X
সোমবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার জরুরি

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২১, ১১:৪০

স্বদেশ রায়

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা রাষ্ট্রচিন্তকদের অনেকেই মনে করেছিলেন পৃথিবী এখন গণতন্ত্রের। গণতন্ত্র বিকাশের চূড়ান্তই হবে আধুনিক সভ্যতা বিকাশের পথ। গণতন্ত্রকে এই শেষ কথা মনে করাতে আমেরিকাও দেশে দেশে কিছুটা হলেও তাদের নীতি বদলায়। দেখা যেতে থাকে– সামরিক সরকারের বদলে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তারা সমর্থন দেয়। আমেরিকার বন্ধু অনেক সামরিক সরকারের বিচারও তাদের নিজ নিজ দেশে হয়। আমেরিকা কোনও বাধা দেয় না। পশ্চিমা বিশ্বের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রাষ্ট্রচিন্তকও মনে করেছিলেন তৃতীয় বিশ্বও গণতান্ত্রিক বিশ্ব হবে। এমনকি অনেকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে এমনও ভেবেছিলেন, চীনের উদারনীতি ও পুঁজিবাদ গ্রহণ শেষ অবধি উদার গণতন্ত্রে গিয়ে পৌঁছাবে। কিন্তু একবিংশ শতকের প্রথম দশকের শেষের দিকে এসে দেখা গেলো– চীনের উদারনীতি ও পুঁজিবাদ গ্রহণের নীতি গণতন্ত্রে না গিয়ে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের সাফল্যের দিকে গেলো, যা এই পৃথিবীতে সম্পূর্ণ নতুন। কারণ, এর আগে কখনোই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের সাফল্য পৃথিবী দেখেনি। চীনের এই সাফল্যের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের কূটনীতি, সমরনীতি সবই বদলে গেলো আবারও। ত্রিশ বছর আগে তারা যেমন ভেবেছিল, সেসব ভাবনার অনেক কিছু নিয়ে তারা এখন নতুনভাবে লিখতে ব্যস্ত। অর্থাৎ পৃথিবী আবারও একটি পরিবর্তনে ঢুকে গেছে।

তবে পৃথিবীর এই পরিবর্তনের সময়ে আরেকটি বড় পরিবর্তন হয়েছে গণতন্ত্রের। গণতন্ত্রে যে চারটি বিষয় প্রথমত দেখা যায় সে চারটি বিষয়ই এখন পশ্চিমা বিশ্ব থেকে শুরু করে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে প্রশ্নের মুখোমুখি শুধু নয়, চরম সংকটে। গণতন্ত্রে প্রথমত আসে জনগণ কোনও বাধা ছাড়া তার ভোটের ব্যালটে সিল দিতে পারবে। জনগণের এই ভোটে স্বাধীন ও যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। এই স্বাধীন ও যোগ্য জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে পার্লামেন্ট বা কংগ্রেস গঠিত হবে। কিন্তু এ মুহূর্তের পৃথিবীর দুর্ভাগ্য হলো, গণতন্ত্রে পৃথিবীর সেরা দুই প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও আমেরিকার কংগ্রেস এ দুটোতেও জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রে যা নিষিদ্ধ বা গণতন্ত্রের সঙ্গে যায় না, এমন বিষয়ও চলে আসছে। অর্থাৎ বর্ণ, ধর্ম, ইমিগ্র্যান্ট এমনি সংকীর্ণতা ও পশ্চাৎপদ চিন্তা অনেকেই প্রকাশ্যে ভোটের রাজনীতিতে অর্থাৎ গণতন্ত্রে ব্যবহার করছেন। তাদের অনেকেই কংগ্রেসে বা পার্লামেন্টে ঢুকে যাচ্ছেন অর্থাৎ নির্বাচিত হচ্ছেন। অন্যদিকে গণতন্ত্রের জন্যে একটি সঠিক নির্বাচন অনুষ্ঠানে যাদের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেমন- নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা অর্থাৎ সব ধরনের ব্যুরোক্রেসি (মিলিটারি এবং সিভিল ), বিচারক এবং যদি কোনও দেশে অম্বুডসম্যান থাকে তাহলে অম্বুডসম্যানও। তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে গত দুই দশক ধরে ধীরে ধীরে প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবার নির্বাচন পরিচালনাকারী এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে যে শুধু একটা খারাপ নির্বাচন হচ্ছে বা প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছেন না তা নয়, রাজনৈতিক দলগুলোতেও এর কু-প্রভাব পড়ছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর আর চিন্তা করতে হচ্ছে না, কে পার্লামেন্টের জন্যে বা কংগ্রেসের জন্যে ভালো প্রতিনিধি হবেন, জনগণ কাকে পছন্দ করবেন, তাকে মনোনয়ন দেওয়ার। এর পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ ধরনের অনুগত ও স্বাধীনসত্তাবিহীন লোকদের মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচিত করে আনার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ গণতন্ত্রের একটা বড় শর্ত হলো, পার্লামেন্ট বা কংগ্রেসে যতটা বেশি স্বাধীনসত্তার মানুষকে নির্বাচিত করে আনা যায়। এমনকি সাংবিধানিকভাবে তারা যাতে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকতে পারে তাও নিশ্চিত জরুরি। সাংবিধানিকভাবে জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিমত প্রকাশ ও তার সপক্ষে অবস্থান নেবার স্বাধীনতা নষ্ট করাও কিন্তু গণতন্ত্রের সঙ্গে যায় না। এই স্বাধীনতা নষ্ট হলে গণতন্ত্রের অনেক বড় ক্ষতি হয়। অর্থাৎ তখন পার্লামেন্ট বা কংগ্রেসকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করে এক ধরনের অটোক্র্যাসি অর্থাৎ স্বৈরতন্ত্র বা ব্যক্তিতন্ত্র সৃষ্টি হয়ে যায়। আবার এই নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নষ্ট করা বা কোনও পক্ষে ব্যবহার করার ফলে রাজনৈতিক দল যে সহজে নির্বাচন পার হবার সুযোগ পায়, এর সুদূরপ্রসারী ফলও রাজনৈতিক দলে পড়ে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলে তখন যোগ্য লোকের বদলে সুবিধাবাদী ও সংকীর্ণ চিন্তার লোকের ভিড় বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক দলের এই চরিত্র নষ্ট গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমিতে আঘাত করে। গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘরই নষ্ট হয়ে যায়। গত প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে পৃথিবীর দেশে দেশে গণতন্ত্রের অন্যতম দুই প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ রাজনৈতিক দল ও পার্লামেন্ট বা কংগ্রেস এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

গণতন্ত্রে এর পরে আসে অর্থনৈতিক নীতিতে পুঁজিবাদ বা ক্যাপিটালইজম। গণতন্ত্র কখনোই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি গ্রহণ করবে না। তৃতীয় বিশ্বের দেশ শুধু নয়, উন্নত দেশেও অনেক রাষ্ট্র সামাজিক সুরক্ষা দেবে বা দেয়। কিন্তু গণতন্ত্রে এই সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে অর্থনীতির নীতিকে মেলানো হয় না। সামাজিক সুরক্ষা নীতি সরকার তার নিজস্ব উপায়েই দিয়ে থাকে। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবে পড়ে একসময়ে পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক দেশ পুঁজিবাদ বা উদার অর্থনীতির পাশাপাশি সরকার নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি গ্রহণ করেছিল। যেসব দেশ এই নীতি গ্রহণ করেছিল তারা কেউই সফল হয়নি। বরং গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এসে সেই সব দেশের অর্থনীতিকে রক্ষার জন্যে তাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। তারা সকলেই শেষ অবধি উদার ক্যাপিটালইজমই গ্রহণ করে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর গত দেড় দশকে দেখা যাচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো উদার অর্থনীতি গ্রহণ করলেও তারা রাষ্ট্রের অলিখিত ক্ষমতা দিয়ে কতিপয় সুবিধাবাদী ব্যক্তিকেই অর্থনীতির নানান ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাবার সুযোগ করে দিচ্ছে। এমনকি কোনও কোনও দেশে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রকদের অর্থনীতিতে নিজস্ব অনেক বড় বড় স্টেক আছে। তারা অর্থনীতিকে তাদের ওই সব স্টেকগুলোর স্বার্থেই ব্যবহার করছে। কোনও রাষ্ট্র যখন তার অর্থনীতিতে এভাবে সুবিধাবাদীদের বিশেষ সুবিধা দেয় বা দেওয়ার সুযোগ করে দেয়, তখন স্বাভাবিকই প্রশাসনও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এবং পুরো অর্থনীতির বিষয়টি তখন নীতির বদলে দুর্নীতির দ্বারাই পরিচালিত হয়। এই অর্থনৈতিক দুর্নীতি এতই সর্বগ্রাসী হয়, তা শুধু গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে না- রাষ্ট্রকেও ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যায়। তৃতীয় বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে এখন অর্থনীতির এই দুর্নীতি এবং ‘বিশেষ শ্রেণি বা কতিপয় ব্যক্তির জন্যে অর্থনীতি’ হওয়াতে সেই ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকেও চলেছে।

গণতন্ত্রের আরেকটি বড় বিষয় হলো আইনের শাসন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগ সবসময়ই স্বাধীন থাকে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্ব শুধু নয়, আমেরিকায়ও আইনকে, বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণের একটা চেষ্টা এই শতাব্দীতে যেখানে কমার কথা ছিল, সেখানে বেড়েছে । আইনের শাসনে সব থেকে একটা জরুরি বিষয় থাকে - ‘আইনের শাসন’ না ‘আইন দ্বারা শাসন’। আইনের শাসন সবসময়ই একটি গণতান্ত্রিক রীতি। যার মূলই হচ্ছে, আইনের কাছে সকলে সমান এবং আইনের অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। আইন কখনোই মানুষের স্বাধীন সত্তা, স্বাধীন চলাফেরা ও মত প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে না। আইন যখনই মানুষের স্বাধীন চলাফেরা, স্বাধীন সত্তা ও স্বাধীন মত প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখনই ধরে নিতে হয় ওই রাষ্ট্রে আইনের শাসন নেই। সেখানে রাষ্ট্র আইন দ্বারা মানুষকে শাসন করছে। আইন দ্বারা শাসনের এই ধারা এখন ধীরে ধীরে তৃতীয় বিশ্বসহ উন্নত বিশ্বেরও অনেক দেশে গণতন্ত্রের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। এটা আগে শুধু স্বৈরতন্ত্রী দেশে ছিল। সে রাষ্ট্রগুলোকে একটা সময়ে পুলিশি স্টেট বলা হয়েছে। সেখানে আইন বিভাগের থেকে নির্বাহী বিভাগের অনেক প্রতিষ্ঠান বেআইনিভাবে অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়েছে। এবং তারাই আইনের মূল প্রয়োগকারী হয়ে গেছে। যার ফলে ওই দেশগুলো পুলিশি রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।  তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই মুহূর্তে পুলিশি রাষ্ট্রের চরিত্র ঢুকে যাচ্ছে।

গণতন্ত্রের অপর বড় প্রতিষ্ঠান হলো সিভিল সোসাইটি। সিভিল সোসাইটির স্বাধীন ও দিকনির্দেশনামূলক মতামত ছাড়া কখনোই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র বিকশিত হয় না এবং সামনের দিকে এগোতে পারে না। যেহেতু গণতন্ত্র সভ্যতার একটি পথ, তাই সিভিল সোসাইটি ছাড়া পৃথিবীর শুরু থেকে আজ অবধি কোনও সভ্যতা যেমন এগোতে পারেনি, গণতন্ত্রও তেমনি পারবে না। গণতন্ত্রের অন্যতম কাজ হলো সিভিল সোসাইটিকে বেড়ে ওঠায় সব ধরনের সুযোগ দেওয়া।  বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষ দশকে বা  সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে পৃথিবীর দেশে দেশে, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক বিশ্বে সিভিল সোসাইটি শক্তিশালী হবে বলেই সবাই মনে করেছিল। কারণ, সিভিল সোসাইটি শক্তিশালী হবার  জন্যে সব থেকে বেশি দরকার হয় ওই সমাজের মানুষ ও মতামত যেন কোন একটি মত বা আদর্শ দ্বারা পরিচালিত না হয়। বহুমতকে পর্যালোচনা করে সবকিছু থেকে ভালোটুকু গ্রহণ করার শক্তি নিয়েই সিভিল সোসাইটি গড়ে ওঠে। যে কারণে সিভিল সোসাইটির সঙ্গে রাজনীতির একটা দ্বন্দ্ব সবসময়ই সব সমাজে থাকে। রাজনীতি সবসময়ই চায় তার মতাদর্শে সিভিল সোসাইটি পরিচালিত হোক; অন্যদিকে সিভিল সোসাইটি  সবসময়ই চায় তাদের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন চিন্তা বা মতাদর্শ থেকে কিছু না কিছু গ্রহণ করে রাজনীতি নিজেকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করুক। বাস্তবে এই দ্বন্দ্ব কোনও সমাজ বা রাষ্ট্রে  যত বেশি প্রবল হয় ওই রাষ্ট্র ও সমাজ তত বেশি আধুনিকতার পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে শুধু তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নয়, পশ্চিমা বিশ্বেও দেখা যাচ্ছে সিভিল সোসাইটিকে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার এক জোর প্রচেষ্টা। এমনকি  ইতোমধ্যে তৃতীয় বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশ রাজনৈতিক দল অনুগত সিভিল সোসাইটি গড়ে তুলতেও সমর্থ হয়েছে।

তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশেই গণতন্ত্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এ মুহূর্তে এমনিভাবে ধ্বংসের দোরগোড়ায়। কেন এসব দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে ভেঙে যাচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক নেতারা নিজেদের গণতান্ত্রিক চরিত্র বদলে ফেলছে তা নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে মনে করছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্বকালে দ্বিপরাশক্তির বিশ্বে যেমন অনেক গণতান্ত্রিক দেশ নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি গ্রহণ ও সমাজকে রাষ্ট্র দিয়ে নিয়ন্ত্রণের অনেক পথ নিয়েছিল, এখনও তেমনটি ঘটছে। অর্থাৎ গত দেড় দশকে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামরিক উন্নয়ন পৃথিবীকে এদিকে ঠেলে দিচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো চীনের রাষ্ট্রীয় সর্বগ্রাসী আধিপত্যের নীতি গ্রহণ করছে। ফলে গণতন্ত্র এভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, এর মূল কারণ– এসব দেশে কতিপয় লোক রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে নিজের সম্পদ গোছানোর কাজে ব্যবহার করার জন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক নেতাকে এদিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাস্তবে কম-বেশি দুটোই কাজ করছে। হয়তো এর সঙ্গে আরও কিছু ভুল পদক্ষেপ প্রতি মুহূর্তে যোগ হচ্ছে।

কিন্তু সত্য হলো এই যে পথ, এটি দুর্নীতি ও স্বৈরতন্ত্র দিয়ে তৈরি। এ পথে পৃথিবীর সভ্যতা বেশিদূর যায় না। সত্তর বছরে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর ভেঙে পড়াই তার প্রমাণ। কারণ দুর্নীতি বা অন্যায়ের পথ, কঠোরতার কোনও পথ পৃথিবীতে বেশিদিন স্থায়ী হয় না। বর্তমানের এই আধুনিক সময়ে তো এই আশাই করা যায় না। তাই সত্যিকার অর্থে নিজ নিজ দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য, নিজ নিজ দেশের সভ্যতার স্বার্থে গণতন্ত্রের এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পুনরুদ্ধার করা দরকার। এদিকে মনোযোগ না দিলে গণতান্ত্রিক দেশগুলোও স্বৈরতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে নিজেদের পেছন দিকে ঠেলে দেবে।

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/জেএইচ/

সম্পর্কিত

বুয়েট শিক্ষকেরও আছে ‘দুর্নীতি করার অধিকার’

বুয়েট শিক্ষকেরও আছে ‘দুর্নীতি করার অধিকার’

ভালো মানুষ ও রাজনীতিমুক্ত স্থানীয় সরকার

ভালো মানুষ ও রাজনীতিমুক্ত স্থানীয় সরকার

আয়-ব্যয়ের ভাগশেষ শুধুই দীর্ঘশ্বাস

আয়-ব্যয়ের ভাগশেষ শুধুই দীর্ঘশ্বাস

পুরস্কার থাকলে তিরস্কার কেন নয়?

পুরস্কার থাকলে তিরস্কার কেন নয়?

তাঁর অবসরের পরে...

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭:১২
ওমর শেহাব বাংলাদেশে যারা এক ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, বরং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাস করে (এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চারটি স্তম্ভের একটি) তাদের মধ্যে তিনটি দল আছে। প্রথম দলটি হলো যারা খুবই হতাশ এবং ধরে নিয়েছে এই দেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির কোনও ভবিষ্যৎ নেই। দ্বিতীয় দলটি হলো যারা মনে করে এই দেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা উচিত এবং সম্ভব (জেনারেল জিয়ার আগে কিন্তু বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিই ছিল এবং তাতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু কম ধার্মিক ছিল না!) কিন্তু আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই এই আন্দোলনের বাহন হওয়ার উপযুক্ত নয়। শেষ দলটি হলো তারা যারা মনে করে এই মুহূর্তে ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের সবচেয়ে উপযুক্ত বাহন হলো আওয়ামী লীগ। আমার এই লেখাটি শেষ দলটির জন্য।

কারও যাতে কোনও অস্পষ্টতা না থাকে তাই আমি একটু ব্যাখ্যা করি ধর্মনিরপেক্ষতা কী। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হলো রাষ্ট্র তার আইনে একটি ধর্মের নাগরিককে অন্য ধর্মের নাগরিকের চেয়ে বেশি সুবিধা দেবে না, সবাই সমান মর্যাদা পাবে। প্রত্যেকে যার যার ধর্ম নিজের মতো পালন করবো। যে কোনও ধর্ম বিশ্বাস করে না, সে তার মতো জীবনযাপন করবে।  কেবল সংখ্যায় বেশি হওয়ার কারণে এক ধর্মের অনুসারী যদি অন্য ধর্মের অনুসারীকে বিরক্ত করে তাহলে রাষ্ট্র তাকে ‘টাইট’ দেবে। এটি এক ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বভিত্তিক রাজনীতির চেয়ে দুইভাবে পৃথক।

প্রথমত, আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র তার সংবিধানে বা আইনে কোনও একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে প্রাধান্য দেবে না। আর অনানুষ্ঠানিকভাবে আকারে ইঙ্গিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এরকম বলবে না যে তোমরা থাকো, কিন্তু সীমিত পরিসরে। ধর্ম-বর্ণ-পরিচয় নির্বিশেষে সবার একটাই পাওয়া– সমমর্যাদা ও ন্যায়বিচার। এর মানে কিন্তু এই নয় যে নিজের গঠনতন্ত্রে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ লেখা কোনও দল ক্ষমতায় এলেই এসব অর্জন হয়ে যাবে।

‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রথমত বিশ্বাসের ও দ্বিতীয়ত চর্চার বিষয়। অনেকে বলতে পারেন যে গঠনতন্ত্রে লেখালেখির আনুষ্ঠানিকতা গুরুত্বপূর্ণ নয়, একটি দল সেটি চর্চা করছে কিনা সেটিই মুখ্য।
 
তাদের প্রতি আমার একটিই প্রশ্ন - আপনি নিজের ভবিষ্যতের আর্থিক নিশ্চয়তার জন্য যখন জমি বা ফ্ল্যাট কিনেন তখন কি মুখে মুখে কিনেন, নাকি দলিলে লিখিয়ে নেন?

আমি জানি শুরুতে বলা এই শেষ দলটির আবার দুটি উপদল আছে- একটি হলো মরে গেলেও আওয়ামী লীগের বাইরে ভোট দেবে না আর অন্যটি হলো আওয়ামী লীগের চেয়ে আরও নিখুঁত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল পেলে আমার মতো ‘পল্টি’ মারবে। আমি সেই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে যাবো না।
 
তো, এই শেষ দলের সদস‌্যদের প্রতি আমার প্রশ্ন হলো– আপনাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?

আপনাদের নেত্রীর বয়স এখন চুয়াত্তর বছর। গত নির্বাচনের পর পর, ২০১৯ সালের চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি ডয়েচে ভেলের প্রধান সম্পাদক ইনেস পোলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন তিনি এবার অবসর নিতে চান। এরমধ্যে অতিমারি পৃথিবীর অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই পাল্টে দিয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নেই। কাজেই আমি জানি না বর্তমান পরিস্থিতিতে তার পরিকল্পনায় কোনও পরিবর্তন এসেছে কিনা। আসাটাই স্বাভাবিক।

এই মুহূর্তে যদি শেখ হাসিনা অবসর আরও কিছু দিন পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তারও একটি প্রাকৃতিক ঊর্ধ্বসীমা আছে। আমরা সবাই-ই একদিন না একদিন অবসর নেবো  স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। কাজেই গত তিন বছরে পৃথিবী অনেকটা পাল্টালেও আমার প্রশ্ন পাল্টাচ্ছে না– আপনাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?

আপনি যদি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে দশ বছরের ছোট হন এবং বাংলাদেশের গড় আয়ু মাথায় রাখেন তাহলে আপনি আর কেবল দুটি নতুন সরকার দেখে যাবেন। সেই নতুন সরকার কী ধরনের সরকার হলে আপনি খুশি হবেন? কী ধরনের আইন পাস করলে আপনি শান্তি পাবেন? কোন খাতে বড় বাজেট রাখলে আপনি স্বস্তিতে অবসরে যেতে পারবেন বা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারবেন? আর আপনি যদি কেবল ভোটার হয়ে থাকেন তাহলে আপনি পাবেন সর্বোচ্চ ১১টি নতুন সরকার। ধরলাম এরমধ্যে অর্ধেক সংখ্যক সরকার হবে আপনার পছন্দের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে বিশ্বাসী। তাহলে সেই পাঁচটি সরকারের চিন্তাভাবনা আর কাজকর্ম প্রভাবিত করার জন্য আপনি কতটুকু প্রস্তুত?

এতক্ষণ আমরা ভাসা ভাসা কথা বলেছি। এবার বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় যাই।

ইতিহাস একটি সরকারকে মনে রাখে দুটি কারণে - রাজনৈতিক আদর্শের কারণে আর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর কারণে। দুটি কারণেই শেখ হাসিনা চিরস্থায়ীভাবে শুধুই বাংলাদেশের না, পৃথিবীর ইতিহাসেই জায়গা করে নিয়েছেন। যখন পরাশক্তিগুলো তাঁকে থামাতে চাচ্ছিল, তখন তিনি কারও কথায় পাত্তা না দিয়ে যুদ্ধাপরাধের জন্য দেওয়া বিচার বিভাগের রায় কার্যকর করেছেন। আর অর্থনীতির কথা যদি বলি- আমি ১২ বছর আগে যখন আমেরিকায় আসি, একটা কফি খাওয়ার সময়ও ডলারকে বাংলাদেশি টাকায় পরিবর্তন করার সময় মনে মনে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত। আর এখন আত্মীয়-স্বজনকে যখন ঢাকা আর চট্টগ্রামের আলিশান দোকানে বসে কফি খেতে দেখি তখন সেই দামকে ডলারে পরিবর্তন করলে তখনও প্রায় হার্ট অ্যাটাকই হয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসের দুটি সমস্যা আছে– প্রথমটি হলো এটি মাঝে মধ্যে মোড় নেয় এবং প্রায়ই সেই বাঁকটি হয় অপছন্দের বাঁক।

দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো এটিকে সাময়িকভাবে হলেও ধুয়ে-মুছে ফেলা যায়।

শুধু আমাদের নয়, যেকোনও দেশের ইতিহাসেই আমরা এটি দেখেছি। স্বাধীনতার পর পর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল সবার জানা। কিন্তু আমি যখন আশির দশকের শেষে ও নব্বই দশকের পুরোটা স্কুলে গেলাম, ততদিনে এই তথ্যটি ধুয়ে মুছে ফেলা হয়েছিল।  শুধু তাই-ই নয়, যুদ্ধাপরাধীদের পরিচালিত দৈনিকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের জন্য ভারতকে দোষারোপ করাও আমরা দেখেছি। আমি এখন যেই দেশে থাকি সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ঘৃণ্য দাসপ্রথা টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করা জেনারেলদের স্মৃতি টিকিয়ে রাখার যুদ্ধের কয়েকটি তরঙ্গ এসে আবার চলে গেছে। আর নতুন মোড় নেওয়ার ব্যাপারটি তো আমার প্রজন্ম নিজের চোখের সামনেই দেখলাম। যখন স্কুলে যেতাম কেউ যদি আমাকে বলতো একদিন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে, আমি কোনও দিনও বিশ্বাস করতাম না। আমাদের আগের প্রজন্মের মানুষদের ইতিহাসের বাঁক ঘোরার সাক্ষী হওয়ার অভিজ্ঞতাটি অবশ্য অত সুখকর ছিল না। তারা নিজের চোখে দেখেছে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ওপর তৈরি হওয়া একটি জাতি আস্তে আস্তে ভুল পথে চলে যেতে থাকে।

শিবের গীতের জন্য দুঃখিত। এখন আমি কিছু সম্ভাব্য রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা বলবো।

প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী: ধরা যাক শেখ হাসিনার অবসরের পরও আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বড় ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে টিকে আছে।

রাজনীতি মূলত আদর্শনির্ভর। আর শীর্ষনেতার জীবনাচরণ হলো সেই আদর্শের আয়না। কাজেই নেতৃত্বে যখন পরিবর্তন আসবে, তার প্রভাব সেই রাজনৈতিক দলে পড়তে বাধ্য। কল্পনা করুন অন্য একজন আওয়ামী লীগ নেতাকে, যিনি যুদ্ধাপরাধের রায় বাস্তবায়নের সময় দলের শীর্ষে ছিলেন শেখ হাসিনার পরিবর্তে। কল্পনা করুন গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ফোন দিচ্ছে গোলাম আযমের ফাঁসি স্থগিত করার জন্য। কল্পনা করুন সত্তরের নির্বাচন কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু নন, আছেন মওলানা ভাসানী আর তার অতি বিখ্যাত বহুরূপী চরিত্র। কল্পনা করুন ১৯৭১ সালের নয় মাস আর প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে আছেন খন্দকার মুশতাক আহমেদ! এসব কিন্তু হতেই পারতো। এই বিকল্প নেতৃত্বগুলোর প্রত্যেকেই কিন্তু সেই অবস্থানের খুব কাছেই ছিলেন। তাহলে ইতিহাসটি কেমন হতো? এই বাংলাদেশ কেমন হতো? এই বাংলাদেশ কি আদৌ হতো? আপনি আজকে তাহলে কী হতেন? কোথায় থাকতেন? কাজেই আমি লিখে দিতে পারি, শেখ হাসিনার অবসরের পরে আওয়ামী লীগ আর আগের মতো থাকবে না। থাকাটা ভালোও না। কিন্তু নতুন আওয়ামী লীগ ভালো হবে না খারাপ হবে সেটিই হলো প্রশ্ন। শুরুতে বলা শেষ দলটির সদস্য হিসেবে নতুন আওয়ামী লীগের জন্য কি আপনি প্রস্তুত?

দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণী: ধরা যাক আওয়ামী লীগ আর একটি দল থাকবে না, একাধিক ছোট ছোট দলে পরিণত হবে।

এটি ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে খুব একটা খারাপ লাগে না। বাজারে যদি একাধিক ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল থাকে তাহলে তাদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা হবে এবং কাস্টমার হিসেবে আমি কম দামে ভালো জিনিস পাবো। তবে সমস্যা হচ্ছে সেই ছোট দল থেকে আবার ক্ষমতায় যাওয়ার পর্যায়ে যেতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে। কিন্তু গড় আয়ু মাথায় রাখলে আমি পাবো আর কেবল সাতটি নতুন সরকার। এরমধ্যে অর্ধেক যদি আমার আদর্শের হয় তাহলে মাত্র তিনটি আমার পছন্দের সরকার। মাত্র তিনটি নির্বাচন, তিনটি বাজেট আমার জীবদ্দশায় যেখানে আমি ভোটার হিসেবে এই দেশে একটি ন্যায়ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ উদার গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করার জন্য মত প্রকাশ করতে পারবো। জীবন এত ছোট ‘কেন’!

তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণী: দীর্ঘ সময়ের জন্য এক ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বভিত্তিক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা।

সত্যি কথা বলতে কী, এটিই আমাদের সবচেয়ে বেশি মাথায় রাখা উচিত। কথায় বলে, শুধু স্বপ্ন দেখো না, স্বপ্নভঙ্গের প্রস্তুতিটিও রেখো।  আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় যেকোনও ক্ষমতাশীল দলের মূল চর্চা হলো নাগরিকদের হতাশা ব্যবস্থাপনা। এর অর্থ হলো নাগরিকদের হতাশা কখনও এমন পর্যায়ে যেতে না দেওয়া যে রাস্তায় নামলে আমার নেতাকর্মীরা (মতান্তরে দলীয় সন্ত্রাসীরা) ‘সামলাতে’ পারবে না।

আজকে আমি যদি এক ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতা হই আমার কৌশল কী হওয়া উচিত? একজন আরাম-কেদারাভিত্তিক রাজনীতি-বিশ্লেষক হিসেবে আমার অনুমান হলো, আমার প্রথম কাজ নাগরিকদের হতাশার আগুনে ঘি ঢালা। এটি সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে হতে পারে, নির্বাচনে জোচ্চুরি নিয়ে হতে পারে। অথবা হঠাৎ যদি বাংলাদেশ যদি আবারও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তালিকার শীর্ষে উঠে আসে সেটিরও সুযোগ নেওয়া যেতে পারে!

আরেকটি বুদ্ধি হতে পারে এর সঙ্গে নতুন রক্ত আর নতুন মুখ নিয়ে আসা। আমরা যারা এরকম কিছু সাম্প্রতিক ব্যর্থ চেষ্টা নিয়ে হাসাহাসি করি, তাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, এগুলো হলো রাফ খাতা তাই এগুলো সামনে আসছে। নোট খাতায় দুই রঙের কলমে গোটা গোটা অক্ষরে সুলিখিত পরিকল্পনা হচ্ছে না এরকম কেউ যদি ভাবে সে বোকার স্বর্গে বাস করছে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে এক ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো তখনই ক্ষমতায় আসতে পেরেছে যখন ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো আকণ্ঠ দুর্নীতি আর অদক্ষতায় নিমজ্জিত হয়েছে।

আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি হবে সম্পূর্ণ নতুন চকচকে একটি রাজনৈতিক দল- ঠিক জেনারেল জিয়ার মতো চকচকে। তাদের কাজ কিন্তু খুব বেশি কঠিন না। তাদের মূল কাজ দেশের শতভাগ মানুষকে আস্থায় আনা নয়। তাদের মূল কাজ হলো দশ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটারকে একটু এই ভাবনার অবকাশ দেওয়া যে আচ্ছা এদের একটু সুযোগ দিয়ে দেখিই না! আর একবার ক্ষমতায় আসতে পারলে তাদের প্রধান কাজ হবে একটি আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করার কাজ শুরু করা। মুশতাকের নৈতিকতা সপ্তাহ আর জেনারেল জিয়ার উনিশ দফার কথা মনে আছে? পাশাপাশি কী হবে? আগেরবার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পুনর্লিখন হয়েছিল। এবার হবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইতিহাসের পুনর্লিখন। আর আমাদের পরের প্রজন্ম পাঠ‌্যবইয়ে পড়বে ‘মুক্তিযোদ্ধা গোলাম আযমে’র কথা যে ন্যায়বিচার পায়নি!  এই ব্যাপারে আপনার প্রস্তুতি কী?

এবার কিছু সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের কথা বলি।

প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী: দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গতি এখনকার মতোই থাকবে।

এটি আসলে প্রায় অসম্ভব এবং খুব সম্ভবত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রায় অবধারিত। সরকার যখন পাল্টায় তাদের প্রাধিকার পাল্টায়। তা না হলে আর রাজনৈতিক আদর্শের পার্থক্য কোথায় থাকলো? যদি শেখ হাসিনার অবসরের পরে এক ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বভিত্তিক রাজনৈতিক দল আসে অথবা একাধিকভাগে ভাগ হওয়া আওয়ামী লীগের একটি অংশ যদি ক্ষমতায় থাকে ও সামাজিক ডানপন্থার দিকে সরে যায় তাহলে সেটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বিশাল পরিবর্তন আনতেই পারে। আমাদের মূল সমস্যা কিন্তু জিডিপির সূচক বাড়ানো নয়। এটি বাড়ানো ভালো তবে এটি আসলে কাজের শুরু নয়, শেষ। সরকারের মূল কাজ হলো সম্পদের বৈষম্য কমানো।

একটি জিনিস আমাদের মাথায় রাখতে হয়, সুযোগ সম্পদের সমানুপাতিক নয়, সূচক হিসেবে কাজ করে। কাজেই যারা টাকা বেশি তার সন্তান সেই হারে বেশি সুযোগ পায় না, বরং তার টাকার সূচক পরিমাণ বেশি সুযোগ পায়। এই ঘাটতি মেটানোই সরকারের কাজ। সরকার যদি না মেটাতে পারে কী হবে? আপনার জীবদ্দশাতেই তরুণরা বিদ্রোহ করবে! তাদের কথা শুনতে আপনি বাধ্য হবেন। নিজে অনেক টাকা বানালেও অবসর আর পাবেন না। জানালা বন্ধ রাখলেও রাস্তা থেকে স্লোগানের আওয়াজ ঠিকই ভেসে আসবে। কাজেই আমরা যদি বেশি সুযোগপ্রাপ্ত হই এবং পরিণত বয়সে শান্তিতে থাকতে চাই, তাহলে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো নিজের চেয়ে কম সুযোগপ্রাপ্ত তরুণ বা তরুণীটিকে তার সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া। আপনার প্রিয় দল যদি বিগড়ে যায় আর সেটি না করে, তার জন্য আপনার প্রস্তুতি কি?

দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণী : অন্ধকারের দশক।

ধরা যাক শেখ হাসিনার অবসরের পর সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটিই ঘটলো। অর্থাৎ নতুন আওয়ামী লীগ তার সঠিক রাস্তাটি খুঁজে পাচ্ছে না আর প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সেই সুযোগে ক্ষমতার দখল নেওয়ার প্রস্তুতিটি নেই। তখন কী হবে? যেটি হবে সেটি হলো অস্থিতিশীল অর্থনীতি। এটি কিন্তু আপনার অপছন্দের দলের ক্ষমতায় থাকার মতো না! ব্যবসায়ী, চাকরিদাতা, ও চাকরিজীবী- সবাই পছন্দ করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। এর মানে হলো আপনি আপনার স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারছেন। হয়তো সরকার আপনার পছন্দের না কিন্তু অন্তত আপনি আপনার অবসর কীভাবে নিশ্চিন্তে কাটাবেন তার বুদ্ধিটি জানেন। আপনি যদি তরুণ হন ও সরকার যদি আপনার অপছন্দের হয়, অন্তত কীভাবে সেটি পাল্টাবেন তার একটি পরিকল্পনা করতে পারছেন। কিন্তু যদি দেশ কে চালাচ্ছে, কীভাবে চলছে, সামনে কী হবে এরকম ব্যাপারটিই যদি বুঝতে পারা না যায় তাহলে কী হবে? একটু আশপাশে দেখুন। এরকম দেশ এখনই আপনি অন্তত হাফডজন পাবেন। শুধু তাই-ই নয়, আমাদের নিজেদের দেশেই এরকম অনেক আর্থসামাজিক বৃত্ত আছে, যেখানে তরুণ-তরুণীদের ধারণা এই দেশে তাদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই।

প্রতি বছর হাজার হাজার ছেলেমেয়ে শখ করে চিরস্থায়ীভাবে দেশত্যাগ করে না! এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যদি দীর্ঘমেয়াদি হয় তাহলে বিনিয়োগ ও বেসরকারি চাকরির বাজারে নামবে ধস! তখন কী হবে? আপনি কি তার জন্য প্রস্তুত?

আমি ‘দশক’ শব্দটি ব্যবহার করেছি এই অনুমানে যে যেভাবেই হোক পরবর্তী দশ বছরে যেকোনও একটি আদর্শের দল ‘অনেক হয়েছে, আর না’ এই মানসিকতার সদ্ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসবে এবং সেটি সুসংহত করবে।

আমি অনেক সম্ভাব্যতার কথা বললাম। আমাকে অনেকে ভুল বুঝতে পারেন যে কেন আমি ভীষণ হতাশার কিছু সম্ভাবনার কথা বলছি? আসলে আমি হতাশার কথা বলছি না, এগুলো আসলে ভীষণ আশাবাদ, সম্ভাবনা আর কাজ করার জায়গা। এই চ্যালেঞ্জগুলোই কিন্তু আমাদের যার যার পছন্দের আদর্শের রাজনৈতিক দলগুলোতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি করবে। শেরেবাংলা আর সোহরাওয়ার্দী যদি সব কাজ শেষ করে ফেলতেন, তাহলে কি আমরা বঙ্গবন্ধুকে পেতাম? কিন্তু যেকোনও নেতৃত্বের জন্য লাগে সুযোগ্য সমর্থক আর কর্মী বাহিনী। তাঁর অবসরের পরে আপনি কি প্রস্তুত?

লেখক: তত্ত্বীয় কোয়ান্টাম বিজ্ঞানী, আইবিএম থমাস জে. ওয়াটসন রিসার্চ সেন্টার, যুক্তরাষ্ট্র।  সদস্য, বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন কমিটি
/এসএএস/এমওএফ/

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: প্রান্তজনের সখা

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭:৩৯

নবনীতা চৌধুরী সত্তর সালের সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের পরদিন অর্থাৎ ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর ঝড়জল মাথায় নিয়েই আমার মাকে নিয়ে তাঁর বাবা (আমাদের নানা) রওনা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উদ্দেশ্যে। অনেকেই তখন অবাক হয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, মানুষের জীবন বাঁচে না, আর মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করতে সেসময় এমন তাগিদের কী অর্থ থাকতে পারে! কিন্তু, আমাদের দাদু তখন অপ্রতিরোধ্য। মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেই একটা দায়িত্ব শেষ হয় তাঁর। ঢাকা এসে মেয়েকে এপ্লাইড ফিজিক্সে স্নাতকোত্তরে পড়তে ভর্তি করে দিয়ে বলে গেলেন, এবার তোমার জীবন গড়ে নেওয়ার, নিজেকে দেখে শুনে রাখার সব দায়িত্ব তোমার। তখন হবিগঞ্জ শহর থেকে ঢাকা আসতে দুই দফা রেলগাড়ি বদল করতে হয়। আর সেতো আর এযুগের মোবাইল ইমেইলের যুগ নয়। সত্যিকার অর্থেই মেয়েটির তখন এই বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনও ঘর, পরিচয় বা আশ্রয় থাকে না। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ই তাকে গড়ে তোলে, বাড়িয়ে ধরে আর আগলে রাখে। আমি দেখি তাতেই নির্ধারিত হয় মায়ের ভবিষ্যৎ এমনকি আমাদের অর্থাৎ মায়ের উত্তর প্রজন্মের ভবিতব্যও।

আমার মা বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন অবশ্য আরো আগে। ১৯৬৯ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী হিসেবে রাজপথে নেমে আসেন সারাদেশের আপামর ছাত্রীদের সঙ্গেই। ওই তো বাংলাদেশের মেয়েদের, মায়েদের, বোনেদের মুক্তিসংগ্রামে একাত্ম হয়ে নেমে আসার মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই আমার মা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন ঘূর্ণিঝড় পেরিয়ে, তারপর সময় উত্তাল। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম, ভারতের শরণার্থী জীবন, মুক্তি সংগ্রামীদের মাঝে খবর সরবরাহের কাজ, তাঁরই মাঝে সেলাই ফোড়াই, টিউশনি করে টিঁকে থাকার সংগ্রাম শেষে মা আবার সবাইকে ফেলে ফিরে এলেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্রয়েই। এরপর সবাই ছুটিতে বাড়ি গেছে অথচ একাত্তরের পর বেদখলের জেরে মূল উতপাটিত আমার মায়ের তখন আর কোনও বাড়ি রইলো না। মা ছুটিতে বা স্বাধীনতা পরবর্তী অস্থিরতাতে হল খালি করে দেওয়ার ঘোষণা এলেও হলেই থাকেন। একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্রয়ের অধিকারই অটুট থাকে। আশৈশব তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প আমার কাছে আমার ঘর বাড়ি আঙ্গিনার গল্পের মতো। যেখানে ভয়াল ঝড় পেরিয়ে একদিন আমার মাকে আমার দাদু নিয়ে না এলে আজ আমি যেখানে, সেখানে আর থাকি না। এই যে জন্মের পর থেকে বাংলাদেশের এক মেয়ে আমি জেনে বড় হলাম দেশের সর্বোচ্চ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে পড়ায় আমার সর্বাত্মক অধিকার আর নিজের জীবন নিজে গড়ে নেওয়ার আর নিজেকে দেখে শুনে রাখার সব দায়িত্বও তখন থেকে আমার হবে - এর সবটুকু শুরু তো আসলে ওই ঝড়জল পেরিয়ে আমার মায়ের ওই উঠোনে পা রাখা থেকেই।   

আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মই তো এই অসীম সম্ভাবনার চক্রে এই বঙ্গের একেকটি পরিবারকে ফেলবে বলে। জ্ঞান আর বিদ্যা এমন এক চাবিকাঠি; সে যার হাতে একবার পড়বে তার আর পিছু ফিরবার প্রয়োজন পড়বে না। আমার কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সার্থকতা এই যে, মামা চাচা অর্থ বিত্ত ক্ষমতা শক্তি সব কিছুর ওপরে যে এখনো বিদ্যার জোর ডিগ্রির জোর কপাল ফেরাতে আর ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চরে সে’ প্রমাণে এবং একটি পরিবারকে প্রজন্মান্তরে বর্ধনশীল করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে তা প্রমাণ করে যাচ্ছে এই এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

আমার মায়ের তিরিশ বছরখানেক পর আমি এসে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখনো সেই যাদুর কাঠির ছোয়া অব্যাহত এই প্রাঙ্গণে। সারাদেশের সেরা ছেলেমেয়েরা এসে জীবন বদলের স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হলেন আমার আইন অনুষদে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমার বাবা ছোটবেলা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে বাংলা একাডেমির  বইমেলা প্রাঙ্গণে আনার পথে আমাদের তিন ভাইবোনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ভবন আর অনুষদ চেনাতেন। বড়বোন জানতো সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়বে;  আমি জানতাম শহীদ মিনারের পাশের এনেক্স ভবনে আমি পড়তে চাই আইন আর আমার ভাই ঠিক কবে কখন ঠিক করল ও দেশের সেরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চায় আর তাই ওকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’তেই পড়তে হবে সেটা ঠিক মনে পড়ে না আমার। আমার বড়বোনকে আবার আমাদের  বাবা এক্কেবারে স্কুল পড়া সময়েই দৈনিক সংবাদের পাতায় সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের লেখা দেখিয়ে বলে রেখেছিলেন এই বিদগ্ধজনেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক আর ওকেও নাকি তাই হতে হবে।

এই তো কিছুদিন আগে নিউইয়র্কের রাস্তায় যখন আমি আর আমার বন্ধুটি হাঁটছিলাম, যে এখন বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ কূটনীতিক, জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, আমি ফিরে যাচ্ছিলাম, পরীক্ষার আগের রাতে আমাদের শামসুন্নাহার হলের করিডোর বা মাঠের অস্থির পায়চারীর সময়ে। মনে পড়ছিল, আমার বন্ধুটি তখন হাঁটতো আর বলতো, আন্তর্জাতিক আইন নিয়েই কাজ করতে চায় ও, হতে চায় কূটনীতিক। আমি বলতাম এত হাতে গোনা মানুষ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কোরে যোগ দেওয়ার সুযোগ পায়, শুধু ওই এক কাজেই বোধহয় লক্ষ্য স্থির না করে ওর মতো তুখোড় ছাত্রের উচিত বিদেশে উচ্চশিক্ষায় গিয়ে গবেষক বা শিক্ষক হওয়ার পথও বাতলে রাখা। তখন ফুল টাইম সাংবাদিকতা করে আইন পড়া আমাকে ওই পরীক্ষা পাসের জন্য পরীক্ষার আগের রাতগুলোয় পড়ায় মনিকা। কাজেই পড়ালেও ও কত ভাল করবে আমি জানতাম। কিন্তু, মণিকা বলতো, ও কূটনীতিকই হবে, আর তাই হয়ে উঠতেও পারল ও। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বপ্ন দেখায়, প্রস্তুত করে আর আমাদের নিয়ে যায় স্বপ্ন পূরণের দোরগোড়ায়, সেই আমাদের যাদের বিদ্যা, ডিগ্রি, স্বপ্ন আর কঠোর পরিশ্রম ছাড়া আর কোনও জোর নেই।

আমাদের প্রিয় অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক আইনের গুরু মিজানুর রহমান স্যার আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের তখনকার ভাঙ্গা ক্লাসরুমে, অচল ফ্যানের তলায় দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখাতেন আর ভবিতব্য নির্ধারণের মত বলতেন, ‘তোমরা সারা পৃথিবীতে কাজ করবে। কাজেই পুরো দুনিয়া নিয়ে তোমরা ভাববে এবং সেভাবে প্রস্তুত হবে।’   গরম কফির ইনসুলেটেড মগ হাতে ক্লাসে ঢুকে তখন কি শুধু পাঠ্যবই পড়াতেন মিজান স্যার? তখন স্যার পড়ছেন উইলিয়াম ডালরিম্পলের হোয়াইট মুঘলস। আমাদের সে বইয়ের সাদা সাহেবের সাথে এক ভারতীয় মুসলিম রমণীর গভীর প্রেম বিয়ে আর বিশ্বাসঘাতকতার গল্প বলার সাথে সাথে স্যার আমাদের বলেন বিশ্বে তখন ডিকলোনাইজেশনের যে ডিসকোর্স চলছে তা নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ক্লাসে শুধু অপ্রতিরোধ্য মেধার জোরে উঠে আসা  সুদূর কোন গ্রামের ছাত্রটি তখন গা ঝাড়া দিয়ে বসে জেনে নেয়, নতুন শতকের পৃথিবী আমাদেরই। ধনী বিশ্বের অক্সফোর্ড হার্ভার্ড পড়া সাদা সাহেবদের বুদ্ধি আর তত্ত্বে দুনিয়া আর চলবে না। এখন আমি যখন ঘুরে তাকাই, দেখি আমরা সত্যি সারা পৃথিবীতে কাজ করেছি, করছি। কাজ আর বিদ্যার জোরই আমাদের দেশের পরিধির বাইরে নিয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আমাদের বিশ্ব সভার জন্যে প্রস্তুত করে দিয়েছে।  আমার ক্লাসের ছেলেমেয়েরা দেশের সেরা আইনজীবী, বিচারক, সরকারী কর্মকর্তা তো হয়েছেনই, তারা হয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সেরা গবেষক এবং আইন বিশেষজ্ঞ। আমাদেরই কেউ মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত নির্ধারনী মামলার যুক্তি তর্ক খসড়া করেছে তো কেউ জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউয়ের খসড়া করছে।      

অনেকেই খুব হা হুতাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক তৈরি করতে পারলো না,  মনীষী তৈরি করতে পারলো না কেন? কেন এই বিশ্ববিদ্যালয় নেই একশটি বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়?- এমন হরেক অভিযোগ এর বিরুদ্ধে।

১৯২১ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি কিন্তু তৈরি হয়েছিল একেবারেই এই অঞ্চলের মানুষের যে উচ্চশিক্ষায় অধিকার ছিল না তা প্রতিষ্ঠায় – মানে গ্রাজুয়েট তৈরি করতে। আমার বাবা মায়ের আগের  প্রজন্মে আমার মাতামহসহ পরিবারের যত সদস্য গ্রাজুয়েট ছিলেন তারা সকলেই ঘুরে এসেছিলেন কলকাতা। গ্রাজুয়েট হওয়ার সঙ্গে তখন মেধার প্রতিযোগিতার চেয়েও অর্থ বিত্ত, কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। এই জায়গায় সাম্য তৈরি করাই কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য আর প্রয়োজন ছিল। ওদিকে দেখুন, কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেছে আরো প্রায় সাড়ে চার দশক আগে সেই ১৮৫৭ সালে। পুরো ভারতেরই প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় নাকি ওটি। পূর্ববঙ্গের বাঙালিকে সেই বৈষম্য থেকে মুক্ত করাই ছিল আমাদের অঞ্চলের রাজধানীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আর তা প্রতিষ্ঠার মূল কারণ। ঢাকায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে, তার আগেই কলকাতায় বংশের ধন সম্পদ জমি জিরাত উড়িয়ে কয়েকশ বছরের যে পুরনো  বাবু কালচার তাকে টপকে নগরে নাক গলিয়ে ঢুকে পড়তে শুরু করেছে  ইংরেজের দপ্তরে কলম পিষে মধ্যবিত্ত নামে এক নতুন শ্রেণিতে নাম লেখানো কলেজ ইউনিভার্সিটি পাস করা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি হিন্দু চাকুরেরা। এই চাকরি ছাড়া মূলত গায়ে খাটা কৃষক আর শ্রমজীবী মানুষের পূর্ববঙ্গে নগরে ঢোকা, নগরে টেঁকা আর ঘাম শুকিয়ে গা এলিয়ে বসে ভাবনার বিকাশের সময় সুযোগ হওয়ারই আর কোনও পথ ছিল না। কাজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি আমার চোখে যত না মনীষী তৈরির জন্যে তার চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক, নাগরিক মানুষ তৈরির জন্যে যারা ডিগ্রি বেচে, কলম পিষে নিজের এবং পরিবারের আর্থ সামাজিক অবস্থা বদল করবেন এবং কায়িক শ্রম থেকে উত্তরণের মাধ্যমে নিজেকে মহত্তর ভাবনায় যুক্ত করার পথ খুঁজে পাবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সে কাজ করেছেনও। এ বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির তিন দশকেরও কম সময়ের মধ্যে একে ঘিরেই দানা বেঁধে উঠতে থাকে বাঙালির শ্রেষ্ঠতম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ৫২ সালে ভাষার জন্যে আন্দোলনটিও বাঁধভাঙ্গা হয়ে ওঠে যখন পূর্ববঙ্গের বাঙালি জানতে পারেন সরকারী চাকরির পরীক্ষায় আবার তাদের অজানা ভাষা উর্দু জানা জরুরি করার ঘোষণা এসেছে। আসলে ক্রমাগত প্রান্তিক করে রাখা, প্রান্তিক হয়ে থাকা পূর্ববঙ্গের কৃষিজীবী বাঙালির, মূলত বাঙালি মুসলমানের বৈষম্যমুক্তির সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে গত শতবছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের মতো প্রান্তজনের সখা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের পরিবারের স্বপ্নলোকের চাবি এই বিশ্ববিদ্যালয়। আমার মা, মামী, পিসি পরিবারের সব নারীরা আগের প্রজন্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে গেছেন এর হাত ধরেই। কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছেন, দেশ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। এই প্রজন্মে আমার বোন শৈশবের পরিকল্পনামত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন, তারপর এখন ভাষা আর ভাষাতত্ত্ব পড়াচ্ছেন ইংরেজি ভাষাভাষীদের এক দেশে। আমার ভাই এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দিয়েই দেশের সেরা করপোরেটে চাকরি করতে করতে দুইদফা বিদেশে পোস্টিংয়ের পর এখন আন্তর্জাতিক পরিসরে চাকরি নিয়ে গিয়ে থিতু হয়েছে।   

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পরীক্ষা দিতে না দিতেই লন্ডনে বিবিসি রেডিওতে চাকরি করতে দেশ ছেড়েছিলাম। শিক্ষক আর বাবা-মায়ের প্রত্যাশা ছিল মাস্টার্সটা করে নেব সময় সুযোগমত। সাত বছর পর যখন দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম তখন মানবাধিকার আইনে মাস্টার্স করতে ভর্তি হলাম বিশ্বখ্যাত ল’ স্কুল, লন্ডন ইউনিভার্সিটির সোয়াস’এ। আমার মনে আছে, পৃথিবীর নানা দেশে আইন পড়ে আসা ছাত্ররা যখন মানবাধিকার আইনেরও মূল ভিত্তি যে আইন– আন্তর্জাতিক আইন – সে বিষয়টির প্রেক্ষিত আর ধারণা বুঝতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন পর্যায়ে এসে হিমশিম, তখন সোয়াসের বিশ্বখ্যাত অধ্যাপকেরা মুগ্ধ যে কতটা গভীরতায় আজকের দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাস, প্রয়োগ সম্পর্কে পড়ে বা জেনে এসেছি এলএলবি অনার্স পর্যায়েই। আমার ক্লাসের আরেক সহপাঠী মাহফুজা লিজা, পুলিশের বড় কর্তা। সুদীর্ঘ সময় কাজ করেছে, উগ্র সন্ত্রাসবাদীদের বিষয়ে সকল গোয়েন্দা তথ্য আর তাদের মনোজগত বিশ্লেষণ করে সন্ত্রাসবাদ প্রতিহত করতে কৌশল নির্ধারণে। বছরের পর বছর নিজের বিশ্লেষনের সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অপরাধবিজ্ঞানী, গোয়েন্দা আর তদন্তকারীর বিশ্লেষণ মিলিয়ে আন্তর্জাতিক কৌশল নির্ধারণই ছিল ওর শ্বাসরুদ্ধকর এসাইনমেন্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী প্রস্তুত ছিল এতেও। কারণ, পৃথিবীর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই অপরাধী দমনে ফৌজদারি আইন পড়ানো হয় বটে কিন্তু ক্রিমিনোলজি অর্থাৎ অপরাধ বিজ্ঞান পড়িয়ে এর প্রেক্ষিত, বাস্তবতা বা মনোজগত বোঝার তাত্ত্বিক শিক্ষা এলএলবি অনার্সে জুড়ে দিয়ে আইনের গ্রাজুয়েটদের উপলব্ধি গভীর করার উদ্যোগটুকু থাকে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিকশিত হচ্ছে, অগ্রসর হচ্ছে। ক্রিমিনোলজি বা অপরাধ বিজ্ঞানে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স, মাস্টার্স সম্ভব। আমি এখন বিশ্বের সর্ববৃহৎ বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের জেন্ডার কর্মসূচি দেখভাল করি। আমার টিমে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার অ্যান্ড উইমেন স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রীরা দলে বেশ ভারী। সমতার বিষয়টিকে মূলধারায় আনার জরুরি কাজটি তাই ক্রমেই জাতীয় প্রেক্ষিত বুঝে আন্তর্জাতিক বাস্তবতা জেনে সকল তাত্ত্বিক জ্ঞানে দক্ষ জনশক্তির হাতে চলে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্থকতা এখানেই। যখন যেমন প্রয়োজন, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তেমন দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। সবাই হয়তো যে বিষয়ে পড়ছেন সে বিষয়েই কর্মক্ষেত্রে জায়গা করে নিতে পারছেন না তবে মাথা উঁচু করে ঠিক দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন আর চারপাশ বদলে দিচ্ছেন। নারী পুরুষ, ধনী গরিব,  গুলশান কি গুলিস্তান,  চট্টগ্রাম থেকে চাটমোহর, সুনামগঞ্জ কি ঢাল চর যে যেখান থেকে যে পরিচয় নিয়েই একবার উঠে এসেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে, কাউকে ফেরায়নি সে, কেউ আর ফিরে তাকায়নি। আমার মনে হয় এদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এখনো তার বেতনে, খরচে, ভর্তি পরীক্ষায়, আশ্রয়ে এই সাম্যটুকু ধরে রাখতে পেরেছে বলেই এতরকম গোষ্ঠীবাদী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা আর আশরাফ আতরাফে বৈষম্যহীনতার দাবিটুকুই বাংলাদেশের উচ্চকিত মধ্যবিত্ত মানসের মূল দাবি হয়ে থেকে যেতে পেরেছে। 

লেখক: পরিচালক, জেন্ডার কর্মসূচি, ব্র্যাক
(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের স্নাতক)

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

পরিবেশের সুরক্ষায় স্কয়ার টয়লেট্রিজের চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন

পরিবেশের সুরক্ষায় স্কয়ার টয়লেট্রিজের চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের ইএমআইএস সেবা সাময়িক বন্ধ

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের ইএমআইএস সেবা সাময়িক বন্ধ

সম্রাটের সহযোগী মেহেদী আলমসহ দুজন কারাগারে

সম্রাটের সহযোগী মেহেদী আলমসহ দুজন কারাগারে

জাহাজের ধাক্কায় ট্রলার ডুবে ১২ জেলে নিখোঁজ

জাহাজের ধাক্কায় ট্রলার ডুবে ১২ জেলে নিখোঁজ

আরও ৫৬ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি  

আরও ৫৬ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি  

এসএমই পণ্য মেলায় পাওয়া যাচ্ছে বিএসইসি’র পণ্য

এসএমই পণ্য মেলায় পাওয়া যাচ্ছে বিএসইসি’র পণ্য

দেশে তৈরি স্মার্টফোন নিয়ে এলো শাওমি

দেশে তৈরি স্মার্টফোন নিয়ে এলো শাওমি

কাতার সফরে যাচ্ছেন এরদোয়ান

কাতার সফরে যাচ্ছেন এরদোয়ান

‘বঙ্গবন্ধু’ বায়োপিক মুক্তি পেতে পারে মার্চে: তথ্যমন্ত্রী

‘বঙ্গবন্ধু’ বায়োপিক মুক্তি পেতে পারে মার্চে: তথ্যমন্ত্রী

হোয়াটসঅ্যাপ থেকে মেসেজ পাঠিয়ে ডাকা যাবে উবার

হোয়াটসঅ্যাপ থেকে মেসেজ পাঠিয়ে ডাকা যাবে উবার

ক্যানবেরায় বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী দিবস উদযাপন

ক্যানবেরায় বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী দিবস উদযাপন

উপকারী মিষ্টি আলু দিয়ে ৪ পদ

উপকারী মিষ্টি আলু দিয়ে ৪ পদ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune