৩৫০ বছরের পুরোনো দুর্গ যেভাবে হলো বিশ্বের অন্যতম সুন্দর হোটেল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১১ জুন ২০২৬, ০৮:২৮আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩

বিশ্বের সেরা হোটেলগুলো এখন আর কেবল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিচার করা হয় না; আজকের ভ্রমণপিপাসুরা খোঁজেন ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ছোঁয়া। এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে মর্যাদাপূর্ণ প্রি ভের্সাই পুরস্কারের ২০২৬ সালের বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর হোটেলের তালিকায়। আর সেই তালিকায় নাম লিখিয়েছে ভারতের মধ্যপ্রদেশের দ্য ওবেরয় রাজগড় প্যালেস।

খাজুরাহোর কাছে মানিয়াগড় পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই প্রাসাদটি নিচে সবুজ বাগান, প্রাচীন বনভূমি এবং বৃষ্টিতে পুষ্ট একটি হ্রদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। পান্না ন্যাশনাল পার্ক থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত এই পুনরুদ্ধার করা রাজকীয় বাসস্থানটি কেন ভারতের অন্যতম আলোচিত বিলাসবহুল গন্তব্যে পরিণত হয়েছে, তা এর অবস্থান দেখলেই বোঝা যায়। তবে পাঁচ তারকা এই রিসোর্ট হয়ে ওঠার বহু আগে, রাজগড় মূলত যুদ্ধ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাজ্য রক্ষার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থেকে জন্ম নেওয়া একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ ছিল।

রাজগড় প্যালেসের গল্প শুরু হয়েছিল তিন শতাব্দীরও বেশি আগে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে। সেই সময়ে মধ্য ভারত এক বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। মুঘল সাম্রাজ্য যখন পুরো উপমহাদেশ জুড়ে নিজেদের বিস্তার ঘটাচ্ছিল, তখন আঞ্চলিক রাজপুত রাজ্যগুলো তাদের স্বায়ত্তশাসন, সংস্কৃতি ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছিল।

৩৫০ বছরের পুরোনো দুর্গ যেভাবে হলো বিশ্বের অন্যতম সুন্দর হোটেল

বুন্দেলখন্ডের বুন্দেলা রাজবংশের মহারাজা হিন্দুপাত সিং একাধারে সামরিক প্রতিরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব ঘোষণার উদ্দেশ্যে এক দুর্ভেদ্য ঘাঁটি তৈরির জন্য এই পাথুরে মানিয়াগড় পাহাড়কে বেছে নেন। উঁচু এই ভূখণ্ড চারপাশের ওপর নজর রাখার দারুণ সামরিক সুবিধা দিত। বেলেপাথরে তৈরি এই কাঠামোটি মূলত কোনও প্রাসাদ ছিল না, ছিল একটি দুর্গ। এর মাধ্যমে শাসকেরা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ওপর নজর রাখতেন। আজকেও পাহাড়ের ওপর প্রাসাদের এই অবস্থান তার যুদ্ধকালীন অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়।

কিংবদন্তি বুন্দেলা শাসক মহারাজা ছত্রশালের অধীনে যখন পান্না একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, তখন শুরু হয় রাজগড়ের দ্বিতীয় অধ্যায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গটি ধীরে ধীরে একটি প্রাসাদে রূপান্তরিত হতে থাকে। এর মূল প্রতিরক্ষামূলক চরিত্র ঠিক রেখেই এতে রাজকীয় বাসস্থানের মহিমান্বিত রূপ যোগ করা হয়। সামরিক জায়গাগুলোর স্থান নেয় সুন্দর সব উঠান, যুক্ত হয় আলংকারিক উপাদান। ফলে এটি সম্পূর্ণ দুর্গ বা সম্পূর্ণ প্রাসাদ কোনোটিই না হয়ে নিজস্ব এক অনন্য বৈশিষ্ট্যে রূপ নেয়। আজকের অতিথিরাও এখানে হাঁটার সময় এর দ্বৈত রূপ স্পষ্ট অনুভব করতে পারেন।

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর অন্যান্য ঐতিহাসিক রাজকীয় সম্পত্তির মতো রাজগড় প্যালেসের ভাগ্যও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। প্রাসাদটি ধীরে ধীরে অবহেলার শিকার হয়। কয়েক দশক ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে এবং প্রকৃতি একসময় এর চারপাশ গ্রাস করে নেয়। যদিও এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে রাজ্য প্রত্নতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষ একে সুরক্ষাও দিয়েছিল, তবুও এর সংরক্ষণ এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এরপরই আসে সেই ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট।

১৯৯৬ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার এই ঐতিহাসিক সম্পত্তির দায়িত্ব দেয় পৃথ্বী রাজ সিং ওবেরয় এবং দ্য ওবেরয় গ্রুপ-এর হাতে। এরপর যা ঘটেছিল তা কোনও সাধারণ হোটেল রূপান্তর ছিল না; বরং এটি ছিল প্রায় তিন দশক জুড়ে চলা এক উচ্চাভিলাষী ঐতিহ্য পুনর্গঠন।

৩৫০ বছরের পুরোনো দুর্গ যেভাবে হলো বিশ্বের অন্যতম সুন্দর হোটেল

প্রকল্পটির বর্ণনা দিতে গিয়ে দ্য ওবেরয় গ্রুপের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান অর্জুন ওবেরয় বলেন, এটি ছিল ইতিহাসকে পুনরায় জীবিত করার এক দীর্ঘ যাত্রা। পুনর্গঠন টিম অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রাসাদের মূল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, শতবর্ষী পুরোনো গাছপালা, লুকানো পথ, প্রাচীন উপাসনালয় এবং হ্রদটিকে রক্ষা করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সময়কে মুছে দেওয়া নয়, বরং দর্শনার্থীদের সামনে ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলা।

এই প্রাসাদের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো এর স্থাপত্য, যা ইতিহাসের একাধিক যুগকে ধারণ করে আছে। ঐতিহ্যবাহী বুন্দেলখন্ডের বেলেপাথরের উঠান, হাতে আঁকা দেয়ালচিত্র, খোদাই করা স্তম্ভ এবং খিলানযুক্ত ছাদ শত শত বছর আগের আঞ্চলিক কারুশিল্পের পরিচয় দেয়। চুন-প্লাস্টারের ভেতরের অংশে ওপরের জানালা দিয়ে যখন প্রাকৃতিক আলো এসে পড়ে, তখন চারপাশের পরিবেশ যেমন রাজকীয়, ঠিক তেমনি অন্তরঙ্গ মনে হয়। প্রাসাদে পরবর্তীতে যুক্ত হওয়া ফ্রেঞ্চ উইন্ডো এবং ঔপনিবেশিক শৈলীর বিন্যাস ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় নকশার পাশাপাশি এক মিশ্র স্থাপত্যশৈলী তৈরি করেছে।

প্রায় ৭৬ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই এস্টেটটি প্রাচীন শাল ও পলাশ বনে ঘেরা এবং এর নিচে রয়েছে নিজস্ব একটি হ্রদ। প্রাসাদ মাঠের ঠিক ওপাশেই রয়েছে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাঘ্র সংরক্ষণাগার পান্না ন্যাশনাল পার্ক। আর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকাভুক্ত খাজুরাহোর মন্দিরগুলো এখান থেকে সামান্য ড্রাইভের দূরত্বে অবস্থিত। রাজকীয় ঐতিহ্য, বন্যপ্রাণী এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এমন সংমিশ্রণ বিলাসবহুল ভ্রমণের মানদণ্ডেও বেশ বিরল। অতিথিরা এখানে সকালে মধ্যযুগীয় মন্দির ঘুরে, বিকালে বনের মধ্যে বাঘের সন্ধান করে সন্ধ্যায় এক সাবেক রাজকীয় প্রাসাদে নৈশভোজের অভিজ্ঞতা নিতে পারেন।

২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব আনুষ্ঠানিকভাবে দ্য ওবেরয় রাজগড় প্যালেস-এর উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দ্য ওবেরয় রাজগড় প্যালেস মধ্যপ্রদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করার পাশাপাশি বিশ্বমানের আতিথেয়তা প্রদান করছে। এটি রাজ্যের পর্যটন খাতে একটি অসাধারণ সংযোজন।

হোটেল হিসেবে চালু হওয়ার পর থেকেই দ্রুত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে প্রাসাদটি। এটি লাক্সারি ট্রাভেল ইন্টেলিজেন্স-এর বিশ্বের সেরা নতুন বিলাসবহুল হোটেলগুলোর তালিকায় স্থান পাওয়ার পর, এবার প্রি ভের্সাই কর্তৃক বিশ্বের অন্যতম সুন্দর হোটেলের স্বীকৃতি লাভ করলো।

সূত্র: এনডিটিভি

/এএ/
সম্পর্কিত
‘চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত’, ইরানে রাতের বিমান হামলা বাতিল করলেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা হুঁশিয়ারি ইরানি স্পিকারের
বৈশ্বিক অর্থনীতির পূর্বাভাসে দুঃসংবাদ দিলো বিশ্বব্যাংক
সর্বশেষ খবর
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ফিরলো আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ফিরলো আর্জেন্টিনা
শুরু হলো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ, মুখোমুখি মেক্সিকো- দক্ষিণ আফ্রিকা
শুরু হলো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ, মুখোমুখি মেক্সিকো- দক্ষিণ আফ্রিকা
শাকিরার জাদুতে মাতল অ্যাজটেকা: ঐতিহ্যের ক্যানভাসে বিশ্বকাপের বর্ণিল সাংস্কৃতিক মহোৎসব
শাকিরার জাদুতে মাতল অ্যাজটেকা: ঐতিহ্যের ক্যানভাসে বিশ্বকাপের বর্ণিল সাংস্কৃতিক মহোৎসব
‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর পর্দা উঠলো
‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর পর্দা উঠলো
সর্বাধিক পঠিত
সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের আছে আইডি কার্ড, চিনতে পেরেছে পরিবার
সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের আছে আইডি কার্ড, চিনতে পেরেছে পরিবার
১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল, কার কত বেতন
১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল, কার কত বেতন
বিএসএফের পুশইনের পর সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের পরিচয় মিলেছে
বিএসএফের পুশইনের পর সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের পরিচয় মিলেছে
পেনশনের ৩০ শতাংশ গ্র্যাচুয়িটি পাবেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা
পেনশনের ৩০ শতাংশ গ্র্যাচুয়িটি পাবেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা
দেশে ফের ভূমিকম্প অনুভূত
দেশে ফের ভূমিকম্প অনুভূত