বিশেষ সাক্ষাৎকারে ড. ইফতেখারুজ্জামান

‘রাষ্ট্র সংস্কারের অভীষ্ট রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধে জিম্মি’

জামাল উদ্দিন
০৫ আগস্ট ২০২৬, ১৭:২০আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১২

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র সংস্কারের এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু দুই বছর পর সেই সম্ভাবনা এখন রাজনৈতিক আপস, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ ও পুরোনো ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতির চাপে অনেকটাই থমকে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করলেও তা ছিল নড়বড়ে; আর নির্বাচিত সরকারও দলীয়করণ, স্বার্থের সংঘাত ও ‘এবার আমাদের পালা’ মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি— এমন মূল্যায়ন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের।

তাঁর মতে, জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠাই ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা। অথচ এই লক্ষ‍্যে প্রণীত সংস্কার কমিশনগুলোর বহু যুগান্তকারী সুপারিশ উপেক্ষিত হয়েছে। দুদকসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধে। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ায়—এমন আইন দ্রুত অনুমোদন পেলেও সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার সহায়ক বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ‍্যাদেশ বাতিল কিংবা স্থগিত করা হয়েছে। ফলে তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্র সংস্কারের অভীষ্ট এখন ‘রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের হাতে জিম্মি’।

বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. ইফতেখারুজ্জামান কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা, বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের শাসন, জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ, দুদকের অকার্যকারিতা, আমলাতান্ত্রিক বাধা, দলীয়করণ, গুম প্রতিরোধ আইনের দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রপতির সম্পদ বিবরণী প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলের সুবিধা সম্পদ বিবরণী প্রকাশের শর্তে দেওয়ারও প্রস্তাব করেছেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর সবার প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রের সংস্কার হবে, রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে। গত দুই বছরে আসলে কতটা পরিবর্তন হয়েছে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: এটি মানুষের প্রত্যাশা ছিল, অবশ্যই। একই সঙ্গে এ লক্ষ‍্যে বিশাল সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। এ ধরনের অভূতপূর্ব সুযোগ এর আগে খুব কমই দেখা গেছে। আন্দোলন বিজয়ী হওয়ার পর, ৫ আগস্ট কর্তৃত্ববাদের পতনের ফলশ্রুতিতে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে সেই সরকারের ওপর তিনটি মৌলিক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল। আন্দোলনটিকে এখন আমরা যেভাবেই দেখি না কেন, প্রথম দায়িত্বটি ছিল—যা ঘটেছে, মানুষের যে বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, সেসবের বিচার করা।

দ্বিতীয় দায়িত্ব ছিল নির্বাচন। এত বছর দেশের মানুষ রাজনৈতিক অধিকার, বিশেষ করে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর।

তৃতীয় দায়িত্বটি আপনার প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আমি মনে করি, আন্দোলনের মূল অভীষ্ট ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। রাষ্ট্র সংস্কারকে নানাভাবে বিবেচনা বা সংজ্ঞায়িত করা যায়। তবে আন্দোলন থেকে উঠে আসা মূল কথাটি ছিল—বাংলাদেশের মানুষ কর্তৃত্ববাদের পতনের মাধ‍্যমে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সরকারব‍্যবস্থা চেয়েছে। তারা একটি ‘অ্যাকাউন্টেবল গভর্নেন্স’ চেয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান

সেই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এগুলো নিয়ে বিতর্ক ছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে কমিশন করা হলো, আবার কোন কোন ক্ষেত্র বাদ দেওয়া হলো, কমিশন গঠন প্রক্রিয়া ও গঠন কতটুকু অন্তর্ভূক্তিমূলক ছিল—সেই উদ্বেগ আপাতত বাদ দিচ্ছি। তবে আমি মনে করি, কমিশনগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব মোটামুটি যথাযথভাবে পালন করেছে। এ মূল্যায়ন নিয়েও বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু প্রতিটি কমিশনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত যুগান্তকারী কিছু সুপারিশ প্রস্তাব করা হয়েছিল।

সেসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হতে পারত। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার এসে সেই সংস্কারগুলো এগিয়ে নিতে পারত। তাহলে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে সবার যে প্রত্যাশা ছিল, সেটি পূরণের পথ অনেকাংশে সুগম হতে পারতো।

একেবারে কিছুই হয়নি, তা বলবো না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরির্তনের একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমার বিবেচনায় সেই ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে। মৌলিক জায়গাগুলোতে অন্তর্বর্তী সরকার আপস করেছে। তারা বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশও পাস করেছে। কিন্তু এসব অধ্যাদেশ প্রণয়নের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার  নিজের গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে খুলে দেখেনি, বা মোটেও বিবেচনায় নেয়নি—আমি সরাসরি যতটুকু জানি।

এর ফলে বহুমাত্রিক ঘাটতি ও অসংগতি তৈরি হয়েছে। অতএব অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভীষ্ট অনুযায়ী রাষ্ট্রসংস্কারকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিয়েছে—এ কথা আমি বলতে পারবো না। সে কারণেই সংস্কারের ভিত্তিটি নড়বড়ে হয়েছে।

তা স্বত্বেও, যত বিতর্কই থাকুক না কেন, একটি জুলাই সনদ হয়েছে এবং সেটিতে সই করা হয়েছে। তবে সনদটির দুর্বলতাও রয়েছে। বিশেষ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর কারণে মৌলিক কিছু বিষয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি নথিভুক্ত রয়েছে। এ কারণে তারা একদিকে বলতে পারছে, সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে; অন্যদিকে যেসব বিষয়ে তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, সেগুলো কেবল নিজেদের অবস্থান বা এজেন্ডা অনুযায়ী  বাস্তবায়ন করবে। জুলাই চেতনা যেখানে মুখ্য বিষয় নয়। আবার অন্য একটি পক্ষ চাইছে, নোট অব ডিসেন্ট স্বত্বেও জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হোক। যদিও অপরপক্ষের নিরঙ্কুশ সংখ‍্যাগরিষ্টতার কারণে তা অবাস্তব দাবিতে পরিণত হয়েছে। হারাতে হচ্ছে জুলাই অভীষ্টের সাথে সামজ্ঞস‍্যপূর্ণ রাষ্টসংস্কার বাস্তবায়নের সম্ভাবনা।

এক কথায় আমি বলবো, অন্তর্বর্তী সরকার একদিকে সংস্কারের ভিত্তিটিকে নড়বড়ে করে রেখে গেছে। অন্যদিকে যারা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন, দায়িত্ব নিয়েছেন এবং সংসদ গঠন করেছেন, তারাও রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক অঙ্গীকারের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল, তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

বিশেষ করে যে দলটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তাদের সামনে শুধু জুলাই সনদ নয়; নিজেদের ৩১ দফা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এজেন্ডা এবং নির্বাচনী ইশতেহারও রয়েছে। রয়েছে কর্তৃত্ববাদের সরাসরি ভুক্তভোগী হিসেবে দেড় যুগের তিক্ত অভিজ্ঞতা। তা সত্ত্বেও গত কয়েক মাসে তারা এসব অভিজ্ঞতা থেকে কী শিক্ষা নিয়েছেন, বা তাদের নিজেদের অঙ্গীকারের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে।

রাষ্ট্র সংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেটি একেবারেই হারিয়ে গেছে—আমি তা বলবো না। তবে অনেক আপস হয়েছে। যতটুকু সংস্কার হতে পারতো, তার পথে বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমার পর্যবেক্ষণ থেকে সরকারপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট অনেককে সুযোগ পেলেই বলেছি। বর্তমান সরকারকেও বলেছি এবং এখনও বলছি—আমরা সবাই রাষ্ট্র সংস্কার চাই বলে একটি অভিন্ন ব্যানার ধারণ করছি। কিন্তু যারা এই ব্যানার ধারণ করছেন, রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে বা জুলাই অভ‍্যূথ‍্যানের বিজয়ি শক্তি হিসেবে তাদের চিন্তাভাবনা বা প্রত‍্যাশা একসূত্রে গাথা কি না, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাজনৈতিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল কমন এনিমির বিরুদ্ধে, কিন্তু কর্তৃত্ববাদের পতনের পর সকলের লক্ষ‍্য, উদ্দেশ্য বা প্রত‍্যাশা কী এক ছিল?

যার ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের পরিপন্থী শক্তিগুলো সম্পর্কে কোনো বিশ্লেষণ নেই। এসব শক্তির কোনো ম্যাপিংও করা হয়নি। আমার দৃষ্টিতে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রধান প্রতিবন্ধকতা আসছে আমলাতন্ত্র এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো থেকেই। অন্তর্বর্তী সরকারকে আমি এ কথা বলেছি। বর্তমান সরকারকেও বলেছি এবং বলে যাচ্ছি।

আমি মনে করি না, আমাদের আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই অভ্যুত্থান থেকে যে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ ও প্রয়োজন ছিল, ততটুকু নিতে পেরেছে। বিশেষ করে জুলাই চেতনার রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে তারা কোনো শিক্ষা নিয়েছে বলে আমি দেখতে পাচ্ছি না।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে এই ব্যর্থতার মূল দায় কার?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: মূল দায় তাঁদের, যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন, সেই অন্তর্বর্তী সরকার; তাদের অন্যতম সহায়ক শক্তি আমলাতন্ত্র এবং তখন তাদের ক্ষমতার পেছনের ভিত্তি হিসেবে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো—সবারই দায় রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও রাজনৈতিক দলগুলো ছিল ক্ষমতার একটি মূল ভিত্তি। তাদের টানাপোড়েন, সহায়তা, সমর্থন, বিরোধিতা ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ম‍্যানেজ করেই অন্তর্বর্তী সরকার এবং সরকারের আমলাতন্ত্র কাজ করেছে।

প্রতিবন্ধকতার আরো একটি প্রধান জায়গা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত দক্ষতার ঘাটতি, সৎসাহসের অভাব, স্বচ্ছতা এবং দৃঢ়তার ঘাটতি। অন্যদিকে আমলাতন্ত্র থেকে ছিল প্রবল প্রতিকূলতা।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে জবাবদিহিমূলক সরকারব‍্যবস্থার অনূকুল কোনো মৌলিক সংস্কার হোক—এটি আমলাতন্ত্রের কাছে গ্রহণযোগ‍্য নয়। তারা এধরনের সংস্কার চায় না, কোনো দিন চায়নি, এখনো চাইছে না এবং ভবিষ্যতেও চাইবে না— যদি তাদের নিজেদের যথাযথ সংস্কার করা না যায়। যার রূপরেখাও সরকারের অজানা নয়। তা স্বত্বেও বাংলাদেশে সংস্কার ততটুকুই হবে যতটুকু আমলাতন্ত্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনতে সক্ষমতা না দেয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমলাতন্ত্রের পেছনে যে রাজনৈতিক শক্তি ছিল, এখনো তার ধারাবাহিকতা রয়েছে। বর্তমানে যাঁরা সরকারে ও সংসদে আছেন, তাঁদের রাজনৈতিক শক্তি এবং আমলাতন্ত্রেই বাস্তবে রয়েছে সম্ভাবনাও চ্যালেঞ্জ। তারা একই সঙ্গে ‘অ্যাঞ্জেল অ্যান্ড ডেভিল’। তারাই সংস্কারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে যদি সদিচ্ছা থাকে, আবার তারাই সংস্কারের পথে সবচেয়ে দুরূহ প্রতিকূলতার উৎস।

বাংলা ট্রিবিউন: অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন আপনি দেখেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জন সম্পর্কে ইতিমধ্যে বলেছি। যতটুকু সম্ভাবনা ছিল, তার সিংহভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। রাষ্ট্র সংস্কারের দৃষ্টিকোণ থেকে তারা যতটুকু ভিত্তি তৈরি করেছে, সেটি নড়বড়ে।

এর একটি কারণ হচ্ছে, সংস্কার কমিশনগুলোর প্রস্তাব বা সুপারিশ সরকারের প্রাধান্য পায়নি। ১১টি সংস্কার কমিশনের প্রত্যেকটি দুই ধরনের সুপারিশ করেছিল। সরকারের পক্ষ থেকেই এটি চাওয়া হয়েছিল। প্রথমটি ছিল আশু করণীয়—অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ। দ্বিতীয়টি ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ‍্যে ঐকমত‍্যের ভিত্তিতে নির্বাচনের পর বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ।

ড. ইফতেখারুজ্জামান (ছবি: বাংলা ট্রিবিউন)

কিন্তু প্রথম শ্রেণির সুপারিশগুলোর মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন সহায়ক বিষয়গুলোতে মোটেই হাত দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে দ্বিতীয় পর্যায়ে গঠিত কমিশনগুলোর প্রতিবেদনের কোনো ক্ষেত্রেই কোনো কাজ হয়নি। যেসব ক্ষেত্রে হাত দেওয়া হয়েছে, সেখানে শুধু ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ করা হয়েছে। সেই বাছাইয়ের কাজও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা ও আমলাতন্ত্র মিলে নিজেদের পছন্দের সামান‍্য কিছু ক্ষেত্রে নামসর্বস্ব সিদ্ধান্ত ছাড়া প্রত্যাশিত মানের কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার দিকটিও বিবেচনা করা দরকার। সরকারটি একটি বিশাল গণরায়ের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল। গণরায় বলতে আমরা শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া রায়কে বুঝি না; আন্দোলনের মাধ্যমে গণরায় তৈরি হয়েছিল। সেই গণরায়ের ভিত্তিতেই সরকারটি গঠিত হয়েছিল। এই রায়কে সরকার রাষ্ট্রসংস্কার বাস্তবায়নের জন‍্য প্রয়োজনীয় মনোবল, সক্ষমতা ও সৎসাহসে রূপান্তর করতে পারেনি।

 রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলে যেভাবে জনসম্পৃক্ততা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার ভিত্তি থাকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সে ধরনের কোনো ভিত্তি ছিল না। এ কারণে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা অনেক সময় নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ভিত্তিতে চলেছে। সরকার পরিচালনা অংশগ্রহণমূলক ছিল না।

অনেক সিদ্ধান্ত ছিল ‘আরবিট্রারি’ বা খামখেয়ালিনির্ভর। অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি ছিল। নিয়োগ, পদায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে এমন অনেক সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেগুলো ছিল স্বার্থের দ্বন্দ্বে জর্জরিত। সরকার পরিচালনায় ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, স্বজনপ্রীতি, জেলাপ্রীতি, প্রতিষ্ঠানপ্রীতি ও পরিচয়প্রীতির প্রভাব ছিল। অর্থাৎ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।

স্বচ্ছতার ঘাটতির একটি বিব্রতকর দৃষ্টান্ত দিই। দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, মন্ত্রিসভার সব সদস্য এবং সব পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী অনতিবিলম্বে প্রকাশ করা হবে। পরবর্তী সময়ে এটি বাস্তবায়নের জন্য একটি ফরম্যাটও তৈরি করা হয়েছিল।

কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের মুহূর্ত পর্যন্ত বাস্তবে কিছুই হয়নি। শেষ মুহূর্তে লোক দেখানোর মতো কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল, যা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণত রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে এক্ষেত্রে পরিস্থিতি ব্যতিক্রম ছিল। এটি প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালন করা একটি অন্তর্বর্তী সরকার ছিল। ফলে তাদের কিছু সিদ্ধান্ত নিতেই হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশাল গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবসম্পন্ন অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছে, যেগুলোর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না, অংশগ্রহণমূলক ছিল না এবং জনগণ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের যথাযথভাবে অবহিতও করা হয়নি।

কাজেই সংস্কারের ভিত্তি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে যেমন দুর্বলতা ছিল, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের দুর্বলতা দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে যে ধরনের প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি।

সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্নীতির মাত্রা নিয়েও অনেক বিতর্ক ছিল। শুধু বিতর্ক নয়, সুনির্দিষ্ট ও তথ্যনির্ভর অভিযোগও রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে অথবা তাঁদের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের একাংশ বড় ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়েছেন—এমন অভিযোগ আছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে এ-সংক্রান্ত তথ্য ছিল। দুদকের তৎকালীন সূত্র থেকে জানা যায়, তাদের কাছে এসব তথ্য ছিল। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তারা বলেছে, পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি।

সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে যে ধরনের প্রত্যাশা ছিল, সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলা ট্রিবিউন: গত পাঁচ মাস ধরে দুদক কমিশন শূন্য। আপনি দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন। দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আপনাদের সুপারিশ নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কিছুই হলো না কেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। অন্য সব খাতের মতো দুদক সংস্কার কমিশনের ক্ষেত্রেও এটি ঘটেছে। এ কমিশনের দায়িত্বে ছিলাম বলে বিষয়টিতে হয়তো আমার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা একটু বেশি। আমি ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কাজ করেছি। ফলে পরিবর্তনের একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়েছিল এবং দেশবাসীর বড়ধরনের প্রত্যাশা ছিল।

অন্য কমিশনগুলোর মতো আমরাও আশু করণীয় সুপারিশ দিয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন, দুদক সংস্কার কমিশনের প্রায় শতভাগ প্রস্তাবের সঙ্গে প্রায় শতভাগ রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল। দু-একটি ছোটখাটো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছাড়া প্রায় সবাই সম্পূর্ণ একমত ছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারেরও বিষয়টি জানা ছিল। সরকারের পক্ষ থেকেও শতভাগ সহমতের কথা বলা হয়েছিল, এসব সুপারিশ নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই এবং তারা সেগুলো বাস্তবায়ন করবেন।

দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এখানে আমাদের সঙ্গে বসে প্রতিটি সুপারিশ একটির পর একটি দেখেছেন। প্রতিটিতে টিক দিয়ে তিনি বলেছেন, এমন একটি সুপারিশও নেই, যার সঙ্গে তিনি একমত না হয়ে পারেন।

এমন একটি প্রেক্ষাপট থাকা সত্ত্বেও যেসব আশু করণীয় প্রস্তাব ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগ নেয়নি। দুদক জন্মলগ্ন থেকে যে আস্থাহীনতার সংকটে ভুগছে, তার মৌলিক কারণগুলো দূর করার সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।

আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুদকের ভেতর থেকেও প্রতিকূলতা ছিল। সেখানেও মূল চ্যালেঞ্জ ছিল আমলাতন্ত্র— প্রেষণে আসা আমলাদের সাথে দুদকের নিজস্ব আমলাতন্ত্র এব‍্যাপারে  সম্পূর্ণ একমত হয়েছে। তাদের দিক থেকে প্রতিকূলতা আসায় আশু করণীয় বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি।

অন‍্যদিকে সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে আমাদের অবহিত না করে সরকার দুদক আইন ২০০৪ সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। নাগরিক সমাজ, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজন—কাউকে অবহিত করা হয়নি। বিশেষ করে সরকারেরই উদ‍্যোগে গঠিত যে সংস্কার কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে তাদেরও সম্পৃক্ত করা হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে একটি খসড়া অধ্যাদেশ প্রস্তুত করা হলো এবং সেটি পাস করার উদ্যোগ নেওয়া হলো। আমরা বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারি। তখন কী হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করি।

আমরা জানতে পারি, দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর সিংহভাগ অবজ্ঞা করে নিজেদের মতো করে অধ্যাদেশের ধারা তৈরি করা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলি, আমরা দুদকের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা চেয়েছি। কিন্তু স্বাধীনতার পাশাপাশি দুদকের জবাবদিহিরও একটি ক্ষেত্র তৈরি করতে চেয়েছি। অতীতে ক্ষমতাসীনদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এবং সরকারপক্ষকে সুরক্ষা দিতে দুদককে ব্যবহার করা হয়েছে। দুদক নিজেও ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে বা সেই সুযোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু এর জন্য দুদককে কখনো জবাবদিহি করতে হয়নি।

ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যেন পরিহার করা যায়, সে লক্ষ্যে আমাদের কিছু সুপারিশ ছিল। সেগুলো সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়।

বিষয়টি জানার পর আমরা তৎকালীন সরকারের সঙ্গে বৈঠক করি। প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠকে আমরা তাদের সুপারিশগুলোর প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সক্ষম হই। তারা রাজি হয়েছিল এবং বলেছিল, ঠিক আছে, এগুলো প্রয়োজনীয় এবং অধ্যাদেশে রাখা হবে। এমনকি কেমন শিরোনাম ও ভাষা ব্যবহার করা হবে তাও নোট করা ‌হয়।

কিন্তু মন্ত্রিপরিষদে অধ‍্যাদেশ অনুমোদনের সময়ে সেগুলো আর রাখা হয়নি। কেন রাখা হয়নি জানতে চাইলে বলা হয়, আমলাতন্ত্র থেকে বাধার কারণে সম্ভব হয়নি। শুধু আমলাতন্ত্র নয়, সাতজন উপদেষ্টাও আমলাদের পক্ষ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ আমলাতন্ত্রের হাতে পুরো মন্ত্রিপরিষদ আত্মসমর্পণ করে দুদকের কার্যকারিতার জন‍্য সরকারেরই গঠিত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন প্রতিহত করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন কীভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, এটি তার একটি দৃষ্টান্ত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো একই অবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, তৎকালীন দুদক কমিশন পদত্যাগ করার পর পাঁচ মাস ধরে কমিশন শূন্য রয়েছে। সবাই জানে, সরকারের ইচ্ছাতেই তৎকালীন কমিশন পদত্যাগ করেছিল।

যাঁরা পদত্যাগ করেছিলেন, তাঁরা খুব কার্যকর বা দক্ষ ছিলেন—এমন দাবি না করলেও বলতে হবে, মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলা যায় না।

তাঁদের পদত্যাগের পর পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। অতি সম্প্রতি নতুন কমিশন গঠনের জন্য একটি সার্চ কমিটি করা হয়েছে। সেই কমিটিও বিতর্কিত। কারণ এতে পদে বহাল মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সদস্য করা হয়েছে, যা হওয়ার কথা নয়।

তারপরও যতটুকু জানি, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে শুধু একটি বা একাধিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এর বেশি কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে কি দুদক আবার পুরোনো ব্যবস্থার দিকেই ফিরে যাচ্ছে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: পুরোনো আইন অনুসারে পুরোনো ব্যবস্থার দিকেই ফিরে যাওয়া হচ্ছে। শুরুতে যে কথাটি বলেছিলাম, জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন। কিন্তু দুদক যথাযথভাবে গঠিত হোক এবং গঠিত হওয়ার পর কার্যকরভাবে কাজ করুক—বর্তমান সরকারের আচরণে এখন পর্যন্ত আমরা এমন কোনো দৃষ্টান্ত দেখতে পাইনি।

বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ নিয়ে একমত হয়েছিল। সেই ঐকমত্য ভেঙে গেল কেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: এই ঐকমত্য শেষ পর্যন্ত থাকলো না—এতে আমি মোটেও অবাক হইনি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে থাকার সুযোগ হয়েছিল। তখন থেকেই আমি বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলাম।  শুরু থেকে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে - সংস্কার যা-ই হোক না কেন, সরকারের হাত-পা বেঁধে দেয়া যাবে না। অর্থাৎ সরকারের জবাবদিহির অভীষ্টকে সরকারের গতিশীলতার প্রতিবন্ধক হিসেবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব‍্যাখ‍্যার মাধ্যমে প্র‍তিরোধ করা হয়েছে।

যখনই ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর আশ্রয় নিতে হলো, তখনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে এটি সত্যিকারের ঐকমত্য নয়। শুধু একটি দুর্বল ‘কমন মিনিমাম গ্রাউন্ডে’ পৌঁছানো গেছে। এর বেশি কিছু নয়।

তারপরও সবাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। গণভোটে জনগণের রায় এসেছে এবং বিপুল ভোটে এটি অনুমোদিত হয়েছে। ফলে একটি অঙ্গীকার অবশ্যই রয়েছে।

কিন্তু আগেই বলেছি, একটি রাজনৈতিক দল দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জয়ী হয়েছে। সনদ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদের সদস্যদের ‘কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি’ বা গনপরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁরা সেটি করেননি। এর মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের অবস্থানকেই একধরনের বিতর্কের মধ্যে ফেলেছেন।

তবে কঠোর বাস্তবতা হচ্ছে, তাঁরা যদিওবা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি গণপরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিতেন, তাহলেও জুলাই সনদের নোট অব ডিসেন্টগুলো বিবেচনায় রেখেই বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগোত। অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পাওয়া দল যতটুকু চাইবে, ততটুকুই সংস্কার হবে।

এখন যেহেতু সেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, সরকার যা করছে বা ভবিষ্যতে করবে, সেটিও হবে কেবল তাদের নিজেদের পছন্দের সীমারেখার মধ্যেই।

জুলাই সনদের মূল চেতনা ছিল জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি এজেন্ডা বা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। কিন্তু এখন সেই ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার বাস্তবায়নের আর কোনো সুযোগ আমি দেখতে পাচ্ছি না।

আরেকটি বিষয় বলি। রাষ্ট্র সংস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু আইন প্রণীত হয়েছে। মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ ছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এসব অধ্যাদেশের একটি বড় অংশ সংসদে অনুমোদন করিয়ে নিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো অধ্যাদেশ অনুমোদন করানো অবশ্যই একটি ভালো ও বড় কাজ।

কিন্তু এখানে দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে। যেসব অধ্যাদেশ সরকারের, অর্থাৎ নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা অধিকতর শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করেছে, সেগুলো উৎসাহভরে পাস করা হয়েছে।

অন্যদিকে যেসব অধ্যাদেশ নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির মধ্যে আনা এবং ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, সেগুলো হয় রহিত করা হয়েছে, নয়তো স্থগিত করা হয়েছে।

সরকারের এই দ্বিমুখী প্রবণতা আমাদের একটি মৌলিক বার্তা দিচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের যে মূল চেতনা ও অভীষ্ট ছিল জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, সেটি অর্জনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে যে বিশাল  প্রতিকূলতা কাজ করছে এবং সেই প্রতিকূলতার পেছনে আমলাতন্ত্র যে অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে কাজ করছে—এই ঘটনাগুলো তারই প্রমাণ।

বাংলা ট্রিবিউন: বর্তমান সরকারের প্রায় ছয় মাস হয়ে গেল। সুশাসনের দিক থেকে ইতিবাচক কিংবা উদ্বেগজনক কী দেখছেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: সরকারের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমী ও অভূতপূর্ব উদ্যোগ, প্রয়াস এবং ব্যক্তিগত চর্চার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। এগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক, এমনকি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছেও নতুন ধারার  রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কিন্তু শীর্ষনেতৃত্বের এই নতুন ধারার প্রতিফলন সরকার পরিচালনার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। বরং বিভিন্ন জায়গায় দলীয় আধিপত্যের একই পুরোনো সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। পার্থক্য শুধু হাতবদলের।

বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকট স্বার্থের দ্বন্দ্ব, দলীয় পছন্দ-অপছন্দ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিবেচনা কাজ করছে। রাজনৈতিক ভূমিকা, নির্বাচনে ভূমিকা অথবা আন্দোলনে ভূমিকার কারণে পুরস্কৃত করার চর্চা প্রকট রূপ ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ থেকে শুরু করে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে একই দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মূল বার্তা—‘আমরা ১৭ বছর সুযোগের বাইরে ছিলাম, এখন আমাদের পালা; এখন আমরা উইনার; এখন আমাদেরই একচ্ছত্র সুযোগ।’

সর্বোপরি, ওপরের দিকে নেতৃত্বের পর্যায়ে নতুন ধারার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও শাসনযন্ত্র ও সরকার পরিচালনার মধ্যে তার দৃষ্টান্ত বিরল। বরং উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি এবং সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের আচরণে পরিবারতন্ত্র দেখা যাচ্ছে। স্বার্থের দ্বন্দ্বপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক অবস্থান, জনপ্রতিনিধির ক্ষমতা ও সরকারি পদকে নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অসুস্থ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চক্রের হাতে রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন জিম্মিদশার মধ্যে পড়ে আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: জরুরি ভিত্তিতে কোন সংস্কারগুলো করা প্রয়োজন? কোন দুই-একটি বিষয় বাস্তবায়িত না হলে মানুষের প্রত্যাশা পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: কয়েকটি ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথমেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলতে হবে—যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।

বিচার বিভাগ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণমুক্ত করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান যেন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, দলনিরপেক্ষ নেতৃত্ব এবং পর্যাপ্ত সম্পদ নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি আরও দুটি জায়গায় হাত না দিলে শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না। একটি হচ্ছে আমলাতন্ত্রের সংস্কার।

প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। তারপরও সেই প্রতিবেদনে বেশ কিছু যুগান্তকারী প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু সেসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেই। এখনো তা হয়নি এবং হওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। যতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, সেখানেও আমলাতন্ত্রের ভেতরের একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধার জায়গাগুলো বেছে নিয়েছে।

আমলাতন্ত্রের সংস্কার না হলে এর অভ্যন্তরে অনিয়ম-দুর্নীতি এবং প্রশাসনের জবাবদিহিহীন কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার প্রবণতা দূর হবে না। বিষয়টি শুধু শাসনযন্ত্রের অংশ হিসেবে ক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমলাতন্ত্রের নিজেদের মধ্যেও বড় ধরনের আন্তক্যাডার বৈষম্য রয়েছে। যত দিন আন্তক‍্যাডার বৈষম্য জিইয়ে থাকবে, তত দিন আমাদের শাসনযন্ত্র একটি ‘টিকিং টাইমবোমা’র ওপর থাকবে। কাজেই আমলাতন্ত্রের সংস্কার অপরিহার্য।

তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কার। অন্যান্য সব ক্ষেত্রে সংস্কার অপরিহার্য হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার না হলে বাংলাদেশে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না।

রাজনৈতিক দলগুলো যদি সেই পুরোনো ধারণা ধরে রাখে—রাজনীতিতে যে জিতবে, সে সবকিছু নেবে; যে ক্ষমতায় থাকবে, সবকিছু তার হাতে থাকবে; এখন তাদের পালা—তাহলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।

বিশেষ করে স্বাধীনতার পর থেকে এবং আরও নির্দিষ্টভাবে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকে এ চর্চা চলছে। ক্ষমতায় থাকাকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির মাধ্যমে নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে। যত দিন তারা নিজেদের সংস্কারের কথা না ভাববে এবং এই চর্চার পরিবর্তন না করবে, তত দিন বাংলাদেশে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না।

বাংলা ট্রিবিউন: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, রাষ্ট্রের কিছুই পরিবর্তন হয়নি। তাঁর এই মন্তব্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: আমি মনে করি, মির্জা ফখরুল সাহেবের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার প্রতিফলন তাঁর বক্তব্যে ঘটেছে। বাস্তবে যা ঘটছে, সেটিই তিনি অল্প কথায় বলে দিয়েছেন।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে এসব কথা বলে আসছি। তাঁর বক্তব্যের পেছনে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। তিনি নিজের হতাশার কথাও প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে একদিকে সরাসরি আমলাতন্ত্রের প্রতিরোধের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে, অন্যদিকে পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক শক্তির ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকাও উঠে এসেছে।

তিনি সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তিনি অন‍্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব। তাঁর মতো একজন ব্যক্তির পক্ষ থেকে যখন এ ধরনের কথা বলা হয়, তখন সেটিকে বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেই দেখতে হবে।

এই বক্তব্যও যদি সরকারকে, বিশেষ করে সরকারি দলকে, নড়েচড়ে বসার এবং যথাযথ সৎ সাহস দেখানোর প্রেরণা না দেয়, তাহলে এমন সময় আসতে পারে, যখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তখন সেই প্রতিকূলতা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, বা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে কিনা, সেটি এখনই ভাবতে হবে।

আরেকটি বিষয় বলে রাখি। আমার যতটুকু ধারণা, সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও একই ধরনের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আমি যতটুকু জানি, সরকারপ্রধান ব‍্যাতিক্রমী  অনেক কিছু  করতে চান; কিন্তু বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবন্ধকতার কারণে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে না। এর কিছু দৃষ্টান্ত প্রকাশ্যেও এসেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আমলাতন্ত্রের বাধা থেকে মুক্তির উপায় কী?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: আমলাতন্ত্র ছাড়া কোনো সরকার চলতে পারে না। ফলে আমলাতন্ত্রকে বাদ দেওয়া নয়, এর সংস্কার করতে হবে।

আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রস্তাব রয়েছে। বিশেষ করে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছে, তার মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য অনেক বিষয় আছে। সেগুলো বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

আরেকটি খুব সাধারণ জায়গায় হাত দিতে পারলে আমলাতন্ত্রের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি অনেকটা কমানো সম্ভব। নতুন পে-স্কেল হয়েছে। আমরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছি, ১১ বছর পর সরকারি খাতে নতুন পে-স্কেল দেওয়া অপরিহার্য। কিন্তু এটিকে শর্তসাপেক্ষ করতে হবে।

শর্তটি হবে—যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করবেন, শুধু তাঁরাই নতুন পে-স্কেল পাওয়ার যোগ্য হবেন। যাঁরা সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করবেন না, তাঁরা নতুন পে-স্কেল পাওয়ার যোগ্য হবেন না।

আমাদের বার্তা ছিল—সরকার ইতিবাচক প্রণোদনা দিক। বেতন বাড়িয়ে দিক, দ্বিগুণ করুক; সামর্থ্য থাকলে তিন গুণও করুক। কিন্তু শুধু ইতিবাচক প্রণোদনা দিয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আমলাতন্ত্রের শুদ্ধতা নিশ্চিত করা যায় না। পৃথিবীর কোথাও শুধু প্রণোদনা দিয়ে এটি সম্ভব হয়নি।

একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, যাঁরা অনিয়ম করেন, বিধিমালা লঙ্ঘন করেন অথবা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য বিভিন্ন আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নির্ধারিত রয়েছে।

এর অন্যতম কার্যকর উপায় হচ্ছে সম্পদ বিবরণী প্রকাশ। শুধু সরকারের কাছে জমা দিলে হবে না। জনগণের সামনে প্রকাশ্যে সম্পদের হিসাব দিতে হবে।

এই চর্চা প্রতিষ্ঠা করা গেলে আমলাতন্ত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, গুম এখনও বন্ধ হয়নি। শেখ মিরাজ নামে একজনের ঘটনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: এটিও অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। গুম প্রতিরোধে একটি খসড়া আইন করা হয়েছে।

বাংলাদেশে যে কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেই সময়ে গুম, খুন ও অপহরণসহ যে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তার মূল্য পুরো দেশবাসীকে দিতে হয়েছে।

কিন্তু যাঁরা আজ ক্ষমতায় আছেন এবং সংসদে আছেন, তাঁদের অনেকেই এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। কাজেই গুম প্রতিরোধের জন্য বাস্তবসম্মত আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির প্রবল তাগিদ তাঁদের থাকার কথা।

অত্যন্ত দুর্ভাগ্য ও হতাশার সঙ্গে আমরা লক্ষ করেছি, খসড়া আইনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে গুম, খুন ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

আইনটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের দেওয়া হয়েছে, তারাই সম্ভাব্য ‘পারপিট্রেটর’ বা অপরাধ সংঘটনকারী। অর্থাৎ আমি গুম করব, খুন করব এবং আমিই নিজের বিচার করব—এ ধরনের একটি ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তদন্ত ও প্রতিবেদনের পুরো দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনের পরিবর্তে পুলিশের হাতে দেওয়া হচ্ছে।

খসড়া আইনে এমন ধারাও রয়েছে, যেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা—অর্থাৎ পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা সংস্থা বা সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত হলে তার প্রতিকারের এখতিয়ার বাস্তবে অভিযুক্তের হাতেই থাকবে।

ইতিহাস বলে, বেশির ভাগ গুমের ঘটনায় এসব সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ রয়েছে। অথচ খসড়া আইনে বাস্তবে তাদের বিচারহীনতার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

খসড়া আইনে যেসব দুর্বলতা রাখা হয়েছে, আমরা তার প্রতিবাদ করছি। আমাদের কাছে অঙ্গীকার করা হয়েছে, আইনটি পাস করার আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তবে সেই আলোচনা সত্যিই হবে কি না, আমরা নিশ্চিত নই। সত্যিকারের সংস্কারের পথে অগ্রসর হতে না পারাকে একদিকে আমি সৎসাহসের ঘাটতি বলব।

বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামায় সম্পদের হিসাব দিতে হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থীর ক্ষেত্রে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগেই কি তাঁর সম্পদের হিসাব দেওয়া উচিত নয়?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: আদর্শিকভাবে অবশ্যই থাকা দরকার। তবে এ জন্য আলাদা আইন করতে হবে। রাষ্ট্রপতি-সম্পর্কিত বিদ্যমান আইনে বিষয়টি সেভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

আবার রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব পালনের সময় আইনগত দায়মুক্তি বা ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সম্পদ বিবরণী প্রকাশের প্রশ্নটি দায়মুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যায়। এটিও একটি বিতর্কিত বিষয়।

দায়মুক্তির বিধান কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি পদত্যাগকৃত রাষ্ট্রপতির কথা বলা যায়। তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। কিছু অভিযোগ তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে এবং সেই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে, হয়তো তিনি দায়মুক্তির সুবিধা দাবি করতে পারেন।

কিন্তু রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তিনি যদি উদাহরণস্বরূপ ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার জন্য অবৈধভাবে কোনো জমি দখল করেন, তাহলে সেই অপরাধের জন্য তাঁর দায়মুক্তি পাওয়ার কথা নয়। আইনে এসব ব্যাখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে বা রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে, সেগুলোর বিচার অবশ্যই হতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগ, অবৈধভাবে একাধিক বিদেশি পাসপোর্ট রাখার অভিযোগ অথবা বিদেশে সম্পদ পাচারের অভিযোগ থাকলে সেগুলোর বিচার করতে হবে।

আমি মনে করি, বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেও এটি সম্ভব। বাংলাদেশে সাবেক রাষ্ট্রপতির দুর্নীতির দায়ে বিচার হওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। কাজেই যেকোনো রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের বিচার করার সুযোগ থাকা উচিত।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
সাক্ষাৎকারে শিরীন পারভিন হক‘আন্দোলনে থাকলেও অভ্যুত্থানের পর নারীর সামাজিক অবস্থানে পরিবর্তন আসেনি’
সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে, একটু সময় দিয়ে দেখি
একান্ত সাক্ষাৎকারে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদশ্রম খাতে সরকারের মনোযোগ এখন পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক নয়
সর্বশেষ খবর
কারাগারেই মারা গেলেন সেই আওয়ামী লীগ নেতা
কারাগারেই মারা গেলেন সেই আওয়ামী লীগ নেতা
সাকিব আল হাসানের বাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ
সাকিব আল হাসানের বাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ
কী আছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ডকুমেন্টারিতে, কেন এতো বিতর্ক
কী আছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ডকুমেন্টারিতে, কেন এতো বিতর্ক
নান্দাইলে জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের পুনর্বাসনে একাধিক ঘোষণা তথ্য প্রতিমন্ত্রীর
নান্দাইলে জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের পুনর্বাসনে একাধিক ঘোষণা তথ্য প্রতিমন্ত্রীর
সর্বাধিক পঠিত
মা-কে বিয়েতে দাওয়াত না দেওয়ায় কর্মীকে বরখাস্ত করলেন মালিক
মা-কে বিয়েতে দাওয়াত না দেওয়ায় কর্মীকে বরখাস্ত করলেন মালিক
মোকতাদিরকে জামিন দিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অচল করে দেবো: হেফাজতের মহাসচিব
মোকতাদিরকে জামিন দিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অচল করে দেবো: হেফাজতের মহাসচিব
অক্সফোর্ডের ভুয়া ডিগ্রি ও জালিয়াতি: বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাবেক এমপি প্রার্থীর কারাদণ্ড
অক্সফোর্ডের ভুয়া ডিগ্রি ও জালিয়াতি: বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাবেক এমপি প্রার্থীর কারাদণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে হট্টগোল 
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে হট্টগোল 
এনসিপি নেতা সালাউদ্দিন তানভীর গ্রেফতার, নেওয়া হচ্ছে বগুড়ায়
এনসিপি নেতা সালাউদ্দিন তানভীর গ্রেফতার, নেওয়া হচ্ছে বগুড়ায়