যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সাইবার হামলা চালিয়ে লন্ডনের পুরো পরিবহন নেটওয়ার্ক অচল করে দেওয়ার মূল পরিকল্পনাকারী দুই হ্যাকারকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের একজন হলেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তালহা জুবায়েদ এবং অপরজন ওয়েন ফ্লাওয়ার্স। উলিচ ক্রাউন কোর্টে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক শুনানিতে তাদের এই সাজা ঘোষণা করা হয়।
কম্পিউটার মিসইউজ অ্যাক্টের ৩জেডএ ধারার অধীনে এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও, আসামিদের সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নজিরবিহীন অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং আসামিদের ব্যক্তিগত মানসিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত এই ভারসাম্যপূর্ণ রায় দিয়েছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, সাজার মেয়াদ কিছুটা কম হওয়ার পেছনে আসামিদের তরুণ বয়স ও মানসিক বিকাশজনিত সমস্যা বড় ভূমিকা রেখেছে। যদিও বিচারের প্রথম দিন একদম শেষ মুহূর্তে নিজেদের দোষ স্বীকার করায় তারা আইনগতভাবে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সাজার ছাড় পাননি, বরং মাত্র ১০ শতাংশ ছাড় পেয়েছেন। রায় দেওয়ার সময় বিচারপতি টার্নার ৩ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ডের এই সাইবার হামলার ভয়াবহতার পাশাপাশি আসামিদের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাগুলোও বিবেচনা করেন। বিশেষ করে জুবায়েদের তীব্র বিষণ্নতা এবং অটিজমের বিষয়টি উঠে আসে। বিচারক এই হামলাকে রাষ্ট্রীয় অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের চেয়ে হ্যাকার দল স্ক্যাটার্ড স্পাইডার-এর মধ্যে নিজেদের জাহির করার জন্য এক ধরনের স্বার্থান্বেষী ও বেপরোয়া বাহাদুরি বলে উল্লেখ করেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে ২০ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তালহা জুবায়েদ এবং তার শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ সহযোগী ১৯ বছর বয়সী ওয়েন ফ্লাওয়ার্সের সমান্তরাল জীবনের বিভিন্ন অজানা অধ্যায় জানা গেছে। ১৬ জুলাই বিচারপতি টার্নার এই দুই তরুণকে সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। বিচারক শুনানির সময় উল্লেখ করেন যে, লাখ লাখ সাধারণ যাত্রীর দুর্ভোগের কথা তোয়াক্কা না করে স্রেফ সস্তা বাহাদুরির লোভেই তারা এই বড় ধরনের ভার্চুয়াল অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
২০২৪ সালের আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল)-এর সিস্টেমে টানা কয়েকদিন ধরে চলা এই অনুপ্রবেশের ফলে এক জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রসিকিউটরদের ভাষায়, বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে টিএফএল তাদের পুরো সিস্টেমের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছিল। এই হামলার ফলে সংস্থাটির সরাসরি ক্ষতি ও পুনরুদ্ধারের পেছনে খরচ হয় ২ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড, আর রাজস্ব ক্ষতি হয় আরও ১ কোটি পাউন্ড।
হামলার চরম মুহূর্তে জুবায়েদ এবং ফ্লাওয়ার্স সিস্টেমের সর্বোচ্চ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাক্সেস পেয়ে যান, যা ছিল মূলত পুরো নেটওয়ার্কের চাবিকাঠি। চরম দাম্ভিকতা দেখিয়ে ফ্লাওয়ার্স চলমান হ্যাকিংয়ের একটি লাইভ-স্ট্রিম ভিডিও রেকর্ড করেন এবং জুবায়েদ সেটি তাদের বন্ধুদের টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দেন, যেখানে তিনি লন্ডনের পাতাল রেলে জট পাকানোর দম্ভোক্তি করেছিলেন।
তদন্তকারীরা জানান, কেবল পরিবহন নেটওয়ার্ক অচল করেই তারা ক্ষান্ত হননি, টিএফএল-এর বিশাল গ্রাহক ডেটাবেজ ঘেঁটে হাই-প্রোফাইল তারকাদের ব্যক্তিগত তথ্যও খুঁজছিলেন তারা। এই ভার্চুয়াল হামলার প্রভাবে টিএফএল-এর প্রায় ২৭ হাজার কর্মীকে সশরীরে অফিসে গিয়ে তাদের সিকিউরিটি ক্রেডেনশিয়াল রিসেট করতে হয়েছিল। এছাড়া লন্ডনের সাধারণ ও অসহায় মানুষদের জন্য জরুরি সেবা যেমন ডায়াল-এ-রাইড বুকিং সিস্টেম, স্কুলপড়ুয়াদের ফটোকার্ড আবেদন এবং রিফান্ড প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
বিশ্বজুড়ে সাইবার জগতে রাজত্ব করলেও ব্যক্তিগত জীবনে এই দুজন ছিলেন ভীষণ নিঃসঙ্গ। পূর্ব লন্ডনের বো এলাকার এক সাধারণ বহুতল ফ্ল্যাটে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন তালহা জুবায়েদ। তার বাংলাদেশি বাবা একজন স্থানীয় কেয়ার ওয়ার্কার এবং মা চাকরি ছেড়ে ছেলের সার্বক্ষণিক সেবা করতেন। আদালতে ছেলের এই দ্বৈত জীবনের সত্যতা উন্মোচিত হওয়ার সময় দর্শক গ্যালারিতে বসে চোখ মুছছিলেন এই দম্পতি। কিশোর বয়সেই প্রতারণাসহ ২২টি অপরাধের রেকর্ড থাকার পরও জুবায়েদ ডার্ক ওয়েবে ‘@autistic’ ছদ্মনামে আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
পূর্ব লন্ডনের ওই ফ্ল্যাটে যখন পুলিশ অভিযান চালায়, তখন বসার ঘরের সোফার কুশনের নিচ থেকে একটি সচল ও গোপন বাংলাদেশি পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়, যা আন্তর্জাতিক বিচার এড়ানোর একটি পরিকল্পিত পালানোর ছক হিসেবে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। এছাড়া জুবায়েদ লাখ লাখ ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি সমৃদ্ধ এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল ওয়ালেটের পাসওয়ার্ড দিতেও অস্বীকৃতি জানান।
তার সহযোগী ওয়েন ফ্লাওয়ার্স থাকতেন ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ওয়ালসালের একটি বাড়িতে তার নানি ও মামার সঙ্গে। ফ্লাওয়ার্স আগে থেকেই স্থানীয় পুলিশের নজরদারিতে ছিলেন এবং ২০২৩ সালের শেষের দিকে তার অনলাইন কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য একটি নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। জুবায়েদ যখন নেটওয়ার্ক হ্যাক করতে ব্যস্ত থাকতেন, ফ্লাওয়ার্স তখন বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে সক্রিয় ছিলেন। গেম খেলে দিন কাটানো ফ্লাওয়ার্স একপর্যায়ে সাইবার চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। গ্রেফতারের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এসএসএম হেলথ কেয়ার করপোরেশন ও সাটার হেলথ-এর সিস্টেমে হ্যাকিং চালাচ্ছিলেন।
বড় বড় করপোরেট নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়া এই দুই তরুণের পতন ঘটে নিতান্ত সাধারণ এক ভুলের কারণে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) এবং মার্কিন ফেডারেল সংস্থাগুলোর তদন্তকারীরা ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে কেনা একটি ফুড ডেলিভারি অর্ডার এবং গেমিং গিফট কার্ডের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাক করতে সক্ষম হন। যে ক্রিপ্টো ওয়ালেট থেকে এই পেমেন্ট করা হয়েছিল, সেটির সঙ্গে বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে হাতিয়ে নেওয়া মুক্তিপণের অর্থ জমা রাখার সার্ভার অবকাঠামোর সরাসরি সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়।
যুক্তরাজ্যে তাদের আইনি প্রক্রিয়া কারাদণ্ডের মাধ্যমে শেষ হলেও সামনে আরও বড় ঝড় অপেক্ষা করছে। মার্কিন বিচার বিভাগ জুবায়েদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একটি ফেডারেল চার্জশিট প্রকাশ করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭টি প্রতিষ্ঠানে ১২০ বারের বেশি সাইবার হামলা চালিয়ে ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলারেরও বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মার্কিন আইনজীবীদের দাবি, জুবায়েদের চক্রটি বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ২০ কোটি ডলারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন করেছে। যুক্তরাজ্যের সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই মার্কিন সরকার তাকে প্রত্যর্পণের জোর চেষ্টা চালাবে, যেখানে দোষী সাব্যস্ত হলে মার্কিন ফেডারেল কারাগারে তার সর্বোচ্চ ৯৫ বছরের সাজা হতে পারে।

খামেনির জানাজায় শরিক হয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর
যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে কী ভাবছেন ইরানের প্রভাবশালী নেতারা
শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ: সংঘাত বিস্তারের হুঁশিয়ারি ইরানের
ব্রাজিলের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলো যুক্তরাষ্ট্র







