X
শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

গহন

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ১২:১০

১.

একটা পোড়া গন্ধ সহোদরার মতো আমার সাথে লেগে আছে সে অনেক্ষণ। ঠিক মাংস পোড়া না, আবার বন পোড়াও না। মনে হয় পালক পোড়া গন্ধ। তবে উৎকট গন্ধ না, আবার মিষ্টিও না—হালকা একটা পালক পোড়া গন্ধই এতক্ষণ ধরে হাঁটতেছে আমার সাথে সাথে। শ্মশানের মতো বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াতেই গন্ধটা যেন একটু নড়েচড়ে উঠে জানান দিলো এটাই তার অঙ্গারখানা। এখানকার ছাইই সুরমা হয়ে লেগে আছে রোহানের চোখে। এখানকার গন্ধই আতর হয়ে লেগে আছে মেহগনির গায়ে।

‘রোহানরে যাদু আমার, এইডা তুই কী করলি।’ রানু খালার এই বিলাপ আমাকে খুব একটা বিচলিত করেনি, আমি যেমন দাঁড়িয়ে ছিলাম তেমনি আছি। মোখলেচ-রোহানের সাগরেদ যার সাথে দেখা হইছিলো গতবার—আমাকে চিনতে পারে। চেনার আলামত হিসাবে আমার কাছে এসে দাঁড়ায়, হয়তো কোন কথা ওর বুকের ভিতর আকুপাকু করতেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে বলা কতটা শোভন হবে তা ভেবে সে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। আমি নিজে থেকে আগায়ে গিয়া বললাম, ‘মন খারাপ কইরো না মোখলেচ। তোমার উস্তাদ শান্তির দেশেই গেছে। ওর জন্যে এরচেয়ে ভাল আর কিই-বা হইতে পারতো।’ পাশ ফিরে তাকাতেই আমি মোখলেচের বদলে একটা শিশু মেহগনিকে ঈশ্বরের তপ্ত নিশ্বাসে কেঁপে কেঁপে উঠতে দেখি।

আমার মনে হয়, যদি উঁকি দেই এই অসমাপ্ত বাড়িটার কোনার একটা রুমে, যা গত পনেরো বছর ধরে ছিলো রোহানের আস্তানা, দেখবো এখনও সে হেলান দিয়ে বসা এবং পাশে বসে আসে মোখলেচ ও আরো দুই একজন গাঞ্জুট্টি স্যাঙ্গাৎ। শেষবারের প্রথম দর্শনের দৃশ্যটা তো এমনই ছিলো। রোহান আমাকে দেখে অবিশ্বাসী দৃষ্টি নিয়ে শূন্যতার দিকে তাকিয়ে ছিলো, যেন মরা মাছের খোলা চোখ, যেন ঘোলা পানির নিচে শুয়ে আছে দুইটা শিশু কাছিম। আমি কি রোহানের দিকে তাকায়ে মুচকি মুচকি হাসতেছিলাম?—হয়তো তাই। এই এখনও যেমন আমি টের পাচ্ছি আমার ঠোঁটের কোণে একটু হাসি হাসি ভাব, আর আমার মুখমণ্ডলে উদ্ভাসিত হচ্ছে একটা অচেনা প্রাপ্তির নিষ্ঠুর তৃপ্তি। রোহান হয়তো বুঝতে পারতেছিল না আমার এত খুশি হওয়ার কী আছে। এত বছর পর এমন আচমকা এসে রোহানকে খুশি করার সুযোগ আর আদৌ আছে কিনা তা নিয়ে আমি কিছুটা সন্দিহান ছিলাম। তারপরও প্রথম দেখার মুহূর্তে তো আর এত কথা, এত রাগ, এত অভিমান মনে থাকে না। হয়তো একটু পরেই একটা একটা করে মনে পড়বে। আর আমার উচ্ছ্বাস চুপসাইতে থাকবে বেলুনের মতো। আমার খুব ইচ্ছা করতেছিলো রোহানকে একটু জড়ায়ে ধরি। যদি রোহান একটু উঠে এসে আমাকে একটা হাগ দিতো, আমি এটা কল্পনা করতে পারি, এটুকুই, এর বেশি আমি ওর কাছ থেকে আশা করতে পারি না। রোহান যেমন বসা ছিলো তেমনই বসে থাকে। এক মুহূর্তের জন্যে চোখ নামিয়ে আবার চোখ তুলে তাকায় আমার চোখে সরাসরি। আমার মনে হয় রোহানের চোখ দুইটা আমার চোখের ভিতর দিয়ে আমার কলিজায় গিয়ে ঘা মারল। এই চাহনি নতুন না, কিন্তু এত বছর পরও তা একই রকম থাকবে তা আমি আশা করি নাই।

রোহানের চোখ আর আমার চোখের সামনে নাই, কিন্তু ওর ঘা-মারা-দৃষ্টি এখনও আমায় দেখছে এই পোড়া গন্ধমাখা বাড়িটার ভিতর বসে বসে। আমি এই ক্লান্ত অবসন্ন শরীর নিয়ে বাড়ির ঐ কোনার রুমটার দিকে আর আগানোর সাহস করলাম না। আমি তো জানি ঐ ঘরে আর এখন কেউ নাই; এমনকি স্মৃতিরাও মৃত। বাড়িটা আগের চাইতে অনেক বেশি জঙ্গলাকীর্ণ হইছে। গতবার যখন আসছিলাম তখন রোহান পাঁচটা মেহগনির চারা লাগাইছে দেখাইতেছিলো। আর বলতেছিলো, 'নেক্সট যখন আসবা দেখবা এইগুলো আর চারা নাই বিশাল বৃক্ষ হয়ে গেছে।’

রোহানের পক্ষে কি আর কখনও জানা সম্ভব হবে যে মাত্র দুই বছরের মাথায় ওর খোঁজে এসে ওর লাগানো মেহগনির পাশে আমি এতিমের মতো বসে আছি। চোখের সামনে ওর বাগানবাড়ি; এটা একসময় শ্মশানবাড়ি হিসাবে পরিচিত ছিল। দূরে দেখা যাচ্ছে পুষ্কুনির পাড়। যে কারো হঠাৎ দেখে মনে হতে পারে ওটা মহুয়ার তীর, পুষ্কুনির পাড় না। তীর লাগোয়া শ্মশানের মঠটা রোহানের মতোই গোঁয়ার, ভেঙে ভেঙেও স্বাক্ষী হয়ে থাকার জিদ সারা অঙ্গে মেখে দাঁড়িয়ে আছে; যেন কিছুতেই মিশবে না, কিছুতেই বলবে না আমাকে একটু ধরো। কেবল ওর বাড়িটার ভেতরই ঝোপঝাড়ে ঠাসা, নিশ্চয় গরু ছাগলও সেখানে যেতে ভয় পায়। দেখলে বোঝা যায়, বাড়িটা এখন সাপ-নেউল, শেয়াল আর সজারুর দখলে চলে গেছে। এই পুষ্কুনিতে তো কেউ কখনও গোসল করতে আসে বলে মনে হয় না, আসে কি? পানির রং দেখে মনে হয় শুধু ভূত-পেত্নীই পারে এই পুকুরে গোসল করতে। দুই বছর আগে মোখলেচ বলতেছিলো, রুম আর এই পুষ্কুনির পাড় এই তার গুরুর দুনিয়া। এর বাইরে সে গত পনেরো বছরে কোথাও যায় নাই।

‘মোখলেচ, তোমার গুরু নাকি গোয়ালন্দ গেছিলো? তুমি কিছু জান?’

‘না আপা গুরু জীবনেও এই বাড়ির বাইরে যায় নাই, খোদার কসম। আমি আছি না—আমি যাই, যেখানেই যাওয়া লাগে। গুরু বাইর হয় না। উনার কাছে সবাই আসে, উনি কারো কাছে যায় না।’

মোখলেচের কথা শুনে আমার রাগ হওয়া উচিত ছিলো কিন্তু আমি তা না করে মুচকি মুচকি হাসছি আর খোঁচাচ্ছি মোখলেচকে আমার মাথায় বিঁধে থাকা ক্রুশকাঁটা দিয়ে। মনে মনে বলছি, আরও আরও কথা বল মোখলেচ; আমার খুব জানা দরকার রোহান কী কী করে।

‘তোমার গুরু এখন সাধু সাজছে, না?’

‘জি আপা গুরুর কোনো লোভ নাই। উনি খাঁটি সাধু।’

আমি মনে মনে বলি একটা ড্রাগ ডিলার কেমনে সাধু হয় মোখলেচ? প্রশ্নটা গিলে ফেলে বরং মোখলেচকে একটা হাসি উপহার দেই। মোখলেচ গুরুর গরিমায় কিছুটা স্ফীত হয়ে ওঠে। মানুষ এমনই মাকাল ফল, তার বাহির দেখে ভিতর বোঝার উপায় নাই। রোহান সাদা কাপড় পড়ে, চুল দাড়ি কাটে না, একটা সাধু সাধু ভাব আছে। প্রথম দেখে আমারও তাই মনে হইছিলো, তারপর ড্রাগের সাথে সম্পৃক্ততার কথা মাথায় নিয়ে কিছুতেই আর সাধু হিসাবে দেখতে পারতেছিলাম না। এই সুফি বেশ নিয়ে ও যখন মিথ্যা বলে, যখন বলে ও গোয়ালন্দ গেছিল চাচিকে খুঁজতে, চাচি নাকি এখন গোয়ালন্দ মাগিপাড়ার নেত্রী, তখন আমার পক্ষে ওর এই সুফি ভাবকে হিপোক্র্যাসি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় নাই। আবার ভাবি, ও হয়তো আমাকে আঘাত করার আর কোন অস্ত্র না পেয়ে চাচিকে বেছে নিছে। ও জানে আমাকে কোথায় আঘাত করলে ব্যাথায় নীল হয়ে যাব, কিন্তু টুঁ শব্দটাও করব না। চাচি চলে যাওয়ার পর থেকেই তো রোহান আসলে সাধু ভাব নিয়ে নিছিলো। সেই ছোটবেলায় যখন রোহানের বয়স ৭-৮ তখনই ও কথা বলতো না, সমবয়সীদের সাথে খেলতে যাইতো না, চেয়ে কখনও খাইতো না। দিলে খাইতো না দিলে চুপচাপ পুষ্কুনির পাড়ে গিয়ে বসে থাকতো।

একটা জীবন পুষ্কুনির পাড়ে বইসা পার করে দিলি রোহান?

২.

মাঝেমধ্যে ভাবি আমাদের ফ্যামিলির পাপটা কোথায়? আমরা সবাই এত অভিশপ্ত কেন? চাচি চলে যাওয়ার পর রোহানকে সত্যি আমি কোলেপিঠে করে বড় করেছি। সারাদিন আমার পিছে পিছে ঘুরতো, রাতেও আমার সাথেই শুইতো। ওমা! বছর দু'য়েক যাওয়ার পরই দেখি ছেলের নুনু খাড়ানো শুরু করছে। যদিও রানু খালা বলছিলো বাচ্চাদের নুনু সেক্সের জন্যে খাড়ায় না, প্রস্রাবের প্রেসারে নাকি খাড়ায়। আস্তে আস্তে ও আমার বুকেও হাত দেওয়া শুরু করল। আমি যতই হাতটা পেটে নিয়ে দেই কিছুক্ষণ পর দেখি হাতটা আবার বুকে চলে আসছে। তারপর দিতাম চিপা ঝাড়ি, জোরে কিছু বলাও যেত না। পাশের খাটেই আবার ছোট ফুপি। তারপরও ছোটফুপি কেমনে কেমনে যেন টের পায়। একদিন রোহানকে বলে, 'রোহান এবার বড় হইছো বাবা, এখন আর আপুর সাথে ঘুমানোর দরকার নাই, ঠিকাছে? এখন থেকে পাশের রুমে শুইবা।' রোহান বরাবরের মতই কিছু বলে না। শুনল কী শুনল না তাও বোঝা যেত না। পাশের রুম আমার পড়ার রুম, একটা ছোট্ট চকি ছিলো। পরের দিন আমি নিজেই সেখানে ওর জন্যে বিছানা করে দেই, রাতে সাথে নিয়ে গিয়ে শোয়ায়ে দেই। শেষে একটা চিমটি দিতেও ভুলি না।

ওমা! অর্ধেক রাত পর দেখি ও আবার আমার বিছানায়। সেটাও ফুপি টের পায় এবং রোহানকে ঝাড়ি দেয়। ঘোষণা করে যদি কথা না শোনে তাহলে নানির বাড়িতে পাঠায়ে দেবে। রোহানের নুয়ে পড়া মাথা আরো আরো নুয়ে পড়তেছিলো। ওর পুরো শরীরে ফুটে উঠতেছিলো লজ্জা আর কষ্টের এক আশ্চর্য পারিজাত। আমার খুব ইচ্ছা করতেছিলো ওকে একটু আদর করি, একটু মাথায় হাত বুলায়ে দেই, আর একবার বুকের সাথে মিশায়ে দেই প্রিয় মুখটা। কিন্তু ফুপির ভয়ে আমি রোহানের দিকে তাকাতেও পারতেছিলাম না।

মেয়েমানুষ হয়ে জন্মাইছি, সাহস দেখানোরও সাহস নাই। মধ্যাহ্নের এই নির্জনতা উপভোগেরও উপায় নাই। নিজের অজান্তেই ইন্দ্রিয় সংকেত দিচ্ছে—ওঠা উচিত, ওঠা উচিত। এরই মধ্যে অচেনা পাখির অদ্ভুত আর্তনাদ ক্ষণে ক্ষণে অত্নরাত্মা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। আমি পাখি খুব বেশি চিনি না। দুয়েকটা কমন পাখি চিনি—শালিক, কাক, ঘুঘু, চড়ুই। কিন্তু এমন কোনো পাখির দেখা এই বাড়িতে পাই নাই। হঠাৎ করে একটা বাচ্চার কান্না আমার সমস্ত শরীর এমন কাঁপায়ে দিলো যে আমি ঠিক বুঝতেছিলাম না কী করব। এদিক সেদিক চোখ যেতেই আমার মাথার উপর রেনট্রির ডালে বসা একটা পেঁচাকে দেখলাম। মনে পড়ল আমি পেঁচাও চিনি; দেখছি আগেও বহুবার। পেঁচা নাকি ভেংচি মারে, ওদের ডাকও নাকি বাচ্চার কান্নার মতো শোনায়, দাদি বলতো। আমি কখনও পেঁচার ভেংচি বা কান্না শুনছি বলে মনে পড়ছে না। দাদি বলতো নির্জন দুপুরে বা সন্ধ্যায় এরা ডাকে আর কোনো মানুষকে একা দেখলে পুরা মাথাটা উল্টা দিকে ঘুরায়ে এমন ম্যাজিক দেখাবে যে তোর যদি জানা না থাকে তো ভয়ে মুতে দিতে পারিস। দাদির কথা মনে পড়াতে একটু সাহস পেলাম। পেঁচাটার দিকে ভালো করে তাকালাম। দেখি ও আমাকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতেছে। ওর চোখে চোখ পড়তেই আমি কেঁপে উঠলাম। মনে হলো আমি এই চোখ চিনি। যে দৃষ্টি আমার চোখ হয়ে বুকের ভিতর গিয়ে ঘা মারে। আমাকে চোখ সরানোর কোনো রকম সুযোগ না দিয়ে পেঁচাটা শাই করে আমার উপর দিয়ে উড়ে চলে গেল। পোড়া গন্ধটা আবারও এসে নাকে লাগল।

৩.

রোহানের মামাবাড়িতে এখন আর কেউ নাই। নানুর কথা মনে আছে, খুব দেমাগী মহিলা ছিলো। চাচিও নিশ্চয় নানুর স্বভাব পাইছিলো। চাচিরও দেমাগে নাকি মাটিতে পা পড়তো না। এইগুলো অবশ্য ছোট ফুপির কথা। আমার মনে হয় চাচির নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পেছনে ছোট ফুপির অসূয়াই ছিলো বড় কারণ। চাচির প্রতি ছোট ফুপির ঈর্ষা আমি ছোট মানুষ তবুও বুঝতাম। ছোট ফুপি আর দাদি যেন কোমর বেঁধে লেগে ছিলো চাচিকে বাড়িছাড়া করার জন্যে। নিজেও এমন একটা ফ্যামিলির সাথে গাঁটছড়া বাঁধার পর জানি, মানুষ কিভাবে মানুষকে পাগল বানায়ে ফেলে।

দাদাও ততদিনে নিজের সব দাপটের নিচে চাপা পরা এক মরা বাঘ, যার নখ আছে ধার নাই, রাগের গরগর আছে হুঙ্কার নাই। যে দাদার ভয়ে আমার বাবা-চাচা চিরদিন শিশুই থেকে গেল। সেই দাদা এখন ছোট ফুপির হুঙ্কারে সদা কম্পমান, আম্মা ছাড়া কোনো কথা বলে না। কথা শুরু এবং শেষ দুই জায়গায় দুই আম্মার ব্যবহার আমার পিত্তি জ্বালায়ে দিত। মনে মনে ভাবতাম কবে এই অভিশপ্ত পরিবার আমি ত্যাগ করব। কবে আমার ইন্টার পরীক্ষাটা শেষ হবে, কবে কোন একটা ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে উঠবো। একবার বাড়ির বাইরে যাইতে পারলে জীবনেও আর এমুখো হবো না। তখন একবারও রোহানের কথা ভাবতাম না। আমার নিজের জীবনই তখন এত বিষায়ে উঠছিলো যে একটু শ্বাস নেওয়ার জন্যে হলেও আমাকে বাড়ি ছাড়তে হবে, এই ছিলো দিন-রাত্রির কল্পনা। দাঁত-মুখ খিঁচে তখন একটাই কাজ ছিলো পড়াশোনা। বুঝতে পারছিলাম, এই অভিশপ্ত জায়গা থেকে আমার পরিত্রাণ পাওয়ার একটাই পথ—কোনো একটা ভার্সিটিতে ভর্তি। আহা! রোহান তুইও যদি আমার মতো চিন্তা করতে পারতি, যদি পড়াশুনাটা করতি, যদি দেশ ছেড়ে আমার কাছে চলে আসতে পারতি, তাহলে বিদেশের বাড়িতে আমরা যা খুশি তাই করতে পারতাম। 'চল পালায়ে যাই' তোর অবুঝ আবদারই হয়তো তখন আমরা সত্যি বানায়ে ফেলতে পারতাম। আচ্ছা পালায়ে যাওয়ার বুদ্ধি তোরে কে দিছিলো?

মাঝে মাঝে ভাবি রোহানের মাথায় কেন আসছিলো পালায়ে যাওয়ার কথা? ও তখন স্কুলেও যায় না। একদিন যায়তো তিন দিন যায় না। কারো কথাও শুনে না; না ফুপির, না আমার। ততদিনে দাদার কথা বলার শক্তিও আর অবশিষ্ট নাই। ও মনে করতো ওর সব আবদারই যেহেতু আমি মেনে নেই বিয়ের আবদারও বোধ হয় মেনে নেব; গাধা একটা।

রোহানের বড়মামার চেহারাও একটু একটু মনে পড়ে। এখন দেখলে আর চিনবো কিনা কে জানে। ছোটমামার কথা কিছুই প্রায় মনে নাই। শুনছি ছোটমামা এখন কানাডায় থাকে। আর বড়মামা ঢাকায়। উনাদের বাড়ি এখন শেয়াল-কুকুর আর পোকামাকড়ের দখলে। এই বাগানবাড়িটাও বড়মামা নিজে শুরু করছিলো রিটায়ার্মেন্ট লাইফে থাকবে বলে। কী কারনে যেন কিছুদূর করে আর করে নাই। পরে রোহান এসে এখানে আস্তানা গাড়লো। আস্তানা হিসাবে বাড়িটা সত্যিই চমৎকার। চারদিকে দেয়াল ঘেরা, বিশাল পুষ্কুনি সাথে চারপাশে নানা রকম গাছের সমাহার। এমন একটা বাড়ি থেকে যে ইনকাম হওয়ার কথা তা দিয়েই কিন্তু রোহান চলতে পারতো। ওর ড্রাগ ডিলিংয়ে জড়াতে হইছিলো কেন? না মোখলেচকে যেকোন ভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে। গ্রামে কেউ না কেউ ওর খোঁজ দিতে পারবে নিশ্চয়।

৪.

বাড়িটা থেকে বের হয়ে একটা গোপাট ধরে কয়েকশ গজ গেলেই সড়ক। সড়কটা এখনও পাকা হয় নাই। তবে রিকশা চলে আর আধা মাইল মতো গেলেই রিকশা স্ট্যান্ড পাওয়া যায়। রাস্তাটার কাছে যেতেই দেখি একটা খালি রিকশা আসতাছে। জিগাইলাম গাংনি বাজারে যাবে কিনা, সেও রাজি হয়ে গেল। বাজার বলতে যা বোঝায়, গাংনি বাজার আসলে সেরকম না। একটা খোলা যায়গা, পাশে একটা প্রাইমারি স্কুল এবং এই স্কুল মাঠে সপ্তাহে দুইদিন হাট বসে। এলাকার মানুষ গাংনি বাজার হিসাবেই চিনে; রোহানের নানাবাড়ির কাছে। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয় কেউ না কেউ মোখলেচের খোঁজ দিতে পারবে।

’চইত মাইয়া দিনের রোইদ গো আম্মা অক্করে আড্ডিত গে লাগে’ রিকশা ওয়ালার এই কথায় মনে করার চেষ্টা করলাম লাস্ট কবে চৈত্র মাসের রোদে বাইরে ছিলাম। না মনে পড়ে না। খুব বেশি চেষ্টা করতেও ইচ্ছা করতেছে না। তারপরও আমার ইচ্ছাকে তোয়াক্কা না করে আমার মনই হিসাব করে দেখলো যে গতবারও এই সময়েই আমি রোহানের খোঁজে আসছিলাম, এবারও প্রায় একই সময়ে আবার আসালাম। হ্যাঁ ফেব্রুয়ারীর শেষ, তার মানেতো চৈত্র মাসই। খুব তাতিয়ে রোদ উঠছে, কিন্তু বাতাসে একটা স্নিগ্ধ আমেজ আছে। বাতাসের কারণে রোদটা কেমন যেন পিছলায়ে পড়ে যাচ্ছে গা থেকে। অবশ্য আমি রিকশার হুডের নিচে বসে ভাবছি আর উনি ঠাডা রোদের মধ্যে রিকশা চালাচ্ছে, দুই জনের দুই রকম লাগারই কথা। আমি যে এতক্ষণ রোদে ঘোরাঘুরি করলাম তাও কিন্তু চৈত্র মাসের রোদের তেজ টের পাইলাম না। মনে মনে বলি, আমার হাড্ডি পুড়ে গেছে গো চাচা, আমার গায়ে রোদ লাগে না।

রিকশায় যে বাতাসটা এসে গায়ে লাগতেছে তা খুবই আরামের, ঘুম চলে আসবে বেশিক্ষণ এই রিকশায় চুপচাপ বসে থাকলে। স্বচ্ছ নীল আকাশ, বাতাসের ঝাপটানি নাই, কিন্তু মোলায়েম পরশটা আছে। পুরা রাস্তা ফাঁকা, রিকশা তো নাই-ই মানুষজনও চোখে পড়ছে না। গ্রামের দুপুর এত নির্জন হয়? কেমন যেন ভুতুড়ে একটা নির্জনতা; চকচকে রোদ, কিন্তু চারপাশ নিস্তরঙ্গ নিথর। রোহানের আস্তানাতেও একাই ছিলাম, তবে এতোটা নির্জনতা অনুভব করিনি। এখন এত ভুতুড়ে লাগছে কেন? রিকশাওয়ালা চাচাকে তো বদলোক মনে হয় নাই, যে নির্জন পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।

'আম্মা আপনে কার বাড়ি যাইবেন?'

রিকশাওয়ালা চাচার এই কথা আমাকে ভুতুরে চিন্তার বাইরে নিয়ে আসে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলি ’রোহানের মামা বাড়ি, চিনেন?’

‘নাম না বললে তো চিনবো না।’

‘গাংনির ফরাজী বাড়ি, চিনেন?’

‘হ চিনুম না কে? আমরাতো চোদ্দগুষ্টি এই এলাকায়ই বড় হৈছি। ফরাজীগো বাড়িতে এহন আর কেউ থাহে না। গ্রামের সব বদ মানুষ রাতে গিয়া ঐহানে জমা হয়। গাঞ্জামদ খায়। ঐহানে কেন যাইবেন?’

‘আমার আত্মীয়র বাড়ি এটা। আমি রোহানের চাচাত বোন। রোহানকে চিনেন?’ ওনার নীরবতা আমাকে জানান দিলো যে চিনে না। আমি কী মনে করে যেন আবার প্রশ্ন করলাম। ’সাধুকে চিনেন?’ এবারও উনি নীরব। মনে মনে ভাবি কী বালের সাধু তুমি রোহান; এলাকার মানুষই তোমারে চিনে না। ভাবেসাবে তো মনে হইছিলো তুমি এলাকার বিরাট পির। সবাই তোমার পা-ধোঁয়া পানি নেওয়ার জন্যে লাইন দেয়। হয়তো ভাবটা আমার সাথে বেশিই দেখাইছিলা।

রোহানকে রেখে যখন ঢাকা চলে গেলাম; তারপর থেকে ওর একটাই কাজ ছিলো, আমাকে কষ্ট দেওয়া। যা যা করলে আমি কষ্ট পাবো, যা যা বলতাম না করার জন্যে, চিঠিতে বা বাড়ি আসলে ও তাই আরো বেশি বেশি করে করতো। কয়েক বছর যাওয়ার পর আমি যখন বুঝতে পারি ব্যপারটা, তারপর আর কিছু বলতাম না। বাড়ি আসা, চিঠি লেখাও ক্রমাগত কমায়ে দিছিলাম। রোহান যদি আমার চাচাত ভাই কাম প্রেমিক না হইতো, মানুষ কতটা অবুঝ হইতে পারে তা হয়তো জানাই হইতো না। বুঝলাম তোর সাথে আমার একটা সেক্সসুয়াল সম্পর্ক হয়ে গেছিলো। সেটা এক সাথে এক লেপের নিচে শোয়ার কারণেই হোক, আর তোর প্রতি দয়া পরবশ হয়েই হোক। তোর ছোট বেলার সমস্ত না পাওয়া ভালবাসা আমি যেন নানাভাবে তোকে পুষিয়ে দিতে চাইতাম। সেই চাওয়া থেকেই তোকে প্রথমে বুকে হাত দিতে দেওয়া, তারপর বুক চুষতে দেওয়া, এবং কোনো একসময় কোন রাহুর টানে যে তোর সাথে সেক্সে লিপ্ত হইছিলাম তা ভাবলে এখনও আমার লজ্জা লাগে। তখনতো উঠতি বয়স। মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে বসা। এক একটা দিন মনে হইতো এক একটা বছর। কিছুতেই পার করতে পারতাম না। টিভি দেখে, বই পড়ে, গান শুনেও যখন দিন পার করতে পারতাম না, তখনই শুরু হইতো ফুপির চোখ ফাঁকি দিয়ে তোর সাথে লুকোচুরি খেলা। একদিনতো আমি তোর ঠোঁটে এমন কামড় বসায়ে দিলাম যে ঠোঁট থেকে গলগল করে রক্ত বাইর হচ্ছিলো। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার বেশ ঘন হয়ে গেছে। কল তলায় তুই আমারে পিছন থেকে গিয়ে জড়ায়ে ধরলি। আমি কিছু না বলে ঘুরে তোকে জড়ায়ে ধরে চুমু খাইতে গিয়ে ঠোঁটে এমন চুষাণ দিলাম, কোন ফাঁকে ঠোঁট ফেঁটে রক্ত বাইর হইলো আমি টেরও পাই নাই। এইটুকু ছেলে তারপরও কী বুদ্ধি; ঘরে গিয়ে ফুপিকে বললি কলের ডাণ্ডার বারি খেয়ে ঠোঁট ফাটাইছিস। আমিও দৌড়ায়া গেলাম। ফুপি আমাকেই অর্ডার করল, ‘সোমা তাড়াতাড়ি ডেটল আর তুলা আন। দেখ কী অবস্থা করছে!’ আমি দৌড়ায়ে ডেটল মাখা তুলা দিয়ে তোর ঠোঁটে চেপে ধরলাম। কিন্তু হাসি থামাইতেই পারতেছিলাম না। ফুপি দিল ধমক। আমি বললাম ফুপি, ’ও এত বোকা কেন?’ আমি হাসতে হাসতে বাইরে চলে গেলাম। আমার পক্ষে এই জিনিস ডিল করা আর সম্ভব হচ্ছিলো না।

আহারে রোহান, তুই কি আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যেই এত কিছুর আয়োজন করলি? কিন্তু কোন কিছুই আমাকে কষ্ট দিতে পারলো না। তোর বোঝা উচিত ছিলো আমরা একই মাটি দিয়ে বানানো, একই কাঠের আগুনে পোড়া পুতুল। তোর মা ভেগে গেছিলো, না গুম হয়ে গেছিলো তা কেউ কোনদিন খোঁজও করল না। তার কিছুদিন পর আমার মাওতো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছিলো, যখন উনার কোন ভাবেই মরার কথা না। উনার একটা মেয়ে বাচ্চা ছিলো, শাশুড়ির আদরের বউ ছিলো, শ্বশুরও সংসারের সব দায়িত্ব বড়বউয়ের হাতে দিতেই বেশি পছন্দ করতো—সেই মা মাত্র তিন দিনের জ্বরে মরে গেল। বাবা ঢাকা থেকে আসারও সুযোগ করতে পারলো না। আসলো মৃত্যুর পরের দিন। লাশ নিয়ে আমরা সবাই বসা; ভৈরব থেকে দুই বস্তা চা এনে ঢেকে রাখা হইছে লাশ। আমরা কাঁনতে কাঁনতে কাহিল হয়ে সব চুপ মেরে গেছি। সারা বাড়ি জুড়ে কবরের নিস্তব্ধতা আর মাদ্রাসা থেকে ডেকে আনা কয়েকটা ছেলের নাকি সুরের কুরআন তেলোয়াত ছাড়া কিচ্ছু ছিলো না। চাচা তখন ঢাকায়, খবর পেয়েও বাড়ি আসলো না। চাচির নিখোঁজ হওয়ার মাস তিনেকের মধ্যেই চাচা ঢাকা চলে গেল। তারপর আর কারো খোঁজই নিলো না কোনদিন - না তোর, না আমাদের, না উনার বাবা-মার। এমনতো না যে উনি গোল্লায় গেছে, সেই সাহসতো উনার ছিলো না। উনিতো দিব্যি বিয়ে করে, চাকরি করে, সংসার করে বেশ স্বাভাবিক নাগরিক জীবনই পার করল। শুধু বাড়ির লোকজনকে দেখালো উনার সকল নিরাসক্তি। কী লাভ হইলো তাতে? একটা সংসার একটা পরিবার চিরদিনের জন্যে ছড়িয়ে গেলো দুনিয়ার নানা প্রান্তে, আর যারা যেতে পারলো না তারা একে একে মিশে গেল মাটির সাথে একটা না বলতে পারা লজ্জা নিয়ে।

এগুলোকে আমি দাদার পুঞ্জীভূত পাপের ফল হিসাবেই দেখি। এর শুরু অনেক আগে, দাদার এলাকায় প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার ভিতর দিয়ে। বিত্তবৈভরের লোভ, দেশভাগের সুযোগে হিন্দুদের সম্পত্তি নামমাত্র মুল্যে হাতায়ে নেওয়া, বিচারের নামে সাধারণের উপর অত্যাচারের ফসলই আমাদের জীবনে কষ্ট আর ভোগান্তি হয়ে ফেরত আসছে রোহান। দাদা নিজেও শেষ বয়সে দেখে গেছে উনার পরিবারের স্খলন। দেখে গেছে উনার আদরের ছেলেদের মধ্যে একজনও স্বাভাবিক পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে পারে নাই। যদিও দৃশ্যত চাকরি বাকরি করা সাধারণ মধ্যবিত্ত অহংকারী জীবনের অধিকারী হইতে পারছিলো দুইজনই। কিন্তু এই দৃশ্যের ভিতর ছিলো দগদগে ঘা। এই গ্যাংগ্রিন হয়ে যাওয়া ঘা আমাদের কাউকেই স্বস্তিতে থাকতে দেবে না। তুই দেখে নিস রোহান, একজনও স্বাভাবিক মৃত্যু পাবে না।

৫.

গাংনি বাজারের দোকানদার আর রিকশাওয়ালা চাচার সহযোগিতায় সহজেই পেয়ে গেলাম মোখলেচকে। গ্রামের মানুষ এখনও একজন আর একজনের খোঁজ খবর রাখে। মোখলেচ গ্রামেই আছে। গতকাল সন্ধ্যায় লোকজন তারে দেখছে, সে বাড়িতেই আছে। এসব খবরা-খরব গাংনি বাজারেই পেয়ে গেলাম। মোখলেচদের বাড়িতে গিয়ে ওকে পাইতেও বেশি সময় লাগে নাই। এখন ওকে নিয়ে যাচ্ছি রোহানের কবর জিয়ারত করতে।

আমি বাড়ি থেকে যাওয়ার বছর খানেক পরই রোহান নানিরবাড়ি চলে যায়। ততদিনে আমাদের বাড়িতেও ফুপি আর দাদা ছাড়া কেউ নাই। ফুপিকে রোহান কখনই সহ্য করতে পারতো না। ততদিনে তাগড়া জোয়ান ও গোয়ার হয়ে উঠছে। ওর গায়ের শক্তির সাথে পারে এমন কেউই বাড়িতে নাই। তার সর্বোচ্চ ভুক্তভোগী মনে হয় আমিই। আবার নিজেকে দোষী বলেও মনে হয়। আমার আশকারা রোহানের জীবনে সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে হাজির হইছিলো। মাঝে মাঝে এও মনে হয় আমি কি রোহানকে ব্যবহার করেছি। আমি কি পেডোফিল?

আমি চোখের ইশারায় ওকে বসায়ে রাখতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ও যতবার উঠতে চাইতো ততবারই আমি চোখ রাঙ্গাতাম। ও উঠতে গিয়েও আবার বসে পড়তো। মাঝেমধ্যে ফুপি বা দাদা ওরে ধমকও দিত। ‘হেই সারাদিন তুই ঘরের মধ্যে কি করস?’ রোহান মাথা নিচু করে বাইর হয়ে যেত আর আমি মুচকি মুচকি হাসতাম। ওকে ঝাড়ি খাওয়াতে পারাই যেন আমার সফলতা। সেই রাগ সে আমার উপর উসুল করতে নানা ভাবে। হায়রে জোরে জোরে ঠাপ মারতো। আমি ওর এই রাগটা উপভোগ করতাম। একবার ওরে আমি অনেক ভয় পাওয়ায় দিছিলাম। তখন আমার পিরিয়ড শুরু হবে হবে করতেছে আমি বুঝতেছিলাম। তার মধ্যেই ও আমাকে জোরাজুরি শুরু করল। আমি অনেক বলেও ওকে থামাতে পারলাম না। করার পর ও টের পাইছে যে ওর পেনিস রক্তে লাল হয়ে গেছে। আমি আবার পরের দিন সকালে আমার সালোয়ারের রক্ত দেখালাম ওরে। ও ভয়ে নীল হয়ে গেছিলো আর প্রতিজ্ঞা করছিলো জীবনেও আমার উপর জোর খাটাবে না। এই প্রতিজ্ঞা অবশ্য ও তিনদিনও রাখে নাই; আমি নিজেই রাখতে দেই নাই। আমি এমন ভাব করতাম যেন আর একটু সাধলে খাব। এইটা বুঝে ও আমাকে পিড়াপিড়ি করতো, করতেই থাকতো। শেষ পর্যন্ত ওকে জয়ী হতে দিতাম। এই করতে করতে কনডম ব্যবহার করা পরেও একবার প্র্যাগনেন্ট হয়ে গেলাম। প্রথমবার পিরিয়ড মিস হওয়ার পরই বুঝতে পারছি যে দেরি করা ঠিক হবে না। সাথে সাথে একদিন কলেজ ফাঁকি দিয়ে রোহানকে নিয়ে নরসিংদী গেলাম। পরিচিত এক আপার সহায়তায় সেবার রক্ষা পাইছিলাম।

আমার আশকারা পাইয়া ওর এমন সাহস হইছিলো, এখন ভাবতেই অবাক লাগে। এই পুচকা এত সাহস কোত্থেকে পাইছিল। বেশ কয়েকবার তো ঢাকায় এসে বায়না ধরতো যে আমাকে নিয়ে সে হোটেলে থাকবে। আমি অবশ্য ততদিনে ইফতির সাথে প্রেম করা শুরু করছি। ওরে ঝাড়ির উপর রাখতাম। আর পাত্তা দিতাম না। দুইতিন বার ট্রাই করেই বুঝছে যে ডাল আর গলবে না। সম্ভবত এর পরই ও গাঞ্জা খাওয়া শুরু করে। পরে শুনছি গাঞ্জা, মদ, ফেন্সি, ইয়াবা হয়ে হিরোইনে গিয়ে ঠেকছিল। যতদিন নানু জীবিত ছিলো ততদিন পয়সার অভাব হয় নাই। বড়মামাও তখন ঘনঘন বাড়ি আসতো। ছোটমামাও নানু বললে কেন টাকা পাঠাতে হবে সেই প্রশ্ন কখনই করতো না। করবেই বা কেন, মার দায় শোধ করার আরতো কোন পথ নাই টাকা ছাড়া। তাই যখনই আবদার তখনই টাকা। আর টাকা ওঠানো, খরচ করা তখন রোহানেরই কাজ। আস্তে আস্তে বড়মামার কান হয়ে যখন ছোটমামা পর্যন্ত পৌঁছালো রোহানের নেশা করার গল্প ততদিন রোহানের আর ফেরার অবস্থা রইল না। যদিও নানুর মৃত্যুর পর মামারা টাকা পয়সা দেওয়া একদমই বন্ধ করে দেয়, তাতে কী; ড্রাগির আবার পয়সার অভাব হয় নাকি। সেই থেকেই মনে হয় ব্যবসার শুরু। এলাকার নেতা আর পুলিশও ছিলো ওর ব্যবসার অংশিদার। ওরে আর পায় কে? রোহানের হাত ধরে বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, নিকলি, মিটামইনসহ কিশোরগঞ্জের প্রায় পুরাটাই এখন ড্রাগিদের স্বর্গরাজ্য। এগুলো সবই রানু খালার মুখের কথা। এত শানশৌকত, এত যার ক্ষমতা, এত এত শিষ্য ও স্যাঙ্গাৎ থাকা সত্ত্বেও ওর আত্নহত্যা করা লাগল কেন? কবরের পাশে দাঁড়ায়ে দোয়ার বদলে এই প্রশ্নটাই করব তোকে রোহান।

৬.

গোরস্থানে পৌঁছার পর মোখলেচকে আমার অপ্রকৃতস্থ মনে হচ্ছিল। প্রথম দেখে কিন্তু আমি একদমই বুঝতে পারি নাই যে ও নেশাগ্রস্ত । এখনতো মনে হচ্ছে নেশায় বুদ হয়ে আছে; নাকি ওর স্বভাবই এরকম। কোনকিছুই নিজ সিদ্ধান্তে করতে পারে না। কাউকে বলে দেওয়া লাগে কী করতে হবে। না হয়, কবর দেখাতে এসে ও একবার গোরস্থানে পূর্বকোনায় গিয়ে দাঁড়ায়ে, মনে মনে কী যেন মাপে, আবার পশ্চিম কোনায় এসে দাঁড়ায় কী কারণে। কয়েক কদম হাটে, আবার থামে, আবার আমার কাছে আসে, কী যেন বলতে চায় কিন্তু বলে না, আবার খোঁজে। একবার এসে বলে গেল, ’একটু সময় দেন আপা কবর খুঁজতাছি।’ এক একরের চেয়েও কম জায়গা নিয়ে এই গোরস্থান, সেখানে কবর খুঁজে বাইর করতে হবে কেন আমি বুঝলাম না। মোখলেচ কি দাফনের সময় ছিলো না? প্রশ্নটা করা ঠিক হবে কিনা বুঝতাছি না।

মোখলেচকে দেখে যতটা গরীব, শেকড়হীন, ছিন্নমূল শিশু যে খড়কুটোর মতই সমাজে ঠিকে আছে আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে, তরুন বয়সে যারা হঠাৎই হয়ে উঠে সমাজের উঠতি কোন রংবাজের চেলা, যার মা-বাবার সন্ধান কোনদিনই তার পেয়ে উঠা হয় নাই, যারা দৈবক্রমে কৈশোর উত্তীর্ণ হতে পারলে হয়ে উঠে নেশা দ্রব্যের চলমান দোকান তাদেরই একজন ভেবেছিলাম। কিন্তু বাড়ি গিয়ে দেখলাম, না, তা না। ওর মাকে দেখে মনে হলো নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠার ট্রানজিসন পিরিয়ড পার করতেছে। বাবা ছিল দলিল লেখক, বড়ভাই বিদেশ থাকে, আরেক ভাই ঢাকায় চাকরি করে। মোখলেচ নিজে ইন্টার পাস বাদাইম্মা। খাওয়া পরার কোন সমস্যা নাই। বড় ভাই নাকি বিদেশ নিবে সেই স্বপ্নে বিভোর।

'আমার ছোটডা ফারাজীগো ভাইগ্না সাধুর পাল্লায় পইড়া নষ্ট হইয়া গেছে গো মা।’ মোখলেচের মা আমাকে দেখেই এই কথাগুলো বলে উঠেছিলো। আমি শুনলাম কী শুনলাম না সেই দিকেও উনার খুব একটা খেয়াল নাই। যেন বলাটাই উনার কর্তব্য। আমার শোনা-নাশোনা দিয়ে উনার কিছু যায় আসে না। আমিও এই কথার কোন উত্তর না দিতে পাইরা চুপ থাকি। মোখলেচ ঘর থেকে বাইর হয়ে আসে। আমাকে চিনতে ওর বিন্দুমাত্র দেরি হয় নাই। ঘর থেকে বাইর হয়ে সে আমাকে পা ছুঁয়ে সেলাম করে বসতে পারে ভেবে আমি কিছুটা শংকিত এবং সতর্ক ছিলাম। আল্লার রহমত সে তা করেনি। ’স্লামালাইকুম আপা,’ বলে সে পাশে এসে এমন তমিজের সাথে দাঁড়ায় যেন আমি সত্যি ওর গুরু-মা। আমিও টুকটাক দুয়েকটা কথা বলার পর আসল কথায় আসি। বলি যে আমি রোহানের কবর জিয়ারত করতে চাই। আমার এই কথাটা শুনার সাথে সাথে ওর চেহারায় যে হাসির রেশটা ছিলো তা মিশে গিয়ে পথ হারানো মানুষের উদ্বেগের চিহ্ন ফুটে উঠে। ওর এই ভাবান্তর আমাকে কিছুটা হতাশ করলেও আমি তা বুঝতে দেই না; বা আমি নিজেও তা বুঝতে চাই না। আমার কথাতো খুব পরিষ্কার। রোহানের কবরটা দেখতে যাবো; এর বেশি কিছু না।

মোখলেচকে খুব অপ্রকৃতিস্ত, উদ্ভ্রান্ত একজন মানুষ মনে হচ্ছিল। এই পশ্চিম দিকে যাচ্ছে তো এই পূর্বমাথায় গিয়ে দিকভ্রান্ত পথিকের মত দাঁড়ায়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করছে সে এখন কোথায়। আমি খুব বেশি নেশাগ্রস্ত মানুষ দেখি নাই। যা দেখছি রোহানকেই গতবার দেশে আসার পর, তাও একবারই তো দেখা। সেই দেখায় মনে হইছিলো, নেশাখোর গুলা মনে হয় টাইম আর স্পেসটা ঠিক কোথায় তা চিহ্নিত করতে পারে না। মোখলেচের এতক্ষণ কবর খোঁজার কসরত দেখে যা বুঝলাম, মোখলেচ আসলে জানে না রোহানের কবর কোথায় বা সে ভুলে গেছে। নেশাগ্রস্ততার কারণে ঠিক মনে পড়ছে না সে গোরস্থানে কেন আসছে, বা কী খোঁজে, বারবার হয়তো তার মনে পড়ছে কিন্তু পরক্ষণেই হয়তো তা আবার গুলায়ে ফেলতেছে। শেষ পর্যন্ত মোখলেচকে আমি নিজে থেকে ডেকে এনে বললাম, মুখলেচ সত্য করে বলতো সমস্যা কী? তুমি এমন করতেছো কেন? তুমি কি জান রোহানের কবর কোথায়? এবার মোখলেচ আমার সামনে দাঁড়ায়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করে। আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম। এখানে কান্নার কী হইল, বুঝতেছি না। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর জিজ্ঞেস করলাম। কী হইছে মোখলেচ? যা সত্য তাই খুলে বল আমি কিছু মনে করব না। ‘আপা, আমি জানি না আসলে গুরুর কবর কোথায়। গুরু মারা যাওয়ার আগে আমাদেরকে বলছিলো, ‘যদি উনি মারা যায় তাইলে আমরা যেন উনাকে উনার রুমেই বসায়ে কবর দেই ।’ উনি বলছিলো, ‘কাফনের কাপড়ও পড়ানোর দরকার নাই। উনি যে সাদা কাপড় পরতো তাইতো কাফনের কাপড়। আর উনার মৃত্যুর পর আমরা যেন কেউ না কাঁদি বরং গাঞ্জা-মদ খাইয়া যেন ফুর্তি আমোদ করি। তাইলেই গুরু হিসাবে উনার আত্না শান্তি পাইবো। আর বলছিলো, কোন একদিন নাকি কোন একজন আইসা এই বাগানবাড়িতে মাজার বানাইবো।'

'আমরা তা করতে পারি নাই আপা। গুরুর মৃত্যুর পর আমরা চেষ্টা করছিলাম খুব গোপনে যেন দাফনটা শেষ করতে পারি কিন্তু কেমনে যেন জানাজানি হয়ে গেল। বড়মামার কানে গেল কথা। বড়মামা সাথে সাথে গাড়ি নিয়া রওয়ানা করছে ঢাকা থেইক্কা। আর ফরাজীগোর চাচাতো ভাই মিথুন ফরাজী আমাদের আইসা বাগানবাড়িতে শাসায়ে গেছে। যদি মামা আসার আগে আমরা কিছু করি তাইলে কারো নিস্তার নাই। আমরা ওর কথা শুনি নাই। আমরা আমাদের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম গুরুরে রুমে দাফন করার, কিন্তু তার আগেই বড়মামা এক গাড়ি পুলিশ নিয়া আইসা হাজির। উনারা যখন ইউনিয়ন পরিষদ প্রঙ্গনে আইসা হাজির তখনই আমরা খবর পাই, তারপরতো আপা জান বাঁচানো ফরজ মনে কইরা আমরা সবাই গুরুরে সেখানে রাইখাই পালাই। আমিতো আপা পরে ছয় মাস বাড়িতে আসতে পারি নাই। এখনও আমার নামে থানায় ড্রাগ ডিলিংয়ের মামলা আছে। ছয় মাস পলায়ে, তিন মাস জেল খাইট্টা, তারপর এখন জামিনে আছি আপা। বড় ভাই লাখ টাকা খরচ কইরা আমারে বাইর করে আনছে। প্রমিজ করাইছে যে আর কোনদিন নেশাপানি খামু না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমারে ব্রুনাই লইয়া যাইবো।

গুরুর লাশ যেখানেই দাফন করুক আপা। উনি বাগান বাড়িতেই আছে। উনারে এহান থেইক্কা কেউ সরাইতে পারব না। আপনে দেইখা নিয়েন। বড়মামা এই যে বিছানায় পড়ছে আর উঠতে পারব না। উনি গুরুর মনে খুব কষ্ট দিছে। খুব চেষ্টা করছে গুরুরে বাগানবাড়ি থেইকা উৎখাত করার, পারে নাই। আর পারবও না। একদিন ঠিকই এই বাড়িতে মাজার উঠবো। আমি নিজেই করুম। বিদেশ থেইকা আইসা এইডাই অইব আমার প্রথম কাজ।’

যতই আমি মুখলেচের কথা শুনতেছিলাম ততই আমার রানু খালার কথা মনে হইতেছিলো। রানু খালা কিন্তু একবারের জন্যেও বলে নাই যে বড়মামার সাথে রোহানের বাড়ি নিয়া ঝামেলা চলতেছিল। দেশে এসে প্রথম আমার উনার সাথেই কথা হয়। উনার কথা শুনে মনে হইছিলো বড়মামা যেন রোহানের শোকেই স্ট্রোক করছে। রানু খালা বলতেছিল যে রোহানকে গোরস্থানেই দাফন করা হইছে। বড় ভাইজান নিজে উপস্থিত থেকে একাজ করে তারপর ঢাকা গেছেন। রোহানের সাগরেদদের উদ্ধত ব্যবহারই বড় ভাইজানের অসুস্থতার কারণ। রোহানের সাগরেদরা রোহানকে বাগানবাড়িতেই দাফন করতে চাইছিলো; এমন কি, শুধু বাগান বাড়িতেই না রোহান যে রুমে থাকতো সে রুমেই। এই রকম বেদাত কাজ কি মেনে নেওয়া যায় নাকি! একটা গাঞ্জাখোরের মাজার হবে বাগানবাড়িতে তাও ভাইজান জীবিত থাকতেই।

রোহান বহুদিন ধরেই নাকি বড়মামার সাথে ওর মার ওয়ারিস নিয়ে দেন-দরবার করতেছিলো। অনেক দেন-দরবার করার পর বড়মামা দাবি করে বসে যে রোহানের মা আসলে ওনাদের বাবার মেয়ে না। সে মার আগের তরফের সন্তান, বাবা এইকথা কাউকে জানতে দেয় নাই। চাচি নিখোঁজ হওয়ার পর বড়মামাদের পক্ষ থেকে যে কেউ কোন খোঁজখবর নিলো না, উল্টা চাচির দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছিল সবাই, এতদিন পর এসে শুনি তখন থেকেই নাকি এই সব বলাবলি শুরু করছিলো। যাই হোক বড়মামা রোহানকে কোন সম্পত্তির ভাগ দিতে রাজি হয়নি। ছোটমামা নাকি রোহানকে কিছু টাকা পয়সা দিছিলো তবে তা সম্পতির ভাগ হিসাবে না, এমনি ভাগ্নে হিসাবে। যদিও রোহানের মৃ্ত্যুর পর বড়মামা নাকি বলছে সজিব (ছোটমামা) যে টাকা পয়সা দিছে তা হিসাবে ধরলে রোহান তার সম্পত্তির তিনগুন নিয়ে নিছে। আর এত বছর ধরে যে থাকলো খাইলো তার হিসাবতো বাদই। ’আসলে সব দোষ মার বুঝলি সোমা,’ রানুখালা বলে। ‘মার লাই পেয়ে যেমন আপা নষ্ট হইছিলো তেমন রোহানও হইল। আমি বুঝলাম না, আম্মা কিন্তু আমাদের সব ভাই বোনের বেলায়, একেবারে কাট কাট, পান থেকে চুন খসোনো যেত না। কিন্তু আপা আর রোহানে বেলায় একদম দিলদরিয়া। আম্মা নাই উনাকে কোন কিছুর জন্যে দোষারোপ করতে মন সায় দেয় না। কিন্তু দেখ, ওনার লাইয়ের ফলাফল দেখ।’

কাকে বিশ্বাস করব, মোখলেচকে নাকি রানু খালাকে? অবশ্য উনারা উনাদের দিক থেকে হয়তো সত্যই বলতেছে। যার যার পার্সপেকটিভ থেইকা, যা তারা বিশ্বাস করে, যেভাবে দেখে। যে মৃত্যুকে মোখলেচ স্বেচ্চামৃত্যু হিসাবে গ্লোরিফাই করতাছে, সেই একই মৃত্যুকে রানুখালা কালিমা লেপতেছে ওভার ডোজের মৃত্যু বলে। বড়মামার স্ট্রোক রানুখালার কাছে রোহানের শোক সহ্য করতে না পারার ফল; আর মোখলেচের কাছে মালিকের শাস্তি। রানুখালা রোহানকে কখনই পছন্দ করতো না। আজব! নিজের হারায়ে যাওয়া বোনের একমাত্র ছেলে, খালা হিসাবে উনার দায়িত্ব ছিলো ছেলেটাকে মানুষ করার নূন্যতাম চেষ্টা করা। তাতো করলই না, সারাজীবন রোহানের বদনাম বলে বেড়ানোই যেন উনার কাজ। সেই গাধা রোহানও নাকি একবার ক্ষেপছিলো রানু খালার মেয়েকে বিয়ে করার জন্যে। রোহানটা আসলেই গাধা ছিলো। ও যে নিজেরে কি মনে করতো তা আমি আজও বুঝে উঠতে পারি নাই। রাজ্যহারা এক রাজার চরিত্রে অভিনয় করল ও সারা জীবন।

‘বড়মামা পরে প্রচার দিছে আমরা নাকি লাশ নিয়াই পলাইছিলাম। কিন্তু আপা বিশ্বাস করেন আমরা লাশ নেই নাই। লাশ লাশের জায়গাতেই ছিলো আমরা নিজের জান হাতে নিয়া পলাইছিলাম। কিন্তু বড়মামা কয় উনি নাকি বাগান বাড়িতে গিয়া কোন লাশ পায় নাই। আমি জানি আপা গুরু বাগান বাড়ির মধ্যেই মিশে গেছে। উনারে বড়মামা চাইলেই সরাইতে পারব না। আপনি দেইখেন বড়মামার বিরাট ক্ষতি অইবো। উনি জীবনে উনার সম্পদ ভোগ কইরা মরতে পারব না। উনার ধনসম্পদ সব কাউয়াকুলি খাইবো। আপনি দেইখেন আপা।’

আসলে রোহানের কবর কই দেওয়া হইছে তা কেউ জানে না বড়মামা ছাড়া। ছোট ফুপি হয়তো ঠিকই কইছে, রোহানকে কবর দেওয়া হয় নাই নদীতে ভাসায়া দেওয়া হৈছে। বড়মামা আতঙ্কে ছিলো ওরা আবার উনার অনুপস্থিতিতে লাশ এনে বাগান বাড়িতে দাফন করে কিনা। গাঞ্জুটিদের দিয়া তো কোন বিশ্বাস নাই। এই জন্যে উনি লাশ গুম করে ফেলছে যেন ওরা চাইলেও তা খুঁজে না পায়। ফুপি যদিও শিউর না নদীতে ভাসায়ে দিছে না কোথাও এমনি মাটি চাপা দিছে যেন কেউ খুঁজে না পায়। ছোট ফুপির এই কথা আমি রোহানের বিরুদ্ধে উনার বিষোদগারের অংশ হিসাবে নিছিলাম। এখন দেখতেছি রোহানের অমঙ্গলাকাঙ্খী শুধু ছোট ফুপিই ছিলো না ওর নানি বাড়ির লোকজনও একই দলে। এত এত গরল নিয়ে রোহান তুই কেমনে টিকে ছিলি এত দিন? আহারে সোনা আমার, তোর জন্যে কিছুই করতে পারলাম না।

৭.

বাসে ওঠার আগে মোখলেচকে বললাম, যদি পার বাগানবাড়িটা জঙ্গল বানায়ে ফালাও। যত পার গাছ লাগাও, দেখবা একদিন এই বাড়ি আপনাতেই মাজার হয়ে গেছ, তোমার বানাইতে অইব না। মোখলেচ আমার কথা শুনল কী শুনল না বোঝা গেল না। আমি বাসে উঠে বসলাম। সারাদিন পর বসে বাসের সিটকেই দুনিয়ার সবচেয়ে আরামের জায়গা মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বাসের এই নোংরা সিটের মধ্যে আমার শরীরটা ঢুকে গেছে। দীর্ঘ সময় যে দাঁড়িয়ে ছিলাম তা বসার পর মনে হইল। বাসটা চলতে শুরু করল। সকালের স্নীগ্ধতা আর নাই সেই জায়গায় একটা ইতরপ্রাণীর গন্ধযুক্ত তপ্ত নিশ্বাসের বায়ু ধেয়ে আসছে বাসের উল্টা দিক থেকে। তারপরও চোখ বুজে বসে থাকতে ভাল লাগছে পিঠ আর কোমরের আরামের জন্যে। মনে হচ্ছে আমার জীবনের একটা অধ্যায় বুঝি শেষ করে আসলাম। পেঁচার দৃষ্টিটা কিছুতেই চোখ থেকে সরাতে পারছি না। এখন যতবার রোহানের মুখটা মনে করার চেষ্টা করছি ততবারই রোহানের চোখ সমেত পেঁচার গোলগাল মুখটাও মনে পড়ছে। দাদির কাছে শুনছি, মৃত মানুষের আত্না কখনও কখনও নানা পশুপাখির রূপ ধরে প্রিয়জনদের কাছে আসে। আমাদের বাড়িতে তাই কখনও কুকুর, বিড়াল বা পশুপাখিকে, এমনকি কাককেও লাটি দিয়ে তাড়ানোর নিয়ম ছিলো না। বরং যতটা পারা যেত সবাইকে কিছু না কিছু খাইতে দিত দাদি। বিশেষ করে কুকুর-বিড়ালকে বেশি দিতো। রোহান তুইও কি এখন পেঁচা হয়ে আমাদের সাথে দেখা করতে আসবি?

হঠাৎ দেখি পেঁচার বদলে আমার পাশের সিটে চাচি এসে বসছে। সম্পূর্ণ উলঙ্গ, গায়ে একটা সুতাও নাই। বলে আমার সাথে উনিও অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে। আমি ভয়ে কুকড়ায়ে যাইতেছি। কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারির আর সীমা থাকবে না। আমি আড়চোখে দেখছি কেউ আমাদের দেখতেছে কিনা; না কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নাই। গাড়িটা দেখি আস্তে আস্তে একটা আঁকাবাঁকা পথ ধরে গহিন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যাইতেছে। চারদিকের অন্ধকার ঘন হয়ে আসতাছে। আর আমার ভয়টা একটু একটু কমতাছে। একটু পর দেখি যেখানে চাচি বসা ছিলো সেখানে রোহান। আমি ওর দিকে তাকাতেই বলে, 'সোমাপু, গাড়ির স্টিয়ারিংটা ধর ড্রাইবার কিন্তু নেমে চলে গেছে'। আমি তাকায়ে দেখি সত্যি ড্রাইভিং সিটে কেউ নাই। আমি সিট থেকে উঠে ড্রাইভিং সিটের দিকে আগায়ে যাইতেই দেখি গাড়ির স্টিয়ারিংও নাই; ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠার সাথে সাথে টের পাই গাড়িটা একটা ক্রেচক্রেচ শব্দ করে থামলো। দেখি, না সবকিছু যেমন ছিলো তেমনই আছে। গাড়িটা আগের মতই আবার চলতে শুরু করল। ভয়ে ভয়ে রোহান যে সিটটায় বসা ছিল সেদিকে তাকালাম, দেখি একটা জমাট অন্ধকার বসে আছে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ২৩:১৩

[তৌহিন হাসানের প্রথম উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ বইমেলা ২০২১-এ পেন্সিল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি পড়ার ইচ্ছে হয়েছিল প্রচ্ছদ দেখে। নিজের দেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মাইল দূরে বসে স্পর্শ করে, দেখেশুনে বই কেনার সুযোগ কোথায়! কিন্তু ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে একবিন্দুও নিরাশ করেনি। সহজ, সাবলীল গদ্যশৈলীর সাথে কাব্যময়তার পাশাপাশি ভালো লেগেছে উপন্যাসের বুনন। এক্ষেত্রে লেখকের স্বাতন্ত্র্যের ছাপ সুস্পষ্ট। কোনো টাইমলাইন বা ক্রনোলোজি না মেনে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে ঘটনাগুলোকে উপস্থাপন করেছেন। মূল চরিত্র পঙ্খীর জীবনের নানা ঘটনাকে ঘিরেই পুরো কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।
একটা গল্প বা উপন্যাস পড়ার পর সেটা নিয়ে স্বয়ং লেখকের সাথে কথা বলা বা মত বিনিময়ের সুযোগ পাওয়াটা এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরা হয়েছে।]


প্রশ্ন : এটি আপনার প্রথম উপন্যাস। কবে, কখন এই উপন্যাস লেখার ভাবনা মাথায় এলো?
উত্তর : ‘উড়ালপঙ্খী’ আমার প্রথম উপন্যাস। এটি লেখার পরিকল্পনা প্রথম মাথায় আসে আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর আগে। গল্পের কাঠামোটা তখনই ভেবে রেখেছি। কিন্তু লেখা শুরু করেছি অনেক দেরিতে, ২০২০ সালের নভেম্বরে।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বিষয়বস্তু গতানুগতিকতার বাইরে এবং বেশ অপ্রচলিত। মনস্তত্ত্ব জটিল একটা বিষয়। প্রেম, বিরহ এসব নিয়ে না লিখে এই কনসেপ্টটাই কেন বেছে নিলেন?
উত্তর : আসলে গতানুগতিকতার বাইরে কি না জানি না! আমার ভেতর থেকে যেভাবে এসেছে, যেভাবে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেছি, সেভাবেই লিখে গেছি৷ আর উপন্যাসের ঘটনা বা চরিত্রগুলো যে কল্পনাপ্রসূত তা-ও কিন্তু না! এই চরিত্রগুলোকে আমি বাস্তব জীবনে বিভিন্নভাবে দেখেছি, জেনেছি, বিশ্লেষণ করেছি। চেনা চৌহদ্দির মধ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা থেকে তুলে এনে উপন্যাসে সন্নিবেশ করেছি৷

প্রশ্ন : বইটির প্রচ্ছদ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : আমি যেহেতু প্রফেশনালি বইয়ের প্রচ্ছদ করি, নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ করাটা আমার জন্য বেশ কঠিন। একটা দ্বিধা কাজ করে। উপন্যাস লেখার মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রচ্ছদে ছবি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেই৷ যেহেতু মূল চরিত্রের আবেগটাকে আমি খুব ভালো করে জানি, তার চেহারার নির্লিপ্ততাকে প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকেই বলেছে কাভারে কেন একটা মেয়ের মুখ! প্রচ্ছদ তো এবস্ট্রাকট হয়, তাতে নানা রকমের আর্টিস্টিক মোটিফ থাকে! কিন্তু আমার মনে হয়েছে একজন পাঠক যখন বইটা পড়ে মূল চরিত্রটাকে অনুধাবন করবে তখন বুঝতে পারবে কেন এই প্রচ্ছদ ব্যবহার করেছি। বই না পড়ে আগে থেকে সেটা বোঝা যাবে না।
একজন পাঠক হিসেবে আমারও কিন্তু একই অনুভূতি হয়েছে৷ ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে শেষ করার পর প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে এই বইয়ের এরচেয়ে উত্তম প্রচ্ছদ আর হতে পারে না!

প্রশ্ন : পঙ্খী প্রথা ভাঙায় বিশ্বাসী। সমাজ-সংসারের প্রচলিত নিয়মগুলো তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। সে জায়গা থেকে ‘উড়ালপঙ্খী’ নামটা আমার কাছে যথার্থ মনে হয়েছে। আপনারও কি নামকরণের ক্ষেত্রে এরকম ভাবনা ছিল?
উত্তর : নামকরণের ক্ষেত্রে আমার ভাবনাটা খুবই সরল ছিল। যেহেতু মেয়েটার নাম উড়ালপঙ্খী, নামটা তার বাবার দেওয়া এবং গল্পটা তাকে ঘিরেই, তাই উপন্যাসের নামও উড়ালপঙ্খী। তাছাড়া সে সব সময় মুক্ত থাকতে চাইত, কারো কথা শুনত না। সামাজিক বিধিনিষেধ মানেনি। নিজের যেটা ভালো লাগে তাই করে। এসব কারণেই উড়ালপঙ্খী নামটা বেছে নেওয়া।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বুনন সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর : ব্যক্তিগত জীবনে আমি প্রচুর কথা বলতে পছন্দ করি। একটা বিষয়ে কথা বলার মাঝখানে বিভিন্ন উদাহরণ, সাবক্যাটাগরি, ক্রস-রেফারেন্স চলে আসে৷ এটা আমার কথা বলার ধরন বা অভ্যাস। লেখার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে৷ উপন্যাসের সংজ্ঞা এখনও আমার কাছে দুর্বোধ্য। ঔপন্যাসিক, কবি, সাহিত্যিক—এই শব্দগুলো পছন্দ করি না। নিজেকে স্টোরি টেলার ভাবতে ভালোবাসি। আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই৷ গল্পের তো শাখা থাকে, ঘটনা একটা হতে পারে কিন্তু তাকে বর্ণনা করার সময় অনেক ডালপালার বিস্তার হয়। পঙ্খীর গল্পটা বলার সময় টুকরো টুকরোভাবে নানা গল্প প্রাসংঙ্গিকভাবেই চারপাশ থেকে চলে এসেছে। হয়তো অন্যভাবে বলতে পারতাম! কিন্তু আমার কাছে যেভাবে কমফোর্টেবল মনে হয়েছে, আমি সেভাবেই বলে গেছি। 

প্রশ্ন : কতদিনে উপন্যাসটা শেষ করেছেন? নির্মাণের  সময়ের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা শুনতে চাই।
উত্তর : খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করতে হয়েছে, প্রায় আড়াই মাসের মতো। যেহেতু পাঁচ বছর ধরে গল্পটা মাথায় ছিল অনেকটা প্রি-প্রোডাকশনের মতো, তাই লেখার সময় খুব একটা ভাবতে হয়নি৷ পার্শ্বচরিত্র, বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা আগে থেকেই মাথায় ছিল। ব্যাপারটা আসলে অনেকটা রান্না করার মতো! উপকরণগুলো আগে থেকে প্রস্তুত থাকলে রান্নায় বেশি সময় লাগে না।
আর অভিজ্ঞতা বলতে যেটা হয়েছে কখনো একটানা লিখতে পারিনি। আবার লেখার নির্দিষ্ট কোনো সময়ও ছিল না৷ রাত-দিন এক হয়ে গিয়েছিল। জীবনযাপনে একটু ব্যাঘাত হয়েছে৷ খানিকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল সবকিছু।

প্রশ্ন : পড়া শেষ হবার পরেও একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা আর ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। পঙ্খীর মনোজগতের যে টানাপড়েন, তার জীবন পরিক্রমায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে—আমার মনে হয়েছে এর মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে চান। এটা কী সচেতনভাবে করেছেন নাকি অবচেতনে ঘটেছে?
উত্তর : শুধু আমার ক্ষেত্রে না, যেকোনো লেখকের ক্ষেত্রেই এটা সত্য যে তারা সচেতনভাবে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে  চান না। আমি শুধু আমার  মতো করে নিজের ভাষায় একটা চরিত্র সম্পর্কে লিখে যেতে চেয়েছিলাম। পাঠকের মনোজগতে এর কী প্রভাব পড়বে সেটা পাঠকের মস্তিষ্কপ্রসূত। একজন পাঠক কিভাবে পঙ্খীকে গ্রহণ করেছে সেটা একান্তই তার ব্যাপার। অনেক পাঠক হয়তো বিষণ্ন চরিত্রই পছন্দ করেন না। আবার অনেকেই পঙ্খীর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সাথে নিজের মিল খুঁজে পাবেন। 
 
প্রশ্ন : আজকাল যেটা দেখা যাচ্ছে অনেক লেখকই উপন্যাস প্রকাশের আগে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সেটা লিখছেন যা পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ হচ্ছে। লেখার সময় কোনো চরিত্রকে রাখবেন, কার কি পরিণতি হবে সেটা পাঠকদেরই জিজ্ঞেস করছেন। এটা কেন হচ্ছে?
উত্তর : মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভাব বিনিময় করা। লেখক, কবি, সাহিত্যিকরা যেকোনো শিল্প-মাধ্যমের দ্বারা নিজের দর্শন প্রকাশ করেন। শিল্প তো চর্চার ব্যাপার। চিন্তা ও চর্চা—এই দুটোর সমন্বয়ে শিল্পের বিকাশ ঘটে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়টা খুব অস্থির। এখন ভাব বিনিময়ের অসংখ্য মাধ্যম। সব সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় প্র‍্যাকটিসটা পাল্টে গেছে। যার ফলে ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে লেখকরা হোঁচট খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তখন পাঠকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। অনেকে দেখা যাচ্ছে প্রচ্ছদ আপলোড করছেন তিনটা। পাঠককে বাছাই করার অপশন দেওয়া হচ্ছে। এটা খুবই আশঙ্কার বিষয়। এটা কারোর দোষ না, শুধুই চর্চার অভাব।

প্রশ্ন : তিমির একজন বিপ্লবী হতে চেয়েছিল, কর্পোরেট কালচারের অংশ হতে চায়নি। ছাত্রজীবনে তাকে দেখা গেছে যথেষ্ট দায়িত্বহীন। আবার পঙ্খীর স্বামী হিসেবে সে যথেষ্ট দায়িত্বশীল ছিল। এই চরিত্র নিয়ে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ক্লাসে ৪০-৪৫ জন ছাত্রের মধ্যে কেউ থাকে বিপ্লবী, কেউ খুব সিরিয়াস, কেউ কবি অথবা শিল্পী, আবার দু-চারজন থাকে খুব বোকাসোকা যাদের নিয়ে সবাই স্যাটায়ার করে। আজকাল কোনো সামাজিক সমস্যা হলে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী টিএসসিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তিমির তাদেরই একজন, কোনো কল্পিত চরিত্র না। সে অন্যায় সহ্য করতে পারত না। বামপন্থি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্রজীবনে তিমির প্রেমবন্ধন এসবে আস্থা রাখত না। কিন্তু একটা সময় হোঁচট খায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে তার ভাবনায় পরিবর্তন আসে। তখন পঙ্খীকে বিয়ে করে সংসারী হয়। এমনকি কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একটা প্রাইভেট ফার্মের জন্য বিজ্ঞাপন লেখা শুরু করে। তিমির আসলে বাইরের কেউ না, আমাদের সমাজেরই একজন।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে মনে হয়েছে জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজি, নারীদের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আপনার বেশ ভালো দখল আছে। এই বিষয়গুলোতে কী আগে থেকেই আগ্রহ ছিল?
উত্তর : এই বিষয়গুলোতে আমার আলাদা আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে আমার পড়াশোনা শুরু হয় ক্লাস নাইন থেকে। তখন প্রথম মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়া শুরু করি। সে সময় নিজে টেলিস্কোপ বানাই। ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন বই, জেনেটিক সায়েন্স ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ জাগে। এরপর ধীরে ধীরে পরিচিত হই সিগমন ফ্রয়েড, সিমন দ্য বোভোয়ারের সাথে।
আমি তখন সরকারি স্কুলের ছাত্র। প্রাইভেটে ইংরেজি পড়তাম অঞ্জন ভদ্র নামে পাশের স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে। পড়া শেষে স্যার আধা ঘণ্টার একটা বাড়তি ক্লাস নিতেন অন্যান্য বিষয়ে। এর সাথে সিলেবাসের পড়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমি জানার আগ্রহ থেকে সেই ক্লাসে থাকতাম। এরিস্টটল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শারীরতত্ত্ব, জেনেটিক সায়েন্স, মনস্তত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ, লালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্যার কথা বলতেন যার আশিভাগই বুঝতাম না। স্যার বলতেন—শুধু শুনে যাও, কোনো প্রশ্ন করবে না। এখন না বুঝলেও আজ থেকে ১০ বছর পরে আমার কথাগুলো ঠিকই বুঝবে। যারা বুঝতে পারবে তারা কেউ লেখক হবে, কেউ-বা দার্শনিক'। তখন এসব বিষয় নিয়ে বেশি বেশি পড়া শুরু করি। এই বাড়তি  জানার আগ্রহের কারণে আমার পড়াশোনায় কোনো ক্ষতি হয়নি বরং সব সময় ভালো রেজাল্ট করেছি। আর ১০ বছর পর স্যারের কথাগুলোর মানেও আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? যে ভাবনাটা আপনার মাথায় ছিল কাগজে-কলমে কী সেটাকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন?
উত্তর : আমার বিশ্বাস নিজের ভাবনাটাকে কাগজে-কলমে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। এ বিষয়ে আমার আত্মতৃপ্তি আছে। কোনো আক্ষেপ নেই। যদিও অনেকে বলেন লেখকের আত্মতৃপ্তি বলে কিছু নেই। কিন্তু এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় আমি সব ঘটনা এবং চরিত্রকে ভাবনা অনুযায়ী ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি।
আর নিজস্ব মূল্যায়নের কথা যদি বলি তবে বলব এখানে পাঠকরা নিজের আশপাশের নানা ঘটনাকেই খুঁজে পাবেন। চিরচেনা সমাজের বিভিন্ন বিষয়, জেনেটিক্স, মনোজাগতিক টানাপড়েন, সোশ্যাল ট্যাবুসহ নানা ঘটনা এখানে উঠে এসেছে। অনেক চরিত্রের সাথে পাঠকরা নিজেদের রিলেট করতে পারবেন। আমার বিশ্বাস অনেক পাঠক নিজেকে তিমির ভাববেন। তিমিরের মতো চরিত্র বা সিকদার চাচার মতো যৌন নির্যাতকরা আমাদের সমাজে বাস করে। আবার অনেক মেয়ের জীবনের অভিজ্ঞতা হয়তো পঙ্খীর সাথে মিলে যাবে। হিন্দু-মুসলিম বিয়ে কিংবা হুট করে বিয়ে করে ফেলা—এসব ঘটনাও তো আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে!

প্রশ্ন : শেষটা হয়েছে একটা ধোঁয়াশার মাঝে। এমন একটা সমাপ্তিই কী চেয়েছিলেন?
উত্তর : হ্যাঁ, এমন একটা সমাপ্তিই চেয়েছিলাম। এমন বেশকিছু ঘটনা আমার চেনাজগতেই ঘটে গেছে। আমাদের সমাজে বহুগামিতা বেড়েছে—এটা একটা বড় সামাজিক সংকট। আমি সচেতনভাবেই উপন্যাসের শেষে তিমির এবং ফরহাদকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছি। শেষটা হয়েছে ক্লিফহ্যাঙ্গারের মতো যা পাঠককে অপেক্ষায় রাখবে। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে আগামীতে ‘উড়ালপঙ্খী'র পরবর্তী খণ্ড আসবে।
 
[একজন পাঠক হিসেবে পরবর্তী খণ্ডটি পড়ার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করব। ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে এক বিষণ্ণ-সুন্দর অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পড়া শেষ হবার বহুদিন পরও এর রেশটুকু মনে থেকে গেছে। 'রামের সুমতি', 'পরিনীতা', 'পথের পাঁচালী' কিংবা 'পুঁইমাচা'—এসব গল্প-উপন্যাস পড়ে যেমন মনে হয়েছিল যতবার পড়ব ততবারই চোখ ভিজে যাবে, ‘উড়ালপঙ্খী’ও একইভাবে আমার মন ছুঁয়ে গেছে। একজন শক্তিশালী লেখকই কেবল পারেন পাঠককে এই অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে।
মনস্তাত্ত্বিক ঘরানার উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে একটি চমৎকার সংযোজন। যারা গতানুগতিকতার বাইরে ভিন্ন স্বাদের কিছু পড়তে চান তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য হবে। পঙ্খীর জীবনের অন্ধকার চোরাগলিগুলোতে ভ্রমণ করতে করতে পাঠকের মনে সমাজের ভয়ানক কিছু অসঙ্গতির চিত্র ফুটে উঠবে। শিশু-কিশোরদের যৌন নির্যাতন, ভিক্টিম ব্লেমিং, স্টেরিওটাইপস, ট্যাবু, পুঁজিবাদসহ নানা রকমের সামাজিক সমস্যা সচেতন পাঠকমাত্রের মনে ভাবনার উদ্রেক করবে। আমাদের সমাজে 'সিকদার' রূপী মামা, চাচা, ভাই অনেক মেয়েরই থাকে। অথচ নির্ভয়ে এসব বলার মতো জায়গা থাকে না বলেই পঙ্খীদের জীবন এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন! 'আলোয় আলোয় মুক্তি' চেয়েও পঙ্খীরা অন্ধগলিতে হারিয়ে যায় বারবার। পঙ্খীর মনোজগতের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। একজন মানু্ষের জীবনের ভিত তৈরিতে তার শৈশব এবং কৈশোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম।
তিমির চরিত্রটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে। তিমিরের বয়ানে জীবন ও সমাজ নিয়ে যেসব ভাবনা ও দর্শন লেখক তুলে ধরেছেন তার বেশিরভাগের সাথেই একাত্ব হতে পেরেছি। খুব মন খারাপ হয়েছে, কিছুটা রাগও—যখন তিমির আর পঙ্খীর পথ আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু এটাও মনে হয়েছে এমনটা না করলে হয়তো একটা গতানুগতিক সমাপ্তিই ঘটত।
প্রাঞ্জল বর্ণনায় প্রতিটি চরিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজির পাশাপাশি মেয়েদের মনোজগৎ সম্পর্কে লেখকের জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটেছে পুরো উপন্যাসজুড়ে। পঙ্খী স্রোতের বিপরীতে চলা এক অসীম সাহসী তরুণী। সে চেয়েছিল কন্যা মুক্তি অপরিসীমার জন্য চার দেয়ালের ভেতরে একটা আলোকময় জগৎ গড়ে তুলতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতটুকু পেরেছিল! সেটা খোঁজার দায়টুকু আগ্রহী পাঠকদেরই থাকুক!—শা. মি.]

/জেডেএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:১৮

বিকালের মেঘ ভেদ করে ঠোঁটজুড়ে আসে স্নিগ্ধ জলধারা। বহমান শান্ত জীবনের স্তুতি। তিনি হেসে চলেন, মন মাতানো মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কংক্রিট শহরের মিহি আলোর অডিটোরিয়ামে মানুষ মানুষের বিশ্বস্ত চোখ খোঁজে। স্বপ্ন দেখে সরল বৈভবহীন জীবনের। যে স্বপ্নের স্পন্দন এখন ছড়িয়ে গেছে সমস্ত বাংলাদেশে। মঞ্চে যিনি অনর্গল কথা বলছেন সেই ‘আলোকিত মানুষ’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাগ্মী এ মানুষটির জীবন বহু কাজে বহু সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত।

তাঁকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাঁর অজস্র সৃষ্টিশীল বইয়ের দিকে, পাঠ নিতে হবে তাঁর আত্মজৈবনিক বইয়ের সরস বয়ান। জানতে হবে তাঁর ব্যাপক কর্মজীবন সম্পর্কে। চোখ খোলা রেখে আমাদের নিবিষ্ট হতে হবে সবুজ নিসর্গ, মানুষের কাছাকাছি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে। সেই প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যন্ত্র বা নাগরিকতার ছোবলে যেখানে তাঁর হৃদয়ও আশাহত হয়েছে।

তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন―

একা একা টের পাই চারপাশে―আকাশে ও নিচে―
অবিশ্রান্ত আর্তনাদে ভেঙে যায় বহুদিনকার
ধানভানানীর গান এদেশের, পাটক্ষেত, বেহুলার ঘর―
ঢেঁকির পুরনো গল্প, সাপ, ঝোপ, দোয়েলের দেশ―
বাংলাদেশের আবহমানের।
(শাব্দিত কলঘর, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ২০)

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জন্ম ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে। অবিভক্ত ভারতে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। পিতা সেময়কার স্বনামধন্য অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার আযীম উদ্দীন আহমেদ, মাতা করিমউন্নেসা বেগম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলায়। দেশভাগের পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরিবারের সাথে চলে আসেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। পিতার চাকরি সূত্রেই তার শৈশবের কিছু সময় কাটে টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। সেখানকার বংশী নদী তাঁর শৈশবের মনোহর চিন্তায় দারুণভাবে গেঁথে আছে। তাঁর আত্মজৈবনিক বই বহে জলবতী ধারা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক ইত্যাদি তাঁর বহমান জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, জীবন গল্পের সুনিপুণ বৃত্তান্ত। পিতার নাট্যচর্চা ও কবিতার খেয়াল তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। কলেজে পড়া অবস্থায় বুঁদ হয়েছেন কবিতায় ও সরল জীবনের দর্শনে। মূলত তার ব্যাপ্তিময় জীবনের ভিতটা সেসময়ই রচিত হয়েছিল। কলেজজীবনে তার কিছু শিক্ষকের অবদানও এক্ষেত্রে স্বীকার্য। কলেজজীবনেই তিনি ভ্রমণ করেন ইংরেজি কবিতা ও বাংলা কবিতার অপার সৌন্দর্যের ভূমিতে। যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে যোগদানের মধ্যদিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। যা অব্যাহত ছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। হরগঙ্গা কলেজ ছাড়াও শিক্ষকতা করেছে সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ) এবং সর্বশেষ ঢাকা কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যাপনার পর অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বাংলা পড়াতেন। অধ্যাপক হিসেবে তার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। মূলত তাঁর সকল কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন সবটুকু। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিজের কথায়―

আমি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলাম। সাহিত্যের স্বপ্ন ও সৌন্দর্য আজীবন আমার চেতনা-জগতে যে-হীরের দীপ্তি ছড়িয়েছে আমি সেই উজ্জ্বলতাকে ছাত্রদের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। তাদের সেই আনন্দে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি। পরীক্ষায় ছাত্রদের বেশি নম্বর পাওয়াবার জন্যে পরিশ্রম করে জীবন নিঃশেষ করাকে আমার কাছে ‘দুর্লভ মানবজন্মে’র অপচয় বলেই মনে হয়েছে। জীবন কত দীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র সবচেয়ে ভালো করে জানতে পারে তার জীবনে দীপান্বিত শিক্ষকদের কাছ থেকে। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১১)

বর্তমান সময়ের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেও এ সফল অধ্যাপক দ্বিধা করেননি। প্রসঙ্গক্রমেই তিনি লিখেছেন―

আজ দেশের স্কুল-কলেজগুলোয় কার্যত লেখাপড়া হচ্ছেই না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, যাঁরা যোগ্য তাঁরা ছাত্রদের দেন অতি সামান্য। ফলে অভিভাবকরা কেউই বিদ্যালয়কে আজ তাঁদের সন্তানদের বিকাশের অঙ্গন হিসেবে মনে করেন না। ফলে বাণিজ্যিক উদ্যমসম্পন্ন গৃহশিক্ষকরা আজ হয়ে উঠেছেন ছাত্রসমাজের মূল আশ্রয়। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১৭৬)

বাংলাদেশের ষাটের দশকে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় একযুগ ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য বাঁকবদলের ধারায়, প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে। নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন সেসময়কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন হতে যুক্ত হন উপস্থাপনায়। রুচিশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, উপস্থাপনায় তার নিজস্ব ধরন ইত্যাদি কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক খ্যাতিতে ও ব্যক্তিত্বে। তাঁর হাত ধরেই অনেক মেধাবী তরুণ উঠে আসে। তাঁর ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ বইটিতে তিনি তুলে ধরছেন তাঁর উপস্থাপক জীবনের নানান দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতা। বর্ণনা করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা আর সমৃদ্ধির বিভিন্ন দিক। আমাদের মহান মুত্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল বলে তিনি বইটিতে বলেছেন নির্দ্বিধায়। তাঁর ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বই পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় জীবনে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাঙালির সংগঠনের দুর্বলতা এবং তা কীভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নতির মূলবাধা হয়ে দাঁড়ায় তার স্পষ্ট বয়ান রয়েছে বইটিতে। সংগঠনের অভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ব্যক্তি ডুবে থাকে তা আত্মকেন্দ্রিকতায় এসবের সত্য উপলব্ধি উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। তিনি কবিতায় লিখেছেন―

রাত্রিকে বাসে না ভালো কেউ সম্প্রতি। কেননা এ
রাত্রি সব এক করে দেয়। রাত্রির নির্বাক কাফন
জামার পৃথক রঙ, স্বতন্ত্র চুলছাঁটা, আস্তিনে মাপ
মুছে দিয়ে সবাইকে আদ্যোপান্ত এক পাতলুনের ভেতর
নিয়ে আসে।
(মৃত্যুময়ের জন্য, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ৫৬)

হ্যাঁ, তিনি এমন রাত্রিকেই দূর করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিমান, মুক্ত চেতনার সৃজনশীল মানুষ না হলে আগামী বাংলাদেশ হবে অনুর্বর, অন্ধকার। তিনি বইয়ের সোনালি অক্ষরে, জ্ঞানের অমৃতবাণীতে বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে, তরুণদের। বই পড়া আন্দোলন ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ হচ্ছে―আগামী দিনের অর্থাৎ তরুণদের বড় করে তোলা ও তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে অবিরাম। এগুলো মধ্যে রয়েছে―দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, আলোর ইশকুল, কেন্দ্রের লাইব্রেরি, আলোকচিত্র চক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। সারা দেশে প্রায় ২৪ লাখ ছাত্র/ছাত্রী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন―

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের সর্বাধিক কীর্তি হিসেবে দেখা দেয়। যেখানে আমরা অনেকে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি না, সেখানে একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যে তাঁর বিশেষ যোগ্যতার প্রকাশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যাপ্তি সারা দেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও।…সায়ীদ লিখেছেন প্রচুর। কবিতা ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভাষণ, স্মৃতিকথা ও জার্নাল, নাটক ও অনুবাদ।…তাঁর মধ্যে মিলিত হয়েছে শিল্পী ও কর্মী, ভাবুক ও উদযোগী। তাঁর চিন্তা ও সাধনায় দেশ ক্রমাগত উপকৃত হোক। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, পৃ. ৩৫, ৩৬)

সত্যিকারভাবেই বহুমুখী কাজের মাধ্যমে তিনি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতায় সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন। সামাজিক নানা কাজেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলন, পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে আছে―জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭), র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫), পরিবেশ পদক (২০০৮), বাংলা একাডেমি পদক (২০১২) ইত্যাদি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের দেখানো পথেই আগামী দিনের তরুণদের মধ্যে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বই পড়ার মাধ্যমে এমন অনুভূতির প্রবহমানতায়, চর্চায় হয়তো আমরা পাব সংঘবদ্ধ, প্রগতিশীল, আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে আসা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত এক প্রজন্ম। যা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

এ মহীরুহের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সহায়ক গ্রন্থ

১. বহে জলবতী ধারা (প্রথম খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
২. বহে জলবতী ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০১১।
৩. মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৮৮।
৪. নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৫. বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৬. আমার উপস্থাপক জীবন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৫।
৭, সংগঠন ও বাঙালি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
৮. আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, সম্পাদনা―আতাউর রহমান, ঢাকা, ২০১৫।
৯. ইন্টারনেট।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

সর্বশেষ

খুলনায় বৃষ্টিতে ভেসে গেছে ১০৮ কোটি টাকার মাছ

খুলনায় বৃষ্টিতে ভেসে গেছে ১০৮ কোটি টাকার মাছ

হেফাজতের হরতালে সহিংসতা মামলার আসামি গ্রেফতার

হেফাজতের হরতালে সহিংসতা মামলার আসামি গ্রেফতার

করোনা রোগীর চাপ ঢাকা মেডিক্যালে

করোনা রোগীর চাপ ঢাকা মেডিক্যালে

প্রতি শনিবার ১০ মিনিট সময় চান মেয়র আতিক

প্রতি শনিবার ১০ মিনিট সময় চান মেয়র আতিক

করোনায় প্রথম র‌্যাবের নারী সদস্যের মৃত্যু, মহাপরিচালকের শোক

করোনায় প্রথম র‌্যাবের নারী সদস্যের মৃত্যু, মহাপরিচালকের শোক

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব রটানোর অভিযোগে একজন গ্রেফতার

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব রটানোর অভিযোগে একজন গ্রেফতার

ফুটবল খেলায় ও রাস্তায় ঘোরাঘুরি করায় আটক ৪৪

ফুটবল খেলায় ও রাস্তায় ঘোরাঘুরি করায় আটক ৪৪

অনলাইনে বোমা তৈরির স্কুল চালাতো জঙ্গি ফোরকান

অনলাইনে বোমা তৈরির স্কুল চালাতো জঙ্গি ফোরকান

হেলেনার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় প্রতিবেদন ১২ সেপ্টেম্বর

হেলেনার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় প্রতিবেদন ১২ সেপ্টেম্বর

বিনামূল্যে অক্সিজেন পৌঁছে দেবে ছাত্রলীগ

বিনামূল্যে অক্সিজেন পৌঁছে দেবে ছাত্রলীগ

সিএএ বাস্তবায়নে বিলম্বে হতাশ উদ্বাস্তু-মতুয়ারা

সিএএ বাস্তবায়নে বিলম্বে হতাশ উদ্বাস্তু-মতুয়ারা

‘দলের ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন হেলেনা’

‘দলের ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন হেলেনা’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

শীতের অপেক্ষা করছি না

শীতের অপেক্ষা করছি না

মন্তাজের নিজের জমি

মন্তাজের নিজের জমি

© 2021 Bangla Tribune