X
বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১, ৮ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

ক্রায়িং রুম

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩:২০

ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় আমি কেঁদে ফেলছিলাম, মনে হয় এ জন্যই ওরা আমাকে চাকরিটা দিয়েছে। আমি খুব সহজেই কাঁদতে পারি। এমনকি কখনও কখনও আমি জানিও না কেন কাঁদছি। বরং, ব্যাপারটা তখনই বেশি ঘটে যখন আমি কান্না সামলাতে চাই। আমার চোখ তখন জলে টইটুম্বুর হয়ে ওঠে।

কাজটা শুরু করার পর অবশ্য নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছি। এখন যেহেতু আমি এখানে কাজ করি আমার আর কান্নার দরকার হয় না। মনে হয় আমার কান্না যেন অন্যরা কেঁদে দিচ্ছে। কাস্টমারের কান্নাই যেন আমার থেরাপি। যদিও কাস্টমারের সাথে আমার কোনো যোগাযোগই নেই, এমনকি কথাও হয় না সারা দিনে একবার।  

ডিসেম্বর শুরু হয়ে গেছে, বছরের এই সময়টা খুব ব্যস্ত থাকে। আমরা এর মধ্যে আমাদের ওপেনিং আওয়ার বাড়িয়ে দিয়েছি কাস্টমারের চাহিদা পূরণ করার কথা চিন্তা করে। ক্রিসমাসের আগের সময়টা একদম মাথা খারাপ করে দেয়। কাস্টমারের দীর্ঘ লাইন তখন বারান্দা পাড় হয়ে রাস্তায় চলে যায়। বাইরে থেকে দেখলে তখন মনে হয় লোকজন যেন কোনো মজাদার খাবারের জন্য শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টে লাইন দিয়েছে।

ক্রায়িং রুম দোকানটা কিংক্রস স্টেশনের কাছেই। সিটির কাছাকাছি বলে চাকরিজীবীদের জন্য যাতায়াত করাও খুব সহজ। আর এরাই আমাদের রেগুলার কাস্টমার। আমাদের ব্যস্ত সময়টাও তাই অফিস ছুটির আগে কিংবা পরে। আমাদের ব্যস্ত সময়টা তাই অন্যদের চাইতে আলাদা। ক্রায়িং রুমে কোনো ঘড়ি নেই। মানুষের আসা এবং বের হয়ে যাওয়া থেকে আপনাকে সময়ের হিসাব রাখতে হবে। মানুষ এখানে পানির মতো নিরবচ্ছিন্নভাবে আসতেই থাকে। কোন রুমটা বেশি সময় নেই তা দেখে আপনি আপনার অনুভূতি দিয়ে হিসাব করবেন কতক্ষণ হইল, সময় দিয়ে না। এখানে মানুষকে বুঝতে হয় বডি ল্যাংগুয়েজ দিয়ে, খুব ধীরস্থির, শান্ত নিয়মমানা পদ্ধতিতে নিজের দুঃখ লাঘব করার চেষ্টা করে তারা।

এই সপ্তাহে আমি কাজ করব ভোরে। সকাল ৭টায় দোকান খুলতে হবে। সেমিস্টার চলাকালীন ছাড়া আমি সকালে উঠতে পারি না। কিন্তু খুব ভোরে কাজটা শুরু করলে মনে হচ্ছে আমার ভালোই লাগবে। কাজেই আমি খুব ভোরে উঠলাম। যখন বাথরুম থেকে বের হলাম তখন কেবল সূর্য উঠছে।

আমি যখন পৌঁছলাম, দোকানে দেখি চারদিকে একটা লেবুর গন্ধ। ঠিক সত্যিকারের লেবু না কেমন যেন একটা আর্টেফিসিয়াল লেবুর গন্ধ। আমার কাছে মনে হলো বাহ্ বেশ তো, বেশ একটা পরিচ্ছন্ন গন্ধ যেন গতকালের সব কষ্টকে ধুয়ে-মুছে একটা নতুন দিনের সূচনা করল। আমি ওয়াটার কুলারটা ফিল করে দিলাম। সবকটা ডেস্কে টিস্যু দিলাম। আমাদের অনেক টিস্যু লাগে। আমি হিসাব করে দেখলাম স্লো সময়েই সপ্তাহে হাজার খানেক টিস্যু লাগে ।

ব্যবসাটা চলে মূলত সরকারি অনুদান আর কিছু ব্যক্তির দানের ওপর। এই জন্যেই পরিচালনাপর্ষদ আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কাজ দিয়েছে। আমরা খুব সহজেই ওদের নির্দেশনাগুলো মানতে পারি। আবার বেতনও যথেষ্ট কম, যা দিয়ে তারা কিছুতেই একজন ডিগ্রিধারীকে নিতে পারবে না।

একটা দানের বাক্সও রাখা আছে রুমের এক কোনায়। যে কেউ চাইলেই যেকোনো অংক দান করতে পারে। সাধারণত মানুষ গড়পড়তা ৫ ডলার দান করে। কিন্তু কোনো কোনো দিন কেউ একজন আশ্চর্য রকমের বড় অংকও দিয়ে বসতে পারে। একদিন আমি বাক্স খুলতে গিয়ে দেখি কেউ একজন পাঁচ হাজার ডলারের চেক রেখে গেছে। আমি কয়েকবার ফিগারটা চেক করে দেখলাম যেন কোনো ভুল না হয়। আমি উল্টেপাল্টেও দেখলাম যদি কোথাও ডোনারের নামদাম থাকে। নিদেনপক্ষে যদি কোনো ক্লুও রেখে যায়। কিন্তু না কোনো নামধাম কিচ্ছু নেই। মানুষ কেমনে পারে কোনো ক্লু না রেখে যেতে।

সেদিন একজন সুটেটবুটেট লোক আসছে, চুল খুব সুন্দর করে ছাঁটা। এত স্মুদ গর্জিয়াস একটা কোট পরছে, দেখে মনে হচ্ছিল যেন আটলান্টিকের সীল মাছের চামড়া দিয়ে বানানো। সে উঠে যাওয়ার মুহূর্তে আমার চোখে চোখ রাখল। ঘটনাটা আমার চেক পাওয়ার আগের, আমার মনে হলো সে কি আমাকে কোনো ইঙ্গিত করে গেল এই চাহনি দিয়ে। আমি ভাবলাম নিশ্চয় সে পুরা টিস্যু বক্স খালি করে গিয়েছে কিন্তু চেক করতে গিয়ে দেখি, না, তেমন কিছুই না। বরং হাফ বক্সও খালি করেনি। অবশ্য তার টাকাটা সঠিক হাতে পড়ছে কিনা তার নিশ্চয়তামূলক চাহনিও হতে পারে সেটা।

ইতোমধ্যে আমার বেশ অভিজ্ঞতা হয়েছে, এখন আমি ভিড়ের মধ্যে থেকেও সহজেই চিনতে পারি কে নতুন কাস্টমার। তারা খুব আস্তে হাঁটে আর রুমটা খুঁটে খুঁটে দেখে বাইরে থেকে। কখনও কখনও তাদেরকে হারিয়ে যাওয়া মানুষের মতো মনে হয়। যেন ওরা ঠিক নিশ্চিত না ঠিক জায়গামতো আসছে কি না। যদিও এখানে মিসলিড করার কেউ নেই, সবাই এখানে আসে নিজ দায়িত্বে কাঁদতে। কাউকে বিরক্ত করার কোনো ইচ্ছা কারো মধ্যেই নেই। আপনি যদি আমাদের ওয়েবসাইডের ছবি দেখেন তাইলে দেখবেন, আমাদের কাস্টমার এমনভাবে বসছে যেন তারা কোনো একটা স্টাডি গ্রুপ, সবাই তাদের কাজে নিমগ্ন। কারো কারো কান্না শুরু করার জন্যে দরকার হয় ছবি বা চিঠি। কেউ কেউ আবার এসেই শুরু করে দেয়। তাদেরকে দেখে মনে হয় যেন এথলেটদের ফোকাস নিয়ে বসেছে, মাথাটা একটু নিচু করে, শরীরটা টানটান যেন যেকোনো মূল্যে মনোকষ্ট লাঘব করা চাই। 

অনেকেই আমার কথা অনেক সময় বিশ্বাস করে না যে, আমাদের কাস্টমারদের মধ্যে পুরুষই বেশি মহিলাদের তুলনায়। এখানে এসে আমি এও দেখছি যে, পুরুষ যখন কাঁদে তখন অনেক জোরে জোরে কাঁদে, জোরে হিক্কা তোলে আর মহিলারা যখন কাঁদে তখন খুবই নরম সুরে কাঁদে হিক্কা তুলতেও তা খুব বেশি জোরে তোলে না। যেন সে সামান্য একটু বাতাস নেওয়ার জন্যে জোরে একটা শ্বাস নিলো বা হাঁচি দিলো এই যা।

ক্রায়িং রুমে কথা বলা বারণ। নতুন কাস্টমার কখনও কখনও অন্য কাস্টমারের সাথে কথা বলতে চায়। তখন পুরাতন কাস্টমার তাদেরকে দেয়ালে টাঙ্গানো নোটিশটা দেখিয়ে দেয়। আমার কাজ তাদেরকে একটু অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে এখানকার নিয়মকানুন বুঝিয়ে বলা।

কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁদতে থাকে। কেউ যদি ক্লোজিং টাইমেও কান্না না থামায় তো আমার কাজ তাদেরকে বলা। এই জন্যে অবশ্য ইভিনিং শিপ্টে কাজ করতে ভালো লাগে না। কোনো মানুষকে তার কান্নার মাঝখানে গিয়ে কি বলা যায় নাকি যে কান্না থামাও; এখন বাড়ি যাওয়ার সময় হয়েছে।

সকালে যারা আসে তারা বিকালের কাস্টমার থেকে ভিন্ন। তারা বেশ প্রফেশনাল আর নিয়মকানুনেও ভালো, তাদেরকে সত্যি আমি পছন্দ করি। তারা আসে কাঁদে যতক্ষণ তাদের কাঁদার সময় আছে হাতে, তারপর রওয়ানা করে দেয় যার যার গন্তব্যে। বিকালে যারা আসে তারা যেতেই চায় না। ওরা কান্না শুরু করতেও দেরি করে, আবার অন্ধকার হয়ে গেলেও খবর থাকে না ওঠার। কাউকে কাউকে দেখে তো মনে হয় এটাই যেন তাদের প্রিয় জায়গা, এখানে থাকতেই পছন্দ করে।

 

আজকে আমার ম্যানেজার লুইস এখানে। তার কাজ হলো রোস্টার করা আর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জোগান নিশ্চিত করা। অফিসে বসে বসে আমাকে দেখাও যেন ওর একটা কাজ যা আমার ভালো লাগে না। কেউ আমাকে সারক্ষণ চোখে চোখে রাখছে মনে হলেই অস্বস্তি লাগে।

‘হায় সুজি’, এসেই সে বলল, তার কথা বলার ঢং চড়া, যাই বলে মনে হয় প্রশ্ন করছে। আর আমিও যা উত্তর দেই তা যেন যাচাই বাছায়ের মধ্যদিয়ে পাস হয়।

আমি ঠিক বলতে পারব না কেন, কিন্তু লুইসের সাথে কথা বলার সময় আমার বড় বোন আলিসনের কথা মনে পড়ে। মাঝেমধ্যে মনে হয় তারা যেন একই ব্যক্তি দুই রকম সাজে আমার সামনে উপস্থিত। আমি জানি ওরা এক না কিন্তু লুইসের দৃষ্টিভঙ্গি একদম আমার বড় বোনের মতো। তারা যে শুধু দেখেই তা না, দেখার চেয়েও বেশি হিসাব করে, কবে না আমি আবার তাদের বিপদে ফেলে দেই।

দু-সপ্তাহ আগে আলিসনের বার্থডে ছিল। সে এখন আর সিডনিতে থাকে না। আমার সাথে কদাচিত দেখা হয় যদি আমি ট্রেনে করে ওর সিটিতে যাই। গত সপ্তাহে একদিন কাজ শেষ করার পর আমি একটা কার্ড কিনলাম আমার ক্রায়িং রুমের কাছেই একটা বইয়ের দোকান থেকে। প্রথম পৃষ্ঠার মধ্যে ছিল একটা পেঁচার ছবি। বড় বড় চোখ যেন রাজ্যের বিম্ময়ে পূর্ণ আর ছোট দুইটা কান খাড়া করে রাখা সতর্কভাবে।

আমি পোস্টঅফিসে গেলাম এবং ওদের চেইন দিয়ে বাঁধা বলপয়েন্টটা দিয়ে লেখলাম। আমি বেশ যত্ন করে সতর্ক চাপ দিয়ে লেখলাম যেন বলপয়েন্টটা ভালো কাজ করে। Dear Alison, Happy Birthday! I hope you had a great day! এর বেশি আর কিছু আমার মাথায় আসছিল না। আমি আর একটু চিন্তা করে লিখলাম sorry, I could not be there! তারপর আমি আমার নাম লিখলাম এবং পরিশেষে দুইটা এক্স দিলাম। কিছুক্ষণ পর যখন আমি পড়তে গেলাম আমার নিজের লেখাটায় দেখি আমি অনেকগুলো এক্সক্লেমেটরি সাইন দিয়ে রেখেছি। আমি দিব্যি চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম, সে কি করবে এই কার্ড হাতে পেয়ে। সে ভাববে আমার মেসেস পুরাই ফেইক। মনে হলো থাক, এই কার্ড না পাঠানোই ভালো। কার্ড আমি বাড়ি নিয়ে আমার বেডসাইড ড্রয়ারে রেখে দিলাম।

আমি যখন তাকে বলছিলাম আমার ক্রায়িং রুমের চাকরিটার কথা, সে সাথে সাথে বলছিল, ‘সারা দিন ওদের মধ্যে থেকে নানা মানুষের অশ্রু বিসর্জন দেওয়া দেখা তো খুবই ডিপ্রেসিং জব। কেন তুমি ক্যাফে-ট্যাফেতে একটু ট্রাই করো না। তোমার বাড়ির কাছেই হয়তো একটা কিছু পেয়ে যাবে।’ আমি জানি এটাই তার আমার প্রতি কেয়ারের নমুনা। যখনই আমি তাকে কিছু বলি সেটা সে ভুল প্রমাণ করে একটা নতুন ফতোয়া দেবেই দেবে।

সত্যি কথা বলতে আমার কাছে কিন্তু কাজটা মোটেও ডিপ্রেসিং লাগে না। আমার বরং তাদেরকে দেখে মায়াই লাগে। ভাবি, হায়! ওদের বুঝি আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

আমি ডালউইচ হিলে একটা শেয়ার একোমোডেশনে থাকি। আমার একটা ফ্লাটমেট আছে। মেয়েটি চায়না থেকে এসেছে পড়ালেখা করার জন্য। মেয়েটির নাম ক্যাথি, যদিও ওর মেইল এড্রেসে দেখি নাম দেওয়া ‘পাই উ”। ওর সাথে আমার খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। কখনও কখনও ওর ফোনালাপ শুনে বুঝতে পারি যে ও বাসায়। ও কী বলে তা বোঝার সাধ্য আমার নেই কারণ সে খুব চাপা কিন্তু চড়া গলায় কেন্টোনিজে কথা বলে।

আর একটা মেয়ে, সে এসেছে নরওয়ে থেকে। সে পিউর ব্লন্ড। কথা বলার সময় সে অনেক সময় নিয়ে কথা বলে তাই ওর কথা বুঝতে আমার খবর হয়ে যায়। সামার শুরু হওয়ার পর প্রায় প্রত্যেকদিন সে মধ্যরাতের আগে বাসায় আসে না। মেয়েটার ফ্রেন্ড বানানোর ক্ষমতা সত্যি আমাকে অবাক করে। এত সহজে ও মানুষের জীবনে ঢুকে যেতে পারে যে বিষ্মিত না হয়ে উপায় থাকে না।

কাউকে সহজে ফ্রেন্ড বানায়ে ফেলা আমার জন্যে প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। ওর নাম হেরিয়ট, ওকে ঠিক আমার ফ্রেন্ড বলব কি না বুঝতেছি না। সে যদিও আমার ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। একদিন যখন আমাদের টিউটোরিয়াল চলছিল তার মাঝখানে আমি এককোনায় বসে বাসা থেকে নিয়ে আসা স্যান্ডউইচ খাচ্ছিলাম। সে তার আরো দুইটা ফ্রেন্ড নিয়ে এসে আমাকে বলল আমি ওদের সাথে জয়েন করতে চাই কি না ইউনি ক্যাফেতে। 

তারপর থেকে আমরা একসাথে মুভিও দেখতে গেছি আবার বেশ কয়েকবার ক্লাসের পর কফিও খেয়েছি। আমি যখন হেরিয়টের সাথে থাকি তখন নিজের জন্য আমার করুণা হয়, কেন যে আমি আমাকে নিয়ে এত বিব্রত বুঝি না। আমি আমার এই অদ্ভুত ফিলিংসের কথা হেরিয়টকে বলছি।

আমি সত্যিই জানি না এই সব চিন্তা আমার মাথায় কোত্থেকে আসে। কথা প্রসঙ্গে একদিন ওরে আমি বলছি যে স্কুল ব্রান্ডে আমি ওবে (সানায়ের মতো একটা মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট কিন্তু সুরটা বাঁশি এবং সানাইয়ের মাঝামাঝি) বাজাইতাম। যদিও আমি এটা ওকে বলিনি যে আমি মাঝেমধ্যে আমার ওবেটা হাতে নেই, ঠোঁটে লাগিয়ে খুব আস্তে করে ফুঁ দেই, এত আস্তে যেন আমি সুরটা বুঝতে পারি আওয়াজ না করে।

হেরিয়েটের খুব লম্বা ব্লন্ড চুল ছিলো, এটা সে খুব সুন্দর করে ছেঁটে আসলো। কাঁধের দুই পাশে চুলটা সুন্দর করে কাটা একদম মাপমতো, কাঁধ বরাবর কিন্তু আবার কাঁধের সাথে লাগোয়া না। ওর মুখে সবসময় একটা মাপা হাসি লেগে থাকে। তিন সপ্তাহ হলো সেমিস্টার শেষ হয়েছে, এর মধ্যে ওর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ হয়নি । ওর তো অনেক বন্ধুবান্ধব, ও যখন ওদের ব্যাপারে কথা বলে মনে হয় তারা সবাই ওর বেডসাইড ড্রয়ারেই থাকে। যখন যাকে দরকার তার সাথে সে কথা বলে।

মাঝেমধ্যে ভাবি যে ওরে একটা ফোন করি। বলি যে চল মুভি দেখতে যাই বা চল একসাথে ব্রাঞ্চ করি বা একটা কিছু। কিন্তু হেরিয়টের সাথে থাকা সময়টাতে মনে হয় ও আসলে আমার সাথে নেই। মনে হয় ও যেন  অন্য কোথাও অন্য কারো সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

গত তিনদিন ধরে এক মহিলাকে দেখছি নিয়মিত ক্রায়িং রুমে আসছে। আমি খেয়াল করলাম ও কান্নার সময় এমনভাবে মুখটা হাত দিয়ে ঢেকে রাখে যেন মনে হয় ওর মুখটা মাঝখান দিয়ে ভাঙ্গা।

ওকে দেখে মনে হয় ও আমার বয়সীই হবে। ওর পরনে টিশার্ট ও জিনস। ওকে দেখে এটাও মনে হচ্ছে যেন কোনো কিছুর ব্যাপারেই সে ঠিক নিশ্চিত না, কি করবে, কোথায় যাবে, এমনকি এখানে আসার ব্যাপারেও। প্রথমদিন দেখার পরই আমার এই ফিলিংসটা হয়েছিল যে, ও খুব নরমশরম একটা মানুষ হয়তো-বা ওকে আমি বন্ধু বানাতে পারতাম যদি জানতাম কিভাবে বন্ধু বানাতে হয়। সত্যিই আমি জানি না মানুষ কিভাবে অচেনা থেকে পরিচিত এবং বন্ধু হয়ে ওঠে। কিভাবে শুরু করে, সম্পূর্ণ অচেনা থেকে বন্ধু হয়ে ওঠার সময় ওরা কী বলে একজন আর একজনকে। সম্ভবত এইসব বিষয় কথা দিয়ে কাভার করা সম্ভব না, হয়তো বন্ধুত্ব নীরব বোঝাপড়ার ভিতর দিয়েই গড়ে ওঠে।

কেউ যদি এখানে লাগাতার তিনদিনের বেশি আসে তাহলে আমরা তাদেরকে একটা প্রশ্নপত্র ধরিয়ে দেই, এটাই ক্রায়িং রুমের নিয়ম। আজকে ওর সাথে দেখা হওয়ার পর আমি তাকে এটা বলি। অনেক রেগুলার কাস্টমার এই কারণে লাগাতার দুই দিন আসার পর একদিন গ্যাপ দেয় এই সব এডমেনিস্টেটিভ ঝামেলা এড়ানো জন্য।

আমাদের ট্রেনিংয়ের সময় ১ ঘণ্টা ধরে শুধু আমাদেরকে বোঝানো হয়েছে `Professional Concern’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদেরকে শুধু বলা হয়েছে যে নিয়মিত যারা আসে, সেই সব কাস্টমার যদি কাউন্সিলিংয়ে যায় তবে তারা উপকৃত হবে। আমাদের দায়িত্ব শুধু তাদেরকে কাউন্সিলরদের লিস্ট ধরিয়ে দেওয়া এর বেশি কিছু করা আমাদের এক্তিয়ারের মধ্যে নেই।

আমি মেয়েটিকে ইন্টারভিউ রুমে নিয়ে গেলাম। লাইট জ্বালালাম। লাইট জ্বলে ওঠার আগ মুহূর্তে কিছুটা সময় আমরা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিলাম তারপর হঠাৎ করেই আলোতে ঝলমল করে উঠল রুমটা। আমি দেখলাম মেয়েটির হাতের নখগুলো ফাঁটা, শুকনো রক্তের দাগ এখনও লেগে আছে।

হঠাৎ করে আলো জ্বলে ওঠা একটা রুমে আমার চেহারায় যে অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে হবে তা আমি বাসায় আয়নার সামনে প্রাকটিস করে করে আয়ত্ব করেছি। নিজেকে যেন সত্যিকারের দরদি মানুষের মতো লাগে, যাতে কাস্টমার তার সত্য কথাটা বলতে দ্বিধা না করে।

আমি মহিলাকে বললাম যে, ‘তোমাকে আমি গত তিনদিন ধরে দেখছি তুমি নিয়মিত আসছ।’ মহিলা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে আমার কথার বিরুদ্ধে কিছু বলল না। এবং আমি কিছু বলার আগেই সে কেন প্রতিদিন আসে তা বলতে শুরু করল। সে ডিটেইল বলতে থাকল তার মনোকষ্টের কথা যার অনেককিছু আসলে আমার জানারও দরকার নেই। তার খুব প্রিয় বন্ধু ক্যানসারে মারা গেছে তিনমাস আগে। এটা লিকুমিয়া ছিল যা বোনমেরুকে অকেজো করে দেয়। মেয়েটির এবং আমার মধ্যে আমি আমার হাতগুলো এমনভাবে ধরে রাখছিলাম যে আমি আর তার কথার মধ্যে আমি একটা দেয়াল দিয়ে রাখলাম।

তার আসলে আরো বেশি কষ্ট পাওয়ার কথা ছিল সেই সময়ে, এতদিন পর কেন এত কষ্ট হচ্ছে যখন আর তার কিছুই করার নেই। এখন সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর এখন কেন এত তার অনুশোচনা হচ্ছে, কেন মনে হচ্ছে আরো বেশি সময় ওর যত্ন নেওয়া উচিত ছিল, কেন তাকে বলল না তাদের বন্ধুত্ব কতটা গভীর ছিল; কতটা ভালোবাসত তাকে।

‘ও আমার খুবই ভালো বন্ধু ছিল, তুমি জানো ওকেই আমি আমার জীবনের সব কথা অনায়াসে বলতে পারতাম।’ এইসব বলার পর সে আমার দিকে তাকাল যেন তার প্রত্যাশা আমি তার কথা বুঝতে পারছি এবং এমন একটা কিছু বলব যা তাকে কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করবে। এমন সব কথা যা শুনলে মনে হবে গোছানো পরিপাটি অনেকটা যেন সিল্কের গায়ে সুন্দর করে লাইন দিয়ে লাগানো বোতাম।

কিন্তু এর কিছুই আমি বললাম না। আমি বরং আমাকে প্রশিক্ষণ-কালীন সময়ে শেখানো কথাগুলোই বললাম। বললাম, ‘কী আর করা! তুমি বরং কাউন্সিলরের সাথে দেখা করো।’ বলে আমি তাকে আমাদের হাতে থাকা কাউন্সিলরের লিস্টটা এগিয়ে দিলাম তার দিকে যাতে কাউন্সিলরের নাম অ্যালফাবেটিক্যালি লেখা।

মেয়েটি লিস্টটা নিলো এবং যত্নসহ ধরে থাকল। সে তার চেয়ার থেকে উঠল এবং মাথা নিচু করে ইন্টারভিউ রুম থেকে বেরিয়ে গেল, আমি তাকে ফলো করলাম। মেয়েটি উঠে যাওয়ার সময় এমনভাবে টেবিলটার পাশ দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল, আমি ভয় পাচ্ছিলাম যেন সে আবার ধাক্কা না মারে টেবিলে। মেয়েটি চলে যাওয়ার পর আমার মনে হলো সে আর এখানে আসবে না। এই ক্রায়িং রুম তাকে খুব একটা হালকা করতে পারে নেই বরং আজাইরা কিছু নিয়মকানুনের কথা শুনিয়েছে। আমার মনে হলো মেয়েটি হয়তো এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াবে আর কাঁদবে, মনে হয় ওর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, কেউ নেই যাকে সে বলবে তার কষ্টের কথা।

আমার নিজের বোনের কথা মনে পড়ল। জীবনে আমি তাকে একবারই কাঁদতে দেখছি পরিণত বয়সে। আমার বোনের মেয়েটা তখন মাত্র তিন মাস বয়স, সে খুব একটা ঘুমানোর সময় পেত না তাকে নিয়ে। আমার সেখানে গিয়ে মনে হয়েছিল যেন আমি একটা কিছু দেখে ফেলছি। আলিসন আমাকে দেখে কান্না লুকানোর চেষ্টা করেছিল, আর গোপনে চোখও মুছে ফেলছি তাড়াহুড়া করে, পরে আমারে বলছিল যে সে খুবই লজ্জিত কেঁদে ফেলার জন্য, এটা সে করতে চায়নি।

আমার মনে হয় আমি যদি বলতে পারতাম আলিসনকে, যে আমাদের ক্রায়িং রুমে যারা আসে তাদের যে আমি খুব উঁচু নজরে দেখি তা না কিন্তু আমি তাদের মনে জমে থাকা কষ্টগুলোকে কান্নার পানি দিয়ে মুছে দেওয়ার ক্ষমতাকে শ্রদ্ধা করি।

বিকালের আলো আসছে জানালা গলিয়ে তাতে মানুষের কান্নাভেজা মুখগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এক মুহূর্তের জন্যে আমার মনে হলো তাদের বিষণ্ন মুখগুলো যেন আলো এসে ধুয়ে দিচ্ছে।

যেন ওরা সব খনিতে কর্মরত মানুষ, যার মাথায় লেগে থাকা আলোর জন্যেই তার মুখটা অন্ধকার হয়ে থাকে। মনে হলো যেন কয়েকটা নুড়ি পাথর টুংটাং টুংটাং শব্দ করে গড়িয়ে পড়ছে নিচে, গভীর কোনো খাদে।

 

নোট : গল্পটি নেওয়া হয়েছে `New Australian Fiction 2019’ থেকে। লেখক সম্পর্কে কয়েক লাইন, গুগল থেকে পাওয়া। ‘Gretchen Shirm is a writer and lawyer. She has been published in The Best Australian Stories, Etchings, Wet Ink, and Southerly. She was named one of the Sydney Morning Herald's Best Young Australian Novelists for her collection, Having Cried Wolf.’

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

সর্বশেষ

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune