বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৪ জুন ২০২৬, ১০:৩১আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ১০:৩২

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখন দুটি ভিন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ দিকে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রথম পথটি হলো, চলমান এই সংঘাত যদি দ্রুত শেষ হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি মাঝারি ধরনের মন্দাভাব দেখা দেবে। আর দ্বিতীয় পথটি হলো, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হয়, তবে অনেক দেশই তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়বে।

প্যারিসভিত্তিক সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওএইসিডি) তাদের সর্বশেষ অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে এই তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, যে পথেই বিশ্ব অর্থনীতি এগোবে না কেন, যুদ্ধের কারণে আগের তুলনায় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ধীর হবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। একটি মাত্র নৌ-পথ অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে কীভাবে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও সাপ্লাই চেইন ওলটপালট হয়ে যেতে পারে, এই সংকট তারই সর্বশেষ অনুস্মারক।

ওএইসিডির প্রধান অর্থনীতিবিদ স্টেফানো স্কারপেত্তা সংস্থার সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণে লিখেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি মাত্র চোকপয়েন্টের কাছে আমাদের অর্থনীতির এই দুর্বলতা প্রমাণ করে যে, সাপ্লাই চেইনের স্থিতিস্থাপকতা শক্তিশালী করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।’

দুই পথের পরিসংখ্যানগত হিসাব

ওএইসিডির প্রথম অনুমানটি হলো, চলমান শান্তি আলোচনার মাধ্যমে জ্বালানি সংকটের দ্রুত অবসান ঘটবে। আর তাদের দ্বিতীয় বা নেতিবাচক অনুমানটি হলো, এই সংঘাত আগামী বছরের একটি বড় সময় জুড়ে স্থায়ী হবে।

যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে ওএইসিডি চলতি বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২.৮ শতাংশ প্রক্ষেপণ করেছে, যা গত মার্চ মাসের পূর্বাভাসের (২.৯ শতাংশ) চেয়ে সামান্য কম। সংস্থাটি জানিয়েছে, যুদ্ধ না থাকলে এই প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়ানো হতো। এই ধারায় জি২০ ভুক্ত দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি চলতি বছর ৪ শতাংশ থাকবে এবং ২০২৭ সালে তা কমে ৩.১ শতাংশে নামবে।

সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ২.১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১.৮ শতাংশে নেমে আসবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল দেশগুলো (চীনের বাইরে এশিয়ার বড় অংশ) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদন সরাসরি হ্রাস পাবে। এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কারণে জি২০ দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি চলতি বছর আরও ০.৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে আরও ১.৩ শতাংশ বেড়ে যাবে।

এআই খাতের আশীর্বাদ ও নতুন ঝুঁকি

বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের যে বিনিয়োগের জোয়ার চলছে, তা যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে কিছুটা সাহায্য করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি সংকট থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকায় এর প্রধান সুবিধাভোগী। এআই খাতে বিশাল বিনিয়োগ এবং উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর ব্যয়ের কারণে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ থাকবে, যা জি৭ দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৭ সালে এটি কমে ১.৮ শতাংশ হতে পারে।

তবে এর একটি বড় নেতিবাচক দিকও রয়েছে। ওএইসিডি সতর্ক করেছে যে, এআই প্রযুক্তি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বেশি করে জ্বালানি বাজার, সেমিকন্ডাক্টর সাপ্লাই চেইন এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপকরণের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। মহামারি, একাধিক যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এই ক্ষেত্রগুলো বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে।

ওএইসিডির মতে, এআই বিনিয়োগ প্রধানত তিনটি ফ্রন্টে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এগুলো হলো, ডেটা সেন্টার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা চিপ তৈরির উপাদান এবং হার্ডওয়্যার পরিবহনের বাণিজ্যিক রুট।

স্টেফানো স্কারপেত্তা লিখেছেন, ‘যদি এই ব্যাঘাত ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তবে উচ্চ জ্বালানি-নির্ভর এআই খাতসহ সামগ্রিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং আর্থিক বাজারে নতুন করে অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হবে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর অপেক্ষার নীতি

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভসহ বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ‘ওয়েট অ্যান্ড সী’ নীতি গ্রহণ করেছে। তবে ওএইসিডি বলছে, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে বেশিরভাগ দেশের সুদের হার প্রায় ০.৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর হাত এভাবে বাঁধা পড়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার পুরো দায় এসে পড়বে দেশগুলোর রাজস্ব নীতির ওপর। অথচ এই মুহূর্তে ক্রমবর্ধমান ঋণ, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং আকাশচুম্বী প্রতিরক্ষা খরচের কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ সরকারেরই নতুন করে পদক্ষেপ নেওয়ার মতো সুযোগ খুব সীমিত।

সূত্র: অ্যাক্সিওস

/এএ/
সম্পর্কিত
ইরান ও লেবাননে একসঙ্গেই যুদ্ধ শেষ হতে হবে: আরাঘচি
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
সর্বশেষ খবর
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি, কমেছে তাপমাত্রা 
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি, কমেছে তাপমাত্রা 
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ
বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ
সোভিয়েত ভূমিতে জসীম উদ্‌দীন
সোভিয়েত ভূমিতে জসীম উদ্‌দীন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি