনে দারোয়ান পেছনে হরমুজ। দারোয়ান লাইলিকে জানায়, ঘোর বিপদের দিনে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি চায় হরমুজ। দারোয়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই ভয়ে দরজা চাপাতে চায় লাইলি। হরমুজ দরজা ধাক্কা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। লুট করতে চায়—সোনালি আর রূপালি ব্যাংক। লুট করতে চায় লাইলির অব্যবহৃত স্বর্ণঘর। হাতে থাকা খাবার এক পাশে রাখে হরমুজ। লাইলি অসহায়ের মতো হাত জোড় করে ফ্যালফ্যাল তাকায়। হরমুজ বলে, সেই দিন লাশ হয়ে আমাকে তাড়া করেছিলি। আজ তোকে কিছুতেই ছাড়ছি না, লাইলি ভানু। হরমুজের কথা শেষ না হতেই লাইলির কয়েকটা হাঁচি আসে। গত দুইদিনে লাইলির শরীরের তাপমাত্রা বেড়েছে। সেই সঙ্গে কাশিটাও। নাক বেয়ে পাহাড়ি ঝর্নার মতো জল ঝরছে অবিরাম। হরমুজের সন্দেহ মেয়েটি ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত! কিন্তু সুযোগ তো সব সময় আসে না। সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে হয়। এমন সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। উপায় খুঁজে হরমুজ। সাবান-পানিতে ভালোভাবে গোসল দিয়ে স্প্রে করিয়ে নিলেই দুধের স্বাধ গোলে মেটানো সম্ভব।

ফুলমতি হরমুজের কুমতলব বুঝতে পেরেই আর্মি পিঁপড়াকে ইশরা করে। লাখ লাখ পিঁপড়া হরমুজের শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হরমুজ হাত দিয়ে ঘষে পিঁপড়াদের মারার চেষ্টা করে। মারতে মারতে ক্লান্ত। লাখ লাখ পিঁপড়া। কামড় খেয়ে শেষমেষ লাফাতে থাকে হরমুজ। শরীর থেকে খুলে ফেলে শার্ট ও গেঞ্জি। খুলতে বাধ্য হয় পরনের জিন্স। তাতেও থামছে না কামড়। হরমুজ চিৎকার করতে করতে দৌড়ায়। পেছন পেছন দৌড়ায় দারোয়ান।

/জেড-এস/

সম্পর্কিত

শামীম রেজার ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’

শামীম রেজার ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’

নন্দনের নতুন সংহিতা

শামীম রেজার কবিতানন্দনের নতুন সংহিতা

অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন ঝর্না রহমান

অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন ঝর্না রহমান

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | শেষ পর্ব

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | শেষ পর্ব

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | প্রথম পর্ব

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | প্রথম পর্ব

ক্রায়িং রুম

ক্রায়িং রুম

মাল্লাম ইলিয়ার (এ কেমন) বিচার

মাল্লাম ইলিয়ার (এ কেমন) বিচার

ঝুম শব্দে কাঁপে নদী

ঝুম শব্দে কাঁপে নদী

সর্বশেষ

শামীম রেজার ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’

শামীম রেজার ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’

নন্দনের নতুন সংহিতা

শামীম রেজার কবিতানন্দনের নতুন সংহিতা

অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন ঝর্না রহমান

অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন ঝর্না রহমান

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | শেষ পর্ব

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | শেষ পর্ব

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | প্রথম পর্ব

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | প্রথম পর্ব

ক্রায়িং রুম

ক্রায়িং রুম

মাল্লাম ইলিয়ার (এ কেমন) বিচার

মাল্লাম ইলিয়ার (এ কেমন) বিচার

ঝুম শব্দে কাঁপে নদী

ঝুম শব্দে কাঁপে নদী

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.