চট্টগ্রামে গ্যাস সংকটের ধাক্কা লেগেছে বিদ্যুৎ খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমায় বেড়েছে লোডশেডিং। প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা করে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। নগরীর চেয়ে গ্রামের অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেখানে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে নগরীর একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, গ্যাস ও লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের খুব কষ্টে জীবন কাটছে।
যদিও বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের দাবি, লোডশেডিং মাত্র ৬২ থেকে ৬৫ মেগাওয়াট। তবে গ্রাহকরা বিদ্যুৎ বিভাগের এ তথ্য মানতে নারাজ। গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামের সচল একমাত্র সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও কমেছে উৎপাদন।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) চট্টগ্রাম বিতরণ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস, ফার্নেস অয়েল, কয়লা ও পানিনির্ভর ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও গত সোমবার বন্ধ ছিল ছয়টি। এর মধ্যে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে যেগুলো সকালে বন্ধ থাকলেও রাতে চালানো হয়। আবার কিছু কেন্দ্র যান্ত্রিক ত্রুটি ও জ্বালানি সংকটে বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রামের সবকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি। তবে ৩ আগস্ট এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে অফ-পিক আওয়ারে ২ হাজার ৮১৯ দশমিক ১৪ মেগাওয়াট এবং পিক আওয়ারে ৩ হাজার ৩০২ দশমিক ৬০ মেগাওয়াট।
বিউবো সূত্রে জানা গেছে, বিউবোর বিদ্যুতের ক্ষেত্রে পিক-আওয়ার সাধারণত বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত, যখন চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। অন্যদিকে অফ-পিক আওয়ার হলো রাত ১১টা থেকে পরদিন বিকাল ৫টা পর্যন্ত, তখন বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে। এর মধ্যে ওই দিন পিক-আওয়ার বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪৭৭ দশমিক ২ মেগাওয়াট এবং অফ-পিক আওয়ারে চাহিদা ছিল ১ হাজার ৩৫২ দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগের ৩ আগস্টের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, অফ-পিক আওয়ারে বিদ্যুতের লোডশেডিং ছিল ৬৫ মেগাওয়াট এবং পিক আওয়ারে লোডশেডিং ছিল ৬২ মেগাওয়াট।
তবে নগরের হামজারবাগ সংগীত আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রবিউল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে লোডশেডিং-এর মাত্রা অনেকাংশে বেড়েছে। সকাল-বিকাল কিংবা মধ্যরাতেও লোডশেডিং চলছে। দিনে সাত-আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এর মধ্যে গ্যাসের সংকট। এসব কারণে ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাসায় থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে আমাদের। যাওয়ারও জায়গা নেই। কবে সংকট কাটবে, তাও জানি না।’
একই ভোগান্তির কথা জানিয়ে নগরের সিরাজউদ্দৌলা রোডের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এখানেও প্রতিদিন গড়ে ছয়-সাত লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ বারবার আসা-যাওয়া করায় নষ্ট হচ্ছে বাসার মূল্যবান ইলেক্ট্রিকের জিনিসপত্র। তার মধ্যে গ্যাসের সংকটে রান্না করা যায় না। খুব কষ্টে দিন কাটছে আমাদের।’
এদিকে, নগরের চেয়ে বিদ্যুতের ভয়াবহ অবস্থা গ্রামে। লোডশেডিংয়ের মাত্রাও গ্রামে বেশি। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা এলাকার বাসিন্দা মো. পিয়াল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখানে গত কয়েকদিন ধরে বিদ্যুতের মারাত্মক লোডশেডিং বেড়েছে। দিনে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ভোগান্তির শেষ নেই মানুষের।
চট্টগ্রামে গ্যাসচালিত সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রাউজানে অবস্থিত ২১০ করে মোট ৪২০ মেটাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এই দুটি ইউনিট চালু রাখতে ৪৫ মিলিয়ন করে ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয় বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।
জেলার শিকলবাহায় সচল সরকারি গ্যাস নির্ভর ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ৩ আগস্ট এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে অফ-পিক আওয়ারে উৎপাদন হয়েছে ১৮৪ মেগাওয়াট এবং পিক-আওয়ারে উৎপাদন হয়েছে ১৮৩ মেগাওয়াট।
এ ব্যাপারে শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক অসীম ব্যানার্জী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্যাসনির্ভর শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস সংকটে পুরোপুরি উৎপাদনে যাওয়া যাচ্ছে না। পুরোপুরি উৎপাদনে যেতে ৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। বর্তমানে গত কয়েকদিন গ্যাস মিলছে ২৮ থেকে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ কারণে উৎপাদনও কিছুটা কমেছে।’
চট্টগ্রা০ম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। তবে বর্তমানে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির কারণেই আবাসিক, বাণিজ্যিক ও পরিবহন-সব খাতেই গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ কমেছে। কারিগরি ত্রুটি সারানোর পর পুনরায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকবর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলে (চট্টগ্রামসহ তিন পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজার) ৩ আগস্ট অফ-পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৩৫২ দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট এবং পিক-আওয়ারে চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪৭৭ দশমিক ২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে অফ-পিক আওয়ারে ৬৫ মেগাওয়াট এবং পিক-আওয়ারে ৬২ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।’









