এবার কি ‘ব্যাটল অব হরমুজ’ শুরু করবেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৯ জুলাই ২০২৬, ১৭:২৫আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৮:৪৫

ইরানের সঙ্গে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর হোয়াইট হাউস এখন হরমুজ প্রণালি ঘিরে এক দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এই নতুন সামরিক অভিযানের মেয়াদ ও তীব্রতা কতখানি হবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

যে যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং দেশটির অবশিষ্ট পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, তা এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ নিয়ন্ত্রণের এক অনির্দিষ্টকালের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান হামলা অব্যাহত রাখবে কিনা, তার ওপর ভিত্তি করে এই উত্তেজনা এক-দুদিন, এক সপ্তাহ কিংবা এক মাসও স্থায়ী হতে পারে। ওই কর্মকর্তা সরাসরি বলেন, আমরা তাদের কিছুটা আঘাত দিতে যাচ্ছি, যাতে তারা বুঝতে পারে যে আমরা এখানে ফাজলামো করতে আসিনি।

কূটনৈতিক আলোচনা বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশলের কেন্দ্রে এখন আবার সামরিক চাপ ফিরে এসেছে। বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলার জেরে দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলির পর গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, সমঝোতা স্মারকের অধীনে থাকা ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি এখন ‘শেষ’। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির কাছে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায়, যার মধ্যে গত কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানের ভেতরের কিছু অবকাঠামোও ছিল। জবাবে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবিতে অনড় থাকার ঘোষণা দিয়েছে।

তবে এই হামলার পরপরই ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা ‘কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিলেন’ এবং তারা ‘একটি চুক্তি করতে চান’। ট্রাম্প ঠিক কোন ফোনের কথা বলছেন তা স্পষ্ট নয় এবং ইরানি কর্মকর্তারাও তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি যোগাযোগের কোনও তথ্য নিশ্চিত করেননি। ট্রাম্প আরও বলেন, আমি জানি না তারা চুক্তির যোগ্য কি না। তারা চুক্তি মেনে চলবে কি না, তা-ও আমি জানি না। সত্যি বলতে, ওরা একপ্রকার পাগল।

অন্যদিকে, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘দাদাগিরি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের’ অভিযোগ এনে সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি কেবল তেহরানের শর্তেই পুনরায় খুলবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন, “আপনারা আঘাত করলে, পাল্টা আঘাত পাবেন। হরমুজ প্রণালি কেবল ‘ইরানি ব্যবস্থাপনায়’ খুলবে, আমেরিকার হুমকিতে নয়।”

মূলত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখতেই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। আর ইরানের জন্য যেকোনও চুক্তির ক্ষেত্রে এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই মূল উদ্দেশ্য। এই বিষয়টিই ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের মূল শর্ত, আর এর ধারাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণেই চুক্তিটি এখন ভেস্তে যাচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সই করার পরপরই ইরানি কর্মকর্তারা অভিযোগ তোলেন যে, তেহরানের অনুমতি ছাড়া ওমান উপকূলের কাছাকাছি দক্ষিণ লেন দিয়ে জাহাজ পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।

সূত্রের বরাতে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে হোয়াইট হাউস এখন হামলা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে দেখছে। কারণ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শত শত তেল ট্যাংকার এই প্রণালি দিয়ে পার হতে পেরেছে। এর ফলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলেও তেলের দাম হঠাৎ আকাশচুম্বী হবে না বলে প্রশাসন আশ্বস্ত হয়েছে।

এক মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের একাংশের ক্ষোভ থেকেই এই বর্তমান উত্তেজনার সৃষ্টি। তারা মনে করে, এই সমঝোতা স্মারক তেহরানের জন্য কোনও বাস্তব সুবিধা বয়ে আনেনি। ওমান উপকূলের দক্ষিণ রুট দিয়ে শত শত জাহাজ পার হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমছিল। এছাড়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো লেনদেন অনুমোদন না করায় এবং দেশগুলো সাময়িক ছাড়ের ওপর নির্ভর করতে রাজি না হওয়ায় ইরান তেল বিক্রি করতে সমস্যায় পড়ছিল। তাছাড়া চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইরান এখনও পারমাণবিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাদের অবরুদ্ধ থাকা কোনও তহবিলও মুক্তি পায়নি। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির কারণে এই সমঝোতা স্মারকের লেবানন অংশটির আর কোনও প্রয়োজন ছিল না।

ওই মার্কিন কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরানি নেতৃত্বের একাংশ এই বিষয়গুলো নিয়ে খুশি ছিল না। তারা হামলা শুরু করেছে এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে এবার তাদের শক্ত পাল্টা আঘাত দেওয়ার সময় এসেছে। এটি একটি প্রক্রিয়া, আমাদের ধৈর্য আছে। আমরা যেমনটা চাই তেমন চুক্তি না পেলে আমরা তা করব না।

সর্বশেষ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বুধবার স্পষ্ট করে বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান খুবই সাধারণ, হরমুজ প্রণালি অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে। ভ্যান্স হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তারা যদি এটি বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এর জবাব দেবে। তারা হয় এটি মেনে চলতে পারে, অথবা গত রাতে তাদের সঙ্গে যা ঘটেছে ঠিক সেটাই আবার বরণ করে নিতে পারে। তারা যতক্ষণ না এই পথ খুলে দিচ্ছে এবং জাহাজে হামলা বন্ধ করছে, ততক্ষণ এমনটা ঘটতেই থাকবে।

 

/এএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে মার্কিন হামলা, কাঁপলো ইরান
জার্মানির কাছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করবে যুক্তরাষ্ট্র
যুদ্ধবিমানের পাহারায় খামেনির কফিন, মাশহাদে ট্রাম্পকে নিয়ে ব্যানারে যা লিখলো ইরান
সর্বশেষ খবর
কারাগারের দেয়াল টপকে পালালেন আসামি, দাঁড়িয়ে থেকে দেখলেন কারারক্ষীরা
কারাগারের দেয়াল টপকে পালালেন আসামি, দাঁড়িয়ে থেকে দেখলেন কারারক্ষীরা
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ভোট, হাওর অঞ্চল দিয়ে শুরুর পরিকল্পনা
স্থানীয় সরকারি নির্বাচনঅক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ভোট, হাওর অঞ্চল দিয়ে শুরুর পরিকল্পনা
তথ্য কমিশনার নিয়োগে বাছাই কমিটি পুনর্গঠন
তথ্য কমিশনার নিয়োগে বাছাই কমিটি পুনর্গঠন
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে ‘ফরেন ল্যাংগুয়েজ সেন্টারের’ উদ্বোধন
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে ‘ফরেন ল্যাংগুয়েজ সেন্টারের’ উদ্বোধন
সর্বাধিক পঠিত
বিমানের ওভারটাইম: কেউ ঘুমান রেস্ট রুমে, কেউ মসজিদে, মাসে গচ্চা দেড় কোটি
বিমানের ওভারটাইম: কেউ ঘুমান রেস্ট রুমে, কেউ মসজিদে, মাসে গচ্চা দেড় কোটি
শাপলা চত্বর ঘটনার তদন্ত শেষ, আসামির তালিকায় যারা 
শাপলা চত্বর ঘটনার তদন্ত শেষ, আসামির তালিকায় যারা 
আলোচিত সেই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় ১৪ জুলাই
আলোচিত সেই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় ১৪ জুলাই
কেন ইনকিলাব সেন্টার ছাড়লেন জাবের-জুমা 
কেন ইনকিলাব সেন্টার ছাড়লেন জাবের-জুমা 
ফিফার তদন্তে মিসর জয়ী হলে আর্জেন্টিনার কপালে কী ঘটবে?
ফিফার তদন্তে মিসর জয়ী হলে আর্জেন্টিনার কপালে কী ঘটবে?