উপসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা প্রভাব কি বাড়ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩০ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৫আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৩

পাকিস্তান ও কুয়েতের মধ্যে নতুনভাবে অনুমোদিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিটি কোনও সামরিক জোট কিংবা সরাসরি সেনা মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা তৈরি না করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর সময়কাল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা অংশীদারত্বে বৈচিত্র্য আনার যে চেষ্টা উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো করছে, এটি তারই এক স্পষ্ট ইঙ্গিত।

২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত এই পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তিটি চলতি মাসে অনুমোদিত হয়েছে। চুক্তিটিতে সামরিক প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, লজিস্টিকস, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সামরিক কর্মীদের পারস্পরিক বিনিময় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নে একটি যৌথ সামরিক কমিটি গঠিত হলেও কোনও দেশকে অন্য দেশের প্রতিরক্ষায় বাধ্য করার মতো বাধ্যবাধকতা এতে রাখা হয়নি।

চলতি সপ্তাহে কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জারাহ জারাহ জাবের আল আহমদ আল সাবাহর দুদিনের পাকিস্তান সফরের ঠিক আগেই চুক্তিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সফরকালে দুই পক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা এবং নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা গভীর করতে একমত হয়েছে বলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে।

পাকিস্তান ও সৌদি আরব তাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের চুক্তি করার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে কুয়েতের সঙ্গে এই চুক্তি অনুমোদিত হলো, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে ইসলামাবাদকে নতুনভাবে হাজির করছে।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই রিয়াদকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও সামরিক উপদেষ্টা পাঠাবার মাধ্যমে সহযোগিতা করে আসছে। অপরদিকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটের সময় সৌদি আরব বারবার আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বলা হয়েছিল যে, যেকোনও একটি দেশের ওপর আগ্রাসন উভয় দেশের ওপর আক্রমণ বলে বিবেচিত হবে। সেই সঙ্গে একটি প্রতিরোধ ছাতা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়, যা উভয় দেশকে তাদের পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ব্যবহারে স্বাধীনতা দেয়।

কুয়েত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক চুক্তির গুরুত্ব কতটুকু, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও সবাই এক বিষয়ে একমত যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েল সংঘাত এবং ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার যুগে মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের সামরিক প্রয়োজনীয়তা এখনও অটুট।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বেড়েছে গুরুত্ব

কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক নুরা শুয়াইবি মনে করেন, আইনি রূপরেখার দিক থেকে এই চুক্তিটি খুবই সাধারণ, কিন্তু এটি কার্যকরের সময়টি অত্যন্ত কৌশলগত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আইনি দিক থেকে চুক্তিটি রুটিনমাফিক, কিন্তু সময় নির্ধারণের দিক থেকে এটি কৌশলগত।

তিনি জানান, চুক্তিতে সামরিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের মতো সাধারণ বিষয়গুলো থাকলেও এতে কোনও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা বা কুয়েতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা নেই।

বরং এর গুরুত্ব লুকিয়ে আছে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে। অধ্যাপক শুয়াইবি বলেন, কুয়েতের ওপর সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকি থেকে কুয়েত বুঝতে পেরেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহ্যগত প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখার পরও নিরাপত্তার জন্য আরও বিকল্প পথ খোলা রাখা দরকার।

তিনি মন্তব্য করেন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চুক্তি কার্যকরের বিলম্বের কারণ হতে পারে, তবে ভূরাজনীতিই নির্ধারণ করেছে চুক্তিটির অনুমোদনের সঠিক সময়। উপসাগরীয় আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিচ্ছে না, বরং একক কোনও দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে।

কেন পাকিস্তান?

কয়েক দশক ধরেই উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবেই হাজার হাজার পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা এই অঞ্চলে পরামর্শক ও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ মহড়া, সন্ত্রাসবাদ দমন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে।

অধ্যাপক শুয়াইবির মতে, কোনও একক ক্ষমতার জন্য নয়, বরং পাকিস্তানের বহুবিধ সক্ষমতার সংমিশ্রণই তাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তিনি পাকিস্তানের অভিজ্ঞ সশস্ত্র বাহিনী, বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্প, সন্ত্রাস দমনে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরের শুরুর দিকে বহুজাতিক কম্বাইন্ড টাস্ক ফোর্স ১৫০-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করে পাকিস্তানি নৌবাহিনী, যা আরব সাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলে সামরিক অভিজ্ঞতা জোরদার করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার পাশাপাশি নিজস্ব যুদ্ধবিমান প্রস্তুতকারী ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর অধিকারী পাকিস্তান উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠেছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব যৌথভাবে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির খসড়া তৈরি করছে। অন্যদিকে বাহরাইনও অনুরূপ চুক্তিতে আগ্রহী এবং জর্ডান পাকিস্তানের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

কুয়েতের প্রাথমিক নিরাপত্তা প্রদানকারী হওয়ার বদলে পাকিস্তান মূলত সামরিক প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও প্রতিরক্ষাপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। অধ্যাপক শুয়াইবি উল্লেখ করেন, নিয়মিত সামরিক মহড়া, ড্রোনের হুমকি মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং যৌথ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া এই চুক্তির কাঠামোগত গভীরতাকেই নির্দেশ করে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে কি নীতিগত পরিবর্তন আসছে?

ইসলামাবাদের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর গবেষণা সহযোগী পরিচালক ইয়াসির হুসেইন এই চুক্তিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিস্তৃত কৌশলগত পুনর্মূল্যায়নের ফল হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পাকিস্তানকে একটি বিশ্বস্ত নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে আরও উচ্চতায় তুলে ধরছে। ২০২৩ সালের তুলনায় বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনা অনেক বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বিলম্ব ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশেরই অংশ ছিল বলে মনে করেন তিনি।

ইয়াসির হুসেইন আরও বলেন, সৌদি আরব ও কুয়েতের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বৃদ্ধি মোটেও ইরানবিরোধী কোনও অক্ষ তৈরি করছে না। বরং এতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়ছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে এনে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে পাকিস্তান অতীতে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।

নতুন কিছু নয়, পুরোনো ধারারই অংশ

তবে অনেকেই এই চুক্তিকে হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনও বড় পরিবর্তনের রূপ দিতে নারাজ। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানে নিয়োজিত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতা বহু পুরোনো এবং এটি নতুন কিছু নয়।

তিনি বলেন, সব উপসাগরীয় দেশের সঙ্গেই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। এটি নতুন কিছু নয়। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে ২০২৩ সালের চুক্তিটি অনুমোদনে সময় লেগেছে বলে তিনি মনে করেন।

আসিফ দুররানি জানান, উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি মানেই ইরানের সঙ্গে শত্রুতা নয়। পাকিস্তান সবসময়ই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে নিজস্ব ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার সময় পাকিস্তান উভয় পক্ষের আস্থা অর্জনে সফল হয়েছিল, যা তাদের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দেয়।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

/এএ/
সম্পর্কিত
মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যর্থ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভারী’ বিমান হামলা
‘সিচুয়েশনশিপ’ থেকে মাথা ঠান্ডা রেখে বের হবেন কীভাবে
লোহিত সাগরে হুথি হামলা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক জোট চায় সৌদি আরব
সর্বশেষ খবর
তিতাস এলাকায় গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ থাকবে 
তিতাস এলাকায় গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ থাকবে 
সড়ক খুঁড়তে গিয়ে মিললো ৩ মর্টার শেল, আতঙ্কে কাজ বন্ধ
সড়ক খুঁড়তে গিয়ে মিললো ৩ মর্টার শেল, আতঙ্কে কাজ বন্ধ
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আরসা সদস্য নিহত
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আরসা সদস্য নিহত
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ৩ জনকে নিয়োগপত্র তুলে দিয়ে দিন শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী 
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ৩ জনকে নিয়োগপত্র তুলে দিয়ে দিন শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী 
সর্বাধিক পঠিত
২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে ভারতে পালানোর সময় দুই কর্মকর্তা ধরা
২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে ভারতে পালানোর সময় দুই কর্মকর্তা ধরা
ইমনকে ধরতে অভিযান চালায় ৯টি টিম, পুলিশকে বলেন নাম মিরাজ বাড়ি ঢাকায়
ইমনকে ধরতে অভিযান চালায় ৯টি টিম, পুলিশকে বলেন নাম মিরাজ বাড়ি ঢাকায়
বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ ও মালয়েশিয়া থেকে ৫ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নিতে রাজি মিয়ানমার: আনোয়ার ইব্রাহিম
বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ ও মালয়েশিয়া থেকে ৫ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নিতে রাজি মিয়ানমার: আনোয়ার ইব্রাহিম
৪ দিন আগে কীভাবে দেশে ঢুকেছেন দুর্ধর্ষ ইমন, সাজ্জাদ ও রায়হান কোথায়?
৪ দিন আগে কীভাবে দেশে ঢুকেছেন দুর্ধর্ষ ইমন, সাজ্জাদ ও রায়হান কোথায়?
টানা ২৪ ঘণ্টা উড্ডয়ন: দীর্ঘতম বাণিজ্যিক ফ্লাইটের বিশ্বরেকর্ড
টানা ২৪ ঘণ্টা উড্ডয়ন: দীর্ঘতম বাণিজ্যিক ফ্লাইটের বিশ্বরেকর্ড