বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ কোয়ার্টার ফাইনাল স্টেজে পৌঁছে গেছে। টুর্নামেন্টে টিকে আছে এখন মাত্র আটটি দল। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটে প্রতিটি দলই এখন ফুটন্ত কড়াইয়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে শেষ আটের দলগুলোর সামনে স্বপ্ন জয়ের সুযোগ। এই রোমাঞ্চকর টুর্নামেন্ট প্রায় প্রতিদিনই ফুটবলপ্রেমীদের জাদুকরি সব মুহূর্ত উপহার দিয়ে চলেছে।
শেষ ষোলোর লড়াইয়ে দর্শকদের বুঁদ করে রাখার মতো সব উপাদানই ছিল, তা মেক্সিকোর বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের রুদ্ধশ্বাস জয়ই হোক, মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বেলজিয়ামের দাপুটে পারফরম্যান্স। ১৯৯৮ সালের পর নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসে নরওয়ের আরলিং হালান্ড তার আধিপত্য ধরে রেখেছেন, ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে জিতিয়েছেন। তবে স্পেনের কাছে পর্তুগালের সংকীর্ণ হারে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ফুটবলের আরও এক মহাতারকাকে বিদায় জানাতে হয়েছে।
আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফিটি কার হাতে উঠছে, তা নিয়ে যখন আসল লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে, তখন গোল ডট কম-এর মূল্যায়নে টিকে থাকা শীর্ষ আটটি দলের পাওয়ার র্যাঙ্কিং নিচে তুলে ধরা হলো:
৮. বেলজিয়াম
গ্রুপ পর্বে হোঁচট খেতে খেতে চলা এবং শেষ বত্রিশের ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে খেলার শেষ চার মিনিট বাকি থাকার সময়ও ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা বেলজিয়াম অবশেষে যেন নিজেদের ফিরে পেয়েছে। সঠিক সময়ে স্বরূপে ফিরে তারা কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে। সেনেগালের বিপক্ষে সেই প্রত্যাবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়েছে রেড ডেভিলরা। তারকা খেলোয়াড় কেভিন ডি ব্রুইনা এবং জেরেমি ডোকুকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার মতো সাহসী সিদ্ধান্তের সুফল পেয়েছেন কোচ রুডি গার্সিয়া।
অন্যদিকে, রোমেলু লুকাকু বদলি হিসেবে মাঠে নামলেও চার্লস ডি কেটেলারে অবশেষে প্রমাণ করেছেন যে তিনি দলের আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। কোয়ার্টারে স্পেনের বিপক্ষে জিততে হলে বেলজিয়ামকে নিজেদের খেলা আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে হবে।
৭. সুইজারল্যান্ড
কলম্বিয়ার বিপক্ষে সুইজারল্যান্ডের শেষ ষোলোর ম্যাচটি দেখতে খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না, তবে কেউ তা আশাও করেনি। ভ্যাঙ্কুভারে মুখোমুখি হওয়ার আগে দুই দলই চোখধাঁধানো ফুটবল খেলার চেয়ে নিজেদের সুরক্ষার দিকেই বেশি মনোযোগী ছিল। ফলে ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ানো মোটেও আশ্চর্যজনক ছিল না। টুর্নামেন্টের অন্যতম আবিষ্কার জোহান মানজাম্বির চোটের কারণে অনুপস্থিতি সত্ত্বেও সুইজারল্যান্ড যেভাবে জয়ের পথ খুঁজে নিয়েছে, তার কৃতিত্ব তাদের দিতেই হয়। তা ছাড়া টাইব্রেকার হিরো রুবেন ভার্গাসও পুরোপুরি ফিট না থাকায় বেঞ্চ থেকে মাঠে এসেছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সুইসরা আন্ডারডগ হিসেবেই মাঠে নামবে, তবে গত দুই ম্যাচে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার দুর্বল পারফরম্যান্স তাদের মনে বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।
৬. মরক্কো
কানাডার বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে কানাডাই ভালো দল ছিল বলে জেসি মার্শ যে দাবি করেছেন, তা একেবারেই ভিত্তিহীন। কানাডা নিশ্চিতভাবেই অ্যাটলাস লায়ন মরক্কোকে কিছুটা সমস্যায় ফেলেছিল, তবে মরক্কোই যোগ্য দল হিসেবে ৩-০ গোলের জয় তুলে নিয়েছে। গত বিশ্বকাপে চতুর্থ হওয়া মরক্কোর সামনে এবার ফ্রান্স, যারা কাতারে তাদের রূপকথার দৌড় থামিয়ে দিয়েছিল। এবারের ফ্রান্স দল আগের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। তবে মরক্কোও বিশেষ করে আক্রমণভাগে বেশ উন্নতি করেছে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার এই ম্যাচে তাদের হারানোর কিছু নেই।
৫. নরওয়ে
২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের চেয়ে ভালো সময় আর কোনও দল কাটাচ্ছে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে এসেই গ্রুপ পর্ব পার করার মূল লক্ষ্য পূরণ করে ফেলায় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এই দলটি সম্পূর্ণ চাপহীন ও মুক্ত মনে ফুটবল খেলছে। তাদের এই স্বাধীন ফুটবল ব্রাজিলের মতো দলের জন্য দুঃস্বপ্ন প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা রক্ষণভাগকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য আরলিং হালান্ডের মতো একজন একাই যথেষ্ট, তা তিনি ইস্ট রাদারফোর্ডে জোড়া গোল করে প্রমাণ করেছেন। কোয়ার্টারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও নরওয়ে আন্ডারডগ হিসেবে নামবে এবং সব চাপ থাকবে ইংলিশদের ওপরই, যা নরওয়েকে বাড়তি সুবিধা দেবে।
৪. আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনা কি ভাগ্যবান নাকি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম? হয়তো দুটিই। কারণ মিসরের বিপক্ষে ভাগ্য লিওনেল স্কালোনির দলের পক্ষে ছিল। তবে ম্যাচের মাত্র ১১ মিনিট বাকি থাকতেও ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর যেভাবে তারা ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতেছে, তার জন্য বড় প্রশংসা তাদের প্রাপ্য। আটলান্টার এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে ছিলেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ম্যাচে আরও একটি পেনাল্টি মিসের খেসারত তিনি দেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে দিয়ে এক গোল করিয়ে এবং পরে নিজে এক গোল করেন। ইনজুরি টাইমে লাউতারো মার্টিনেজের ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজ জয়সূচক গোলটি করেন। কোয়ার্টারে সুইজারল্যান্ডকে আর্জেন্টিনার হারানো উচিত, তবে কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষে যেভাবে তারা কষ্টার্জিত জয় পেয়েছে, তাতে চ্যাম্পিয়নদের কপালে চিন্তার ভাঁজ থেকেই যাচ্ছে।
৩. ইংল্যান্ড
বিশ্বকাপের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি অবশেষে থমাস টুখেলের দলের সেরা পারফরম্যান্স বের করে এনেছে। ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকোকে হারিয়ে তারা আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘদিনের ট্রফি খরা কাটানোর মতো যোগ্যতা ও মানসিকতা প্রদর্শন করেছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে ৩-২ গোলের রোমাঞ্চকর জয়ে জুড বেলিংহাম অসাধারণ খেললেও এটি ছিল পুরো ইংলিশ দলের একটি সম্মিলিত পারফরম্যান্স, যা কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের মুখোমুখি হওয়ার আগে তাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। নরওয়ে ফরোয়ার্ড আরলিং হালান্ডের হুমকি নিয়ে টুখেলের শিষ্যদের নতুন করে বলার কিছু নেই। টুখেল মনে করেন, হালান্ডের কাছে বল যাওয়ার পথ যদি ইংল্যান্ড বন্ধ করতে পারে, তবে বাকি কাজ বেলিংহাম ও হ্যারি কেইন অনায়াসেই সেরে নেবেন।
২. স্পেন
শেষ বত্রিশের ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে স্পেন যেভাবে খেলেছিল, সোমবার পর্তুগালের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষায় সেই উচ্চতা ছুঁতে না পারলেও তারা ঠিকই জয় তুলে নিয়েছে। মিকেল মেরিনোর ইনজুরি টাইমের গোল লা রোহাদের জয় নিশ্চিত করে। ২০২৪ সালের ইউরো জয়ের পর এবার বিশ্বখেতাব জয়ের ট্র্যাকেই রয়েছে স্পেন। তবে টুর্নামেন্টজুড়ে লামিন ইয়ামাল এখনও তার প্রত্যাশিত জাদু পুরোপুরি দেখাতে পারেননি। রক্ষণভাগে দুর্বলতা থাকা বেলজিয়ামের মুখোমুখি হওয়াটাই হয়তো স্পেনের এই তরুণ সুপারস্টারের স্বরূপে ফেরার সেরা সুযোগ হতে পারে।
১. ফ্রান্স
প্যারাগুয়ে সবদিক থেকে ফ্রান্সকে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা করলেও কিলিয়ান এমবাপ্পে পেনাল্টি থেকে ম্যাচের একমাত্র গোলটি করে শেষ হাসি হাসেন। ম্যাচ শেষে এমবাপ্পে উল্লেখ করেন, প্রতিপক্ষের শারীরিক ও আক্রমণাত্মক ফুটবল ব্লুজদের মোটেও বিচলিত করতে পারেনি, কারণ তারা যেকোনও কঠিন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। কোয়ার্টারে মরক্কোকে বিদায় করতে হলে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যদের অবশ্যই তাদের সেরা ছন্দে ফিরতে হবে। তবে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তারা প্রমাণ করেছে যে মনমতো খেলা না হলেও কীভাবে ম্যাচ জিতে বের হয়ে আসতে হয়, আর এ কারণেই তারা বিশ্বকাপ জয়ের ফেবারিট হিসেবে শীর্ষেই রয়েছে।
সূত্র: গোল ডট কম

খুবই বিশেষ একজন মানুষ, মেসির প্রশংসায় পঞ্চমুখ বেকহ্যাম
মেসি-মিসর কোচের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, ‘বর্ণবাদ-বিরোধী’ ইশারার ভিডিও ভাইরাল
মেসি, এমবাপ্পে নাকি হালান্ড; গোল্ডেন বুটের সিংহাসন কার






