যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাতের জেরে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি করোনা মহামারির পর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যেতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা তাদের সর্বশেষ গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি মূল্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংক ঋণের বাড়তি খরচের কারণ দেখিয়ে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত জানুয়ারি মাসেও ২ দশমিক ৯ শতাংশ হবে বলে আভাস দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি উভয় পক্ষের কারণে বারবার বিঘ্নের মুখে পড়ায় এই সংঘাত যেকোনো মুহূর্তে আবারও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে যে, পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে যদি এই বিপর্যয় আরও খারাপের দিকে যায়, তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক রুট হরমুজ প্রণালি ইরান বন্ধ করে দেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং অন্যান্য সাপ্লাই চেইনের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম চলতি বছর গড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৪ ডলারে দাঁড়াতে পারে, যা গত বছরের গড় দামের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া চলতি বছর সারের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যার সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে খাদ্যপণ্যের দামের ওপর।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ থাকার কারণে চলতি বছর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা গত বছর ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা যদি আরও ভেঙে পড়ে, তবে চলতি বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে যেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
ঝুঁকিতে উন্নয়নশীল দেশগুলো
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কার একেবারে সম্মুখভাগে রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। গত জানুয়ারির পর থেকে বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশেরই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে এই সংস্থা। ২০২৭ সাল নাগাদ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছানোর আশা করা হলেও, তা ২০১০-এর দশকের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কম থাকবে।
উল্লেখ্য, ২০১০-এর দশকে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠছিল।
চীন ও ভারতকে বাদ দিলে, ধনী দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ের যে ব্যবধান রয়েছে, তা ঘুচানোর ক্ষেত্রে গত এক দশকে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো গত এক দশকে একের পর এক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এর প্রভাব দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবে সবার জন্য মূল পরীক্ষাটা একই-আগামীর প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানকে বিসর্জন না দিয়ে, কীভাবে বর্তমানের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা যায় এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যেকোনো উন্নয়নশীল দেশকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই সংকটে সহায়তার জন্য তারা ইতোমধ্যে ৬ হাজার কোটি ডলারের একটি তহবিল বরাদ্দ রেখেছে। সংঘাত যদি এভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এই সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করা হতে পারে বলেও বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা









