X
মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮

সেকশনস

রকিব উদ্দিনের বাঁশ-বিলাস

আপডেট : ০৮ মে ২০২১, ১২:৩০

বাঁশমতি নয়, কিনতে গিয়েছেন বাসমতি চাল—পরিচিত দোকানদার চাল ঠিকমতো দিলেও মেমোতে এভাবে ‘বাঁশ’ দিয়ে দেবে ভাবতে পারেননি রকিব উদ্দিন। মেমো হাতে নিয়ে হিসাব ও সওদা মেলাতে গিয়েই ধরা পড়ল বিষয়টা। কিছুক্ষণ পর স্ত্রী মতিবিবির কণ্ঠে বাঁশ চেরাইয়ের শব্দ ফুটল। কাছে গিয়ে দেখেন—অবস্থা গুরুতর। চালুনিতে ঢালা চালগুলোর উপরে হাঁটছে ইয়া বড় এক পোকা! রকিব উদ্দিনকে বিষয়টা চাক্ষুষ করতে দেখে মতিবিবির তেজ বাড়ল আরও—‘বলি, কম দামি চাল কিনতে গিয়ে আজকাল পোকামাকড়ও কেনা শুরু করেছ নাকি?’
‘কী যা তা বলছ গিন্নি? এই চালে নিশ্চয়ই ফরমালিন মেশানো হয়নি। যে কারণে প্রাণের অস্তিত্ব মিলছে।’
‘আর ইতর প্রাণীর মতো আমাকে এসব খাওয়াতে চাও? বলিহারি তোমার সস্তা চিন্তার।’
দাঁত দিয়ে জিভ কাটলেন রকিব উদ্দিন। এমন অপবাদ মেনে নেওয়া যায় না। একমাত্র শ্যালিকা দীর্ঘদিন পরে বেড়াতে আসছে, তাকে ভালোমন্দ খাওয়াতে হবে বলেই তো গিন্নি একশ’ পদের আইটেম লিখেছে রুলটানা কাগজে। বোনকে আপ্যায়নের জন্য ইউটিউব থেকে শিখছে নিত্যনতুন রেসিপি। মতিবিবির বাক্যে ঝাল উপর্যুপরি বাড়তেই থাকে—‘তুমি চাও না আমার বোন এখানে আসুক। এজন্য সস্তায় বাঁশমতি চাল কিনেছ। লিখলাম কী আর আনলে কী। চালাকি বুঝি না ভেবেছ!’
বাঁশ এবার কোন দিক দিয়ে যাবে ভেবে শঙ্কিত হলেন রকিব উদ্দিন। ভয়ংকর কয়েকটি চিত্র কল্পনা করে ধপাস শব্দ তুলে বসে পড়লেন বাঁশ-নির্মিত সোফায়। কোথায় যেন মটমট শব্দ উঠল। বেতের বদলে বাঁশ দিয়ে সোফা বানিয়েছেন। সেটা যতটা না খরচ বাঁচানোর জন্য, তারচেয়ে অনেক বেশি ঐতিহ্য সংরক্ষণের তাগিদে। বাঙালির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাঁশের যে অনিবার্য উপস্থিতি—উপলব্ধি করতে পেরেছেন অনেকে আগেই। তখন থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছেন বাঁশ যেন ‘জাতীয় কাষ্ঠ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ানোর। দৈনিক চিচিংফাঁক ও বাদানুবাদ’র সম্পাদকীয় পাতায় চিঠিও লিখেছেন দুটি। সংস্কৃতি ও জনজীবনে বাঁশের প্রভাব আলোচনা করে উপসংহার টেনেছেন, ‘তবে কেন এই উপকারী বস্তুকে জাতীয় কাষ্ঠ হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হবে না’ বলে।
রকিব উদ্দিনের প্রস্তাবনার সঙ্গে সহমত পোষণ করে বাদানুবাদ পত্রিকায় পাল্টা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন দুজন পাঠক। একজন এও বললেন, কিছু বিষয় আদতেই জাতীয় ইস্যু। তবে কেন সম্পাদকীয় স্তম্ভে লেখা থাকবে ‘মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন!’
চাল নিয়ে দোকানির এমন চালবাজিতে ক্ষুব্ধ রকিব উদ্দিন আবার চলে গেলেন বাজারে। কিনে আনলেন আরও পাঁচ কেজি। দেখে হাসি ফুটল মতিবিবির মুখে। প্রশ্রয়ের ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমি তো এমনি বকা বললাম। তুমি কিছু মনে করোনি তো!’
রকিব উদ্দিনও কম যান না। ফিচকে হাসি ঝুলিয়ে বললেন, ‘না। আমি সীমিত পরিসরে পোকা এনে দেখলাম তোমার কেমন লাগে!’
মতিবিবি আবার ফিরলেন স্বরূপে—‘দ্যাখো, বাঁশ-মারা কথা বলবে না!’
শ্যালিকার শুভাগমন ঘটল দুইদিন পরে। জম্পেশ খাওয়াদাওয়ার পরে বিছানায় গড়িয়ে নিল সবাই একটু। বিকালের রোদ নরম হতে শুরু করলে রকিব উদ্দিন বললেন, ‘বাতাসী, চলো তোমাকে আমার বাঁশ-নিবাসটা দেখিয়ে আনি।’
ভ্রুর বদলে ঠোঁট কুঁচকে গেল শ্যালিকার— ‘বাঁশ-নিবাস মানে?’
‘আহা, চলোই না। সরাসরি দেখবে।’
বাতাসীর জন্য তো বটেই, যে কারও জন্যই দর্শনীয় হতে পারে রকিব উদ্দিনের বৈঠকখানা। চারদিকে বাঁশগাছ, সেই বাঁশবাগানের ভেতরে বাঁশের চেয়ার-টেবিল ও লম্বা বেঞ্চি বানানো। বাঁশের ছড়ানো ডালপালা ছায়া বিস্তারে চমৎকার আলোছায়ার দৃশ্য রচনা করে। ব্যতিক্রমী এই বৈঠকখানায় বসে চায়ে চুমুক দেওয়ার সুযোগ অনেকের জন্যই হতে পারে জীবনের স্মরণীয় ঘটনা। মেহমানদের উদ্দেশে বাঁশের কঞ্চিতে লিখে রাখা হয়েছে ‘বাঁশবাগানে স্বাগত’। বিশাল বাগানে গাছের পাতারা বাতাসে নাচে-দোলে, শনশন শব্দ করে।
সবমিলিয়ে বাতাসী মুগ্ধ। মুগ্ধতা থেকেই বায়না ধরল, রাতের খাবারটা এখানেই খাবে। তাহলে তো আলো-বাতাসেরও ব্যবস্থা করতে হয়। একমাত্র শ্যালিকা বলে কথা। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন রকিব উদ্দিন। মতিবিবি এতদিন স্বামীর বাঁশ-কাণ্ডে বীতশ্রদ্ধ ছিলেন, বোনের পরিতৃপ্তি তাকে প্রসন্নতা দিল। মনে হলো, মিনসে যা করেছে একেবারেই খারাপ করেনি। উপযাচক হয়ে অন্যকে বাঁশ-চারা উপহার, অবাধ্য সন্তানকে শাসন করার জন্য ভালো মানের কঞ্চি, ঘরের চালের খুঁটি কিংবা বিয়ের সামিয়ানা তৈরির জন্য এতদিন তিনি যাকে তাকে বিনামূল্যে বাঁশ সরবরাহ করে এসেছেন; যেহেতু এতবড় বাঁশবাগানের সব বাঁশ নিজের লাগবে না; বিক্রি করে একশ’-পাঁচশ’ টাকা নেবেন তেমন চাহিদাও নেই। কোনো রকমে ডাল-ভাতে দিন পার করতে পারলেই তিনি খুশি। জীবনের ব্রত হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঁশকে জনপ্রিয় করার উপায় উদ্ভাবন। ভবিষ্যতে তিনি বাঁশ রেস্তোরাঁও চালু করতে চান। একটি ‘দ্বীপে’ থাকবে রেস্তোরাঁটি, চারদিকে থাকবে বাঁশের সাঁকো। সাঁকো পেরিয়েই প্রবেশ করতে হবে বাঁশ-রেস্তোরাঁয়। এখানকার চামচ-প্লেট-তৈজসপত্র সব হবে বাঁশের। কচি বাঁশের জনপ্রিয় যেসব রেসিপি প্রচলিত পাহাড়ে ও সমতলে সেসব তো থাকবেই, যুক্ত হবে আরও রেসিপি। সেসব আপাতত স্বপ্ন ও পরিকল্পনা।
রাতে বাঁশ-নিবাসে খেতে খেতে রকিব উদ্দিন শ্যালিকাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কী ধরনের বাঁশ তোমার পছন্দ?’
‘মানে?’ প্রশ্নের গতি-মুখ অনুধাবন করতে না পেরে গলায় ভাত আটকে গেল বাতাসীর। মতিবিবি বাঁশ খোলের গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন। পানি খেয়ে ধাতস্থ হলে মতিবিবি স্বামীকে লক্ষ করে কটাক্ষ হানলেন—‘তুমি আমার বোনকেও বাঁশ দেবে নাকি?’
‘কেন নয়! বাঁশ প্রকৃতিবান্ধব উদ্ভিদ। সবার ঘরে ঘরে থাকা চাই। ভাতে-মাছে যদি বাঙালি হয় তাহলে বাঁশে-ঘরেও বাঙালি!’
‘আমি বাঁশ দিয়ে কী করব, দুলাভাই?’ বাতাসীর এমন প্রশ্নে বিরক্ত হলেন রকিব উদ্দিন।
‘একজন বাঙালি হয়ে এমন প্রশ্ন করতে লজ্জা হলো না তোমার! বাঁশকে তুমি কীভাবে ব্যবহার করতে চাও সেটাও বলে দিতে হবে!’
‘কম সময়ের মধ্যে জানাতে হবে। কারণ তুমি এই বাড়ি থেকে যাওয়ার আগেই বাঁশগুলো কেটে সাইজ করে রাখতে হবে।’
অনেক ভেবে বাতাসী বলল, ‘তাহলে প্রথম কিস্তিতে আমাকে ছোট সাইজের একটা বাঁশ দিন। কাউকে কাউকে মাঝেমধ্যে খুব পেটাতে ইচ্ছা করে।’
মতিবিবি বলে উঠলেন, ‘ছোট দেখে আমাকেও একটা দিয়ো।’
রকিব উদ্দিনের থমথমে মুখ দেখে দুবোনেরই উপলব্ধিতে এল, এমন উপহার চাওয়া ঠিক হয়নি। অন্তত দাতা প্রসন্ন মনে এমন ‘ছোটখাটো’ উপহার দেন না। অপমানটা গা-সওয়া হয়ে এলে রকিব উদ্দিন বললেন, ‘ছোটবেলায় আমরা বাঁশে সঞ্চয় করতাম। ছনের ঘরের পিলার ছিল বাঁশ। সেই বাঁশের যেকোনো একটি গিরার প্রথমাংশ দা দিয়ে কেটে, ফুটো করে পয়সা জমাতাম। এক-দুই বছর পরে নিচের অংশ কাটলে অনেক টাকা হতো। তোমরা যদি আমার কাছ থেকে মিছেমিছি প্রয়োজন দেখিয়ে বাঁশ নিয়েও জমাতে, একসময় ঠিকই একত্রে কয়েক হাজার টাকার বাঁশ বিক্রি করতে পারবে। এত বাঁশ দিয়ে কী করব, আমার তো খাওয়ার লোক নেই!’
বাতাসী দুলাভাইয়ের দুঃখ আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘জানেনই তো, আমি শহরে থাকি। বাঁশ রাখার জায়গা পাব কোথায়!’
‘এই একটা বড় সমস্যা। যতই তোমরা শহরমুখী হচ্ছ বাঁশের সঙ্গে সম্পর্ক ততই কমছে। ধুলো-বালি, কালো ধোঁয়া, যানজট, ঘুষ, দুর্নীতি, মাত্রাতিরিক্ত গরম ও জলাবদ্ধতা ইত্যাদি শুষে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বাঁশ কি তোমরা শহরে পাও? পাও না। যে কারণে এত এত সমস্যা প্রকট হচ্ছে।’
‘আপনার কথা হয়তো ঠিক। তবে বাঁশের ব্যবহার কমার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে—স্কুল-কলেজে মাস্টাররা এখন বেত দিয়ে শিক্ষার্থীদের পেটাতে পারেন না। এ কারণেও অনেকেই বাঁশ-বিমুখ। ধুরন্ধর শ্রেণির লোকরা সবসময় অন্যকে অদৃশ্য বাঁশ দেওয়ার পাঁয়তারায় থাকে। তারাও সত্যিকারের বাঁশ পছন্দ করে না।’
শ্যালিকার জ্ঞানগর্ভ ভাষণে উৎফুল্লতা ফিরল রকিব উদ্দিনের—‘খুব ভালো একটা পয়েন্ট বের করেছ। অন্যকে বাঁশ দেওয়া চিন্তা তখনই আসে, যখন আমরা প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাই। প্রকৃতিবিমুখতাই হিংস্র ও স্বার্থপর করে তুলছে মানুষকে। এজন্য আমাদের প্রয়োজন বেশি বেশি বাঁশচর্চা করা। বাঁশপাতা দিয়ে খাওয়ার ভর্তা বানানো যায় কিনা সেটা নিয়েও পুষ্টিবিদদের গবেষণার আওতায় আনা উচিত।’
‘আপনার কথা মনে থাকবে দুলাভাই। শহরে গিয়েই আমি আপনার বাঁশতত্ত্ব ছড়িয়ে দেবো। মানুষকে অবশ্যই বাঁশমুখী হতে হবে। নইলে পৃথিবী বাঁচবে না, সংস্কৃতি টিকবে না।’
‘ঠিক। একটু খেয়াল করলে দেখবে, শৈশবে যারা বাঁশের দোলনায় দোল খেয়েছে কিংবা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে দাঁত মেজেছে তারাই বড় হয়ে বড় মানুষ হয়েছে। আর যারা বাঁশের ছোঁয়া পায়নি এরা হয়েছে ফার্মের মুরগি।’
মতিবিবির গলায় এবার নরম সুর। বিদগ্ধ আলোচনায় অযাচিত হস্তক্ষেপের ভঙ্গিতে বললেন, ‘ফার্মের মুরগির বাজার কিন্তু এখন উঠতির দিকে। গতকাল দেশি মুরগি কিনেছ।’
‘ইয়ে... তাহলে ওদের আমরা পচা আলু হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি।’
‘আলু সবজি হিসেবে উন্নত মানের। মাছে দেওয়া যায়, আবার মাংসেও।’ বাতাসীর কথা ফের ঐতিহ্যের দিকে ঠেলে দিলো রকিব উদ্দিনকে—‘ছোটবেলায় আমরা লাকড়ির রান্না খেতাম। জ্বালানি হিসেবে বাঁশ ও কঞ্চি ছিল জনপ্রিয়। সেসব এখন নেই বলেই গ্যাস্ট্রিক, পেটের পীড়া বেড়েছে বহুগুণে। গ্যাসে কি ভেষজ উপাদান আছে? একটুও নেই!’
মতিবিবি যেন এবার বড় অস্ত্র পেলেন হাতে। বললেন, ‘তোমার কীর্তি আমি শুনিনি মনে করেছ? ছোটবেলায় কঞ্চি দিয়ে গুলতি খেলার সময় এক ছেলের চোখ কানা করে দিয়েছিলে তুমি। তারপর তো বাড়ি থেকেই পালিয়েছ। এই তোমার ভালো বাঁশের উদাহরণ!’
‘দ্যাখো গিন্নি, বাঁশ থেকে বাঁশিও কিন্তু হয়। গুণ থাকলে সেই বাঁশিতে চমৎকার সুরও তোলা যায়। এই সুরের সম্মোহনীতে কদমতলায় যুগে যুগে প্রেমিকরা আস্তানা গাড়ে, অবিবাহিতা মেয়েদের উতলা করে। সবসময় ইতিবাচক জিনিসটাকেই বেছে নিতে হয়।’
দুলাভাইয়ের পক্ষ নিয়ে বাতাসী বোনকে বলল, ‘তুই সবকিছুতে দুলাভাইকে কোণঠাসা করিস কেন রে?’
‘ও আমার মনমতো চলে না কেন!’
দুজনের মাঝখানে নাকটা গলিয়ে দিলেন রকিব উদ্দিন, ‘বাঁশের প্রকারভেদ অনেক কিন্তু বাঁশ মূলত দুই প্রকার। আইক্কাওয়ালা ও আইক্কা-ছাড়া। এসব বাঁশ অবশ্য গৃহে ব্যবহার হয় না। সেখানে থাকে ছিপছিপে কঞ্চি। আমি যদি এমন একটি কঞ্চির মালিক হতাম আমার ক্ষেত্রে মতিবিবির এতটা দুর্মতি হতো না।’
‘কী বললে? আমাকে মারবে!’ তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন মতিবিবি। স্মিত হেসে রকিব উদ্দিন বললেন, ‘ওইভাবে নিচ্ছ কেন? ওষুধ হিসেবেও যে বাঁশ কার্যকরী সেটাই স্মরণ করিয়ে দিলাম। বিশ্বাস হয়নি? পুলিশ যে লাঠিচার্জ করে অধিকাংশ কিন্তু বাঁশেরই। একবার হলো কী, এক লাঠিচার্জে পড়ল আমার বন্ধু মাহতাব। পরদিন কাগজে ছবি ছাপা হলো। সে নিজের পিটুনি খাওয়ার অসম্মানের কথা ভুলে লোকজনকে কাগজ দেখিয়ে বলতে লাগল—এই দেখুন, আমার ছবি ছাপা হয়েছে!’
এমন গল্পে খিলখিল করে হেসে উঠল বাতাসী। তখনো মতিবিবির মুখ ভার। তা দেখে মৃদুস্বরে বাতাসী বলল, ‘প্রবাদের কথাই সঠিক, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়!’
মতিবিবি সরব হলেন আবার—‘তুই কি আমারে কিছু কইলি?’
‘বলেছি। আমাদের ঘুমানোর আয়োজন করতে হবে না?’
মতিবিবিকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিলেন না রকিব উদ্দিন; বাতাসীকে উদ্দেশ্য করে বললেন—‘আমার অন্তিমযাত্রায় ব্যবহার জন্য দুইটা বাঁশ ঠিক করে রেখেছি। দেখবে?’
‘বালাই ষাট!’
‘ওই ষাট-সত্তরের হিসাব এখন আর নেই। পঞ্চাশের পর থেকেই অক্কা পাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। আর জলে-ঘোলে আমার বয়সও তো কম হলো না!’
রকিব উদ্দিন উঠে দেখান তার সমাধিতে ব্যবহারের জন্য নির্বাচিত বাঁশ দুইটি। বাতাসী বাঁশদ্বয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে দেয় সযত্নে! রাত বলে তার চোখে পড়ে না, দুই বাঁশের গায়েই রকিব উদ্দিন পেন্সিলে লিখে রেখেছেন ‘শেষযাত্রার বিশ্বস্ত সঙ্গী’। দুজনের উদ্দেশেই মতিবিবি বললেন, ‘তোরা তাহলে অন্তিম ঘুমের চিন্তা কর। আমি ঘরে গেলাম!’
শ্যালিকার বিদায় দিনে বড় পাঁচটি বাঁশ উপহার দিলেন রকিব উদ্দিন। বাতাসীর গ্রহণে ইতস্তত প্রকাশ, কোথায় রাখবে কীভাবে নেবে... সব দ্বিধার জবাব মিলল এভাবে—‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’! তবে শ্যালিকা যে খুবই করিৎকর্মা তাও বোঝা গেছে ফেরার এক সপ্তাহের মধ্যেই। দৈনিক হায় দিন আয় দিন’র জেলা প্রতিনিধি এল রকিব উদ্দিনের বাড়িতে। পরের সপ্তাহেই প্রকাশিত হলে সম্পূর্ণ রঙিন বিশেষ ফিচার—‘একজন রকিব উদ্দিন ও তাঁর বাঁশ-সাম্রাজ্য’। সেদিনই কাগজের প্রথম পাতায় সচিত্র প্রতিবেদনে জানানো হলো—ভবন তৈরিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাঁশ! রডের তুলনায় কম খরচে মেলে বলে কঞ্জুস নির্মাতারা এদিকেই ঝুঁকছে। বিষয়টা টক অব দ্য কান্ট্রি হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর অনুসন্ধানে নামে। বেরিয়ে আসে রকিব উদ্দিনের নাম। গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, যত জায়গায় বাঁশ-ভবন নির্মিত হচ্ছে সব বাঁশের চালান যাচ্ছে বাঁশাধিপতি রকিব উদ্দিনের বাড়ি থেকে। এই যাত্রায় তার বেশ ভালোই ধকল গেল। কিছুতেই বোঝাতে সমর্থ হননি তার বাগানের বাঁশের ব্যবহার ইতিবাচক। কারও মাথাও বাড়ি দেওয়া কিংবা মাথার ছাদ হিসেবে ব্যবহারের জন্য নয়। সরকারি বাহিনী কোনো কথা আমলে না নিয়ে শাসিয়ে গেল, ফের বাঁশ স্থাপনার অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘুষ দিলেও রক্ষা নেই!
কিছুদিন ঘটল ট্রেন দুর্ঘটনা। যাত্রীসহ উল্টে পড়ল ট্রেন। এবার রেললাইনের স্লিপারে বাঁধা বাঁশের অস্তিত্ব মিলল। এখানেও রকিব উদ্দিনের সংশ্লিষ্টতা আবিষ্কার করেছে উৎসাহী পক্ষ। ফলে বাঁশ বিনোদন কেন্দ্রে অভ্যাগতদের যাতায়াত কমতে লাগল। যাদের তিনি দাওয়াত দিতেন, প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী বাঁশ উপহার দিতেন এরাও অনেকেই গাঢাকা দিল। সেধে কে বিপদে পড়তে চায়! বেসরকারি টেলিভিশন প্রতিবেদনে, কাগজের লাল কালির শিরোনামেও উঠে আসে রকিব উদ্দিনের নাম। মধ্যরাতে টেলিভিশন টকশোর আলোচকরা প্রশ্ন তুললেন, রকিব উদ্দিনের খুঁটির জোর কোথায়, কীভাবে, কাদের প্রশ্রয় তিনি গড়ে তুলেছেন বাঁশ-সিন্ডিকেট? রেললাইনের স্লিপারে কিংবা ভবনে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগই শুধু নয়, যারা জনমভর বাঁশ খেয়ে এসেছে এরাও হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল রকিব উদ্দিনকে। একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বে, একটা লোক লাখো মানুষকে যুগের পর যুগ বাঁশ দিয়ে যাবে তা হতে পারে না!
অনেক আলোচনা-সমালোচনা ও নিন্দার মধ্যে একদিন রকিব উদ্দিন গোপন সূত্রে খবর পেলেন, তাকে ধরতে আসছে প্রশিক্ষিত একটি বাহিনী। মতিবিবি ভয়ার্ত কণ্ঠে বললেন, ‘এখন কী হবে?’
অভয়ের হাসি দিয়ে রকিব উদ্দিন বললেন, ‘ভয় নেই। যার কেউ নেই, তার বাঁশ আছে। বাঁশই আমাকে সুরক্ষা দেবে। তোমাকেও। অবস্থা বেগতিক দেখলে বাঁশ হাতে নিয়ে শত্রু মোকাবিলা করবে!’
লুঙ্গিতে মালকোছা মেরে রকিব উদ্দিন উঠে গেলেন বড় বাঁশটির ‘মগডালে’। দুই দিনের খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে। অন্য বাঁশগুলোর গায়ে ঝুলিয়ে রেখে পাততে হবে ভাসমান সংসার। এই যাত্রায় কতদিন থাকতে হবে, কে জানে! যত যা-ই হোক, ধরা দেওয়া চলবে না। চারপাশে পরিবেষ্টিত খাকি ইউনিফর্ম পরা লোকের মাঝখানে সবুজমানব রকিব উদ্দিনকে মানাবে না মোটেও!

/জেডএস/

সর্বশেষ

জেফ বেজোসকে মহাকাশে পাঠানোর আবেদনে ৩০ হাজার মানুষের স্বাক্ষর

জেফ বেজোসকে মহাকাশে পাঠানোর আবেদনে ৩০ হাজার মানুষের স্বাক্ষর

ভিক্ষুক জাতির কোনও মর্যাদা নেই: বঙ্গবন্ধু

ভিক্ষুক জাতির কোনও মর্যাদা নেই: বঙ্গবন্ধু

আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় জয়

আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় জয়

ঘু‌রে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ব্রিটে‌নের বাংলা‌দেশিরা

ঘু‌রে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ব্রিটে‌নের বাংলা‌দেশিরা

৬ মিনিটের ঝলকে গ্রুপ সেরা বেলজিয়াম

৬ মিনিটের ঝলকে গ্রুপ সেরা বেলজিয়াম

প্রথমবারের মতো আমিরাত সফরে যাচ্ছেন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রথমবারের মতো আমিরাত সফরে যাচ্ছেন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আজ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে রাজধানী

আজ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে রাজধানী

বাংলাদেশের ফেসবুক লাইভে যুক্ত হচ্ছেন নোম চমস্কি

বাংলাদেশের ফেসবুক লাইভে যুক্ত হচ্ছেন নোম চমস্কি

দুবাইয়ের সেই রাজকন্যাকে স্পেনে দেখা গেছে

দুবাইয়ের সেই রাজকন্যাকে স্পেনে দেখা গেছে

পিরোজপুরে ১৮ ইউপিতে নৌকা, ১১টিতে স্বতন্ত্র জয়ী

পিরোজপুরে ১৮ ইউপিতে নৌকা, ১১টিতে স্বতন্ত্র জয়ী

জ্যামিতি বক্সে ইয়াবা বহন করতেন বাবা-ছেলে

জ্যামিতি বক্সে ইয়াবা বহন করতেন বাবা-ছেলে

‘আমরা ১০-১১ গোল খেতাম, এখন ৫-৬টা খাই’

‘আমরা ১০-১১ গোল খেতাম, এখন ৫-৬টা খাই’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

আমার গুণ
আমার প্রিয়-অপ্রিয়

আমার প্রিয়-অপ্রিয়

প্রেমের কবি

প্রেমের কবি

আমার চেতনার কবি

আমার চেতনার কবি

সুফিয়া কামালের কবিতা

সুফিয়া কামালের কবিতা

অশ্রুবিন্দুর মতো স্পষ্ট ও নিঃসঙ্গ

পাখিদের নির্মিত সাঁকোঅশ্রুবিন্দুর মতো স্পষ্ট ও নিঃসঙ্গ

দেখা না দেখার বায়োস্কোপ

দেখা না দেখার বায়োস্কোপ

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ ও হাসান হাফিজুর রহমান

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ ও হাসান হাফিজুর রহমান

ঈশ্বর ভাবনার ‘বিগ্রহ ও নিরাকার’

ঈশ্বর ভাবনার ‘বিগ্রহ ও নিরাকার’

মলিন জগতের প্রাণ

মলিন জগতের প্রাণ

© 2021 Bangla Tribune