মিরপুরে টার্গেট কিলিং, কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব

ইমরান আলী
০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে গুলি। প্রকাশ্য রাস্তায় কুপিয়ে হত্যা। আধিপত্যের বিরোধে রক্তপাত। চাঁদা না দিলে হুমকি। কখনও গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি। আর অলিগলিতে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট। রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুরে অপরাধের এই চিত্র এখন অনেকটাই নিয়মিত। এলাকাবাসীর ভাষ্য, একদিকে প্রকাশ্য কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব, অপরদিকে আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীদের গোপন তৎপরতা। দুইয়ের চাপে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য নিয়ে বিরোধ তৈরি হলেই হচ্ছে ‘টার্গেট কিলিং’। অভিযোগ আছে, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্দেশে স্থানীয় সহযোগীরা এসব হত্যাকাণ্ড ও হামলা চালাচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে মাদক কারবার, দখলবাজি, ছিনতাই এবং কিশোর গ্যাংয়ের নিত্য উৎপাত।

তাদের ভাষায়, অপরাধের মাত্রায় মিরপুর এখন আর মোহাম্মদপুরের চেয়ে পিছিয়ে নেই। রাজধানীর আরেক ‘মোহাম্মদপুর’ হয়ে উঠছে মিরপুর।

তবে পুলিশ বলছে, মিরপুরে অপরাধ দমনে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য থেকে শুরু করে পেশাদার সন্ত্রাসী—সবাইকে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার তানভীর সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এসব কিছুর পরেও পুলিশ কিন্তু থেমে নেই। কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধী গ্রেফতার করা, সন্ত্রাসীদের তৎপরতা থামানো—সবকিছু নিয়েই পুলিশ কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের চেষ্টার কোনও কমতি নেই।’’

র‌্যাব-৪ কোম্পানি কমান্ডার কে এন নিয়তি রায় বলেন, ‘‘এ এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি। প্রতিটি ঘটনায় অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনতে পেরেছি। তবে বিদেশ থেকে কে বা কারা এগুলো করে বা মদত দেয়, সেটি আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়। স্থানীয়ভাবে যারা অপরাধ করবে, আমরা তাদের আইনের আওতায় আনবো। সে যেই হোক, অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’’

আন্ডারওয়ার্ল্ডের টার্গেট কিলিং

গত বছরের ১৭ নভেম্বর পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

গত ১৮ জুলাই ভাসানটেকে কাউসার মোল্লা নামে এক যুবককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর ছয় দিন পর কাফরুলে যুবদল কর্মী ইউসুফ আলীকে ঘিরে আরেকটি হামলার ঘটনা ঘটে। তবে হামলাকারীদের মূল টার্গেট ছিলেন যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু।

এর বাইরেও চাঁদার দাবিতে গুলি চালিয়ে ভয় দেখানোর একাধিক ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য পর্যালোচনা করে জানা যায়, এসব ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীদের তৎপরতা। চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখতেই হত্যাকাণ্ড ও হামলাগুলো ঘটানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

স্থানীয় বাসিন্দা আজহার উদ্দিন বলেন, ‘‘প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনেই আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীদের হাত রয়েছে। এরা দেশের বাইরে থেকে রাজনীতি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। যারাই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাদেরই হত্যা করা হচ্ছে কিংবা হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘অনেকেই প্রাণভয়ে তাদের সঙ্গে আপস করছে। আর যারা আপস করছে না, তাদের পরিণতি হচ্ছে লাশ।’’

আজহার উদ্দিনের ভাষ্য, বৃহত্তর মিরপুরে বর্তমানে যারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জায়গায় রয়েছেন, তাদের অনেকেই এসব সন্ত্রাসীকে ‘মেইনটেইন’ করে চলেন।

শুধু আজহার উদ্দিন নন, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকার আরও কয়েকজন বাসিন্দাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের বক্তব্য, আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভয় এবং কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব—দুইয়ে মিলে মিরপুরবাসী এখন অপরাধীদের হাতে জিম্মি।

একাধিক বাসিন্দা বলেন, ‘অপরাধের দিক থেকে মোহাম্মদপুরের চেয়ে মিরপুর কোনও অংশে কম নয়। রাজধানীর আরেক মোহাম্মদপুর হচ্ছে মিরপুর।’

আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বৃহত্তর মিরপুরের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে চারটি প্রধান গ্রুপ। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এসব চক্র ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ নামে পরিচিত। তাদের মূল হোতারা বিদেশে অবস্থান করলেও নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে মিরপুরকে অন্তত ১৪টি এলাকায় ভাগ করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

জানা গেছে, মিরপুরে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, দখল এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে মফিজুর রহমান মামুন, ইব্রাহীম, শাহাদাত এবং আব্বাস উদ্দিন ওরফে কিলার আব্বাসের বিরুদ্ধে।

সূত্রের দাবি, মামুন বর্তমানে মালয়েশিয়ায়, ইব্রাহীম ফ্রান্সে, শাহাদাত ইতালিতে এবং কিলার আব্বাস দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। এর বাইরে মহসিন-মোক্তার নামে আরেকটি গ্রুপের সদস্যরাও দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, মামুনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মিরপুর-১২, পল্লবী, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকা। ইব্রাহীমের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর-১৩, মিরপুর-১৪, ভাসানটেক ও কালশী। শাহাদাতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মিরপুর-১, ২, ৬ ও ৭ নম্বর সেকশন।

কাফরুল এলাকায় আব্বাস উদ্দিন ওরফে কিলার আব্বাসের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি স্থানীয় সূত্রের। আর মিরপুর-১০ ও ১১ নম্বর এলাকা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে মহসিন-মোক্তার গ্রুপের বিরুদ্ধে।

তবে এলাকাভিত্তিক এই বিভাজন সব সময় মানা হয় না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, কোনও ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নজরে পড়লে তিনি কোন এলাকায় থাকেন, সেটি আর বিবেচ্য থাকে না। একবার নজরে পড়লে হয় তাকে আপস করতে হয়, নয়তো হত্যা বা হামলার ঝুঁকিতে পড়তে হয়।

সক্রিয় যেসব কিশোর গ্যাং

পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বৃহত্তর মিরপুরের সাতটি থানা এলাকায় সক্রিয় বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের নাম উঠে এসেছে। থানা সাতটি হলো—মিরপুর, পল্লবী, দারুস সালাম, রূপনগর, শাহ আলী, ভাসানটেক ও কাফরুল।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে—সুমন ব্যাপারী গ্যাং, পিচ্চি বাবু গ্যাং, বিহারি রাশেল গ্রুপ, বিচ্ছু বাহিনী, সাইফুল গ্যাং, বাবু-রাজন ও রিপন গ্যাং, সাব্বির গ্যাং, নয়ন গ্যাং, এবল মোবারক গ্যাং, অপু গ্রুপ, আব্বাস গ্রুপ, নাডা ইসমাইল গ্রুপ, হ্যাপি গ্রুপ, সজীব গ্রুপ, বগা হৃদয় গ্রুপ, ভাস্কর গ্রুপ এবং রবিন গ্রুপ।

এ ছাড়া রয়েছে এলকে ডেভিল বা বয়েজ এলকে তালতলা গ্রুপ, পটেটো রুবেল গ্রুপ, অতুল গ্রুপ, আশিক গ্রুপ, জল্লা মিলন গ্রুপ, রকি গ্রুপ, পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ, মুসা-হারুন গ্রুপ ওরফে ভাই ভাই গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ, ইয়াসিন গ্রুপ, ইমন ও জুয়েল গ্রুপ, রাজিব গ্যাং, ‘ভইরা দে’ গ্যাং, ‘ধইরা দে’ গ্যাং, রিংকু গ্রুপ, হীরা গ্রুপ, ভোলা গ্রুপ, শাহ কিবরিয়া গ্রুপ, শাহিন গ্রুপ, গোলাম রাব্বানী গ্রুপ এবং এলাচ জুয়েল গ্যাং।

এলাকাবাসীর দাবি, শুধু পল্লবী ও কাফরুল থানা এলাকায় প্রায় ৩৫টি এবং মিরপুর থানা এলাকায় অন্তত ১০টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। সব মিলিয়ে বৃহত্তর মিরপুরের সাত থানা এলাকায় ছোট-বড় দুই শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকতে পারে।

তাদের আশঙ্কা, এসব অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা না গেলে ধারাবাহিক হামলা ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে না। মিরপুরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ও সমন্বিত তৎপরতা প্রয়োজন।

অপরাধী যেই হোক, ছাড় নয়

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ডিবিপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হচ্ছে। ভাড়াটে শুটার ও পেশাদার খুনিদের তালিকা প্রতিনিয়ত আপডেট করা হচ্ছে এবং তাদের আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অপরাধী যেই হোক, কোনও ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘রাজধানীসহ সারা দেশের তালিকাভুক্ত অপরাধীদের নিবিড় নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনা হবে।’’

/জেইউ/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
গাবতলীতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, নিহত ১
এত অভিযান-গ্রেফতারের পরও কেন ‘অনিরাপদ’ ঢাকা?
সর্বশেষ খবর
১৪ মাস পর সিলেটে ফের করোনা শনাক্ত 
১৪ মাস পর সিলেটে ফের করোনা শনাক্ত 
কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
গাবতলীতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, নিহত ১
গাবতলীতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, নিহত ১
‘যৌন ডাক্তার’ ট্যাগ ও ‘ফেসবুকে ওষুধ বিক্রি’ নিয়ে মুখ খুললেন তাসনিম জারা
‘যৌন ডাক্তার’ ট্যাগ ও ‘ফেসবুকে ওষুধ বিক্রি’ নিয়ে মুখ খুললেন তাসনিম জারা
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে ৬ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
নতুন দায়িত্বে ৬ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
প্রদর্শনীতে মুজিব থাকলেও জিয়া না থাকার কারণ জানালেন জামায়াত আমির
প্রদর্শনীতে মুজিব থাকলেও জিয়া না থাকার কারণ জানালেন জামায়াত আমির
বঙ্গোপসাগরে এক জালেই ধরা পড়লো ৪৮ লাখ টাকার ইলিশ
বঙ্গোপসাগরে এক জালেই ধরা পড়লো ৪৮ লাখ টাকার ইলিশ
পাঁচ তারকা হোটেলে অভিযান, পাওয়া গেলো পচা মাংস ও মেয়াদোত্তীর্ণ দুধ
পাঁচ তারকা হোটেলে অভিযান, পাওয়া গেলো পচা মাংস ও মেয়াদোত্তীর্ণ দুধ
জামায়াত আমিরের বাসায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উপস্থাপন নিয়ে বিতর্ক
জামায়াত আমিরের বাসায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উপস্থাপন নিয়ে বিতর্ক